• বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭  |   ৩৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

‘জিলাপির প্যাঁচ ও চিকিৎসা’

  আনার কলি

৩১ মে ২০২০, ২২:১৮
করোনা
ছবি : সম্পাদিত

অন্য সময় জিলাপি খাওয়া হোক বা না হোক কিন্তু রমজানে জিলাপি চাই ই চাই। আট-দশটা পরিবারের মতো সীমা (ছদ্মনাম) ও তার স্বামী প্রতিবছর রমজানে জিলাপি দোকান থেকে কিনে খায়। এবার লকডাউনের কারণে জিলাপি পাওয়া বা খাওয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই সীমা ভাবলো বাসায় বানালে কেমন হয়, সে ইউটিউব দেখে চেষ্টা করলো। তার খুব মন খারাপ হলো এই দেখে যে ঠিকমতো জিলাপি হচ্ছে না, ফেসবুকে অন্য ভাবীদের পোস্ট দেখলো, তাদের জিলাপিও সুন্দর হয়েছে একদম দোকানের মতো। 

সে তারপর আরও কয়েক দফা চেষ্টা করে দোকানের মতো, অন্য ভাবীদের মতো জিলাপি বানাতে সক্ষম হলো। যা খেতেও খুব ভালো হয়েছে। তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেলো, এর ফলে একে একে বুন্দিয়া, দই, কালো জাম এবং আরও অনেক মজাদার খাবার তৈরি করলো। এই কাজ সম্ভব হয়েছে তার চিন্তার পরিবর্তনের কারণে যখন সে অন্যভাবে চিন্তা করলো যে, দেখি আমি চেষ্টা করে পারি কিনা, অন্য ভাবীরা পারলে আমিও পারবো।

এতদিন সে ভাবতো এই খাবারগুলো শুধু দোকানেই বানানো সম্ভব, ঘরে না। কিন্তু জিলাপি বানানোর সময় অন্যভাবে চিন্তা করার ফলে, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে সে সফল হলো। এই ঘটনা উপস্থাপন করার উদ্দেশ্য হলো যে, আমরা নিজেরাও অনেক সময় জানি না যে আমাদের ভেতর অনেক প্রতিভা আছে, অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং নানা নেতিবাচক চিন্তার কারণে নতুন কিছু শিখতে বা নতুন কিছুর উদ্যোগ নিতে আমরা সাহস পাই না।

সম্প্রতি করোনাভাইরাসের প্রভাবে আমাদের দৈনন্দিন কাজের অনেক ব্যাঘাত ঘটছে, আমরা নানা কারণে শারীরিক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। তাই করোনা মহামারির এই কঠিন সময়ে নিজেদের শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য কিভাবে ঠিক রাখা যায় তার কিছু দিক নির্দেশনা জেনে নিই-

নতুন কিছু শেখা : আমাদের দৈনন্দিন চাপ ও কাজের কারণে নতুন কিছু করা বা শেখা হয়ে ওঠে না। আগে হয়তো আপনি অনেক আফসোস করেছেন যে, 'ইশ যদি একটু সময় পেতাম তবে এটা করতাম, ওটা শিখতাম...।' লকডাউনের এই সময়টাকে বিরক্তিকর না ভেবে, একটা সুযোগ হিসেবে ভাবতে পারেন। এই সময়ে নিজেকে আরও জানার চেষ্টা করুন, নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে অন্যভাবে জীবনকে দেখার প্রয়াস করুন। লকডাউনের এই সময়গুলোতে আপনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী আরও দক্ষ হতে পারেন, নতুন কিছুর অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। প্রত্যেক মানুষ আলাদা এবং অনন্য, সবার আলাদা গুণ ও দক্ষতা থাকে। আপনি চাইলেই সীমার মতো নিজের সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু শিখতে পারেন, বাড়িয়ে তুলতে পারেন নিজের দক্ষতা।

লাইফস্টাইল : এই দুঃসময়ে আপনি প্রতিনিয়ত চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন, এই চাপকে নিয়ন্ত্রণ করতে আপনাকে বেশ কিছু বিষয়ের উপর মনোযোগ দিতে হবে, যেমন-
 
রুটিন : লকডাউনে অনেকে পুরোপুরি ঘরে বসে আছেন আবার অনেকে হয়তো ঘরে বসে অফিস এবং ঘরের কাজ দুইটাই করছেন। এর ফলে ভীষণ চাপবোধ করছেন। এক্ষেত্রে যদি ঠিক করে পরিকল্পনা করে নতুন রুটিন বানান, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছোট ছোট কাজ ভাগ করে দেন তাহলে হয়তো অনেকটা কম চাপ কমবে আপনার। চেষ্টা করবেন এই রুটিনেও বৈচিত্র্য আনার, যাতে একঘেয়েমি না আসে। পরিবারের সঙ্গে নতুন কোনো সিনেমা দেখতে পারেন, নতুন কোনো খাবার রাঁধতে পারেন, লুডু, কার্ড, ক্যারাম খেলতে পারেন অথবা অন্য কোনো কাজ যা সবাইকে আনন্দ দিবে।

পর্যাপ্ত ঘুম : অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করবেন। ঘুমানোর আগে পছন্দ মতো বই পড়তে পারেন, শুনতে পারেন প্রিয় কোনো গান কিংবা মেডিটেশন করতে পারেন। ঘুমানোর আগে করোনা মহামারি সংক্রান্ত খবর, লেখা, পোস্ট থেকে নিজেকে দূরে রাখবেন। নিয়ম করে,  সময় নির্দিষ্ট করে দিনে এক থেকে দুইবার খবর দেখবেন/ পড়বেন। 

খাদ্যাভ্যাস : প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (গাজর, পালংশাক, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাকবেরি, ব্লুবেরি), অন্য তাজা, মৌসুমি ফল, শাকসবজি রাখুন। বেশি বেশি পানি পান করুন। অতিরিক্ত তেল, চিনিযুক্ত খাবার পরিহার করুন।

ব্যায়াম : বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত ব্যায়াম করে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। তাই বাসায় বসে ২০/৩০ মিনিট ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলুন। বয়স্করা ঘরে হাটাহাটি বা হালকা ফ্রি হ্যান্ড করতে পারেন নিজ নিজ সুবিধা অনুযায়ী। 

প্রার্থনা : যার যার ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করুন। এতে মনের দুশ্চিন্তা কমবে এবং প্রশান্তি বৃদ্ধি পাবে।

মেডিটেশন : অস্থির মনকে শান্ত রাখার জন্য, নিজেকে আরও বেশি সক্রিয় করার একটি বড় মাধ্যম হতে পারে মেডিটেশন। সকালে ঘুম থেকে উঠে অথবা রাতে ঘুমানোর আগের সময় মেডিটেশনের জন্য উত্তম। আপনি খুব সহজে ‘ব্রিদিং মেডিটেশন’ করতে পারেন যা আপনার ফুসফুসের কার্যকারিতা বাড়াবে।

৪-৭-৮ এই সংখ্যা মনে রাখুন, এবার আরামদায়ক কোথাও শুয়ে, কিংবা হেলান দিয়ে বসে, চোখ বন্ধ করবেন তারপর ১,২,৩,৪ গুনে গুনে গভীরভাবে নাক দিয়ে শ্বাস নিবেন, ৭ সেকেন্ড বা ৭ পর্যন্ত গুনে  শ্বাস ধরে রাখবেন এবং ৮ সেকেন্ড বা ৮ পর্যন্ত গুনে নিশ্বাস বের মুখ দিয়ে বের করবেন। 

এটাই ৪-৭-৮ টেকনিক। এ সময় চেষ্টা করবেন পুরো মনোযোগ শ্বাস-প্রশ্বাসে দিতে। এই প্রক্রিয়া ৩-৪ মিনিট ধরে করবেন। এছাড়া নিজ সুবিধা অনুযায়ী অন্যান্য মেডিটেশন (গাইডেড মেডিটেশন, মাস্কুলার প্রগ্রেসিভ রিলাক্সেশন, ভিজ্যুয়ালাইজেশন, মাইন্ড ফুলনেস) করতে পারেন। নিয়মিত মেডিটেশন করলে আপনার মনোযোগ বাড়বে, রাগ নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং দুশ্চিন্তা কম হবে।

পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রার্থনা, মেডিটেশন, ব্যায়াম এই বিষয় গুলোর প্রতি নজর দেওয়া জরুরি। কারণ এগুলো আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, মনকে শান্ত রেখে এর কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।             

বর্তমান নিয়ে থাকা : আপনি খেয়াল করে দেখবেন আপনার বেশিরভাগ চিন্তা অতীত কেন্দ্রিক, কিংবা ভবিষ্যতে কি হবে এই আশংকা-অনিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করে। বিশেষ করে এই দুঃসময়ে সামনের দিনে কি হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আসবেই, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভবিষ্যতে কি হবে সেটার চিন্তা বা ফেলে আসা অতীতের ভাবনা নিয়ে বর্তমানকে যেন নষ্ট না করি। অতীত থেকে শিক্ষা নিবো, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করবো এবং আজকের দিনের প্রতি দিবো পূর্ণ মনোযোগ। দিনের প্রতিটি কাজ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে করার অভ্যাস করুন, এতে কাজটি ভালো মতো সম্পন্ন হবে, আপনি ভালো বোধ করবেন, অন্য কাজেও উৎসাহ বাড়বে এবং আগামীকালের দুশ্চিন্তা কমে আসবে। সময়টাকে যতটুক পারেন উপভোগ করার চেষ্টা করুন। 

সম্পর্ক : লকডাউনের কারণে যেহেতু বাসায় বেশি থাকছেন এতে করে পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারছেন। পরিবারের সবার সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম বা আনন্দদায়ক সময় কাটানোর চেষ্টা করুন। সম্পর্কগুলো যেন মজবুত হয় সেদিকে নজর দিন, নিজেদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি ঠিক করা, একে অন্যকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায় এমন কাজ করুন, একে অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। আর ঘরে বসে নিজের কাছের মানুষ, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ নিন।

আরও পড়ুন : তুমিও কি আমার মত করে ভাবছো?

ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ান : করোনাভাইরাস আমাদের ফুসফুসকে আক্রান্ত করে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাই এ সময় ফুসফুসের জন্য চাই বাড়তি যত্ন। ডীপ ব্রিদ এক্সারসাইজ আপনার ফুসফুসের বাতাস নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, দেহে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়ায়। আপনি বাসায় কোনো খোলামেলা স্থানে থেকে জোরে জোরে মুখ দিয়ে শ্বাস নিয়ে বেশ কিছু সময় ধরে রাখবেন, তারপর আবার মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে নিশ্বাস ছাড়বেন। এই প্রক্রিয়া কয়েকবার করতে পারেন। পর্যাপ্ত পানি পান করুন, ধূমপান এবং তামাকের ব্যবহার বর্জন করুন। বাসায় বসে যে সব ব্যায়াম করা সম্ভব তা করার চেষ্টা করুন। প্রাণ খুলে হাসুন, নিজের প্রিয় গান গাইতে পারেন, হোক তা বেসুরে। হাসি এবং গান আপনার ফুসফুসকে ভালো রাখবে।

পজিটিভ মনোভাব : আশাবাদী, ইতিবাচক চিন্তা আমাদের শরীর ও মনকে প্রফুল্ল রাখে। তাই চেষ্টা করবেন এই পরিস্থিতি মেনে নিয়ে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে নিজেকে এবং আশপাশের মানুষকে ভালো রাখতে।         

এই সময়টাতে সুস্থ এবং সতর্ক থাকা দুইটাই জরুরি।  তাই আমরা যেন সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে সতর্ক থাকি, বিশ্বাস রাখি এই মহামারি সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় আমরা দূর করে দিতে পারবো।

লেখক : ক্লিনিকাল সাইকোলোজিস্ট, এন এইচ এস, ইউকে

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড