• সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

অন্যের সংস্কৃতিকে নিয়ে মতামত দেওয়ার অধিকার আছে কি?

  ডা. মোঃ সাইফুল ইসলাম ২০ নভেম্বর ২০১৮, ১০:২৬

সংস্কৃতি
ছবি : প্রতীকী

সমাজে কিছু ব্যক্তি আছেন যারা প্রাকৃতিকভাবেই অন্যের নৈতিকতাকে বিচার করতে চান না। কারণ তারা জানেন বিভিন্ন সমাজের বিভিন্ন ধরনের নৈতিক কোড রয়েছে। এই নৈতিক কোডগুলোর প্রতি সন্মান থাকা উচিত এবং সেগুলোকে বিচার বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।

অপরদিকে, অনেকেই বিচার করতে চান। এই বিচার-বিবেচনা হেতু পশ্চিমা বিশ্বে গত কয়েক বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বিভাগের জন্ম হয়েছে। যারা ধর্ম ও নৈতিকতার মধ্যে তুলনা করে থাকেন। এই ভাগ তাদেরকে সকল সমাজের নৈতিকতার ওপর হস্তক্ষেপ করতে প্রলুব্ধ করে।

যখন লোকজন বলতে থাকে আপনি কী করছেন, আপনার সংস্কৃতির এই এই অংশ তো ভুল! আমার স্রষ্টা এভাবে করতে বলেছেন এবং স্রষ্টা আমাদেরকে সৃষ্টি করে কিছু নিয়মের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছেন। এই যেমন, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরকে অনেকের কাছ থেকেই শুনতে হয়, গরু তাদের মা হয় কীভাবে?

এই যে, নিজের সংস্কৃতি দিয়ে অন্যের সংস্কৃতিকে বিবেচনা করার যে প্রবণতা বা পদ্ধতি তাকে বলা হয় ইথনোসেন্ট্রিজম (Ethnocentrism)। এই ইথনোসেন্ট্রিজমের বৈধতা আবার ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হতে পারে। এই যখন আপনি ভাবতে থাকেন অন্যের সংস্কৃতির ভুল ধরা অনুচিত। ঠিক তখনই আপনারই ঘনিষ্ঠ কেউ হয় নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা থেকে অন্যের সাংস্কৃতিকে ভুল বলার চেষ্টা করছে।

সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হচ্ছে নারীদের সতীচ্ছেদ তথা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন। যার জন্য সংশ্লিষ্ট সমাজকে ভিন্ন সমাজ কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী কর্তৃক সমালোচিত হতে হয়। এটিকে অনেকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলেও মনে করেন।

‘ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশ’ এর মতে সারা বিশ্বে ২০০ মিলিয়নের অধিক নারী এই সতিচ্ছেদ করেছেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এর কোন স্বাস্থ্যগত সুবিধা নেই। যদিও জোরপূর্বক এটি করানো হয় তথাপিও এর ব্যবহারিক এবং সামাজিক সুবিধার কথা জানা যায় না। অনেকের মতে, এটি মেয়েদের যৌন আবেদনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য করা হয়। ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশনকে তাই অনেকেই নিন্দা করা বৈধই মনে করে।

আবার পারস্যের একটি প্রচলিত সংস্কৃতি হচ্ছে বাবার মৃতদেহ ভক্ষণ করা। অপরদিকে গ্রীকরা তা না করে মৃতদেহগুলোকে পুড়িয়ে ফেলে। এস্কিমোরা ভাবে শিশু হত্যা নৈতিক কিন্তু আমেরিকায় শিশু হত্যাকে অনৈতিক হিসেবে গণ্য করা হয়।

মূলত প্রত্যেক সংস্কৃতির আলাদা আলাদা নৈতিক কোড রয়েছে, যার দ্বারা তারা তাদের জীবনশৈলী গঠন করে। আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ভাবনা থেকে কল্পনাও করতে পারি না কোনো মৃতদেহ ভক্ষণ বা শিশু হত্যা সঠিক। কিন্তু এই ঘটনাগুলো বিভিন্ন সংস্কৃতিতে গড়ে উঠেছে। 

আসলেই কী আমাদের অধিকার রয়েছে অন্য সমাজের এই ঐতিহ্যগত অনুশীলনগুলোকে ভুল বলা, যা তারা অতি প্রাচীনকাল থেকে অনুশীলন করে আসছে? আমাদের কী উচিত হবে আমাদের সংস্কৃতির উপাদান ও বিশ্বাসগুলোকে অন্য সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া?

নৃতাত্ত্বিকদের মতে, সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা ২৪০০ বছর পূর্ব থেকে ছিল। এর রাজনৈতিক এবং নৈতিক অর্থ রয়েছে। সকলের নিজস্ব বিশ্বাস, প্রথা ও নীতি রয়েছে। যা ভুল অথবা সঠিক নির্ভর করে যে সমাজে আপনি বড় হয়েছেন তার উপর। যে বিষয়টি আপনার সমাজে নৈতিক হিসেবে পরিচিত, অন্য সমাজে তা সম্পূর্ণ অনৈতিক হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। নৈতিকতার সার্বজনীন কোনো মান নেই।

সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা বলে আমরা অন্যের সংস্কৃতি ও কার্যক্রমকে বিচার করতে পারি না। সাধারণত লোকজন তাদের অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস থেকে অন্যের সংস্কৃতিকে বিচার করতে যায়। কিন্তু এটা তাদের জ্ঞান থেকে করে না। অধিকাংশ সময়ে আমরা আমাদের বিশ্বাস থেকে আমাদের সমাজকে গঠন করি এবং সমাজের একটা নির্দিষ্ট বৃত্ত গঠন করি। আমরা সহজে এই বিশ্বাসের পরিবর্তন করতে চাই না।

অনেক সময় একটি সমাজে কোনো প্রাণীকে কষ্টদায়কভাবে হত্যা করাকে সমর্থন করা হয়। সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা ঠিক সেটাই বলে যেটা সংশ্লিষ্ট সমাজের বিশ্বাস এবং সিদ্ধান্তের ব্যাপার। অতএব, সেই সমাজে স্বল্প সংখ্যক লোক থাকতে পারে, যারা প্রাণীটিকে কষ্টদায়কভাবে হত্যা করার বিষয়ে সহমত পোষণ নাও করতে পারেন এবং চাইলে তারা বিষয়টিকে অনৈতিক আখ্যা দিতে পারে। কিন্তু বাইরের কেউ তা বিচার-বিবেচনা না করুক।

যেমন, আমরা ফিমেল জেনিটাল মিউটিলেশন কে বাঁধা দিতে যাই কিংবা সমালোচনা করি। কিন্তু এটি যখন ঐ সকল মেয়েদের দ্বারা সাদরে গৃহীত হয় তখন কি আমাদের কিছু বলার থাকে? যখন মানুষ অন্যের সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতি দিয়ে বিবেচনা করতে থাকে তখন অন্য সংস্কৃতিকে ভুল বলেই মনে হয়। কিন্তু সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা বলে থাকে সকলের বিশ্বাস সমান এবং সম গুরুত্বপূর্ণ।

যেহেতু অন্যের সংস্কৃতি, অন্যের মত নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই এই কথাগুলো মানতে আমাদের কষ্টও হতে পারে। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভিপ্রায় হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। তবে এখন থেকে করণীয় কি সেটিও গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।

তথ্যসূত্র : বিবিসি, এফ থিংকিঙ্ক.অর্গ, লাইভ সায়েন্স। 
 

মানুষের অধিকার নিয়ে লিখবে অধিকার; লিখুন আপনিও। আপনার চারপাশে অধিকার বাস্তবায়নে আপনিও সচেষ্ট হোন, জানান সরাসরি দৈনিক অধিকারকে [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড