• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জাবির হলে সিট সংকটের কারণ ও সমাধানে কিছু সুপারিশ

  মো ফজলুল করিম পাটোয়ারী

০৫ আগস্ট ২০১৯, ১৬:৫১
জাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (ছবি : সংগৃহীত)

১৯৮৯ সালে যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসি ভর্তি তালিকায় মাত্র ৩০০ এর অধিক কিছু ছাত্রছাত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল। একজনকে কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করলাম- মাত্র এই কজন ছাত্র কেন? উত্তর এলো যেই ব্যাচটা বেরিয়ে যাচ্ছে সেই ছাত্র-ছাত্রীদের আসনগুলো খালি হচ্ছে, সংখ্যাটা এরকম তাই এর চেয়ে বেশি ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানো সম্ভব নয়। পরের বছর দেখলাম সংখ্যাটা ৭০০ কিংবা তার বেশি। কারণটা একি, ওই বছর মাস্টার্স কমপ্লিট করা ছাত্র-ছাত্রী বেশি ছিল তাই ওই বেশি পরিমাণ ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করানো হয়েছিলো। মাঝে মাঝে মাস্টার্স ব্যাচটা বের হতে কিছু সময় লাগতো ওই কয়দিন ঢাকায় অবস্থানরত ছাত্রদের খালি সিটে ম্যানেজ করিয়ে নেয়া হতো কিন্তু মাস্টার্সের ঔ ব্যাচের কোর্স কমপ্লিট করার জন্য অনেক তোড়জোড় থাকতো। সিট সংকট ছিলোনা বললেই চলে। 

পাঠক আসুন, এখন কি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ছাত্র ভর্তির সংখ্যাটা নির্ধারণ করা হয় একটু জেনে নেই।

কখনোই হিসাব করা হয় না কিংবা আমলে নেয়া হয় না এদের বিপরীতে মাস্টার্সের ব্যাচে কতজন বের হচ্ছে। মাঝে মাঝে জানানো হয় ওদের ভর্তি সংখ্যাটা এরকম কিন্তু ওই সংখ্যক ছাত্র কিন্তু ঐ বছর পাস করে বের হয় না। আর জেনেই বা লাভ কি? সংখ্যাটিকে বিবেচনা করে নতুন ভর্তির সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় না। আমি ৩ বছর কেন্দ্রীয় ভর্তি পরিচালনা কমিটির সদস্য থাকাকালে অনেক বার বুঝিয়েছি ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা নির্ধারণের জন্য সঠিক এবং যুক্তিযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করা হোক কিন্তু প্রশাসন তা কখনোই আমলে নেননি।

ধরে নিন, এবারের বিপরীত ব্যাচে ৫ বছর আগে ১২০০ ছাত্র ভর্তি করানো হয়েছিল কিন্তু ভর্তির সময় যখন হিসাব করা হয়, গত বছর কতজন ভর্তি হয়েছে? উত্তর : ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে ২২০০। ওকে, ২২০০ এর চেয়ে কমানো যাবে না কিন্তু। তাহলে বিভিন্ন দপ্তরে বিভিন্ন জায়গায় কর্তা ব্যক্তিদের কৈফিয়ত দিতে হবে, বেশি ছাত্র ভর্তি করিয়ে বাহবা নিতে হবে। ভর্তির পর দেখা গেল ২২০০-১২০০= ১০০০ ছাত্র-ছাত্রী, কোনোভাবেই এরা আগামী এক বছর সিট পাবে না। পরের বছর আবার এভাবেই বেশি ভর্তি করানো হয়, ফলশ্রুতিতে সিট সংকট উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে এমন হবে, একজন ছাত্র তার পাঁচ বছরের ছাত্র জীবনে কোন সিট পাবে না। 

যেদিন অনার্স কোর্স ৩ বছরের পরিবর্তে ৪ বছর করা হয়, সিট সংকট সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল। সন্মানিত প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বায়েস একবার ডাবল শিফটে ক্লাস করিয়ে এর সমাধান করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। সেটি ১ বছর চলেছিল। পরেরজন এটা চালু রাখেননি। চালু রাখলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সবসময় ৫টি ব্যাচ থাকতো। মাস্টার্সের ব্যাচের বিপরীতে প্রথম বর্ষে ভর্তি করানো যেতো।

পাঠক, এতক্ষণ আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন কেন সিট সংকট বছরে বছরে তীব্রতর হচ্ছে? এবার আসুন জেনে নেই, আরও কি কি অনুসর্গ  সিট সংকটে অবদান রাখছে-

১. আমি নিশ্চিত তথ্য নিয়েই জেনেছি ছেলেদের কয়েকটা হলে কতিপয় ছাত্র সিঙ্গেল/ ডাবল করে জমিদারি হালহকিকতে থাকছে। কল্পনা করতে পারেন এসব রুমে সোফা রাখার জায়গাও আছে । কিছু কিছু রুম আছে কেউ থাকে না, ওখানে শুধু আড্ডা দেয়া হয়। হলের হাউজ টিউটর, ওয়ার্ডেন এবং প্রভোস্ট এগুলো জানেন অথবা না জানার ভান করেন অথবা একটা অবহেলা আর কি। সিট সংকটের তীব্র প্রদাহে হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণের উদাসীনতা মরিচ লাগানো ছাড়া কিছুই নয়।

২. বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার ৪৯তম আবর্তন ভর্তি হতে যাচ্ছে তাদের বিপরীতে ৪৪তম আবর্তনের মাস্টার্স শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু ৪৩তম আবর্তন এখনো মাস্টার্স করছে। অর্থাৎ যে ছাত্রটি এবার ভর্তি হবে সে আগামী দুবছরেও হলে সিট বরাদ্দ পাবে না। উপরন্তু, হিসাবের চেয়ে বেশি ভর্তি করানোর কারণে তার সিট বরাদ্দ পেতে আরও কমপক্ষে ১ বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ মোট তিন বছর পর এসে সে সিট বরাদ্দ পাবে। এভাবে সিট না পেয়ে কত মেধাবী হারিয়ে যাচ্ছে আমরা কখনোই তার পরিসংখ্যান নিতে চেষ্টা করি না। প্রথম বর্ষ ও দ্বিতীয় বর্ষে ঠিকমতো ক্লাস না করতে পারায়, পড়ালেখায় মনোযোগী হতে না পারায় কারণে সে পরবর্তী বছরগুলোতে পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। সিট পাওয়ার আশায় নেতাদের তাবেদারী করতে থাকে পড়ালেখা জলাঞ্জলি দিয়ে। এই মেধাবীদের হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী আমরা যারা পরিকল্পনাহীনভাবে ছাত্র ভর্তি করি।

৩. হিসেব অনুযায়ী ৪৩তম আবর্তনের আগের কেউ হলে থাকবার কথা নয়। কিন্তু আপনি একটু ঘুরে আসুন হলগুলোতে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, ৩৫ থেকে ৪২তম আবর্তনের কিছু কিছু ছাত্র এখনো হলে অবস্থান করছে। এটা দেখার জন্য কোন দূরবীনের প্রয়োজন নেই, টেকনোলজির সাপোর্টের দরকার নেই, দরকার শুধু হলের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব, নিষ্ঠা এবং ইচ্ছা। অবশ্য এই সমস্যাটি মেয়েদের হলে খুবই কম। 

আমি শুধু সেশনজটের কারণ গুলো তুলে ধরলাম এর কিছু কিছু কারণ এখনি সমাধান যায়। কিন্তু কে নিবে উদ্যোগ? অনেকেই ব্যস্ত কিভাবে জোট ভাঙ্গা-গড়া করা যায়, কিভাবে পরিচালক, সভাপতি নিজেদের পছন্দের লোককে করা যায় এতে নিয়োগ দিতে সুবিধা হয়। কেউ ব্যস্ত প্রভোস্ট ওয়ার্ডেনের দায়িত্ব নিয়ে পছন্দের বাসাটির বরাদ্দ নেয়া যায় এবং কর্মচারী পদে নিয়োগ দেয়া যায়।

সামনে জাকসুর তফশিল ঘোষণা করা হয়েছে, এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে ছাত্র-অছাত্র নির্ধারণ করার। এজন্য হলের ছাত্র-ছাত্রীদের নির্ভুল ডাটাবেজ করতে করতে হবে। এতে নির্বাচন যেমন করে সুশৃঙ্খল হবে তেমনি ভবিষ্যতে হলের আসন ব্যবস্থাপনাও সুন্দর ও নিখুঁতভাবে করা যাবে এবং উপরোক্ত বিশৃঙ্খলা দূর হবে।

সর্বোপরি প্রতিবছরই কম কম ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করিয়ে আবাসন সংকটের তীব্রতা আস্তে আস্তে সমাধান করা যায় অথবা এখনই নতুন হল নির্মাণ করে অতিরিক্ত ছাত্র-ছাত্রী জন্য আবাসন সংকটের সমাধান করা যায়। শর্ত থাকে যে, নতুন হল নির্মাণ করে আরও অতিরিক্ত ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা যাবে না।

লেখক : অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ওডি/এমএ

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড