• সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ৩ পৌষ ১৪২৬  |   ২১ °সে
  • বেটা ভার্সন

সাবিনা : বোরকা পরার অধিকার আদায়ে সাহসী এক কিশোরী

  ডা. মোঃ সাইফুল ইসলাম ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৩১

সাবিনা
সাবিনা (ছবি : সম্পাদিত)

সাবিনা, যে ছিল মাত্র ১৬ বছর বয়সী এক স্কুল পড়ুয়া কিশোরী। এই বয়সে যেকোনো কিশোর-কিশোরী স্বভাবতই স্কুলের নিয়ম-নীতি মেনে চলবে। বাকি সব বন্ধু-বান্ধবের সাথে একই নিয়মনীতি মেনে চলার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তবে ছোট বয়সে ধর্মীয় রীতিনীতি মানার শিক্ষা যারা অর্জন করে তারা হয়তো সহজে তা ছাড়তেও পারে না। সাবিনাও ছিল তেমনই একজন। যার জন্য ইংল্যান্ডের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মুসলিম মেয়েদের ধর্মীয় পোশাক যিলবাব বা বোরকা পরিধান করার অনুমতি মেলে। তবে এই অনুমতি পাওয়ার ঘটনাটি মোটেও সুখকর ছিল না সাবিনার জীবনে।

সাবিনা নিয়মিত সালোয়ার কামিজ পরিধান করেই স্কুলে যেত। এই সালোয়ার কামিজ নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের কোনো সমস্যা ছিল না। এরই মধ্যে ৯/১১ ঘটনা ঘটে যায়। এই ঘটনার পর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়। আর যে লড়াইয়ের প্রধান লক্ষ্যই ছিল মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করা। ৯/১১ ঘটনার কিছুদিন পর বিশ্ব পরিস্থিতি ও বিভিন্ন দেশ যখন মুসলমানদের সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলছে তখন অর্থাৎ ২০০২ সালে সাবিনা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যিলবাব পরিধান করে স্কুলে যাবে! 

সাবিনা ছিল ইংল্যান্ডের বেডফোর্পশায়ারের লুটনে অবস্থিত ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। সালোয়ার কামিজ পরিধান করে নিয়মিত স্কুলে গেলে সমস্যা না হলেও যিলবার পরিধান করে স্কুলে যাওয়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষ সাবিনাকে তা পরতে বাধা দেয়। সাবিনা বাধা অমান্য করলে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ফলে সাবিনা ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার অধিকার হারায়, সেই সাথে হারায় নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের অধিকার।

একদিকে সাবিনার ধর্মীয় মূল্যবোধ, অন্যদিকে পড়াশোনা করে জ্ঞানার্জনের তীব্র আকাঙ্খার কারণে, সাবিনা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নিবে।

সাবিনা আইনের আশ্রয় নিল। মামলা করল ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নামে। বিশেষ করে মামলায় নাম উঠে এসেছিল স্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক স্টুয়ার্ট মুরের। এই মামলায় সাবিনাকে সহায়তা করছিল তার ভাই শুয়েব রহমান ও মা। কিন্তু মামলা চলার কিছুদিন পর সাবিনার মা মারা যায়। মা-বাবা হারানো সাবিনা তার সংগ্রামের পথ থেকে পিছপা হয়নি। যদিও বেশ কয়েকবার তার স্কুল থেকে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল মামলা তুলে নেওয়ার।

২০০২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাবিনা মামলায় হেরে যায়। বিচারক জানায়, স্কুলের নিজস্ব পোশাক নীতি প্রয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে। তাই তারা সাবিনার ওপর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। এছাড়াও সাবিনাকে জানানো হয় অন্য কোনো স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে।

মামলায় হেরে যাওয়ার ফলে সাবিনাসহ বাকি সকল শিক্ষার্থী নিজস্ব ধর্মীয় রীতি স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার হারিয়ে ফেলে। অতঃপর সাবিনা ভিন্ন একটি স্কুলেও ভর্তি হয়েছিলেন। তবুও যিলবাব ছাড়েননি। ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মামলায় জিতে ব্যাপক আনন্দিত হয়েছিলেন। তারা ভেবেই নিয়েছিলেন সাবিনা পরাজয় মেনে নিয়ে অন্য স্কুলেই পড়াশোনা করবে।

কিন্তু সাবিনা ভাবল, যদি ইংল্যান্ডেরই অন্য স্কুলে যিলবার পরিধান করার অনুমতি মেলে তবে ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয়ে সেই অধিকার থাকবে না কেন? এই ভেবে সাবিনা আবারও মামলার রায় পুনর্বিবেচনার জন্য উচ্চ আদালতের স্মরণাপন্ন হয়।

উচ্চ আদালতে লর্ডস জাস্টিস ব্রুক, ম্যামারি এবং স্কট বেকার সাবিনার পক্ষে কথা বলেন। তারা বলেন ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয় অন্যায়ভাবে সাবিনাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করেছে ও তার পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করেছে। এই তিন বিচারকের সিদ্ধান্ত সাবিনার পক্ষে যায় ও উচ্চ আদালতে মামলা রায় সাবিনার পক্ষে দেয়। এর ফলে সাবিনা পুনরায় ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার অনুমতি পায়। এছাড়াও মামলা পরিচালনার জন্য সাবিনার খরচকৃত অর্থ ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয়কে প্রদান করতে বলা হয়।

ডেনবিগ উচ্চ বিদ্যালয়ে এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ ছিল মুসলিম শিক্ষার্থী। যার মধ্যে হয়তো একজনই ছিল সাবিনা। অদম্য সাহসী সাবিনা। যার জন্য আজও ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোতে যিলবাব পরিধান করাকে কেউ নিষেধ করার সাহস পায় না। এই ঘটনা তৎকালীন বিশ্ব মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। তাছাড়া এই মামলা জয়ে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম মেয়েদের নিজস্ব ধর্মীয় চিন্তাচেতনা পালনের অধিকার পেয়েছে বলে মনে করছিল সাবিনা নিজেই।

শতকরা মাত্র ৫ ভাগ মুসলিম জনসংখ্যার দেশে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর সংগ্রাম আজও হয়তো সেখানকার যিলবাব পরিধেয় কিশোরীদের নাড়া দেয়। হয়তো এই সংগ্রামের কাহিনী জানার পর, আজও সংখ্যালঘু মুসলিম জনসংখ্যার দেশে যিলবাব পরিধেয় কোনো কিশোরীকে হেঁটে যেতে দেখলে সাবিনার কথাই মনে পড়বে আপনার।

তথ্যসূত্র : দ্যা গার্ডিয়ান, বিবিসি, টেলিগ্রাফ।
 

মানুষের অধিকার নিয়ে লিখবে অধিকার; লিখুন আপনিও। আপনার চারপাশে অধিকার বাস্তবায়নে আপনিও সচেষ্ট হোন, জানান সরাসরি দৈনিক অধিকারকে [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ই-মেইল: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড