• মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কে জানত সেদিন...

  রহমান মৃধা

০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৯:৫৪
রহমান মৃধা
সুইডেন প্রবাসী রহমান মৃধা

ফ্লোরিডা প্রণালী আটলান্টিক মহাসাগরের মেক্সিকো উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী এক সমুদ্রপথ। পথটির উত্তরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণতম প্রান্তে অবস্থিত ফ্লোরিডা কিজ দ্বীপপুঞ্জ। পথটির দক্ষিণে ও দক্ষিণ-পূর্বে আছে দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা ও বাহামা দ্বীপপুঞ্জ।

আমার ছেলে-মেয়ে জনাথান ও জেসিকা এবারের টেনিস টুরে বেছে নিয়েছে ফ্লোরিডা ট্যুর এরাউন্ডে তাই সঙ্গে আমি এবং স্ত্রী মারিয়াও রয়েছি। জেসিকার প্রথম খেলা অরেঞ্জ বোল হবে মায়ামির কোরাল গাবেলে। অরেঞ্জ বোল টুর্নামেন্টকে আনঅফিসিয়াল ওয়ার্ল্ড কাপ টেনিস টুর্নামেন্ট বলা হয় এবং পৃথিবীর কমপক্ষে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি দেশের ছেলে-মেয়েরা এই খেলায় প্রতি বছর অংশ গ্রহণ করে থাকে।

শর্ত একটি তা হলো এসব খেলোয়াড়দেরকে তার দেশের মধ্যে প্রথম এবং দ্বিতীয় থাকতে হবে মেধা তালিকায় এবং হতে হবে ১২, ১৪, ১৬ এবং ১৮ বছরের কোন এক বয়সের মধ্যে। জেসিকা সুইডেনের হয়ে খেলবে গার্লস আন্ডার ১৪। জনাথান জুনিয়র টেনিস শেষ করেছে এবং সে খেলবে প্রো-টুর আইটিএফ যা এটিপি ওয়ার্ল্ড ট্যুরের ইভেন্ট এবং তার খেলা হবে, ওয়েষ্ট পাল্মবিসে এবং পরে টাম্পা, ফ্লোরিডাতেই।

জেসিকার প্রথম খেলা পড়েছে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এবং জিতেছে খেলাতে, পরের ম্যাস পড়েছে আমেরিকার সঙ্গে। জেসিকা মোটামুটি ভালো খেলেছে এবং তৃতীয় রাউন্ড ছিল তার পারফরমেন্স এবারের টুরে। এবার রওনা দিলাম ওয়েষ্ট পাল্মবিসে যেখানে জনাথান খেলছে।

প্রসঙ্গত বলতে হয়, আমাদের এবারের জার্নীর প্লানটা হয়েছে কিছুটা ভিন্ন ধরণের। যেহেতু জনাথান এবং জেসিকা দুজনেই খেলছে এবং একই সময় খেলা চলছে তাই আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছি। আমি আর জেসিকা কোরাল গাবেলে ওদিকে জনাথান ও মারিয়া ওয়েষ্ট পাল্মবিসে।

মায়ামি ট্যুর শেষে আমরা সবাই যাব টাম্পাতে যেখানে শুধু জনাথান খেলবে পরে খেলা শেষে তিনদিন ছুটি কাটাব আমার বড় ভাই প্রফেসর ড. মান্নান মৃধার বন্ধু ড. ফিরোজ ভাই ও সালমা ভাবির সঙ্গে ফোর্ট মায়ারে, তার পর ফিরব সুইডেন। জনাথান কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, এবার যেতে হবে টাম্পাতে। ওয়েষ্ট পাল্মবিস থেকে সকাল সকালে গাড়িতে করে রওনা দিয়েছি, পথে হঠাৎ দেখি রাস্তার দুইধারে লেক বয়ে চলেছে এবং শত শত এলিগাটর বা কুমির পাড়ের উপরে মনের আনন্দে সূর্যের তাপে বিশ্রামে মগ্ন। কুমিরের নাম শুনেছি এবং দেখেছি। সি-ওয়ার্ল্ডে বা বিশ্বের বিভিন্ন চিড়িয়াখানাতে ঠিকই কিন্তু এ ভাবে রাস্তার দুই ধারে শত শত কুমির এই জীবনে প্রথম দেখলাম।

পথে হরেক রকম মজার মজার পশু পক্ষি দেখতে দেখতে তিনঘন্টা পার হয়ে গেছে এবং আমরা এসে হাজির টাম্পাতে। টাম্পার খেলার শুরুতে জনাথান হাঁটুতে ব্যাথা পায় বিধায় খেলা সমাপ্ত করে সরাসরি চলে গেলাম ফোর্ট মায়ারে।

ফোর্ট মায়ার বিসের সাথেই ফিরোজ ভাই করেছে সুন্দর একটি বাড়ি এবং বাড়ির আসে পাশে সবুজে ভরা। মজার ব্যাপার যে ওনাদের বাড়ির বাগানে আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, নারিকেল, লিচু, আখ, শাক-সব্জি সব কিছুতে ভরা, বলতে গেলে লিটিল বাংলাদেশ ফ্লোরিডাতে।

সবাই খুব আনন্দ ফুর্তির মাঝে আছি। ফিরোজ ভাই এবং সালমা ভাবির আদর যত্ন আমাদের মুগ্ধ করে তুলেছে। বছর দুই আগে ফিরোজ ভাই এবং সালমা ভাবি সুইডেনে এক কনফারেন্সে এসেছিলেন আমাদের স্টকহোমে তাই সবাই সবাইকে আগে থেকে চেনা-জানার কারণে মেলা-মেশাটা জমে উঠেছে।

ফোর্ট মাইয়ারের পাড়ে গড়ে উঠেছে লি কাউন্টি শহর যেখানে ফিরোজ ভায়ের বিশাল ক্লিনিক। আমরা শহর ঘুরতে হঠাৎ চোখে পড়ে গেল বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক টমাস এডিসনের বাগান বাড়ি। টমাস এডিসন অন্ধকার জগতে আলোর সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন তার বাল্ব আবিষ্কারের মধ্যদিয়ে।

টমাস এডিসনের আদি বসতবাড়ি ওয়েষ্ট অরেঞ্জ, নিউ জার্সিতে। তবে জীবনের অনেক সময় এবং শেষের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন এই ফ্লোরিডাতে। ফোর্ট মাইয়ারে শীত এবং বসন্তের সময় ছিল তাঁর জীবনের বেশি সময়ের বাস।

পাঠক কেন আজ হঠাৎ এসব কথা? দীর্ঘ দিন ধরে আমি লিখালিখি করছি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে এবং তাদের বর্তমান সমস্যার কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি নানাভাবে যাতে করে তাদেরও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। প্রতিবন্ধী হতে পারে বা দিতে পারে পরিবর্তন করে গোটা বিশ্বকে যদি তারাও একটু সহানুভূতি পায়।

এমন ঘটনা পৃথিবীতে রয়েছে যা জানা বা অজানা থাকতে পারে। যাই হোক না কেন, আজ বলব আমার ফোর্ট মাইয়ারে লি কাউন্টি শহরের ওপর গড়ে ওঠা টমাস এডিসনের রহস্যময় জীবনকাহিনীর একটু অংশ এবং তাঁর বাগান বাড়ি ভ্রমনের গল্পের সঙ্গে তার ইলেকট্রিক বাল্ব আবিস্কার নিয়ে কিছু কথা।

টমাস আলভা এডিসন জন্ম ১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৭ মৃতু ১৮ অক্টোবর ১৯৩১। টমাস বিশ্বের মানব কল্যাণে এবং বিশ্বের কলকারখানাতে রেভুলেশন সৃষ্টি করেছিলেন ইলেকট্রিক বাল্ব তৈরি করে। টমাস স্কুল জীবন শুরু করেছে। বেশিদিন না যেতেই স্কুলের শিক্ষক তাঁর হাতে একটি চিঠি তুলে দিয়ে বলেছিল, “টমাস চিঠিখানা তোমার মাকে দিবে।”

টমাস বাড়িতে এসে তাঁর মার হাতে চিঠি দিতেই মা তৎক্ষণাৎ চিঠি পড়তে শুরু করেন। টমাসের মায়ের চোখ ভরা জল যা শুধু ঝরছে। টমাসের মায়ের চোখে জল দেখে টমাস মাকে জিজ্ঞেস করে, “মা তোমার চোখে জল কেন? তুমি কাঁদছ কেন? কি এমন কথা লিখেছে যে তুমি কাঁদছ?” মা চোখ মুছে টমাসকে বলে বাবা আমার গর্ব লাগছে তোমার শিক্ষকের চিঠি পড়ে।

কি লিখেছে মা আমার শিক্ষক? লিখেছে তুমি তোমার স্কুলের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র, তারা তোমাকে যুগোপযোগি এবং তোমার প্রয়োজন মত শিক্ষা দিতে পারবে না কারণ তেমন যোগ্য সম্পন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তাদের নেই এমনকি যোগ্য-সম্পন্ন শিক্ষকও নেই তাই তারা লিখেছে আমি তোমার একমাত্র শিক্ষক এবং মা, যে পারবে তোমাকে সুশিক্ষা দিতে।

টমাস বলেছিল তাঁর মাকে “তাহলে তো ভালোই হবে মা, আমি তোমার থেকে শুধু ভালোবাসা নয় এখন থেকে প্রশিক্ষণও পাব কিই না মজা হবে।” টমাস শুধু শিক্ষা নয় সুশিক্ষা পেয়েছিল জীবনে। পৃথিবীর অন্ধকারকে আলোময় করেছিলেন তিনি তাঁর ইলেকট্রিক বাল্ব তৈরি করে। অনেক বছর পার হয়েছে তাঁর মা মারা গেছেন অনেক দিন আগে। আজ হঠাৎ তার কেন একটু অস্থিরতা লাগছে, টমাস পুরনো স্মৃতিচারণের সঙ্গে খুঁজছে ঘরের অনেক পুরনো কাগজপত্র। হঠাৎ আলমারির কোনে তাঁর নজরে পড়ে ছোটবেলার তাঁর মাকে শিক্ষকের দেওয়া সেই চিঠি।

টমাস কিউরিয়াস হয়েই চিঠিখানা খুলে পড়তে অবাক, হতভম্ব এবং দিশাহারা হয়ে পড়ে। মা যা তাকে বলেছিল তার কোন কথাই তো এখানে লিখা নাই। স্কুল শিক্ষক লিখেছিল তোমার ছেলে প্রতিবন্ধী, সে খুবই দুর্বল সব বিষয়ে, তাকে দিয়ে শিক্ষা হবে না। তাই পারলে তুমি নিজেই তোমার ছেলের দায়ীত্ব নেও। আমরা পারব না এমন গাধাঁকে শিক্ষা দিতে।

যে কথা শিক্ষক লিখেছিল সে কথা বিশ্বাস করেনি টমাসের মা সেদিন। টমাসের মা টমাসকে সেই কথা বলেছিলেন যে কথা টমাসের মা বিশ্বাস করেছিল তাঁর ছেলে টমাসের ওপর। স্কুল শিক্ষক সেদিন টমাসের জীবনের আলোর ইতি ঘটিয়েছিল। কিন্তু টমাসের মা তা হতে দেয়নি সেদিন, বরং দিয়েছিল সেদিন হৃদয় ভরে বিশ্বাস আর আশ্বাস টমাসের জীবনে। এক বিস্ময়কর মা এবং তাঁর চমৎকার নেতৃত্ব দিয়েছিল দ্বীপ জ্বেলে টমাসের জীবনে।

Edison cried for hours and then he wrote in his diary: “Thomas Alva Edison was an addled child that, by a hero mother, became the genius of the century.”

ফোর্ট মাইয়ারে টমাসের বাড়িতে তাঁর ডাইরি পড়তে চোখের জল এসেছিল এবং মনে পড়ে গেল লাখো প্রতিবন্ধীদের কথা। মনে পড়ে গেল নহাটার কথা। মনে পড়ে গেল মাগুরার কথা। মনে পড়ে গেল বাংলাদেশের কথা। আমি বাংলাদেশ, আমার নাম বাংলাদেশ। আমি প্রতিবন্ধী নই আমি মানুষ, আমাকে অবহেলা করো না। আমাকে একটু সহানুভূতি এবং সুযোগ দিলে আমিও গণতন্ত্রের সোনার বাংলা গড়তে পারব।

লেখক : রহমান মৃধা, সমাজকর্মী, সুইডেন থেকে

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড