• শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রথম যাত্রী প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে পদ্মা সেতু পার হলো ট্রেন, পূরণ হলো বাঙালির স্বপ্ন 

  মো. খসরু চৌধুরী সিআইপি

১০ অক্টোবর ২০২৩, ১৭:১৪
মো. খসরু চৌধুরী সিআইপি

স্বপ্নের পদ্মা সেতু ছিলো দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু পার হয়ে এবার প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যাত্রী করে আনুষ্ঠানিকভাবে চললো রেল। ১০ অক্টোবর মঙ্গলবার দুপুর ১ টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে রেল।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণ করছে রেলওয়ে। এর মধ্যে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত প্রায় ৮২ কিলোমিটার রেলপথ চালু হলো। আগামী বছর জুনে যশোর পর্যন্ত রেল চালুর লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার।

মাওয়া রেল স্টেশনে ঢাকা-ভাঙ্গা রেল চলাচল উদ্বোধন করতে গিয়ে স্বপ্নের পদ্মা সেতু হয়ে রেল চলাচলের মাহেন্দ্রক্ষণকে ‘স্বপ্ন পূরণের দিন হিসেবে’ অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে স্বপ্ন পূরণের দিন। এই শুভ দিনে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। এই মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, চার নেতা, নিহত মুক্তিযোদ্ধা ’৭৫ এর পনেরো আগেস্ট নিহত শহীদদের। এ সময় তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন আমরাই প্রথম যমুনা নদীর ওপর একই সাথে বাস ও ট্রেন যোগাযোগের বাস্তাবায়ন করি।

এর আগে ২০২২ সালের স্বপ্নের পদ্মা সেতু ২৫ জুন উদ্বোধন করা হয়। দেশ-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্মাণ করেন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর। পদ্মা সেতুর কারণে পাল্টে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দৃশ্যপট। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাটসহ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-যাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সাহস-গৌরব-সততার প্রতীক। পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যয়, দৃঢ় মনোবল ও আস্থার প্রতীক। এই সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। মানুষের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে।

পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে। এটি ছিল ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণের ঘটনা। পদ্মা সেতু ও এর দুই প্রান্তে রেললাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। আয়তন ছোট হলেও ১৭ কোটি মানুষের এই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। শুধু খাদ্যেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়ন বহির্বিশ্বে বিশেষভাবে প্রশংসিত-ঈর্ষণীয়ও বটে। তবে যোগাযোগব্যবস্থা এখনো তেমনভাবে উল্লম্ফন ঘটাতে পারেনি। চোখে পড়ার মতো রাস্তাঘাটের বেশ কিছু উন্নয়ন, সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যেই দৃশ্যমান হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। আওয়ামী লীগ সবকটি নির্বাচনী ইশতেহারে রেল যোগাযোগ বড় প্রত্যাশার কথা ঘোষণা করেছিল। ক্ষমতার দেড় দশকে তা অনেকটা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। বিদেশী ঋণ ছাড়াই পদ্মা সেতু ও পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ দেয়ার মত বড় বড় মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লেইন, দোহাজারী-কক্সবাজার রেল লেইন, ঢাকা মেট্রোরেল, যমুনা নদীর উপর নির্মিতব্য নতুন রেল সেতু, কালুরঘাট রেলসেতু অন্যতম। জানা যায়, সরকার রেল যোগাযেগ উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে ২০ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির মর্যাদার প্রতীক। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর একটি সাহসী সিদ্ধান্ত তাকে একজন আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নতি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অর্থনীতি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের সেতুবন্ধনে তৈরি হয়েছে নতুন মাত্রা। দ্রুত যাতায়াতের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ। পদ্মা সেতু এখন বাংলাদেশ ও বাঙালির গর্বের প্রতীক, আনন্দের ঝরনাধারা। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন এ পদ্মা সেতু।

পদ্মাসেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পর্যটন ও শিল্পায়নে যে আকাশচুম্বী সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তার প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বিত রূপরেখা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের ওই অঞ্চলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, একইস্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার অপূর্ব মনোরম সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা, খানজাহান আলীর মাজার ও ষাটগম্বুজ মসজিদসহ অনেক দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন স্পট রয়েছে, যা এতদিন উত্তাল পদ্মানদী পেরিয়ে যাতায়াতের অসুবিধার কারণে জমে ওঠেনি। পদ্মাসেতুর মেলবন্ধন দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে যেমন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে, একইভাবে সেখানে শিল্পায়নে নতুন নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি পর্যটন খাতেও অপার সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছে।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণ বাংলার ২১টি জেলার কৃষক, মৎস্যজীবী, তাঁতি, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভোক্তার সমাবেশ যে রাজধানী ঢাকা তার সঙ্গে অনায়াসে সংযুক্ত হতে পেরেছে। অন্যদিকে তারা রাজধানী থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে পারছে তাদের গ্রামের ও আশপাশের এসএমই উদ্যোগগুলোর জন্য। দক্ষিণাঞ্চলের সামগ্রিক উৎপাদন, সেবা, পর্যটন, শিল্প-বাণিজ্যেও বিনিয়োগ বেড়েছে। বেড়েছে কর্মসংস্থান। ২১ জেলায় মানুষের আয়-রোজগার ও জীবনের মান বাড়ার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের জিডিপি অন্তত ৩.৫ শতাংশ বাড়বে। আর দেশের জিডিপি বাড়বে অন্তত আরো ১.২৬ শতাংশ। ট্রান্স-এশিয়ান রেল ও সড়ক এই সেতুর মাধ্যমেই যুক্ত হবে। এডিবি বলছে, ২০৫০ সালে ৬৭ হাজার যান চলাচল করবে এই সেতু দিয়ে। জরিপে আরো বলা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই পাঁচ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুবিধা পাবে এই সেতুর কল্যাণে। দক্ষিণাঞ্চলের দারিদ্র্য প্রতিবছর ১ শতাংশেরও বেশি হারে কমবে। অর্থাৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে আমাদের যাত্রা আরো ত্বরান্বিত হবে। এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

আগে যেখানে মাওয়া-জাজিরা ফেরিঘাটে পারাপারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করতে হতো, এখন তা মাত্র ১০ মিনিটেই পার হওয়া যাচ্ছে। পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় থেকে শরিয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরসহ দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে জমির মূল্য বেড়ে চলেছে। হাজার হাজার বেসরকারি ও কর্পোরেট উদ্যোক্তা বিভিন্ন সেক্টরে শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। সেই সাথে সরকার এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তত্ত্বাবধানে ১৭টি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে বাগেরহাটে পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম পার্ক এবং মংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন পরিকল্পনা সেখানে লাখো মানুষের নতুন কর্মসংস্থান ও কর্মচাঞ্চল্যে ভরিয়ে তুলছে।

পদ্মাসেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে টার্গেট করে নতুন নতুন শিল্পোদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মাসেতুর সাথে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সংযোগ সড়ক মহাসড়কগুলোর উন্নয়ন, প্রশস্তকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে করে বাগেরহাট, সুন্দরবন ও কুয়াকাটায় নতুন পর্যটন সম্ভাবনা শুধু দেশীয় দর্শনার্থীদেরই আকৃষ্ট করেনি, আন্তর্জাতিক পর্যটনেরও অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আশাকরি এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সফলভাবে কাজে লাগাতে পারলে অন্য যে কোনো শিল্পোদ্যোগের চেয়ে অনেক বেশি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে।

লেখক: পরিচালক, বিজিএমইএ; শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ; চেয়ারম্যান, নিপা গ্রুপ ও কেসি ফাউন্ডেশন।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড