• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

যে কথা শুনেছিলাম সেদিন প্রথমবার

  সুইডেন প্রবাসী রহমান মৃধা

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২০:০৬
রহমান মৃধা
ছবি : সংগৃহীত

দূর হতে শহরের নাম শুনেছি। বত্রিশটি সেতুর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ শহর। প্রিয় সহধর্মিনীর হাত ধরে একের পর একটি করে সেতুর উপর দিয়ে হাঁটাহাঁটির সঙ্গে মনবিনিময় করা ছিল সেদিনের প্যারিসের জার্নী যা আজ এত বছর পর মনে পড়ে গেল।

আমার আর মারিয়ার বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগেই। সামারের শেষে দুই সপ্তাহের ছুটি নিয়েছি ফ্রান্স ভ্রমণের জন্য। দিনের আলোতে হাতে হাত রেখে হাঁটব আর দেখব। রাতের আঁধারে কফি সোপের আড্ডা আর ফ্যান্সি রেস্টুরেন্টে ফ্রান্সের নানা ধরণের খাবারের সঙ্গে সব মিলে হারিয়ে যাব আমি আর আমার সহধর্মিনী দিনে দুপুরে এবং রাতের আঁধারে।

এমনটি অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল সেদিন হৃদয়ে স্টকহোম থেকে। কোন প্ল্যান ছাড়াই কিনেছি টিকিট। কোথায় উঠব, কোথাই ঘুরবো, কি করবো কিছুই জানিনে শুধু এক বন্ধুর বাড়িতে যাবো সেটা ছিল সিওর। সন্ধা সাতটার দিকে পৌছে গেলাম Paris Charles de Gaulle এয়ারপোর্টে।

এয়ারপোর্ট থেকে ট্রেনে করে চলে এলাম প্যারিসে। সেন্ট্রাল প্যারিসেই সুন্দর একটি হোটেলে ঢুকে চেকিং পর্ব শেষ করে দুজনে বেরিয়ে গেলাম প্যারিসের সামার ইন দি সিটিতে। যাই করি আর যাই দেখি, সবই এক্সপেরিয়েন্স।

এর আগে তো কখনো প্যারিসে আসিনি তাই স্বাভাবিক ভাবেই সবই নতুন। প্যারিসে গিয়ে আনন্দ ফুর্তির রাজ্যে হারিয়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু নয়। কোথায় যাব? কী দেখব? কোথা থেকে শুরু করব? আসতে লাগল মনের মাঝে হাজারও প্রশ্ন। শুরু করলাম Eiffel Tower দিয়ে। রোমান্টিক শহরের দৃশ্য এক নজরে দেখতে পাওয়া ছিল সেদিন এক চোখের দেখা। পরের দেখা ছিল সেই Louvre Museum ভেতরে ঢুকে মোনালিসাকে দেখা। মোনালিসাকে দেখছি আর মাঝে মধ্যে আমার নববিবাহিত সহধর্মিনী মারিয়াকে দেখছি। হঠাৎ মারিয়া জিঙ্গেস করল মোনাকে না দেখে আমাকে কেন বার বার দেখছ? উত্তরে বলেছিলাম সেদিন তুমি সুন্দর তাই চেয়ে দেখি, প্রিয়া সেকি মোর অপরাধ! মোনাকে দেখে চলে গেলাম Cathedral Notre-Dame de Paris কাটালাম কিছুক্ষন সেখানে দুজনে। শুনেছি এই Cathedral এর বিখ্যাত ঘন্টাবাজক Quasimodoর বিশাল ভালোবাসার কাহিনি তার Gypsy Esmeralda এর সঙ্গে, তাই মনের অজান্তে কিছুক্ষন হারিয়ে গিয়েছিলাম দুজনে দুজানার সঙ্গে সেদিন।

পথ চলতে চলতে আর কথা বলতে বলতে চলে এলাম Avenue des Champs. এ সুন্দর ১.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এভিনিউ Place de la Concorde and the Arc de Triomphe যা না দেখলেই নয়। পরে এক নজর দিয়ে এলাম Sacré-Cœur Basilica. দিনের শেষে সেই বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পীদের আড্ডাখানা, বিকেলের শেষে ঘুরে ঘুরে চিত্রশিল্পীদের রংয়ের ছোয়া ছুয়েছিল সেদিন আমাদের হৃদয়ও। ঘোরার রইল বাকি আর দেখার হলোনা শেষ, তবে সময়ের শেষ হতে চলেছে। হঠাৎ চারদিন পার হয়ে গেল প্যারিসে। সময় তাড়া করেছে যেতে হবে এক বন্ধুর বাড়িতে। বন্ধুর বাড়ি St Malo. প্যারিস থেকে ট্রেনে St Malo এর দুরত্ব তিন ঘন্টা। বন্ধুর নাম সামপেয়ার্স।একসঙ্গে পড়েছি সুইডেনে। সামপেয়ার্স বিয়ে করেছে আমার আগে। সামপেয়ার্স আমার চেয়ে মস্তবড় পরিচালক। বিয়েও করেছে এক জমিদারের মেয়েকে।মেয়ের বাবার বাড়ি Jerseyতে। সকালে ঘুম থেকে উঠে এক্সপ্রেস ট্রেনে করে রওনা দিলাম St Maloর উদ্দেশ্যে।

তিন ঘন্টার মত এই ট্রেন জার্নী। পথে ফ্রান্সের গ্রামের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্রায় চলে এসেছি, হঠাৎ টিকিট কাউন্টার আমাদের টিকিট দেখতে চাইল, টিকিট বের করে দেখালাম ফ্রান্স ভাষাতে কি সব বলতে শুরু করল যার কিছুই বুঝলাম না তবে মারিয়া দিব্বি কথা বলে যাচ্ছে দেদারছে। পরে জানতে পারলাম টিকিট শুধু কিনলেই হবে না ট্রেনে ঢোকার আগে একটি মেশিনের মধ্যে দিয়ে চেকিং করতে হয় যা আমরা করিনি, ভুলে গেছি বা খেয়াল করিনি। খেয়াল করব কি করে নতুন প্রেমের জোয়ার বইছে মনে, সব কি আর ঠিক থাকে? যতটুকু মনে পড়ে এসব ভুলের জন্য জরিমানা দিতে হয় দ্বিগুণ এটাই নরমাল নিয়ম কিন্তু মারিয়ার ফ্রান্স ভাষা জানা এবং হ্যানিমুনের ভ্রমণের কথা শোনার পরে বেচারা দয়া করেছিল তাই এক হাজার ফ্রাংক বেঁচে গিয়েছিল সেদিন।

স্টেশনে হাজির হতেই বন্ধু সামপেয়ার্স এবং তার সহধর্মিনী মালিকা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য এক গোছা ফুলের তোড়া হাতে করে। ফ্রান্সের রোমান্টিক ওয়েতে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে নিয়ে গেল আমাদেরকে সেই day trip to the beautiful Channel Islands of Jersey. এ Jersey শহরে বাস করে মালিকার বাবা-মা। মালিকার বাবা তাঁর নিজের Condor boatএ বসে আছে আমাদের জন্য। শুভেচ্ছা ভালোবাসা বিনিময় শেষে রওনা দিলাম Jerseyতে। জীবনে এই প্রথম বেল্ট বাঁধলাম মাজাতে। Condor চলতে শুরু করল হাওয়ার বেগে এবং একঘন্টা কুড়ি মিনিট পরে হাজির হয়ে গেলাম Jersey's stylish beach cafeতে এবং লান্স এখানে সেরে গাড়ি করে পৌছে গেলাম মালিকার বাবা-মার প্রাসাদ বাড়িতে।

বিশাল জায়গা নিয়ে Jerseryতে রয়েছে আঙ্গুর ফলের বাগান সঙ্গে ন্যাচারাল পদ্ধতিতে ওয়াইন তৈরির কারখানা- Let me just say, what a beautiful place this is. মালিকার সঙ্গে সামপেয়ার্সের প্রেমের কাহিনী শুনেছি আগে, এখন সেয়ার করব এক মজার গল্প।

সামপেয়ার্স লেখাপড়াই ভালো তবে মালিকার মত বড়লোক নয়। তাদের প্রেম এবং পরে বিয়ে মালিকার বাবা-মার কিছুটা মতের বিরুদ্ধে বলতে হয় তবে তারা একে অপরকে ভালোবাসে বিধায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। সামপেয়ার্সের ধারণা ছিল একমাত্র মেয়ে কিনা কি হবে বা পাবে বিয়ের পরে। দু.খের বিষয় সাধারণ ভাবে বিয়ে হয়েছে এবং সামপেয়ার্স গিফট হিসাবে ৫০টি ওয়াইনের বোতল পেয়েছে।

সামপেয়ার্সের মনটা বেশ খারাপ ছিল অনেকদিন ধরে। মালিকা এবং সামপেয়ার্স যেহেতু নিজেদের বাড়ি St Maloতে থাকে তাই কোন এক অকেশনে তাদের দুজনার সেলেব্রেশন পালন করবে।

ঘরে ড্রিংক করার মত তেমন কিছু নাই, শেষে সামপেয়ার্স মনে করল বাড়িতে ৫০টি ওয়াইনের বোতল রয়েছে চলো তার একটি ড্রিংক করি? বোতলের কর্ক খুলতেই দেখতে পেল বোতলে ওয়াইন ভরা হয়েছিল ১৮৫০ সালে যা কর্কে সিল মারা রয়েছে। মালিকা তাঁর বাবাকে ফোন করে বিষয়টি বলতে বাবা বলেছিলেন “ঐ ওয়াইন গুলো আমার নানা পেয়েছিলেন তার শ্বশুরের থেকে, পরে আমি পেয়ছিলাম তোমার নানার থেকে এখন তোমরা পেয়েছ আমার থেকে”। - সেদিন সামপেয়ার্স জানতে পেরেছিল পঞ্চাশ হাজার ফ্রাংক প্রতিটি ওয়াইনের বোতলের মার্কেট ভ্যালু যা সে গিফট পেয়েছিল, ১৯৯৪ সালের কথা। মনের আনন্দে ঘুরছি আর প্রতিটি মুহুর্ত এনজয় করছি Jerseyতে।

তিনদিন কখন কি ভাবে পার হয়ে গেল জানিনে। হঠাৎ মারিয়ার শরীরটা বেশ খারাপ মনে হচ্ছে এবং সে বলে সুইডেনে ফিরতে হবে। কি করা তাড়াহুড়ো করে ফ্লাই ব্যাক করলাম বাড়িতে। বাড়িতে ফিরে এসে মারিয়া ডাক্তারের কাছে গিয়েছে। আমি বাসাতে রাঁন্নাবাড়ির ব্যবস্থা করছি। মারিয়া বাসাতে এসে বাথরুমের বাথ টবে পানি ভরে তার মধ্যে গোসল করতে আমাকে বলছে Rahman jag älskar dig. Jag blir mamma till ditt barn. শুনেছি এ কথা হাজারও বার, রহমান আমি ভালোবাসি তোমাকে, আমি তোমার সন্তানের মা হতে চলেছি, এ কথা শুনেছিলাম সেদিন প্রথমবার।

 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড