• মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬  |   ১৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সফলতার পেছনের গল্প : পর্ব ৭

১২.৫ মার্ক কাটার পরেও মেডিকেলে চান্স পাওয়ার গল্প

  হুমাইদ আমিন

১৬ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৪৮
মেডিকেল
ছবি : প্রতীকী (ইনসেটে লেখক হুমাইদ আমিন)

সবার জীবনেই নাকি নির্দিষ্ট একটি স্বপ্ন থাকে। কিন্তু ছোটবেলায় আমি কখনো ইঞ্জিনিয়ার, কখনো পুলিশ, কখনো বা পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কখনো ডাক্তার হওয়ার কথা কল্পনাও আসেনি। আস্তে আস্তে বড় হলাম, জ্ঞানের পরিধি স্বভাবতই বাড়ল। তারপর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সাব্জেক্টটি অনেক ভালো লাগত।এর পেছনে কারণ কী তা এখনো জানি না।

যাইহোক,আমার জীবনে সবই ঠিকঠাক ছিল। তবে, পরিবারের ইচ্ছা ছিল তাদের সন্তানের কেউ যেন মেডিকেলে পড়ে ডাক্তার হয়ে সেবা প্রদান করে। অবশ্যই, আমার বোনের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। ২০১৫ সাল। আমার বোন এইচএসসি দিল। মেডিকেলের জন্য পড়া শুরু করল। তখন আমি এসএসসি দিয়ে স্কুলের বারান্দা পার করিনি। মেডিকেল অ্যাডমিশন টেস্টের পর রেজাল্ট আসল। আমার বোন চান্স পেল না। সবার মন খারাপ। সে আর কোথাও এক্সাম দেয়নি, সেকেন্ড টাইম ট্রাই করবে। আবার প্রস্তুতি নিল।

২০১৬ সাল। ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ থেকেই  আমার এসএসসি পরীক্ষা শুরু। ভালো মতো পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্টও আসল কিছুদিন পর। আলহামদুলিল্লাহ্। সব সাব্জেক্টেই এ প্লাস। কলেজে অ্যাপ্লাই করলাম, চট্টগ্রাম কলেজ ছাড়া অ্যাপ্লাই করা বাকি সব কলেজে চান্সও পেয়েছি। কিন্তু, সংগত কারণে কোথাও অ্যাডমিট হতে পারলাম না। কোনোভাবে অ্যাডমিশন নিলাম চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজে, যে কলেজের নাম শুনলেই অধিকাংশ মানুষ মুখ বাকা করে ফেলত, ভালো হোক আর খারাপ আমারই কলেজ। তাই,আমার খারাপ লাগতো বেশি। অ্যাডমিশনের পরও অনেক কেঁদেছি।

যাই হোক, ১৬ সালের মেডিকেল এক্সামও হলো। রেজাল্ট এসেছে দুই দিন পর। ঐ দিন সোমবার ছিল। সন্ধ্যার পরই রেজাল্ট, আমার বোন চান্স পায়নি। মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল। আমার বোনের লালিত স্বপ্ন শেষ, সঙ্গে আমার পরিবারের স্বপ্নও। ঐ দিন থেকে আমার স্বপ্ন হলো ডাক্তার হওয়া, এর আগে চিন্তাই করিনি। আমার কলেজ জীবন ও রীতিমতো কাটতে লাগল।

১৭ সালে আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে। পড়া অনেক কঠিন! বায়োলজি পড়লেই কান্না আসত, কিছুই বুঝতাম না। হিন্দি মুভি ‘তারে জামিন পার’র ‘ঈশান’ এর মতো অবস্থা ছিল। ঈদুল ফিতরের পর বন্ধু রায়হানের কথা মতো গেলাম ‘মিল্টন দা’ এর বায়োলজি ব্যাচে। যেদিন গেলাম ঐ দিন ‘রক্ত সংবহন’ চ্যাপ্টারটি শুরু হলো। বেসিক ক্লাস। কী অসাধারণভাবে ভাইয়া পড়া বুঝিয়ে দেয়! জাস্ট ওয়াও! রেগুলার ব্যাচে যেতাম। শুধু একদিনই ভাইয়ার ক্লাস মিস করেছি ইন্টারের আগে। এই থেকেই মোড়টা ঘুরে গেল। বায়োলজি আর ভয় লাগে না বরং ভালোই লাগে। টেস্ট এক্সাম হলো। টেস্টের পর লম্বা ক্লাস দিয়ে ভাইয়া বায়োলজি কোনোভাবে শেষ করাল, যদিও ‘ধারাবাহিকতা’ চ্যাপ্টারটি পড়াননি।

২০১৮ সাল। এইচএসসি এক্সাম। আমার কেন্দ্র হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ। প্রথম পরীক্ষা বাংলা। ভালোই দিলাম। তবে ঐ দিনই বুঝে গেলাম এই কেন্দ্রে এক্সাম দিয়ে যাওয়াটা কঠিন হবে। স্যাররা প্রতিনিয়ত খোঁচা দিত, অবশ্যই আমাদের কলেজের প্রতি সবারই বিরূপ ধারণা ছিল। তাই বলে আমরা সবাই দুর্ভোগ পোহাব সেটা মানতে আজও পারি না। পরীক্ষা শেষ। থিওরি ভালোই হলো, প্র‍্যাক্টিকালে যদি ভালো নাম্বার পাই তাইলে ইনশাআল্লাহ্ জিপিএ-ফাইভ থাকবে। আর না হয় ৪.৮ থাকবে। কিন্তু ৪.৬ এর নিচে রেজাল্ট যাবে তা রেজাল্টের আগ পর্যন্ত চিন্তা করিনি।

আচ্ছা, বাকি কথাই আসি। যেহেতু, মেডিকেল ইচ্ছে ছিল তাই আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম মিল্টন ভাইয়ের মেডিকেল ব্যাচে পড়ব। বাসায় জানালাম, রাজি হলো। ভাইয়ার পড়ার প্রতি আমার অনেক আস্থা ছিল। প্রথম দিকে ব্যাচে যেতামই না, এক্সামও দিতাম না। হায়েস্ট মার্ক যেখানে ৯৫ সেখানে আমার স্কোর থাকত ৬০ এর ঘরে। প্রথম ১০০ নং এর পরীক্ষায় হায়েস্ট ৯৪। পেয়েছিল ‘লাবিবা’। সে এখন হবিগঞ্জ মেডিকেলে। আমি পেলাম ৬০! এর কিছুদিন পর রেজাল্ট। রেজাল্ট দেখেই আমি অবাক। ৪.৫, মেডিকেল এক্সাম দিলেই ১২.৫ কাটা যাবে। পরিবারের অবস্থা খুবই খারাপ, সবাই হতাশ। তাদের স্বপ্ন আবারও ধ্বংস হতে যাচ্ছে।

রেজাল্টের পর থেকেই ভালোভাবে পড়া শুরু করলাম। মোটামুটি ভালো নম্বর পেতাম সব এক্সামে। রেগুলার ভালো করার পর মিল্টন ভাইয়ার নজরেও আসলাম, কনফিডেন্সও বাড়ল। এরপর সব পরীক্ষাতেই হয়ত আমি প্রথম নয়ত লাবিবা। সে প্রথম হলে আমি সেকেন্ড। অবশ্যই তাকে ক্রস করতে অনেক বেগ পেতে হতো। কোচিং প্রায় শেষ। অক্টোবরের ৫ তারিখ পরীক্ষা। ১২.৫ কাটবে আর এটায় প্রধান বাধা। শুক্রবার মাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) গেলাম এক্সাম দিতে। প্রশ্ন এত সহজ কেন? আমার মনে হলো এত সহজ প্রশ্নে আমার চান্স হবে না। এক্সাম ভালো হলো, ভয় একটা। ঐ ১২.৫।

বাসায় এসে প্রথমে মিল্টন ভাইকে কল দিলাম। বললাম, এক্সাম বেশ ভালো হয়েছে। সবার কাছে জানতে পারলাম প্রশ্ন কঠিন যদিও আমার মনে হয়নি। ৭ অক্টোবর বন্ধু রায়হানকে নিয়ে ঘুরতে গেলাম সিআরভি। ঐ দিন রেজাল্ট দেবে জানতাম না। দুপুরে রিকশা থেকে নামলাম, সঙ্গে সঙ্গে  হৃদয়ের কল। ‘বন্ধু রেজাল্ট দিয়েছে, পেয়েছিস?। আমি কাঁপতে শুরু করলাম। বাসায় এসেই মোবাইল নিলাম, কোনোভাবেই রেজাল্ট পাই না। পাশে ছিল শুধু আম্মু আর বড় বোন। ভাইকে রোল দিলাম, ভাই সঙ্গে সঙ্গে কল দিল। পড়ে শুনালো আমার আমলনামা। টেস্ট স্কোর ৭৫.৫। ১২.৫ কেটে মেরিট স্কোর ২৬৩.allotment:khulna..সঙ্গে সঙ্গেই লাফ দিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরলাম আর আপু আমাকে। আহ! কী শান্তি লাগে! মিল্টন ভাইকে কল দিয়ে জানালাম মিরাকলের কথা। ভাইয়াও অবাক এবং খুশি। আব্বুকে কল করে জানালাম কিছুক্ষণ পর। শুনেই কেঁদে দিল আমিও কাঁদলাম। খুশির আমেজ এখনো কাটে না। ৭ তারিখটি যদি আবার পেতাম।

১২.৫ আমার জন্য লাকি নাম্বার এই নাম্বারটা আমাকে বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার প্রেরণা হবে ইনশাআল্লাহ্। এখন, আরেকটা স্বপ্ন। বড় ডাক্তার হয়ে বড় কিছু করা। ইনশাআল্লাহ্,আমি এটিও পারব।

লেখক : শিক্ষার্থী, খুলনা মেডিকেল কলেজ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন সজীব 

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড