• মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ওষুধ এবং খাদ্যে ভেজালের কারণ সরকারের দুর্বল ম্যানেজমেন্ট

  রহমান মৃধা

০৬ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৪৫
রহমান মৃধা
সুইডেন প্রবাসী রহমান মৃধা

আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন কোম্পানী সানোফি (SANOFI) বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কোম্পানিটি  জানিয়েছে, `বাংলাদেশের বিপণন ব্যবস্থা অনৈতিক। ওষুধ কোম্পানিগুলোকে তাদের ওষুধ চালানোর জন্য ডাক্তারদের বড় অঙ্কের কমিশন ও উপহারসামগ্রী দিতে হয়। তাহলেই তারা রোগীদের ওই কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন। কিন্তু এ ধরনের মার্কেটিং সানোফির বৈশ্বিক নীতি অনুমোদন করে না। 

ডাক্তারদের ঘুষ দেয়া ছাড়া বাংলাদেশে মার্কেটিং হয় না। তাই তারা বাংলাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। `এ ধরনের খবর বাংলাদেশের ইমেজ (Goodwill) বহিঃবিশ্বের কাছে কি ভালো?

যে দেশে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে নেতাকর্মীরা ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ধান্দাবাজির সঙ্গে জড়িত এবং যে দেশে খাবারে ভেজাল, মিষ্টিতে কাপড়ের রং মেশানো হয়, সে দেশের ওষুধ শিল্পে কী অবস্থা তা আমার জানা নেই! বড় সখ হয় একবার বাংলাদেশের সব ওষুধ কম্পানিসহ ওষুধের দোকানগুলো (ফার্মাসি) অডিট করি। সুইডেনে ওষুধ কম্পানিতে প্রতি বছর সুইডিশ কর্তৃপক্ষ (Läkermedelverket), আমেরিকার FDA (food and drug administration), ইউরোপের The European Pharmacopoeia (Ph. Eur.) এবং জাপানের Japanese Pharmacopoeia 17th Edition- এরা চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ কম্পানীগুলো পরিদর্শন করে থাকে। মানব কল্যাণে এবং মানুষের সেবায় ওষুধ, তাই সে ওষুধ যেন নির্ভেজাল এবং সর্বজনস্বীকৃত হয়। সবসময় cGMP (current good manufacturing practices) মেনে ওষুধ তৈরি থেকে শুরু করে তার রক্ষণাবেক্ষণ এবং ফলোআপ করা এসব কর্তৃপক্ষের কাজের মধ্যে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বাংলাদেশের ওষুধ এবং তার উৎপাদন নিয়ে নানা লেখা প্রতিনিয়ত চোখে পড়ছে। ওষুধের নিরাপদ এবং যৌক্তিক ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ওষুধ কম্পানিগুলোর পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনিভাবে ফার্মাসিস্টদের ভূমিকাও অপরিসীম। ওষুধ কম্পানির মূল কাজ শুধু ওষুধ তৈরি করা নয়, মূল কাজ হচ্ছে সঠিক পদ্ধতিতে (cGMP) গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, সংরক্ষণ, বিতরণ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পরামর্শ প্রদান এবং এর ব্যবহার নির্ধারণ করা। চিকিৎসকের কাজ ডায়াগনস্টিক উপায়ে রুগীর রোগ নির্ণয় করা এবং প্রেসক্রিপশন দেওয়া। 

ওষুধ যখন ফার্মাসিতে/ওষুধের দোকানে বিক্রয়ের জন্য আনা হয়, দোকানের মালিক তা সংরক্ষণ করবেন সেই ওষুধ সংরক্ষণের নিয়মানুযায়ী। যদি লেবেলে লেখা থাকে কোল্ড স্টোরেজ এবং তাপমাত্রা প্লাস ৪-৮ ডিগ্রি তখন তা সেভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এটি করতে হবে ওষুধের গুণগত ফল পেতে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রেহাই পেতে। ওষুধে যদি রুম টেম্পারেচারে সংরক্ষণ করার কথা লেখা থাকে তাহলে সেটাই করতে হবে। আমার প্রশ্ন বাংলাদেশে রুম টেম্পারেচার গরমে কত এবং শীতেই বা কত? যদি ওষুধ তৈরির সময় এ বিষয় খেয়াল করা না হয় তাহলে ওষুধের গুণগতমান বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যে খারাপ হবে না তার কী প্রমাণ রয়েছে? এর উত্তর ডকুমেন্ট ওয়েতে থাকতে হবে। (According to  cGMP regulations the product must validate, revalidate or qualify, prequalify as required by the authorities and this must be documented and filed)।

পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী ( ঘটনার সত্যতা যাচাই করা প্রযোজ্য) যেমন “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিজেই বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে।” আবার  আদালত বলছে, “আমাদের সরকারি সংস্থা থাকার পরেও বাজারে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আছে এবং বিক্রি হচ্ছে।” আদালত আরও বলছে, “দেশের প্রায় ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। ওষুধের প্যাকেটে মেয়াদের তারিখ এত ছোট করে দেওয়া হয় যা দেখা বা বোঝাও যায় না। মনে হয় মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হবে।”

যদিও ওষুধ উৎপাদনের দায়ীত্ব ওষুধ কম্পানীর কিন্তু তার সর্বাঙ্গীন দায়ভার স্বাস্হ্য মন্ত্রণালয়ের। ঠিক তেমনি খাদ্যের সর্বাঙ্গীন দায়ভার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়ীত্বে রয়েছে BSTI (Bangladesh Standards & Testing Institution)। তিনটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় ঘটাতে হলে দরকার জোরালো ম্যানেজমেন্ট এবং পরিদর্শন। তা যেহেতু নিয়মানুযায়ী হচ্ছে না এবং ওষুধ কম্পানী গুলোকে বড় অঙ্কের কমিশন দিতে হচ্ছে সেখানে ওষুধ এবং খাদ্যে ভেজাল অস্বাভাবিক কিছু নয়। কর্তৃপক্ষ জেনেশুনেও তেমন কিছু করছেনা কারণ তারা নিজেরাও জড়িত দুর্নীতির সঙ্গে।

RAB কর্তৃপক্ষ মাঝে মধ্যে হানা দিয়ে ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করছে সীমিত সময়ের জন্য মাত্র। আসল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কি কারণ থাকতে পারে এর পেছনে? যে মূল কারণ (root cause) রয়েছে, তা শনাক্ত করা এবং সমস্যার সমাধান করা আশু প্রয়োজন। শুধু ওষুধ বা লেবেলের গায়ে দাম, তাপমাত্রা এবং মেয়াদ লিখা থাকলেই কি সেই ওষুধ মান সম্পন্ন হলো? ওষুধ তৈরিতে কি কি উপাদান (ingredients) মেশানো হয়েছে/হচ্ছে এবং সেখানে কি পরিমান ভেজাল জড়িত এসব সত্য তথ্য জানার কি উপায় রয়েছে ভোক্তাদের! একজন রোগী মূমুর্ষু অবস্থায় ওষুধ গ্রহণ করে থাকে। সে সময় যদি এই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গ্রহণ করে সেটা তার জন্য যে আরও ক্ষতিকর তাও কি আমরা ভুলতে বসেছি?

উপরের বর্ণনায় এটা প্রতিয়মান হয় যে ওষুধ এবং খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ জড়িত যেমন খাদ্য, স্বাস্থ্য, BSTI এবং শিল্প মন্ত্রণালয়। আমার প্রশ্ন যদি ভুল ওষুধ বা খাবারের কারণে রুগী মারা যায় তবে সামগ্রিক ভাবে এর দায়ভার কার? একটি দেশের পরিকাঠামোতে এটা নিশ্চিত করা দরকার নইলে RAB সারাদেশকে দৌঁড়ের উপর রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে দেশ খাদ্য এবং ওষুধের ভেজাল মুক্ত হবে না।

যে কাজ যাদের করার কথা তা করছে অন্য সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান। যেমন BSTI-এর কাজ নিয়মিত তদন্ত এবং পরিদর্শন করা ওষুধ এবং খাদ্য শিল্পকারখানাগুলো। কিন্তু জানিনে কেন তারা তাদের মিশন সফলতার সাথে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে!

আমার মতে দেশের পরিকাঠামোর দুর্বলতা এবং অধিক সংখ্যক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীন ম্যানেজমেন্ট এর জন্য দায়ী। জনগণের উপর দোষ না চাপিয়ে সরকারকেই এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড