• সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১  |   ৩৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

উন্নত বিশ্বে যা সাংবাদিকতা, বাংলাদেশে তা দেশদ্রোহিতা!

  কবির আল মাহমুদ

০৪ এপ্রিল ২০২৩, ১২:২৯
উন্নত বিশ্বে যা সাংবাদিকতা, বাংলাদেশে তা দেশদ্রোহিতা!
ইউরোপ-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কবির আল মাহমুদ (ফাইল ছবি)

বিশ্বে সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন অসংখ্য চাঞ্চল্যকর ঘটনা সাংবাদিকরা ফাঁস করতে পেরেছেন এমন সব উপায় অবলম্বন করে, যা সত্যি আইনগতভাবে পুরোপুরি সিদ্ধ না। কিন্তু তার পর ও উন্নত বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা এ ধরণের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম্যতা ভোগ করে থাকেন।

কারণ তাদের তথ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য হলো ‘জনস্বার্থে’; ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক বা অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়। ঠিক এই কারণে অনেক নথি সাধারণ কারও হাতে থাকলে গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও, সাংবাদিকদের কাছে থাকাকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য ধরে নেওয়া হয়। কেননা তাদের কাজই হচ্ছে গোপন নথিপত্র নিয়ে। আর এটাই হচ্ছে প্রকৃত সাংবাদিকতা!

প্রায় ১২ বছর থেকে ইউরোপে বসবাস করার সুবাদে আমি একটি জিনিষ আমি উপলব্ধি করেছি। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি উন্নত রাষ্ট্রে সংবাদ মাধ্যমের সুযোগে-সুবিধার পাশাপাশি সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে রয়েছে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা। অথচ বাংলাদেশ এর উল্টো। দেশ যত দ্রুত উন্নত থেকে উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করছে তার চেয়ে দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার অন্যতম হাতিয়ার প্রথম আলো। পুরো বিশ্বে দুই শতাধিক দেশে প্রথম আলোর দেড় কোটির বেশি পাঠক যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের সংবাদ মাধ্যমের ও নেই। ভয়-ভীতিহীন সাংবাদিকতার জন্য বিশ্বের অন্যতম সংবাদ মাধ্যমটির জন্য বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ঢেউ ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। একটি পত্রিকা যে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের নির্ভরতার জায়গা হতে পারে, তা প্রথম আলো প্রমাণ করেছে বারবার।

গত ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে প্রথম আলোর অনলাইন প্রতিবেদন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের জন্য তৈরি একটি ফটোকার্ডের ছবি ও উদ্ধৃতি নিয়ে সারা বাংলাদেশ পুরো বিশ্ব এখন সরগরম। স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন থেকে ছবি ও উদ্ধৃতি নিয়ে কার্ডটি করা হয়েছিল। কার্ডটির ছবিটি ছিল জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়ানো একটি শিশুর আর উদ্ধৃতিটি ছিল একজন দিনমজুরের মন্তব্য।

এতে বিভ্রান্তি তৈরির ঝুঁকি থাকায় প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ দ্রুতই ফেসবুক থেকে কার্ডটি সরিয়ে ফলে। অনলাইনের (ফেসবুক) দিনমজুরের বক্তব্যের সঙ্গে একটি শিশুর ছবির যে অসংগতি ছিল, ফেসবুকের সেই পোস্ট দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়। পরে অনলাইনে প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশোধনী যুক্ত করে বিষয়টি জানানো হয়।

এরপরও ফটোকার্ডটি ঘিরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিপন্ন, দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট ইত্যাদি নানা অভিযোগে দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামানকে রাতে সিআইডি পরিচয়ে তুলে নেওয়া এবং একই সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।

প্রথম আলোর সাংবাদিক শামসুজ্জামানের গ্রেফতার, জামিন নামঞ্জুর করা এবং তাকে কারাগারে পাঠানো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানকে গ্রেফতার করে অতি দ্রুত এবং অদ্ভুত সত্যি আমি হতবাক হয়েছি ও বর্ণনাতীতভাবে।

তেমনিভাবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করা সাংবাদিক, তাদের সংগঠন ও বৈশ্বিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে দ্রুত এ ঘটনার নিন্দা ও সমালোচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগে আটক তরুণ সাংবাদিক শামসুজ্জামান এবং পত্রিকার সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার ফলে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি আরও বেশী নষ্ট হয়েছে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যায়ভার এমন বাস্তবতায় যে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল তা অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, সাংবাদিকের কলম থেকে বের হবে, এমনটাই স্বাভাবিক। কারণ, এটাই সাংবাদিকের কাজ।

বিশ্বের অনেক দেশেই ছোট-বড় সব সংবাদপত্রই বার্তা পরিবেশনে ভুল করে থাকে। এর কোনোটি সাংবাদিকের ভুল, কোনোটি যার সূত্র উদ্ধৃত করে খবর পরিবেশিত হচ্ছে, তার ভুল। নিজের ভুল স্বীকার করা প্রতিটি সৎ সংবাদপত্রের দায়িত্ব। অনলাইন হলে ব্যাখ্যাসহ খবরটি প্রত্যাহার বা সংশোধনী অথবা মুদ্রিত কাগজে হলে ভ্রম সংশোধন, এটাই নিয়ম। সেখানে সঠিক দায়িত্বই পালন করেছে প্রথম আলো।

আর এ ঘটনার জন্য প্রথম আলোর সম্পাদক ও নিজস্ব প্রতিবেদকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা এবং আটক, এটা লঘু অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি। যা সত্যি নিন্দনীয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি তৈরিই করা হয়েছে সাংবাদিকদের কাজকে ব্যাহত করার জন্য। আইনটির পরিধি এত ব্যাপক যে সরকার চাইলে যে কোনো সাংবাদিককে যে কোনো সময় গ্রেফতার করতে পারে। আর ঘটনায় পুরো বিশ্বে আবারো আলোচনায় স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রশ্নে প্রতিবন্ধকতামূলক এ আইন।

এ ক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কীভাবে রক্ষা করা হয়, তা থেকে বাংলাদেশ অভিজ্ঞতা নিতে পারে। সেই সাথে সাংবাদিক নির্যাতনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।

ভিন্নমত ও সরকারের সমালোচনা দমনে এই আইনের ফলে অনেকে স্বাধীনভাবে তাদের মনের কথা বলতে পারছে না। লেখার স্বাধীনতা না থাকায় এবং নিজের জীবনের ভয়ে ও পরিবারের নিরাপত্তায় অনেক সাংবাদিক পেশা পরিবর্তন করছেন, অনেকে দেশান্তরি হয়েছেন, হচ্ছেন।

দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে দুর্নীতি ও লুটপাট হলেও তার খবর প্রকাশ করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশে সাংবাদিকতার যে আদর্শ পেশা ও গৌরব তা হারিয়ে যাবে।

তাই অবিলম্বে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং সাংবাদিক শামসুজ্জামানের নিঃশর্ত মুক্তিসহ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা প্রত্যাহারের সহিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ এক যোগে কাজ করা।

আর এ জন্য প্রথমে দুটি স্মার্ট উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন :

১. স্মার্ট অর্থনীতি অর্থাৎ প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগের আগ্রহী করার পাশাপাশি তাদের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২. স্মার্ট সাংবাদিকতা অর্থাৎ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের ভয়হীন কাজের নিশ্চয়তার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে কাজের স্মার্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আমার বিশ্বাস সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের চিন্তা-প্রসূত উদ্যোগ এবং তা বাস্তবায়নে আন্তরিক হবেন, সেটাই প্রত্যাশিত।

লেখক : কবির আল মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক, ইউরোপ-বাংলাদেশ প্রেসক্লাব।

(মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখা একান্ত লেখকের মত। এর সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড