• বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ধর্ষণ এক মহামারির নাম

  মাহবুব নাহিদ

০৪ আগস্ট ২০১৯, ১৭:৪০
ধর্ষণ
ছবি : প্রতীকী

ধর্ষণ পৃথিবী জুড়েই এক মহামারির নাম হয়ে উঠছে দিনদিন। দিনে দুপুরে ধর্ষণ, ধর্ষণ পূর্বক হত্যা এসব নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু ইদানীংকালে এর মাত্রা বেড়েই চলছে। ধর্ষণের হারের দিক থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ গতিতে। গত ২০১৫ সালে যে পরিমাণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিলো এই বছরে ঘটেছে তার চারগুণ বেশি। এর হার দিনদিন বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ দেখা দিচ্ছে জনমনে।

২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে প্রায় দুই সহস্রাধিক নারী। এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে দুই শতাধিকের উপরে। আমাদের দেশে প্রতি ১০০ দিনে প্রায় ৪০০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। তবে গভীর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে এর মধ্যে অনেক বড় একটা অংশ শিশুরা। একদম ৪ বছরের বাচ্চা শিশুও রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের হাত থেকে। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩ হাজারের মত শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যেও গবেষণা করে দেখা যায় এদের অধিকাংশই হয় নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষকদের হাতে, যেটা আমাদের কাছে লজ্জাজনক। 

তবে অনেকের মতেই বাংলাদেশ এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে। কিন্তু পরিসংখ্যান অন্য কথা বলে। বিশ্বের সেরা ১০ ধর্ষণকারী দেশের মধ্যেই বাংলাদেশের নাম নেই। ধর্ষণের তালিকায় সবার প্রথমের নাম বিশ্বকে শাসন করা তথাকথিত সভ্য দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৩ মিনিটে এক জন ধর্ষণের শিকার হয়। সারা বিশ্বকে যারা আচার আচরণ শিখিয়ে বেড়ায় তাদেরই এই অবস্থা। নারীদের তাদের দেশে মূল্য নেই বললেই চলে। তারা সারা পৃথিবীকে নারীর অধিকার শিখিয়ে বেড়াল তারাই এখনো একজন নারী প্রেসিডেন্ট হবার মত রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারেনি।

গত নির্বাচনে তারা হিলারি ক্লিনটনকে রেখে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছে চরমপন্থি ট্রাম্পকে। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারতও রয়েছে এই তালিকায় ৫ম অবস্থানে রয়েছে। ভারতে বছরে যৌন নির্যাতনের শিকার প্রায় ১২ হাজার শিশু। ২০১২ সালে দিল্লীতে বাসে এক মেয়েকে গণধর্ষণের ঘটনা তো সারা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। 

অর্থাৎ ধর্ষণের ঘটনায় শুধুই বাংলাদেশকে দ্বায় দিলে হবে না। এটি বিশ্বব্যাপী একটা প্রকট সমস্যার নাম। এবার আসি ধর্ষণের কারণ নিয়ে। ধর্ষণের প্রধান কারণ পুরুষের বিকৃত মানসিকতা তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পর্নোগ্রাফির সহজ লভ্যতা, সামাজিক অবক্ষয়, সিনেমা-নাটকে অশ্লীলতার মাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া সহ নানা কারণ এর পিছনে কাজ করে। তবে অবশ্যই প্রধান কারণ হচ্ছে মানসিক সমস্যা।

নারীদের প্রতি আমাদের সম্মানের জায়গাটা কমে যাওয়া এর একটি কারণ। একটি মেয়েকে আমরা আমাদের বোনের মত দেখতে পারি না। একজন মহিলাকে আমরা আমাদের মায়ের মত দেখতে পারিনা। একটা মেয়ে যখন একা একটা নির্জন জায়গায় থাকে, চলাচল করে কিংবা একটা পরিবহনে যাত্রা করে তখন আমরা তাকে সুযোগ মনে করি, কিন্তু তাকে সঠিক সম্মান দেওয়া কিংবা তাকে সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব মনে করি না। আমাদের নিজেদের ঘরেও তো এমনই মা কিংবা ভগ্নি রয়েছে। আমরা প্রতিটি মেয়েকেই কেনো মা কিংবা ভগ্নির আসনে বসাতে পারি না। 

অনেকে আবার ধর্ষণের জন্য নারীদের পোশাককে দায়ী করেন। এখন কথা হচ্ছে পোশাকই যদি দায়ী হবে তাহলে ৪ বছরের বাচ্চা শিশুর ক্ষেত্রে সেই পোশাকের সংজ্ঞা কীভাবে দেবে তা কি ভাবা যায়? হ্যাঁ, অবশ্যই নারীরা রুচিশীল পোশাক পরিধান করে রাস্তাঘাটে চলাচল করবে। কিন্তু তাই বলে পর্দা করা যে শুধুই নারীদের কর্তব্য তা তো নয়। পর্দা পুরুষেরও রয়েছে। আর প্রত্যকে ধর্ম এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। এ বিষয়ে সেগুলো মেনে চলাই উত্তম। মোদ্দা কথা হচ্ছে, পোশাকের দোহাই দিয়ে ধর্ষণকারী বেঁচে যেতে পারে না। 

শুধু ধর্ষণই বড় সমস্যা তা নয়। নারীরা রাস্তাঘাটে অফিস আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে হেনস্তা হচ্ছে। আমাদের দেশের গন পরিবহনগুলোতে নারীদের চলাচল করার কোনো অবস্থাই থাকে না। মেয়েরা “গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না” লেখা টি শার্ট পড়ে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। এই টি শার্ট নিয়েও আবার অনেকের অনেক ধরনের মন্তব্য, সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। নারীরা যে হারে নির্যাতিত হচ্ছে সে হারে কিন্তু বিচার হচ্ছে না। একটা ধর্ষিতা মেয়েকে সমাজ, তার পারিপার্শ্বিকতা ঠিকভাবে মেনে নিতে। জীবনের চলার পথ তার জন্য কণ্টকময় হয়ে ওঠে।

আমাদের মিডিয়াও হন্যে হয়ে প্রচার করে ধর্ষিতা বিস্তারিত বিবরণ, আত্মীয়স্বজন পাড়া প্রতিবেশী সকলের পরিচয়। আমার কথা হচ্ছে প্রচার হবে ধর্ষকের পরিচয়। দেয়ালে দেয়ালে বড় করে ছাপানো হবে ধর্ষকের ছবি। চিনিয়ে দেয়া হবে সারা দেশকে, ঘাতকের দুর্ধর্ষ চেহারা দেখে সবাই থুথু ফেলবে এমন ব্যবস্থা করতে হবে।

আমাদের দেশে একটা ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে সেটা নিয়ে খুব হৈচৈ লেগে যায়। মিডিয়ায় বড় বড় খবর প্রকাশ। এখানে সেখানে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। কারণ যেকোনো ন্যায়বিচারই এদেশে আন্দোলন করে, অনশন করে, মানববন্ধন করে চাইতে হয়। আন্দোলনের ফলে হয়তো ঘাতককে গ্রেপ্তার করাও হয়, যদিও অনেক ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তারটুকুও করা হয় না। আর গ্রেপ্তার করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের বিচার হয় না। কারণ ঘাতকদের কালো হাত সবসময়ই অনেক বড় হয়। এরা সবসময়ই ধরাছোঁয়ার বাহিরে থাকে।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে এসব ঘাতকদের পক্ষে লড়ার জন্য এই পোড়া দেশে আইনজীবীও পাওয়া যায়। কখনো কখনো ধর্ষিতার পক্ষে লড়াই করার জন্য যে কয়জন আইনজীবী থাকে তার চেয়ে সংখ্যায় বেশি দেখা যায় ঘাতকের পক্ষে। কিছুদিন আগে ফেনীর নুসরাতকে ধর্ষণ ও পুড়িয়ে মারার মামলায় তার পক্ষে একজন আইনজীবী থাকলেও আসামীর পক্ষে আইনজীবী ১০ জনেরও বেশি। যেই দেশে ৪ বছরের বাচ্চা শিশুর ধর্ষণকারী মামলা লড়তে আইনজীবী খুঁজে পায় সেই দেশের নাগরিক হতে পেরে আমাদের সকলের লজ্জিত হওয়া উচিত। আমাদের দেশের

আনাচেকানাচে প্রতিনিয়ত বহু নারী-শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আনাচেকানাচে খুঁজে দেখার প্রয়োজন পড়ে না। আলোচিত্র ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসামীর সঠিক বিচার হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারই হয়নি। হাইকোর্ট থেকে ধর্ষণের মামলাকে ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছে আর আইনও রয়েছে কঠোর হবার তবুও কিসের আপত্তি? কোথায় বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে ধর্ষণকারীদের বিচারকার্য। বিষয়টিকে সুনিপুনভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। 

নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ড তাকে দেয়া যেতে পারে।।

৯ (২) ধারায় বলা হয়েছে, ধর্ষণের ফলে বা ধর্ষণের পড়ে অন্য কোন কাজের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষণকারী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এছাড়াও তাকে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। 

এখন কথা হচ্ছে, আইন নিয়ে মন্তব্য করার অধিকার সকলের নাই। দেশের আইনকে অবশ্যই সম্মান করা উচিত। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি শুধু আইন থাকলেই চলবে না, এর যথাযথ কার্যকর অতীব জরুরী। আর ধর্ষণের মামলা গুলোকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের আওতায় আনা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। ধর্ষণের ঘটনা ঘটার রেশ কেটে যাওয়ার আগেই যদি এর বিচার কার্যকর করা যায় তবেই অন্য অপরাধীদের মনে ভীতির জন্ম নেবে। ইংরেজিতে একটা কথা বলে, “Justice delayed, justice denied” আমাদের সমাজেও ধর্ষিতার প্রতি যে বিমুখতা তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

ধর্ষণ একটি সামাজিক তথা জাতীয় সমস্যা। এর প্রতিকারে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা আমার দেশের মা-বোনের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে। এই দেশের নারীদের উপর তারা সীমাহীন নির্যাতন চালিয়েছে। আর আজ স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পরে এসেও যদি আমাদের মা-বোনকে একা রাস্তায় পাঠাতে শঙ্কায় থাকতে হয় তাহলে এর চেয়ে আর বড় দুঃখ কিছুই হতে পারে না।

 

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: তাজবীর হুসাইন

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: ০২-৯১১০৫৮৪

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড