• বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬  |   ৩৪ °সে
  • বেটা ভার্সন

আগুনের কুণ্ডলী দেশ আমাদের

  মাহবুব নাহিদ

১৯ আগস্ট ২০১৯, ১৯:০১
আগুন
মিরপুরে বস্তিতে ভয়াবহ আগুন (ছবি : সংগৃহীত)

কয়েকটা দিন ধরেই খবরের কাগজ ধরলে বা টিভির রিমোট ঘুরালেই আগুনের দৃশ্য। সর্বস্ব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে গরিব মানুষেরা। কারণ আগুন বেশিরভাগই লাগছে ঘনবসতি অর্থাৎ বস্তি এলাকায়।

মনে হচ্ছে যেন আগুন লাগতে লাগতে একদিন পুরো দেশটাই জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে? এত আগুন কেন লাগে আমাদের দেশে? অনেকে হয়তো বলে দিতে পারে এ আমাদের কপালের দোষ কিন্তু কপালের দোষ বলাটা পুরোটাই দায়সারা বক্তব্য। কারণ আমরা দোষ ঘাড়ে নিতে জানি না। আমরা দোষ স্বীকার করতেও জানি না বরং দোষ এড়াতে জানি খুবই দারুণভাবে। দোষ অন্য একজনের ঘাড়ে উঠিয়ে দিতে যেন সবচেয়ে ভালো পারি।

বাংলাদেশে বিগত সাত বছরে এক লাখেরও বেশি আগুন লেগেছে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা পাওয়া যায় না বলেই জানি। এই আগুন লাগায় আবার এগিয়ে আমাদের প্রিয় রাজধানী ঢাকাই। অর্থাৎ খুবই স্পষ্টভাবেই বোঝা যাবে যে এই আগুন কপালের দোষে লাগা আগুন নয়। এ আগুন আমাদের নিজেদের দোষের আগুন।

রাজধানী ঢাকার গত ১ বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। হতাহতের ঘটনাও ঢাকায় বেশি। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের সব বিভাগ থেকে ঢাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে সারা দেশে ৮ হাজার ৪৬১টি আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, এর ২০৮৮টি ঢাকায়, চট্টগ্রামে ২৮৫ ও রাজশাহীতে ১১৬টি। সারা দেশে ৫০৮টি নৌ দুর্ঘটনার মধ্যে ঢাকায় ১৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪টি ও খুলনায় ৪০টি।

এসব ঘটনায় শুধুমাত্র ঢাকায় প্রাণ হারায় ১২১ জন। এক বছরে দেশে ১৬টি ভবন ধসের ঘটনার ১০টি ঢাকায়। এতে ৬ জন নিহত হয়। দেশের গার্মেন্টসগুলোতে ১৭৩টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে ১১৫টি ঢাকায়। শিল্প কারখানায় ১১৩১টি আগুনের ঘটনার মধ্যে ৫২৬টি ঢাকায়। ইতিহাস আর পরিসংখ্যান আমাদের অনেক কিছুই শিক্ষা দেয়ার কথা কিন্তু আমরা ইতিহাস থেকে খুব বেশি শিক্ষা নেই না। ইতিহাস থেকে পাওয়া আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না।

এই ব্যাপারটা কিছু ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করলেই আমাদের কাছে দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের দেশে কাছাকাছি সময়ে ঘটে যাওয়া তিনটি অগ্নিকাণ্ডকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে নিমতলী আর চকবাজারে আগুন লাগার পরে এর ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায় একই ধরনের কিছু কারণে। অর্থাৎ আমাদের পুরান ঢাকায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে গড়া ওঠা কেমিকেলের গোডাউনসমূহ, কিংবা অতি সরু অলিগলি, যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বৈদ্যুতিক ও অন্যান্য তারসমূহ এই আগুনের ভয়াবহতার মূল কারণ, কিন্তু এই সকল বিষয়ে অনেক প্রতিশ্রুতি দেখলেও তার বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাইনি। আর বাস্তবে পরিণত হয়নি বলেই নিমতলীর পরে আবার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ড দেখতে হয়েছে।

২০১২-এর ঢাকা অগ্নিকাণ্ড বা তাজরীন ফ্যাশন অগ্নিকাণ্ড। বাংলাদেশের ঢাকা মহানগরীর উপকণ্ঠ আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড কারখানায় ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সংঘটিত একটি মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড যাতে মোট ১১৭ জন পোষাক শ্রমিক নিহত হয় ও ২০০ জনের অধিক আহত হয়। ভয়ানক এই দুর্ঘটনায় ঐ পোষাক কারখানার নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোষাক শ্রমিক ও আগুন থেকে রেহাই পেতে উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরও ১০ জনের।

নিমতলী অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ৩রা জুন। পুরান ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলী নামীয় মহল্লায় একটি বড়সড় অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয় যা নিম্নতলি অগ্নিকাণ্ড (কখনো নিমতলি ট্র্যাজেডি) নামে অভিহিত। এই অগ্নিকাণ্ডে নিশ্চিতভাবে ১১৭ জন মানুষ নিহত হন। পরে ৬ই জুন এক শিশু এবং ৭ই জুন এক মহিলা মারা গেলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১৯।

এরপরে আসলো চকবাজার, তাও আবার একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে। কেড়ে নিয়ে গেছে ১১০টি তাজা প্রাণ। আর সর্বেশেষ, বনানীর এফ আর টাওয়ার, গুলশানের এন ডি সি মার্কেট, লালবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুর। আগুনের যেন ক্লান্তি নেই। আগুন লেগেই যাচ্ছে বিরতিহীনভাবে।

এবার আসি আগুন কেন লাগে? আগুন লাগার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কারণ হয়তো খুবই সামান্য কিছুও হয়ে থাকে মাঝে মাঝে। কখনো সিগারেটের কারণে আগুন লেগেছে, কখনো বাসার চুলা থেকে, কখনো ইলেকট্রিক তার থেকে, কখনো বা গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে। গত এক বছর সারা দেশে ১৯ হাজার ৬৪২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২,৪৫৩টি ঘটনায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছে ছুড়ে ফেলা জ্বলন্ত সিগারেট থেকে যা অগ্নিকাণ্ডের সব কারণের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এই জায়গাটা নিয়ে ভাবার অনেক প্রয়োজনীয়তা আছে। আমাদের বাজে অভ্যাসগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

কথা হচ্ছে, এইসব ঘটনা তো ঘটতেই পারে, কিন্তু আগুন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই আমাদের আগুনের ভয়াবহতা বাড়িয়ে দেয়। যে সমস্ত জায়গায় আগুন লাগে সেখানে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার অভাব, ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের মতো একে অপরকে জড়িয়ে থাকা হাজারো বৈদ্যুতিক তার, আমাদের সচেতনতার অভাব, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা, ফায়ার সার্ভিসের পৌঁছাতে দেরি হওয়া। অবশ্য ফায়ার সার্ভিসকে এই ব্যাপারে দোষারোপ করার কোনো অবকাশ নেই। কারণ যেসব জায়গায় বেশি আগুন লাগে সেসব জায়গায় ফায়ার সার্ভিসের পৌঁছাতেই বেগ পেতে হয়, এর কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। আর আমাদের দেশে দেখা যায় প্রায়ই বস্তিতে আগুন লাগছে।

বস্তিতে আগুন লাগলে তার ভয়াবহতা হয় আরও বেশি। বস্তিতে ঘরগুলোর অবস্থান এতোটাই গায়ে গায়ে লাগানো থাকে যে আগুন ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি বাধা বেগ পেতে হয় না। অন্যান্য দেশে এত আগুন লাগে না কারণ তাদের একটা পুরান ঢাকা নেই, তাদের একটা অপরিকল্পিত নগর নেই। ঢাকার অবস্থান পৃথিবীর অপরিকল্পিত, অসুন্দর, অপরিষ্কার, অবসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় সর্বাগ্রে। আর আমাদের যত দুর্ঘটনা, যত বিপদ-আপদ সকল কিছুর অধিকাংশই ঢাকা ঘিরেই। দিনদিন ঢাকা হয়ে উঠতে জনবিস্ফোরণ, জনদুর্ভোগ, আগুন, ধ্বংস আর লাশের নগরী।

এখনই সময় রাজধানীকে বিকেন্দ্রীকরণ করা, পরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে তোলার। যদিও সময় অনেকটাই পার হয়ে গিয়েছে। তবে এখনো সময় আছে ঘুরে দাঁড়ানোর। আর ঘুরে আমাদের দাঁড়াতেই হবে, ঘুরে না দাঁড়ালে এভাবে মানুষ মরতে মরতে ঢাকা হয়ে উঠবে আস্ত একটা গোরস্থান, আগুন জ্বলতে জ্বলতে পুরোটাই হয়ে উঠবে একটা ভস্মভূমি। আর ব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রীক মানে যে শুধু ঢাকায়ই নেয়া হবে তা নয় নিতে হবে পুরো বাংলায়। আগুন যেহেতু বেশিরভাগই আবাসিক এলাকায় লাগছে সেহেতু আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পনা মাফিক গড়ে তুলতে হবে।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড