• মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শিক্ষক : মানুষ গড়ার কারিগর

  কাজী ফিরোজ আহাম্মদ পারভেজ

১৪ অক্টোবর ২০২১, ১৩:১০
শিক্ষক
ছবি : প্রতীকী

‘একজন ভাল শিক্ষক মোমবাতির মতো, যিনি অন্যের পথ আলোকিত করতে গিয়ে নিজেকে নিঃশেষ করে দেন’- উচ্চারিত এই শব্দাবলি আধুনিক তুরস্কের হোতা মোস্তাফা কামাল আতাতুর্কের। নিজের অর্জিত সমস্ত বিদ্যা-বুদ্ধি জ্ঞান নিঃস্বার্থহীনভাবে অন্যের মাঝে যিনি বিলিয়ে দিয়ে আনন্দ পান তিনি হলেন একজন শিক্ষক। মেধাবী অথচ দরিদ্র ছাত্র অর্থের অভাবে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারছে না। তেমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক তার সীমিত আয় সত্ত্বেও ঐ ছাত্রের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে কোনো কিছু পাবার প্রত্যাশা না করে, তেমন উদাহরণেরও অভাব নেই এই অভাবের দেশে।

উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড চার শ্রেণীর শিক্ষকের কথা উল্লেখ করেছেন। তা হলো মাঝারি শিক্ষক, ভাল শিক্ষক, উন্নতমানের শিক্ষক এবং মহৎ শ্রেণীর শিক্ষক। তার ভাষায়, "The mediocre teacher tells, The good teacher explains, The superior teacher demonstrates. The great teacher inspires." (মাঝারি শিক্ষক বলেন, ভাল শিক্ষক ব্যাখ্যা করেন, সুপিরিয়র শিক্ষক প্রদর্শন করেন এবং যিনি মহৎ শিক্ষক তিনি উদ্বুদ্ধ করেন)। শিক্ষাদানের মহান ব্রত যার কাজ তাকেই শিক্ষক বলা হয়। শিক্ষার্থীর মানবতাবোধকে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকে স্বার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেন শিক্ষকদের জাতি গঠনের কারিগর বলা হয়। কেননা একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায়ের দীক্ষা দিতে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতার কাজে যারা আছেন তাদেরকে শিক্ষক বলা হয় আর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অধ্যাপক বলা হয়ে থাকে। শিক্ষিত জাতি ছাড়া কোনো দেশের উন্নয়ন ও অভিষ্ঠ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। আর একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষিত জাতি গঠনের মূল কারিগর। তাই শিক্ষিত জাতি গঠনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের নিকট তিনি হলেন একজন আদর্শ শিক্ষক ও অভিভাবক। তিনি কখনও হবেন সুশৃঙ্খল জাতি বিনির্মাণে যোগ্য নেতা তৈরির আধুনিক কারিগর এবং শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ ও উন্নয়নের এক অনিবার্য মাধ্যম।

তবে বর্তমানে গুটিকয়েক শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে প্রায়ই এ পেশা সমালোচিত হয়। কিন্তু গুটি কয়েক উদাহরণ থেকে স্বার্বিক মূল্যায়ন করাটা বোকামি। শুধু পেশায় নিয়োজিত হলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষক হতে হলে তার সম্পর্কিত গুণাবলী অর্জন করতে হবে। শুধু পোশাকে বা পেশায় শিক্ষক হয়ে কী লাভ? বাবা-মা যেমন সন্তানের বুকের ভেতর বেঁচে থাকেন ঠিক তেমনি করেই শিক্ষক বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও দীক্ষার মধ্যে।

পৃথিবীর শিক্ষকতার ইতিহাসে যে ব্যক্তির নাম একজন মহান সাধারণ শিক্ষক হিসেবে অমর হয়ে আছে তিনি হলেন গ্রীক মহান দার্শনিক সক্রেটিস। যাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে প্রহসনের বিচারে হেমলক বিষ পানে হত্যা করা হয়েছিল। এই মহান শিক্ষক জ্ঞান অনুসন্ধানের যে পথ দেখিয়েছেন, যুগে যুগে সে পথ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি কেবলমাত্র শিষ্য গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষা প্রদানে বিশ্বাসী ছিলেন না। তার ছিল না কোনো শিক্ষা দেবার নির্দিষ্ট স্থান। তিনি নিজে জ্ঞান পিপাসু ছিলেন এবং সেই সাথে মানুষকে মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর বোঝানোর চেষ্টা করতেন।

সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন আরেক বিখ্যাত দার্শনিক প্লেটো। প্লেটোকে একাধারে গণিতজ্ঞ এবং দার্শনিক ভাষ্যের রচয়িতা বলা যায়। আমার শিক্ষকদের এই মনুষ্য-মন্ত্রের জোরেই তো আজ মানুষ হওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। তা না হলে কবেই এ রাস্তা থেকে দূরে সরে যেতাম। শিক্ষক নিয়ে বাদশা আলমগীরের কবিতা পড়েছি। এই কবিতা আমরা সবাই পড়েছি। আমার খুব ভাল লাগতো। শিক্ষকের মর্যাদা দেবার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই কবিতা। পড়েছি এবং শিক্ষকদের নিয়ে কল্পনায় অন্য রকম উচ্চতায় চিন্তা করেছি। একজন বাদশা হয়ে যিনি শিক্ষকের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল এবং শিক্ষকের প্রতি সন্তানের একটু অবহেলাও তিনি মেনে নিতে পারেননি। শিক্ষকের চিন্তাতেও যখন ঐ অবহেলার বিষয়টি ছিল না তখন বাদশা তাকে বিষয়টি বলেন। তার যে এ বিষয়টাও যে সন্তানের শিক্ষার মধ্যে আনা উচিত ছিল তা বোঝানোর জন্যই তিনি শিক্ষককে ডেকেছিলেন। আর তাই বাদশা আলমগীরকে কবিতায় মহান বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যিনি সত্যই বুঝেছিলেন শিক্ষকের মর্যাদা কেমন হওয়া উচিত।

'সবাই ভালো ছাত্র হতে পারে না, তবে সবাই চেষ্টা করলেই ভালো মানুষ হতে পারেন'- শিক্ষার লক্ষ হলো ভালো মানুষ তৈরি করা। আর মানুষ (ভালো মানুষ) তৈরির মূল দায়িত্ব শিক্ষকগণের উপর ন্যস্ত। শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়, এটি একটি ব্রত। আদর্শ শিক্ষকের সংজ্ঞা দেশের সংবিধান-সহ কোন গ্রন্থে লেখা আছে কিনা, তা জানা নেই। তবে দামাল ছেলেবেলা থেকে এটুকু মজ্জার মধ্যে ওতপ্রোত ভাবে সম্পৃক্ত করে নিয়েছি যে, শিক্ষক মানেই নমস্য ব্যক্তি, ত্রুটিবিহীন অতিমানবও বটে। একজন শিক্ষক হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যার মধ্যে পরামর্শক হওয়ার, শিক্ষা সহায়ক ব্যক্তি, শিক্ষক নিজেই শিক্ষা সহায়ক সামগ্রীর উন্নয়ন সাধন করবেন, তার আচরণ হবে রোল মডেল, তিনি সমাজের দর্পণ, কারিকুলাম প্রস্তুতকারক ও মূল্যায়ণকারক, শিক্ষা সংগঠক এবং নির্দেশক ইত্যাদি গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ।

সত্যি কথা বলতে একদিক থেকে শিক্ষক একজন সত্যিকারের অতিমানব যাদের থাকে সহজেই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। আবার একদিক থেকে শিক্ষকরা খুব সাধারণ একজন মানুষ যারা তৈরি করেন অসাধারণ সব মানুষ। বছরের পর বছর পাস করিয়ে রেজাল্ট ভাল করাতে পারলেই কিন্তু শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং দায়িত্ব তো প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। একজন শিক্ষকই যা আবিষ্কার করতে পারেন এবং তা ব্যবহারের পথ দেখাতে পারেন।

লেখক- কাজী ফিরোজ আহাম্মদ পারভেজ, শিক্ষার্থী, সিএসই বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড