• সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

শিশুরও রয়েছে মত প্রকাশের অধিকার

  অধিকার ডেস্ক    ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ১৫:৩০

শিশু
শিশুকে তার মত প্রকাশ করতে দিন (ছবি: খাদিজা তাহেরা এবং মেয়ে জারাহ)

প্রেক্ষাপট ১- ছোট্ট মেয়ে নাবিলা, পড়ে ক্লাস ফোরে। রঙ আর তুলি ভীষণ প্রিয় তার। এই বয়সেই জলরঙে দারুণভাবে আঁকতে পারে গ্রামের দৃশ্য, শহরের ছবি কিংবা আরও অনেক দৃশ্য। তবে তাকে ছবি আঁকতে হয় খুব লুকিয়ে, না হয় শুনতে হয় মা-বাবার বকুনি। 

এই তো আজ স্কুলে অঙ্কন প্রতিযোগিতা। ম্যাডাম নাবিলাকে বলে দিয়েছে সে যেন অবশ্যই অংশ নেয়। কিন্তু মায়ের কড়া বারণ! সামনের বছর পিএসসি পরীক্ষা, এখন এসব আঁকাআঁকি করে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। বাবারও একই কথা। পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনো কাজে সময় অপচয় করা চলবে না।

নাবিলার কিচ্ছু ভালো লাগে না। এমনকি আজকাল বইয়ের পড়া পড়তেও ভালো লাগে না তার। আগে হোমওয়ার্ক শেষ করার পর ছবি আঁকার জন্য কিছু সময় দিত, এখন আর তাও দেয় না। সময় নষ্ট হবে বলে মা-বাবা কোথাও ঘুরতেও নিয়ে যায় না। ধীরে ধীরে ভীষণ রকম একাকীত্ব গ্রাস করে নেয় নাবিলাকে। 

প্রেক্ষাপট ২- সপ্তম শ্রেণির কিশোর সুলভ। প্রিয় কাজ স্কুল শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলা। তবে গত দু সপ্তাহ তার ফুটবল খেলা আর  হচ্ছে না। মা তাকে গানের ক্লাসে ভর্তি করিয়েছেন। তার ইচ্ছা ছেলেকে গায়ক বানাবেন। স্কুল শেষেই তাই দৌড়াতে হয় গানের ক্লাসে। 

একবার অবশ্য মা কে নিজের পছন্দের কথা জানিয়েছিল সুলভ। মা ঝাড়ি মেরে জানিয়ে দিয়েছেন, সে ছোট মানুষ! নিজের ভালো সে বুঝবে না। মা যা বলবেন তাই হবে। সা রে গা মা... সুর তুললেও সুলভের মন পড়ে থাকে স্কুলের মাঠে বন্ধুদের কাছে। এক সময় ভেবেই নেয়, পরিবারে তার চাওয়া বা ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। তাই চুপচাপ থাকাই এখন তার ভালোলাগার কাজ। 

উপরের প্রেক্ষাপট দুটি কাল্পনিক হলেও আমাদের সমাজে নাবিলা আর সুলভের মতো অসংখ্য শিশু রয়েছে। শখ যাদের নির্ভর করে মা-বাবার চাওয়ার ওপর, মত প্রকাশ করার ফলে যাদের শুনতে হয় অভিভাবকের বকুনি। 

অথচ একবিংশ শতাব্দীতে সমাজ বিজ্ঞানী ও নীতি-নির্ধারকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সামাজিক বিকাশে ও সমাজের অমূল পরিবর্তন এবং উন্নতিতে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সকলের মতামতসহ পূর্ণ অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন। অন্য সবার মতো শিশুদেরও রয়েছে সমাজে অংশগ্রহণের অধিকার, নিজের মত প্রকাশের অধিকার। 

অনেকে হয়তো বলবে, ‘শিশুরা আবার কীভাবে সমাজে অংশ নেবে? তাদের কাজ কী?’ মূলত সমাজে শিশুর অংশগ্রহণের যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো অন্যদের সঙ্গে মেলামেশার অধিকার, তথ্য কিংবা ধারণা গ্রহণ করা ও প্রকাশ করার অধিকার, মতামতের মূল্য পাবার অধিকার। 

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ধারা- ১২’তে শিশুদের অংশগ্রহণ সম্পর্কিত সব বিষয়ের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অবাধে মত প্রকাশের অধিকার দেওয়া হয়েছে। পুরো বিশ্বের ন্যায় আমাদের দেশেও এই অধিকারের বাস্তব রূপ দেওয়া কথা। অথচ, সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুদের মত প্রকাশের অধিকার রয়ে যাচ্ছে চির অধরা। 

প্রত্যেক মা-বাবার উচিত সন্তানকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া। হতে পারে সে যা বলছে তা ভুল। সেক্ষেত্রে অভিভাবক হিসেবে আপনার উচিত হবে তাকে তার চাওয়া বা ইচ্ছা কেন ঠিক হবে না তা বুঝিয়ে বলা। প্রায়ই মা-বাবা সন্তানকে “তুমি এসব বুঝবে না” বলে থামিয়ে দেন। এমনটা না করে মাঝেমধ্যে তাকেও বলার সুযোগ দিন। 

মাঝেমধ্যে ছোটোখাটো বিষয়ে শিশুর মত জানতে চান। এতে সে বুঝবে পরিবারে তারও গুরুত্ব রয়েছে। পরবর্তী সময়ে শিশু এর ফলে হয়ে উঠবে বিচক্ষণ যা তার চারিত্রিক গঠন ও মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। 

শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ছোট ছোট দায়িত্ব নিতে শেখান। হতে পারে চকলেটগুলো গুছিয়ে রাখা, সবার মধ্যে কোনো খাবার ভাগ করে দেওয়া কিংবা ছোট্ট কোনো বিষয়ে খেয়াল রাখা। এতে শিশু একজন দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ পাবে। 

অপরদিকে শিশুর মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুন্ন হলে সে সবকিছুতে অনাগ্রহী হবে। নিজেকে গুটিয়ে নেবে নিজস্ব জগৎ থেকে, যা মোটেও শুভকর কিছু নয়। 

সুতরাং, থামিয়ে না দিয়ে শিশুকে তার কথা বলতে দিন, তার মত প্রকাশ করতে দিন। শিশুর শখগুলো ভালো হলে তাকে তাই করতে দিন। অভিভাবক হিসেবে শিশুর সঙ্গে আন্তরিক হওয়া আপনার কর্তব্য। 

মানুষের অধিকার নিয়ে লিখবে অধিকার; লিখুন আপনিও। আপনার চারপাশে অধিকার বাস্তবায়নে আপনিও সচেষ্ট হোন, জানান সরাসরি দৈনিক অধিকারকে [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড