• মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৪ আশ্বিন ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

করোনায় শিক্ষার্থীদের দিনলিপি

  মামুন সোহাগ

২১ জুলাই ২০২০, ১৮:৫৩
ছবি : সম্পাদিত

ঘরবন্দী করোনায় সকলেরই নানান স্মৃতি। নিত্য নতুন অনুভূতি আর অভ্যাস। পুরনো সব অভ্যাস বদলেছে পৃথিবীর এই দুঃসময়ে এসে; সবার মাঝেই বৈরিতা। সারাবছরই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুরন্তপনার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ প্রস্ফুটিত হয়। তবে করোনায় সব টালমাটাল ; বেশ পরিবর্তন এসেছে নিত্যদিনের সব কাজেকর্মে। দেশের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের দিনলিপি জানাচ্ছেন মামুন সোহাগ।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজে শেষ বর্ষে পড়ছেন রিফাত খোন্দকার ইমন। করোনার দুর্দিনে বাসায় থেকেই সময় পার করছেন। উষ্মা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি ভেবে পাচ্ছিনা ঠিক কি লিখবো! প্রতিদিন কাজের রুটিন এক থাকেনা। কোনোদিন ক্লাসের পড়া পড়ি, কোনোদিন বিসিএস এর জন্য, কোনোদিন আবার উপন্যাস। হঠাৎ বাইরে চলে যাই কোনোদিন। ঘুরে ঘুরে ফটোগ্রাফি করি কিছু সময়। আবার কিছুদিন একদম খেয়ে ঘুমিয়ে সিনেমা দেখেই কেটে যাচ্ছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সুমাইয়া রিতু বলেন, ‘করোনা মহামারিতে সবাই চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ। সত্যি কথা বলতে পার করা সময়গুলো একদম সুখকর নয়। বাসায় খুব অলস সময় কাটছে। তবে পরিবারের সঙ্গে কাটানোর জন্য অফুরন্ত সময় পেয়েছি আর সেটাই কাজে লাগাচ্ছি। আম্মুর সাহচর্যে থাকি বেশিরভাগ সময়। এছাড়া ছবি আঁকতে ভালোবাসি এজন্য মাঝে মাঝে মনটা আঁকিবুঁকি তে লাগায়। পড়াশোনা টুকিটাকি করি, নতুন রেসিপি তৈরি করি আর আম্মুর বকুনি খাই, বাসায় কিছু ফুল গাছ লাগিয়ে সেগুলোর পরিচর্যা, মায়ের কাজে সাহায্য করা, বোনের সঙ্গে খুনসুটি ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে ফোনটা একটু বেশিই সঙ্গী হয়েছে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন রাত। আবারও খুব শীঘ্রই ফিরে যাবো সেই ব্যস্তময় দিনগুলোতে এই কামনায় করি। আল্লাহ সব স্বাভাবিক করে দিক, ফিরে আসুক জীবন্ত পৃথিবী।’

রাজধানীর ইডেন কলেজের দর্শন বিভাগে পড়ুয়া শিক্ষার্থী মালিহা কলি। হল ছেড়ে বাড়িতে গেছেন মাস চারেক। তিনি বলেন, ‘করোনা দুর্যোগের সময় শিক্ষার্থীরা নিজ বাসায় অবস্থান করছে বলা চলে। যেহেতু সামাজিক দূরত্বের তাগিদে বাসা থেকে বের হবার একেবারেই কোনো সুযোগ নেই সেহেতু বন্দি অবস্থাটা খুব বেশি উৎফুল্লময় হচ্ছেনা। মেয়েদের ক্ষেত্রে মা কে সাহায্য করা, রান্না করা, বই পড়া মোটকথা পরিবার ও নিজেকে সময় দিয়ে কাটানো হচ্ছে। অনলাইন ক্লাসের ও একটা ব্যাপার আছে, গুটিকতক শিক্ষার্থী অনলাইনে পড়াশোনা ব্যাপারে সিরিয়াসনেস প্রকাশ করে হাই সিজিপিএর বন্দোবস্ত করছে। অনিশ্চিত ভবিতব্যের ব্যাপার আরও অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে!’

তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের নুসাইবা ইসলাম রিতি আছেন গাজীপুরে নিজ বাড়িতে। তিনি বলেন, ‘করোনার সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। সেই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বন্ধ। সে কারণে এখন আমরা শিক্ষার্থীরা ঘরেই বন্দী। এখন আমার অবসর কাটছে সপ্তাহে তিনদিন জুম অ্যাপে ক্লাস করে। এছাড়াও যেহেতু বাসা থেকে বের হওয়া যাচ্ছেনা, তাই বাসায় বসেই সময় কাটাচ্ছি। কখনো ছবি আঁকছি, কখনো গল্পের বই পড়ছি, আবার কখনো বা শখের বসে কাপড়ে নকশা করছি। আর ভার্চুয়াল ভাবে বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও কলে আড্ডা দেওয়া, আর স্টাডি নিয়ে গ্রুপ ডিসকাশনতো আছেই। এর মধ্যেও সবথেকে বেশি স্বস্তি পাচ্ছি পরিবারের সকলের সঙ্গে সময় কাটিয়ে। এভাবেই সময় কাটছে।’

বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে আছেন তিতুমীর কলেজ শিক্ষার্থী অন্তুর ইভান। বিরক্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘করোনা বাংলাদেশ হানা দেওয়ার পর থেকেই ঢাকা ছেড়েছি সঙ্গে ছেড়েছি ভালোবাসার ক্যাম্পাস । শুরুতে দিনগুলো খুব অন্যরকম কাটছিল মনে হচ্ছিলো কতদিন পর সবাই কে পেয়েছি সব প্রিয় মানুষগুলো একসঙ্গে। সে ছিলো এক অন্যরকম অনুভুতি। সেই কলেজ লাইফ থেকেই বাবা মা কে ছেড়ে নিজের বাড়ি ছেড়ে থাকছি। সেজন্য হয়তো প্রথম প্রথম দিনগুলো ছিল একদমই অন্যরকম ও ভালোলাগার। কিন্তু এভাবে কিছু দিন চলার পর কেমন যেন মনে হচ্ছিল কিছু কিছু জিনিস খুবই মিস করছি। মিস করছি প্রিয় ক্যাম্পাস আমার ভালোবাসার বন্ধুদের। যাদের ছাড়া জীবন যেন জীবন মনে হয় না। তাদের সঙ্গে একবেলা নিয়ম করে আড্ডা না দিলে মনে হয় আমার বোধহয় খাবার হজম হয় নাই। আবার মাঝে মাঝে একটুখানি মিস করছিলাম সেই ব্যস্ত শহর ঢাকা কে।’

তিনি বলেন, ‘সেই চিরচেনা জ্যাম হাজারো মানুষের ভিড় হাজারো যানবাহনের ভিড়। আর এই অলস দিনগুলো কাটছে যেন একেকটা দিন একেক রকম করে মাঝে মাঝে নিজেই বুঝি না কিভাবে চলছে জীবন। কোন দিন হয়তো দুপুর বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়া আবার কোনদিন হয়তো সারারাত বই পড়ে বা মুভি দেখে। কিছুদিন হলো আবার বিকেল করে কিছুক্ষণ ফুটল ও খেলছি। আবার কোনদিন হয়তোবা বাসা থেকে বের হওয়াটাই হচ্ছে না। এভাবেই কাটছে আমার অসল সময় আর পাড়ি দিচ্ছি আমার লকডাউন এর বেকার জীবন।’

দাপুটে ব্যবস্তায় ঢাকাতে সময় পার করেন ইমরান হোসাইন। পড়ছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। নানা আশা বুকে চেপে তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে যখন চারিদিকে প্রচুর রৌদ্র বিরাজ করে তখন প্রত্যেকে এক পশলা বৃষ্টির আশা করে। যেনো প্রকৃতি আবার তার নিজের সতেজ রুপ ফিরে পায়। কিন্তু তাই বলে এটা নয় যে এক পশলা বৃষ্টির পরিবর্তে সেই বৃষ্টিই কালরূপ ধারণ করে প্রকৃতিকে ভাসিয়ে দেবে। তেমনি ছাত্রজীবনে পড়াশোনা, ক্যাম্পাস, টিউশনি আড্ডাবাজির মধ্যে ২-৪ দিনের ছুটে পাওয়া মানেই প্রিয়জনদের কাছে ছুটে যাওয়া। ঠিক সেভাবেই বাড়িতে এসেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গেই দেশে আঘাত হানলো করোনার ভয়াল থাবা। সবাইকে সুরক্ষা ও নিরাপদ রাখার জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ হলো ১৫ দিনের জন্য। কিন্ত সেই ১৫ দিন রুপান্তরিত হয়ে হয়েছে ৪ মাস।’

আরও পড়ুন : করোনায় অনলাইন শিক্ষা ও ডিআইইউ শিক্ষার্থীদের ভাবনা

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিনেই বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা সাথে মৃত্যুর মিছিল। চিরচেনা সেই বিদ্যাপীঠ আর ভালোবাসায় রঙানো কাছের মানুষগুলোকে দেখি না অনেক দিন। কিন্তু আজ ঘরে বসে এই সোনালী অতীত মনে করা ছাড়া আর কিছুই করার নাই আমাদের। প্রতিক্ষণেই একটা ভয় হৃদয়কে কুরে খায়। প্রিয়জনদের সঙ্গে আবার দেখা হবে কিনা! কিংবা প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে আবার সবাইকে পাবো কিনা! আবার সেই রঙিন, উৎসব মুখর দিন ফিরে পাবো কিনা। বাড়িতে এইভাবে আর কতদিন থাকা যায়। পরিবারের ছোট খাটো কাজ, আর সময় কাটানোর জন্য একটু বই পড়া, ফেসবুক। তবুও সুদিনের অপেক্ষায় দিন গুনছি। এই কামনায় করি সারাক্ষণ পৃথিবী দ্রুত সুস্থ হোক। সবাই ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক।’

jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801721978664

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড