• সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে ‘অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম’

  রিয়াজুল ইসলাম

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:২২
অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম
মতামত প্রদানকারী শিক্ষার্থীরা (ছবি : দৈনিক অধিকার)

করোনার উচ্চ সংক্রমণের কারণে সারাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়লে আশার আলোর মতো দেখা দিয়েছিল ‘অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম’। কিন্তু বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে সেই আশার আলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। করোনাকালীন অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জহির উদ্দিন বলেন, মহামারির প্রবল দুঃসময়ে অনলাইন ক্লাস সশরীরে পাঠদানের বিকল্প হিসেবে অকল্পনীয় উপকার করেছে। যেই প্রতিষ্ঠান বা যারা এটাকে দ্রুত কাজে লাগাতে পেরেছে তারা বাকিদের থেকে একধাপ এগিয়েছে। অনলাইন ক্লাসে প্রাইভেটসহ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিযোজন চোখে পড়ার মতো ছিল। তবে এটাকে কোনো অবস্থায়ই সশরীরে ক্লাসের পরিপূরক বলা যাবে না।

বর্তমান সময়ে একথা আরও বেশি সত্য যে, মহামারির প্রথম দিকে আমরা উপায়হীনভাবে যতটুকু মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি, সে চেষ্টায় এখন ভাটা পড়েছে। এখন অনলাইন ক্লাসের প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অবসন্ন লাগে। এটা ভেবে বেশি খারাপ লাগে, যেই আমি প্রতিদিনের প্রত্যেকটা কাজ সশরীরে করছি সেই আমাকেই ছাত্রজীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ক্লাস করতে হচ্ছে অনলাইনে।

পশ্চিমবঙ্গেও সশরীরে ক্লাস হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো বলছে, ওমিক্রন আগের ভ্যারিয়্যান্টগুলোর থেকে দুর্বল, আক্রান্ত থেকে মৃত্যুর হার অনেক কম। এর থেকে বরং অতীতে ডেঙ্গুজ্বরে বেশি হারে মানুষ মারা যেত। এসবের পরে সত্যিই এই অনলাইনে দায়সারা ব্যবস্থায় আমি কিংবা আমরা দায়সারা ক্লাস করছি। সাবলীল যৌক্তিকতার বলি দিয়ে সত্যিই মনে হয় অদ্ভুত উটের পিঠে চলছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বললে বলতে হবে, অনলাইনে সমস্ত যৌক্তিকতা বাদ দিয়ে দায়সারা ক্লাস চলছে, আমিও দায়সারা ক্লাস করছি। কখনো গাড়িতে, কখনো ঘুমিয়ে কিংবা বাজার করতে করতে ক্লাস এক মহাজাগতিক অনুভূতি দিচ্ছে। যেটা আমি অকপটে স্বীকার করলাম সেটা আমাদের বাস্তবতা। হয়ত স্বীকার করতে কষ্ট হবে অনেকের।

যখন দেশের সবগুলো খাত, গাড়ির সিট, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল কাজ মানিয়ে নিয়ে সাবলীলভাবে চলছে, এসময়ে হুট করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আবারও বিরক্তিকর অনলাইনে ঠেলে দেওয়াটা সত্যিই ক্ষতির মাত্রাটা মসৃণভাবে আর একটু বাড়াবে। বড় অবাক হলাম রোটেশন, শিফটিং এর মতো অন্তত ১০টি বিকল্প ১০ মিনিটে ভাবা যেত। আমাদের জন্য শুধু বিকল্প একটা রাস্তাই খোলা, সর্দি-জ্বর তো অনলাইনে ঠেলে দাও।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান রিয়াজ (তপু) বলেন, করোনা যখন শিক্ষাব্যবস্থাকে ছারখার করে দিতে চলেছিল, তখনই শিক্ষাব্যবস্থার হাল ধরে অনলাইন ক্লাস। ছাত্রছাত্রীরা বেশ উৎসাহের সঙ্গেই ক্লাস করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। বহুদিন পর সময় কাটানোর জন্য কিছু পাওয়া গেল। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, অনলাইন ক্লাস কতটুকু সফলতার সঙ্গে চলছে? দেশের প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করছে, আমি নিজেও করছি।

অনলাইন ক্লাসের জন্য প্রথম যে জিনিসটি লাগে সেটি হলো একটি স্মার্ট ফোন ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ। আমাদের ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিন সবাই ঠিকঠাকমতো ক্লাস করতে পারলেও দ্বিতীয় দিন থেকে শুরু হয় নানা সমস্যা। কারও বাসায় বিদ্যুৎ নেই তো কারও ওয়াই-ফাই ঠিকমতো কাজ করছে না। শিক্ষক সময়মতো ক্লাসে জয়েন করতে পারছেন না। কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তর পাওয়া যায় না, কারণ অপর প্রান্তের মানুষটার ইন্টারনেটে সমস্যা হচ্ছে।

এরপর, শিক্ষক যদি কোনো অ্যাসাইনমেন্ট দেন তাহলে খুব কম ছাত্রছাত্রীই পারেন অ্যাসাইনমেন্ট আপলোড করতে, অধিকাংশই পারেন না। সর্বোপরি, আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে ডিজিটালাইজেশন, বিশেষ করে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ডিজিটালাইজেশন প্রয়োজন ছিল, তা হয়নি। তার চেয়ে বড় কথা আমাদের মাইন্ডসেটটা কিন্তু পরিবর্তন হয়নি। তাই অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম সহায়ক মাত্র, বিকল্প পদ্ধতি নয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শ্রুতিলেখা বিশ্বাস বলেন, অনলাইন ক্লাস করতে গিয়ে প্রথমেই নেটওয়ার্কের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সেক্ষেত্রে ক্লাস মিস হবার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া ক্লাসের পরিপূর্ণ পরিবেশও পাওয়া যায় না। সশরীরে ক্লাস করলে শিক্ষকের সাথে পারস্পরিক ইন্টার অ্যাকশন ভালো হয়। কিন্তু অনলাইন ক্লাসে এটা মোটেও সম্ভব না। ক্লাস ম্যাটেরিয়ালসও পাওয়া যায় না ঠিকভাবে। পরবর্তীতে দেখা যায় সশরীরে পরীক্ষার পূর্বে নানান ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কারণ ম্যাটারিয়ালস সঠিক সময়ে না পাওয়ায় পরীক্ষার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে কোর্স রিলেটেড সবকিছু গুছানো অনেকটা কষ্টকর হয়ে পড়ে। সর্বোপরি অনলাইন ক্লাস শুধু নামমাত্র ক্লাস। এটা কখনো পরিপূর্ণ ক্লাস হতে পারে না।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যপদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থী রাহুল আদিত্য নিজের মত জানিয়ে বলেন, করোনা পরবর্তী সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই শ্রেণিকক্ষ বলতে জুম অথবা গুগল মিট। যদিওবা এর কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সাথে যুক্ত থাকছে, তবে বিড়ম্বনা তৈরি হচ্ছে অন্য জায়গায়। বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যখন প্রতিটি ক্লাস এক-দেড় ঘণ্টা অতিক্রম করে, তখন ক্লাসের প্রতি মনোযোগ আস্তে আস্তে কমতে থাকে।

অপরদিকে, ক্লাসে সকলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় না। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে ইন্টারনেট কানেক্টিভিটি। আবার এটিও লক্ষ্য করা যায় যে, অনেক শিক্ষার্থী উপযুক্ত ডিভাইস না থাকার কারণে ক্লাসে অংশগ্রহণই করতে পারে না।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সজীব হোসাইনের মতে, অনলাইন ক্লাসে নানারকম ভোগান্তি পোহাতে হয়। মোবাইল দিয়ে দীর্ঘসময়ের ক্লাস করতে সমস্যাতে পড়তে হয়। ল্যাপটপ চার্জে দিয়ে ক্লাস করতে হয়, যেখানে একটা অনিশ্চয়তা থাকে। ডিভাইসের সমস্যার পাশাপাশি গ্রামে গেলে নেটওয়ার্কের সমস্যাও দেখা দেয়। তাছাড়া অনলাইন ক্লাসে বিরক্তিকর সময় কাটে, মনোযোগ থাকে না ক্লাস করার। এতে করে আমাদের সার্বিক পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। অফলাইনে যেমন কোর্স রিলেটেড নির্দিষ্ট শিট কিংবা বই পাওয়া যায় অনলাইন ক্লাসে সেই সুযোগ নেই। ফলে একটু জটিল হয়ে যায় সবকিছু। এছাড়াও অনলাইন ক্লাস টানা কয়েক ঘণ্টা করার ক্ষেত্রে একঘেঁয়েমি চলে আসে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লিমা ইসলামের মতে অনলাইন ক্লাসে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নেটওয়ার্ক সমস্যা আর সময়মতো ক্লাসের ভিডিয়ো না পাওয়ায় ক্লাসে অনীহা দেখা দেয়। দীর্ঘসময় ক্লাস করতে গেলে ডিভাইসের চার্জ সংকট, ডাটা প্যাকের সমস্যা কারো না কারো হয়ই। অনেক সময় শিক্ষক অনলাইন ক্লাসের হোস্ট থাকাকালীন ইন্টারনেট বিভ্রাট দেখা দিলে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে আর ক্লাসে জয়েন করে না। তাছাড়া অফলাইন ক্লাসের মতো সরাসরি বই, শিট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে পরবর্তীতে পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও বিঘ্ন ঘটে।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড