• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন

অমরত্ব নয় দরকার স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার

প্রতি মিনিটে বিশ্বে একজন অস্বাভাবিক কারণে মারা যায়

  এস এম সোহাগ ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:৩৩

মানুষ জন্মের পরে মৃত্যুকে নিশ্চিত জেনেই জীবন অতিবাহিত করতে থাকে, তবে ধ্রুব সত্য এই মৃত্যু হোক স্বাভাবিক। ছবি : সম্পাদিত

'জন্মিলে মরিতে হবে,
অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?'

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভূমি’ কবিতা থেকে নেয়া, মৃত্যুর স্বাদ জীব মাত্রই নিতে হবে। মানুষ জন্মাবে, মানুষ মরবে, প্রকৃতির সবচেয়ে স্পষ্ট নিয়ম। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মোট জনসংখ্যা ৭৬৬ কোটি ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২২১ জন। প্রতি ২ সেকেন্ডে পৃথিবিতে জন্ম নেয় ৩ জন আর মৃত্যু হয় ২ জনের। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ মানুষের জন্ম হয় আর মারা যায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার, ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক জনসংখ্যার তারতম্য প্রায় দেড় লক্ষাধিক।

প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায় নানা কারণে, দুর্ভাগ্য হলেও সত্য হলো যার মধ্যে অস্বাভাবিক মৃত্যু সিংহভাগ। স্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের যতটা না নাড়া দেয় অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের মধ্যে তারচেয়ে বেশি দাগ ফেলে যায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২০১৬ সালে বিশ্বে সহিংসতার ফলে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার, যে হিসাবে প্রতি মিনিটে কেউ না কেউ সহিংসতার কারণে মারা যায়। 

মানুষের জন্মের সঙ্গে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে আসে এই ধরণীতে, তা হলো মৃত্যু। বৈজ্ঞানিক কি ধর্মীয় কোথাও এর ব্যত্যয় ঘটে না, সর্বত্র মৃত্যুকে মানব জীবনের একমাত্র চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি মানুষের জন্মের পরে যে জীবন শুরু হয় তা মৃত্যুর মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে। মৃত্যু প্রতিটি জীবের জন্যে যেমন অনিবার্য, মানুষের জন্যে জীবনের স্বাভাবিক সমাপ্তি নিশ্চিত করাটা প্রতিটা রাষ্ট্রের একটা মৌলিক দায়িত্ব।

ছবি : সম্পাদিত 

মানুষ বাঁচতে চায়, কিছু মানুষ বাদে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই বাঁচতে চায়, হতে চায় অমর। কিন্তু, মৃত্যুই সবচেয়ে চরম সত্য। আজ পর্যন্ত মৃত্যুর হাত থেকে কেউ রক্ষা পায়নি, ভবিষ্যতেও পাবে না। এই চরম সত্যিটা জেনেও আমরা মরতে চাই না। তারপরেও প্রস্তুত থাকি, একদিন তো মরতে হবেই। আর মৃত্যুটা হবে স্বাভাবিক এই আশা নিয়েই বেঁচে থাকি।

জীবন ও মৃত্যু একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পেতে চাই। পৃথিবীতে হাজারো অনিয়ম থাকলেও এই পৃথিবী চির মাধুর্যমণ্ডিত। পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু, প্রাণিকে আমি ভালোবাসি। এ ভালোবাসা যে অন্তহীন।

মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি জীব। মানুষের মন, বিবেক, বুদ্ধি, শিক্ষা, পাপ-পূণ্যের হিসাব বোধ আছে। এই পাপ পূণ্যের মাঝেই মানুষের ইহকাল পরকালের হিসাব নিয়ে বেঁচে থাকা। উপনিষদদের‌ ভাষায় মানুষ অমৃতের সন্তান। বাইবেল বলে, সে ঈশ্বরের সন্তান। কুরআনের ভাষায় এক আদমের সন্তান, আশরাফুল মাখলুকাত সৃষ্টির সেরা জীব। আর এই সৃষ্টির সেরা জীব মানুষতত্ত্ব ধর্ম ভুলে অসংখ তন্ত্র, মন্ত্র, জাতি, গোত্র, মতবাদে বিভক্ত। লিপ্ত হয়েছে হানাহানিতে। জীবন সত্যকে টুকরো টুকরো করে কেটে বন্টন করেছে। মৃত্যু দেওয়ার মালিক প্রাণ দাতার। মানুষ হিংস্রতার আশ্রয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুকে অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ঠেলে দেয়।

মহাভারতে উল্লেখ আছে, যক্ষ রূপি ভগবান একদিন যুধিষ্ঠিরকে জিজ্ঞেস করল,”বলো দেখি পৃথিবীতে আশ্চার্য কি? উত্তরে যুধিষ্ঠির বলিল, প্রত্যেক দিনই পৃথিবীতে হাজারো মানুষ মরছে, কিন্তু সকলেই বাঁচতে চায়, অন্যায় করে, খুন করে, লোভ করে, জমি দখল করে, হানাহানি, ধর্ম-জাতি নিয়ে বিবেধ সৃষ্টি করে। এটাই আশ্চর্য।

ছবি : সম্পাদিত 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গ্লোবাল ক্যাম্পেইন ফর এডুকেশনের (জিসিই) ভাইস প্রেসিডেন্ট রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, রাষ্ট্র মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না। সন্ত্রাস এখন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে আপারগ্রাউন্ডে উঠে এসেছে, যা ব্যাধির মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। শিঘ্রই এটি রোধ করা না গেলে দেশের সব অর্জন বৃথা যেতে পারে। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক আলোচনাসভায় তিনি এসব কথা বলেন।

ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (আইএইচডি) ও জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্ট (এনএফটিই) যৌথভাবে এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাসী ধরা হয় কিন্তু বিচার হয় না। সন্ত্রাসী ধরার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় ধূম্রজাল। এ যাবত একজন সন্ত্রাসীরও বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতার কারণেই সন্ত্রাসের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি হচ্ছে ভয়াবহ। তিনি আরও বলেন, আজ প্রমাণ হচ্ছে অবৈধ উপার্জনকারীর ঘরে মূল্যবোধ তৈরি হয় না।

অস্বাভাবিক মৃত্যু কি? 

মানুষ যেদিন জন্মে সেদিন থেকেই তার মৃত্যুর জন্যে জীবন অতিবাহিত হতে থাকে, মৃত্যু প্রায় সর্বদাই অনাকাঙ্ক্ষিত,তবুও অপ্রতিরোধ্য এই মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই আশা করা হয়। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ মারা যাবে সেটাকে আমরা স্বাভাবিক মৃত্যু বলি। দুর্ঘটনা, রোগ, সহিংসতা, খুনসহ এমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে যদি মানুষের মৃত্যু ঘটে তাহলে তাই হবে অস্বাভাবিক মৃত্যু। প্রতিটা মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার থাকলেও রোজ বিশ্বে সহস্রাধিক মৃত্যু ঘটে অস্বাভাবিক কারনে। 

বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ও কারণ

বিশ্বব্যাপী প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক যে কোনো কারণেই হোক মানুষ মরছে। মানুষের মৃত্যু সর্বদাই খুব ব্যথিত করে, আর তা যদি হয় অস্বাভাবিক কারণে তবে সেই কষ্টের সীমা থাকে না। অস্বাভাবিক মৃত্যুর বহু ধরন আছে, রোগ, সহিংসতা,দরিদতা, ক্ষুধা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ এমন অনেক কারণে রোজ মানুষ মরছে। এসবই হলো অস্বাভাবিক কারণ, অস্বাভাবিক কারণে মৃত্যুর সংখ্যা রোজ বাড়ছে। 

ছবি : গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ

রোগ : 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ২০১৭ সালে অস্বাভাবিকভাবে লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। যাদের মধ্যে উপরের অবস্থানে থাকার কারণ হলো- রাজনৈতিক সহিংসতা, দুর্ঘটনা, হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জীবাণুবাহিত রোগ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অবস্থিত ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন, বিশ্বব্যাংক ও ল্যানসেটের যৌথ বিশ্লেষণে মৃত্যুর প্রধান পাঁচটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। মৃত্যুর অন্য তিনটি প্রধান কারণ হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ (সিওপিডি), ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের নিচের অংশের সংক্রমণ (লোয়ার রেসপিরেটরি ইনফেকশন)।

১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ১৯৫টি দেশ ও ভৌগোলিক অঞ্চলের ৩০০ রোগ ও আঘাতের তথ্য নিয়ে এই বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত গবেষকেরা বলছেন, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, টিকা কর্মসূচি, ঘরের অভ্যন্তরীণ বায়ুর মান এবং পুষ্টির উন্নতি দরিদ্র দেশগুলোর শিশুদের দীর্ঘদিন বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। পাশাপাশি স্থূলতা, রক্তে উচ্চমাত্রায় শর্করার উপস্থিতি, মদ্যপান ও মাদকের অপব্যবহার বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে।

মৃত্যুর কারণ হিসেবে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন, বিশ্বব্যাংক ও ল্যানসেটের যৌথ বিশ্লেষণ যে ৫ টি রোগের কথা বলা হয়েছে তা হলো যথাক্রমে : ১. মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ ২. হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির রোগ ৩. দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ৪. ডায়াবেটিস ৫. শ্বাসতন্ত্রের নিচের অংশের সংক্রমণ।