• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রক্তস্নাত একুশের আত্মত্যাগেই আমাদের বাংলা ভাষা

  বিথী আক্তার

২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:০৪
শহীদ মিনার
শহীদ মিনার (ফাইল ছবি)

‘নানান দেশের নানান ভাষা, বিনে স্বদেশী ভাষা মেটে কি আশা?’- রামনিধি গুপ্তের রচিত পঙক্তিটি বাঙালি জাতির হৃদয়ের কথা বলে। মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে স্বদেশী ভাষায় যে প্রশান্তি পাওয়া যায় তা অন্য কোনো ভাষায় পাওয়া যায় না। তাইতো প্রতিটি বাঙালিই বাংলা ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রয়োজনের তাগিদে অন্যান্য ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করলেও দিনশেষে বাংলা ভাষাকে আঁকড়ে ধরতে, ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে জীবন উৎসর্গেও পিছুপা হয়নি বাঙালি জাতি।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজনে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতিতে বিস্তর ফারাক থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় পূর্ববঙ্গ। ফলে নবগঠিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা গঠনকালে বিতর্ক শুরু হয়। তদানীন্তন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্বেও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনা করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। পূর্ব বাংলার মানুষও বসে ছিল না। তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিতে তমুদ্দিন মজলিস গঠন করে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানায়। তারপর ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করলে প্রতিবাদে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলার মানুষ। শুরু হয় মাতৃভাষার মর্যাদা আদায়ের আন্দোলন।

বাঙালির প্রতি অবহেলা, অবিচার, চাপিয়ে দেওয়া অন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গণ আন্দোলনের ঝড় ওঠে। বাঙালি জাতিকে দমিয়ে রাখতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। কিন্তু মায়ের ভাষার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা, মর্যাদা রক্ষার স্পৃহা দমিয়ে রাখতে পারেনি কোনো কিছুই। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারী সরকারের জারিকৃত ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাস্তায় নামে বাংলার মানুষ। সেদিন পুলিশের গুলিতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে অমর হয়েছেন রফিক, সালাম, বরকত, জাব্বারসহ আরও অনেকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। ফলশ্রুতিতে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত হয় বাংলা।

বায়ান্নর একুশ শুধু ভাষার অধিকার অর্জনের ইতিহাস নয়। এই একুশে নিহিত রয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হয়েছিল বাঙালি জাতি। রক্তস্নাত একুশের আত্মত্যাগেই বাংলা ভাষা এবং বাঙালি জাতি বিশ্ব দরবারে সম্মানিত হয়েছে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ফলে শুধু বাঙালিরাই নয়, বৈশ্বিক পর্যায়ে কোটি মানুষ বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে দিনটি উদযাপন করে। যা বাঙালি জাতির জন্য নিঃসন্দেহে আনন্দের ও গৌরবের।

বঙ্গবন্ধু যেমনটি বলেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। ঠিক তেমনি বাংলা ভাষা যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তা ধরে রাখাও কঠিন। বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত ভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে যথাযথ ব্যবহার, চর্চা এবং সমৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তরুণ প্রজন্ম ভাষা চর্চা, বই পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যা ভাষা, সাহিত্যের বিকাশে অন্যতম অন্তরায়।

প্রতিবছর জমকালোভাবে বইমেলার আয়োজন করা হলেও বই বিক্রির পরিসংখ্যান হতাশাজনক। এমনকি একসময় বই উপহার দেওয়া নেওয়ার যে প্রবণতা ছিল তা এখন নেই বললেই চলে। আধুনিকতার নামে এসব এখন সেকেলে বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। অন্য দিকে, ইংরেজির প্রতি ঝুঁকে পড়ছে বর্তমান প্রজন্ম। অন্য ভাষায় দক্ষতা অর্জন অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু আশঙ্কাজনক বিষয় এই যে, এখন কারো যোগ্যতা বিচারের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে ইংরেজি। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজি শেখা প্রয়োজন। কিন্তু এর প্রভাব যেন আমাদের চিত্ত, চেতনায় বাংলা ভাষার তাৎপর্যকে ভুলিয়া না দেয়; সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

এছাড়াও তরুণ প্রজন্মের মাঝে বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় কথা বলার প্রবণতা লক্ষণীয়। এমনকি বর্তমানে গান, নাটক, সিনেমার সংলাপেও একইভাবে ভাষাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এসব বিকৃতি রোধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। অন্য কোনো ভাষায় আশ্রিত হয়ে কিংবা ভাষাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের মাঝে কোনো মহত্ত্ব নেই। বরং যথাযথ ব্যবহারে ভাষার সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখাই সম্মানের। এই মানসিকতায় অনড় থাকতে হবে। তবেই বাংলা ভাষার অর্জিত মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড