• বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সিলেটে উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনের বিবিধ প্রসঙ্গ

  নিয়ামত আলী

২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১০:১৫
শাবিপ্রবি
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা (ছবি : দৈনিক অধিকার)

বাংলাদেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করে থাকে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে যে ধারাটি বাংলাদেশে চালু আছে, সেখানে উপাচার্য পদে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের উপর মহলের আস্থাভাজনদের দিকে নজর দেওয়া হয়। সেই বিবেচনায় উপাচার্য যতটা না শিক্ষক বা শিক্ষকতা কেন্দ্রিক পদ বা পদবী, তার চেয়ে এটি একটি রাজনৈতিক পদ। বলা যায়, এটি সরকারি রাজনীতির আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক প্রশাসনিক কেন্দ্র। এই কেন্দ্রে আসীন উপাচার্য যতটা না শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেন, তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তার রাজনৈতিক দলের লোকজনের এবং নিজের স্বার্থ সুরক্ষায়।

সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যতটুকু কাজ না করলেই নয়, তার চেয়ে বেশি করার চেষ্টা করে থাকেন। বিশেষ করে, গত এক দশকে বাংলাদেশের সরকারী বা তথাকথিত স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, তারা মূলত সরকারের আরেকটি শাসক গোষ্ঠী যারা সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্যই নিয়োগ পেয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হয়। সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ন্যায়, আমলাদের ন্যায় তারাও সীমাহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকবেন এটি একটি সাধারণ ঘটনা হিসেব জনসাধারণের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্য করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে ভাগ বসিয়ে দেশের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। উপাচার্যের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, লোকবল নিয়োগ পরীক্ষায় বাণিজ্য নিয়ে যেসব আন্দোলন হয়েছে, সেসব আন্দোলনকে দমন করতে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনকে সব সময় মাঠে থাকতে দেখা গেছে। অধিকাংশ আন্দোলনে বহিরাগতের উপস্থিতি আছে মন্তব্য করে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য আন্দোলনকে বানচাল করার চেষ্টা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই আন্দোলনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী, আমলাগণ দিন শেষে এইসব উপাচার্যের পক্ষেই সাফাই গেয়েছেন। আন্দোলনকারীদের নামে বেনামে মামলা করে শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভিন্ন কোনো শিক্ষা তাদের উপহার দিতে পারেনি। আর যে সব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনের সমর্থন দিয়েছেন, তাদের জীবনেও নেমে এসেছে সীমাহীন যন্ত্রণা। চাকুরিচ্যুত হবার ঘটনাও কম নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, তার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমস্যা প্রায়ই একরকম। সবখানেই আবাসিক হলের আসন সঙ্কট বেশ প্রকট। ছেলেমেয়ে উভয়কে হলের আবাসিক আসন পেতে হলে রাজনীতির মাঠে উপস্থিত থাকতে হয়। হল প্রভোস্টের শাসন দুঃশানের প্রতিবাদে নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের সরব থাকতে হয়; হলগুলোতে ছেলেমেয়েরা বাপের টাকায় কেনা খাবারের মান নিয়ে আন্দোলন করতে হয়; মেয়ে শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে আলাদা নিয়ম-কানুন চালু করলে তার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় শাবিতে আন্দোলনের সূচনা এই কয়েকটি উল্লেখিত অংশের একটি অংশ। সেখানে সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীরা প্রভোস্ট লিজার পদত্যাগ ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াসহ বিভিন্ন দাবি তুলে আন্দোলন শুরু করে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথম দিকে এই অভিযোগের প্রতি গুরুত্ব না দেয়ার অভিযোগ তুলে। জানা যায়, এই ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটামে কাজ না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ফলাফল হিসেবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ শুরু লাঠিচার্জ করে। এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। সবাইকে হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা হল ত্যাগের নির্দেশ অমান্য করে উল্টো উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে এবং আন্দোলনটি উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। সর্বশেষ খবর হচ্ছে, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবীকে শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন চলছে। বলা হচ্ছে, যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তার দায় দায়িত্ব কে নিবে!

উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে নতুন যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা। ফাঁস হওয়া এক অডিয়ো বার্তায় শাবির উপাচার্যকে জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে দেখা গেছে। এই মন্তব্যের জেরে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদ অব্যাহত আছে। একই সাথে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপকের করা “আমরা চাষাভুষা নই” মন্তব্য নিয়েও সমালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য শাবির কতিপয় শিক্ষক আদতে শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অনেকেই আন্দোলনে বহিরাগতের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। শাবির উপাচার্য সেইজন্যই হয়তো বহিরাগতদের নামে নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করতে ক্যাম্পাসে পুলিশ ডেকে বেধড়ক পিটিয়ে আহত করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি খবর বেশ চাওর হয়েছে যে, দেশের ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শাবির উপাচার্যের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তারা এই বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে, শাবির উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হলে তারাও এক যোগে পদত্যাগ করবেন। ব্যাপারটি এমন দাঁড়িয়েছে যে, উপাচার্যরা নিজেরাই যেন এক একটি সিন্ডিকেট। একটি দেশে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের উপস্থিতিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে যাচ্ছেন- এই ঘটনা তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেল বাংলাদেশের কোনো একটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য স্নাতক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা কারাবন্দী হাজতির পোশাক পরে র‍্যাগডে পালন করেছেন। বিষয়টা মজার হলেও এর ভেতর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইস্পাত কাঠিন্যের উপস্থিতি বিদ্যমান আছে অনেকে মনে করতে পারেন। মোটাদাগে বলা যায়, কারাবন্দী হাজতির পোশাককে প্রতীক হিসেবে দেখলেও এই কারাগারের জেলার কারা এই প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। প্রশ্ন এটিও হতে পারে শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা জীবনকে কারাগারের হাজতির সাথে সমকক্ষ করে দেখছেন কেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর আর যাই হোক, দিন শেষে এটা বলা যায় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে জেলার হিসেবে শিক্ষক মহল যতটা না ভূমিকা পালন করছে; তার চেয়ে বেশি নগ্নভাবে হাজির থাকছে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক প্রশাসন ব্যবস্থা। আর এই কেন্দ্রে আছেন স্বয়ং উপাচার্য এবং তার রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকজন।

দেশের একটি নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কারাবন্দী হাজতির পোশাক পরে কেন র‍্যাগডে পালন করে তা বুঝতে না পারলে শাবির আন্দোলনকেও বুঝা যাবে না। সেই সাথে এটাও বুঝা যাবে না যে, নারীকেন্দ্রিক মন্তব্যের জন্য শুধুমাত্র ডাক্তার মুরাদকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। বুঝতে বাকি থাকে না যে, নারীদের ক্ষেত্রে বিরূপ মন্তব্য শুধু ডাক্তার মুরাদের একার কাজ নয়; তার সাথে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও আছেন। তেমনি আছে দেশের শিক্ষার্থীদের চাষাভুষা খেতাব দেওয়ার হাজারও শিক্ষক।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, হাঙ্গেরির কর্ভিনাস ইউনিভার্সিটি অব বুদাপেস্ট এবং শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

ওডি/নিমি

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড