• শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পুতিনকে অস্ত্র নয়, পয়সাই নিরস্ত্র করতে পারে

  মুহাম্মদ হাসিবুর রহমান

০৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৬:১৭
পুতিন
ভ্লাদিমির পুতিন (ফাইল ছবি)

প্রায় মাসখানেক আগে স্টকহোমে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের ‘যুদ্ধের দুঃস্বপ্ন’ দেখানোর ভয় দেখিয়েছিলেন। তিনি পশ্চিমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন, স্মরণ করতে বলেছিলেন তাদের জর্জিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সাকাশভিলির পরিণতির কথা। রাশিয়ার সে-সময়ের এমন যুদ্ধংদেহী প্রতিক্রিয়া রক্তক্ষয়ী এক সংঘাতেরই আভাস দিচ্ছিল। বিশেষত, যখন কি-না ইউক্রেনের সীমান্ত ছেয়ে নিয়েছিল প্রায় লাখখানেক রুশ সেনায়।

পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। অথচ পাল্টে গেছে মস্কোর প্রতিক্রিয়া। ল্যাভরভের প্রভু পুতিনের সুরও অনেকখানি নমনীয়। সামরিক সংঘাতকেই যেখানে শেষ পরিণতি ধারণা করা হচ্ছিল, সেখানে মাসখানেকের মাথায় মস্কো আশপাশে বিস্তার করছে কূটনীতির ডালপালা। প্রশ্ন হতে পারে, পুতিন কি তবে ভয় পাচ্ছেন?

ন্যাটো জোটের অবকাঠামো রাশিয়ার দুয়ার অবধি সম্প্রসারণ ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ন্যাটোর অস্ত্রসম্ভার রফতানির প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া ক্ষুদ্ধ ছিল শুরু থেকেই। ইউক্রেনকে ন্যাটোর তুরুপের তাস বানানোর প্রচেষ্টায় পুতিনের সংক্ষুদ্ধতা আরও বাড়িয়ে তুলেছিল কৌতুকাভিনেতা থেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠা ভ্লাদিমির জেলিনস্কির অসংলগ্ন কথাবার্তা। অধিকৃত দনবাস ও ক্রিমিয়ায় রাশিয়াকে কোণঠাসা করার যে চেষ্টা ছিল জেলিনস্কির, তা আরও রাগিয়ে দেয় স্বল্পভাষী পুতিনকে। ইউক্রেনকে নিয়ে ইউরোপের বাজি খেলার পরিণতিতেই আমরা রাশিয়াকে পূর্ব ইউক্রেন সীমান্তে অস্ত্রে সজ্জিত দেখতে পাই।

পশ্চিমা নেতাদের সমালোচনা করতেই হয়। তারা রাশিয়ার উদ্বেগ উপেক্ষা করেছেন পুরোপুরি। কোনো পরাশক্তিই ঘরের পাশে কোনরকম হুমকি বরদাশত করতে রাজি নয়। রাশিয়াও বারবার এটা বলে আসছে। তারা ঘরের পাশে ন্যাটোর ক্ষেপণাস্ত্র তাক করা দেখতে চায় না। বিষয়টি অনেকটা, কানাডা বা মেক্সিকো সীমান্তে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার মতোই। যা নিয়ে খোদ পুতিনই বারবার আওয়াজ তুলছেন।

রাশিয়ার ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ লাভের আবদারের বিরোধিতা করাটা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই। কিন্তু ক্রেমলিনকেও মনে রাখতে হবে, তারা কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে দিতে পারে না। ইউক্রেনের অধিকার রয়েছে, যেকোনো বৈশ্বিক প্লাটফর্মে যে কারো সাথে যুক্ত হওয়ার।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে সব পক্ষই শুরুতে অসহনশীল আচরণ করে গেছে। যে কারণে সংকট কেবলই দীর্ঘায়িত হয়েছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, দিন যতই গড়াচ্ছে জড়িত সকল পক্ষ ততই পরিশীলিত আচরণ উপহার দিচ্ছে।

শক্তিমত্তা প্রয়োগ করে রাশিয়াকে দমানো যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের জন্য অসম্ভব ছিল। সেজন্য নেতৃবৃন্দকে এমন একটা পথে হাঁটতেই হতো, যে পথে পুতিন চলতে স্বাচ্ছন্দ্য নন। ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি এক্ষেত্রে বেশ কাজে লেগেছে। কাজে লেগেছে, রাশিয়া থেকে জার্মানি পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়ার হুমকি। সম্ভবত, রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর ওপর রুবলকে বিদেশি মুদ্রায় পরিণত না করা বা বৈশ্বিক অর্থপরিশোধের পদ্ধতি সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার হুমকিও কাজে দিয়েছে কিছুটা। এমন সব নিষেধাজ্ঞার ভয়ে পুতিনকে কিছুটা কব্জা করা গেলেও, তাকে দীর্ঘমেয়াদে হাতে রাখতে হলে পশ্চিমাদের আরও কিছু কাজ করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন লোভনীয় অর্থনৈতিক প্রকল্প তারা ক্রেমলিনের সামনে হাজির করতে পারেন। কারণ, এই মুহূর্তে এই একটিমাত্র পথই খোলা আছে যার মাধ্যমে পুতিনকে কিছুটা কাবু করা যেতে পারে।

আমাদের মনে রাখা উচিত, ইউক্রেনে অচলাবস্থা চলাকালীন সময়েই চীনের দ্বারস্থ হয়েছে রাশিয়া। মতবিরোধপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যু পাশ কাটিয়ে তারা পরস্পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আরও ঘনিষ্ঠ হতে একমত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট সমপর্যায়ের সে বৈঠকে পুতিন ইউক্রেন ইস্যুতে শি জিন পিংয়ের সমর্থনও নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। ভারতকে সঙ্গে নিয়ে গঠিত রাশিয়া ও চীনের মৃতপ্রায় আরআইসি সম্মেলন পুনরুজ্জীবিত করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেজন্য তিনি দুদেশের মধ্যকার বিবাদ মেটাতে মধ্যস্ততার প্রস্তাব দিয়েছেন।

বলা বাহুল্য, পশ্চিমাদের থেকে পাওয়া অর্থনৈতিক ধাক্কা তিনি সামাল দিতে চাইছেন চীন আর ভারতকে পাশে নিয়ে। যদি পুতিন তার উদ্দেশ্য পূরণে সফলতা লাভ করেন, তবে তাকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েও নত করা যাবে না। তাই পশ্চিমাদের যুগপৎ ভয় ও লোভের প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

এছাড়াও ইউরোপকে খানিকটা যত্নশীল হতে হবে রাশিয়ার প্রতি। ক্রেমলিনের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগকে আমলে নিয়ে নিজেদের লোভকে দমন করতে হবে তাদের। পূর্বে ন্যাটো সম্প্রসারণ প্রকল্প স্থগিত করা যেতে পারে এজন্য। আর রাশিয়াকে ইউরোপ তাদের অর্থনৈতিক ভাবনায় সংযুক্ত করতে পারে। যাতে করে রাশিয়া অর্থনৈতিক সুরক্ষা চীনের বদলে ইউরোপে খুঁজে নিতে পারে। এতে করে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা নতুন অক্ষশক্তি অংকুরেই বিনষ্ট হবে। অন্যথায় উদীয়মান এই শক্তির সামনে অসহায় হয়ে পড়তে পারে ইউরোপ। অযাচিত শক্তি প্রয়োগ রাশিয়াকে চীনের আরও নিকটবর্তী করে তুলতে পারে। পশ্চিমের দেশগুলোকে ভবিষ্যতে পড়তে হতে পারে মারাত্মক নিরাপত্তাঝুকিতে। সেজন্য, রাশিয়াকে ইউরোপের আমলে নিতে হবে নিজেদেরই স্বার্থে, ইউরোপেরই সুরক্ষা সংগ্রহে।

আর সেজন্য ভিয়েনা সম্মেলন এবছর মহাগুরুত্বপূর্ণ এক সম্মেলন হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ইউক্রেনকে রক্ষা ও ইউরোপের আত্মরক্ষার জন্য এটাই সম্ভবত শেষ সুযোগ। বিশ্বনেতাদের এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করা উচিত। রাশিয়াকে সংকুচিত করার বদলে তাদের সংযুক্ত করা উচিত। কারণ, পুতিনকে অস্ত্র নয়, পয়সাই নিরস্ত্র করতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড