• রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন

পরমাণু অস্ত্রের হুংকারে কাঁপছে এশিয়া

  অলোক আচার্য

২১ আগস্ট ২০১৯, ১৫:৩৫
পারমাণবিক অস্ত্র

বিশ্ব একদিকে পরমাণু অস্ত্রের ঝুঁকিমুক্ত হতে চাইছে অন্যদিকে বিভিন্ন সময় পরমাণু অস্ত্রসম্পন্ন দেশগুলো নিজেদের বিবাদে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারের কথা সামনে চলে আসে। বর্তমানে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে পরমাণু অস্ত্র সজ্জিতদুই দেশের যুদ্ধের সম্ভাব্যতায় আবারও পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিষয়টি সামনেএসেছে বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং আতঙ্কিত হওয়ার মতো বিষয়। গত বছরেও ভারত পাকিস্থানের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়ায় একই রকম পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল।

কাশ্মীর সংকট থেকে দিল্লী-ইসলামাবাদ পারমাণবিক যুদ্ধের সূত্রপাত হতে পারে বলে পাকিস্থান সেনাবাহিনী থেকে হুশিয়ার করা হয়েছে। বিশ্ব গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। বলা হয় কাশ্মীর থেকে দৃষ্টি সরাতে ভারত এ হামলা করতে পারে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত পাকিস্থান তিনটি যুদ্ধের মধ্যে দুটি হয়েছে কাশ্মীর ইস্যুতে।

সম্প্রতি ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরের স্বায়ত্তসাশনের অধিকার ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়। এর প্রতিবাদে ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাস করার পাশাপাশি ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারকে বহিষ্কার করেছে পাকিস্থান। বিষয়টি জাতিসংঘ পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুই পক্ষই এখন উত্তপ্ত। ভারত-পাকিস্থানের মধ্যে যুদ্ধ হলে কি প্রভাব পরতে পারে তা নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন এর ভয়াবহতা। তারপর যদি সেই যুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের প্রয়োগ করা হয়।

গত মার্চ মাসে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সীমিত পর্যায়ে এমন একটি যুদ্ধ হলেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাবে দীর্ঘমেয়াদে ২০০ কোটি মানুষ প্রাণ হারাবে। বিপন্ন হবে প্রকৃতি। হুমকিতে পড়বে খাদ্যচক্রসহ সমস্ত প্রাণ। ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষ আর দীর্ঘতর পরিবেশ বিপর্যয় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে মানুষসহ আর সব প্রাণের অস্তিত্তকে। কার কাছে কত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে তা গোপনীয় বিষয়। ফলে একেবারে সঠিক সংখ্যা বলা যায় না। তবে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল এর ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের ১৩০-১৪০ টি আর পাকিস্থানের ১৪০ থেকে ১৫০ টি পরমাণু অস্ত্র রয়েছে।

এই দুই দেশ যুদ্ধে জড়ালে তা কেবল নিজেদের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা ছড়িয়ে পরবে প্রথমত এশিয়া এবং কার্যত সারা বিশ্বে। কে জানে এটিই বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর যুদ্ধ হতে পারে! কে যুদ্ধে পরাজিত হবে আর কে বিজয়ী হবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো যুদ্ধ পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কত বছর সময় লাগবে। যে মারাত্বক পরিবেশগত এবং মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে তা কোন উপায়ে মোকাবেলা করা হবে। 

পারমাণবিক অস্ত্রের কথা উঠলেই চলে আসে জাপানের নাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে ১৯৪৫ সালের আগষ্টের ৬ ও ৯ তারিখ হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়। সারা বিশ্ব দেখে ’লিটল বয় ও ফ্যাট ম্যান’ নামের সেই অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। এই বোমা নিক্ষেপের ফলে হিরোশিমায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে ৭৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। আমেরিকার পরে দ্বিতীয় দেশ হিসেবে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় সোভিযেত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ সালে তারা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। তৃতীয় দেশ হিসেবে ব্রিটেন এই বোমার পরীক্ষা করে। এর ফলে পৃথিবী বুঝে যায় যে এই ভয়ংকর অস্ত্র হাতে থাকলে বিশ্বে খবরদারী করা যাবে। 

এরপর চীন,ফ্রান্স,ভারত,পাকিস্থান,উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হয়।একসময় পৃথিবী বুঝতে পারে এই অস্ত্র বিশ্বের জন্য হুমকী। এই অস্ত্র বিস্তার রোধে চুক্তিও হলো। পারমাণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী বোমা আবিষ্কৃত হয়েছে। হাইড্রোজেন বোমা পারমাণবিক বোমার চেয়েও ৭০০ গুণ বেশি শক্তিশালী। তবে তা কোনো যুদ্ধে ব্যাবহার করা হয়নি। 

যদি এখন বিশ্বে পারমাণবিক যুদ্ধ হয় তাহলে বিশ্বের এই ভয়ংকর ক্ষতির জন্য সংশ্লিষ্ট কোনোদেশ নিজেদের দায় অস্বিকার করতে পারবে না। জয়ের থেকেও বড় কথা পৃথিবীকে বিপন্ন করে এই জয় পরাজয় কার জন্য? মোট কথা বিশ্ব এখন ভয়ংকর অস্ত্রের ঝুঁকিতে কাঁপছে। পরমাণু অস্ত্র ধ্বংস ক্ষমতার দিক থেকে অন্য সব অস্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্বক। অন্য অস্ত্রের চেয়ে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে বিশে^র মাথাব্যাথা বেশি। সারাবিশ্বে পরমাণু অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশের সংখ্যাও কম নয়। 

মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। এতে বিশ্বের অস্তিত্তই হুমকির মুখে পরে। ছোট এই পৃথিবী ধ্বংস হওয়ার জন্য যেটুকু অস্ত্র দরকার তার থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র পৃথিবীতে মজুদ রয়েছে।

বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানব সভ্যতা আজ বহুদূর অগ্রসর হয়েছে। একবিংশ শতাব্দির দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আমরা যেমন পৃথিবীকে উন্নত করতে পেরেছি তেমনি নিত্য নতুন অত্যাধুনিক অস্ত্রে নিজেদের সজ্জিত করে সভ্যতাকেই হুমকির মুখোমুখি দাড় করিয়েছি। ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, রুটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালান রোবোক এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডণের রিক টার্কো ২০০৮ সালে একটি যৌথ গবেষনা প্রতিবেদনে তারা বলেছিল, ভারত ও পাকিস্থান যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমায় ফেলা বোমার মতো ১৫ কিলোটন ক্ষমতার ৫০ টি করে পারমাণবিক বোমা ব্যবহৃত করে তাতে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত হবে সাড়ে চার কোটি মানুষ। ওয়েন বি টুন ও তার সহযোগীদের ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারমাণবিক যুদ্ধের যে খরা দেখা দেবে তার কারণে যুদ্ধের প্রথম পাঁচ বছর বিশ্বজুড়ে শস্য উৎপাদনের হ্রাসের হার হবে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।’

এশিয়া ট্রেডস দ্য নিউক্লিয়ার পাথ, আনওয়্যার দ্যাট সেলফ অ্যাস্যুর্ড ডেস্ট্রাকশন উড রেজাল্ট ফ্রম নিউক্লিয়ার ওয়ার’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, যুদ্ধের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ প্রচন্ড ঠান্ডা,খরা ও খাদ্যাভাবের প্রভাবে প্রাণ হারাতে পারে। এটা আমাদের সফলতা না ব্যর্থতা তা একবাক্যে স্বীকার করার সময় আমাদের এখনই আসেনি।

তবে একবাক্যে একথা বলতে দ্বিধা নেই আমাদের এই সুন্দর ধরণীর অস্তিত্ব হুমকিতেই রয়েছে। বিশে^র পরাশক্তিগুলো একের পর এক মারণাস্ত্র বানিয়ে পৃথিবীকে হুমকির মুখে ফেলছে। নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখেই যে এটা করছে তা নিশ্চিত। কিন্তু কেবল নিরাপত্তার অজুহাতে একের পর এক আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে পৃথিবী ভরে ফেলছে এ কথা পুরোপুরি হয়তো সত্যি নয়। কোনদিন যদি এই নিরাপত্তার অজুহাতই বুমেরাং হয়ে আমাদের ওপর চেপে বসে তখন মানব জাতি কোথায় আশ্রয় নেবে? অন্য গ্রহে? হলেও হতে পারে। তবে তার সম্ভাবনাও খুব বেশি নয়।

এক দেশ নতুন কোন অস্ত্র বানাচ্ছে তো আরেক দেশ তার থেকেও ভয়ংকর কোন অস্ত্র বানিয়ে তাক লগিয়ে দিচ্ছে। এসব অস্ত্রের ভয়াবহতা এতই যে এই সুন্দর সবুজ শ্যামল পৃথিবী তার অস্তিত্ব হারাতে পারে। বহুবার এ ধরণী আধুনিক মারণাস্ত্রের আঘাতে কেঁপে উঠেছে। অস্ত্রের ব্যবহার এবং তার ঝুঁকি অত্যন্ত মারাত্বক এবং দীর্ঘস্থায়ী। বিশ্বের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। নিজেদের শক্তি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরুপ হয়ে উঠলে তা মানবকল্যাণে কোন কাজেই আসবে না। অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক সবদিক থেকেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বিশ্ব। তাছাড়া দুই দেশের যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে।

বিভিন্ন দেশ পক্ষ বিপক্ষে ভাগ হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। বলা হয় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে তা বিশ্বের অস্তিত্তই ধ্বংস করে দেবে। কারণ এখন সে সময়ের বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশগুলোর হাতে মারাত্বক সব অস্ত্র। রয়েছে রোবটের ব্যাবহার। তাই দুদেশই যদি সংযত থাকতে পারে তাহলেই মঙ্গল। বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্র শংকামুক্ত হোক এবং নিরাপদ হোক এটাই সবার জন্য মঙ্গল। আমরা আর কোনো হিরোশিমা বা নাগাসাকির মতো পরিণতি দেখতে চাই না।


সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
 
 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড