• বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পাউবোর নদীবিরোধী প্রকল্প

একটি নদী বিধৌত জনপদের কথা বলছি

  এম. নাজমুল হুদা

০৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১৫:৪০
একটি নদী বিধৌত জনপদের কথা বলছি

আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ এ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে শত শত নদী। নদী তার গতিপথ অতিক্রম করে অবশেষে সাগরে গিয়ে মেশে- এটাই প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু সুন্দর নিয়ম পরিবর্তন করে যখন নিজেদের স্বার্থে নিয়ম তৈরি করা হয়, তখনই সৃষ্টিতে বাধে বিপত্তি। পরিবর্তন হয় নদীর গতিপথ।

আজকে আমরা এমন একটি নদী বিধৌত জনপদের কথা বলব- যাদের না আছে কোনো অর্থবিত্ত, আর না আছে মামা-খালুর জোর; আর না আছে কোনো রাজনৈতিক পাওয়ার। ফলে নিজেদের কাগজপত্র থাকার পরও নিজ জমিতে আবাদ করার অপরাধে একেকটি পরিবার কয়েকটি করে মামলার ভারে সবকিছু খুইয়ে এখন একেবারে নিঃস্ব প্রায়।

শুরুর কথা ঘটনাটি সেই ১৯৬০ সালের। তখন বাংলাদেশের মানুষের না ছিল তেমন অর্থবিত্ত, আর না ছিল চাষাবাদ করার উন্নত পদ্ধতি। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান ছির খুবই নিম্ন পর্যায়ের। এক একর ধানের জমিতে আমন ধান ফলত মাত্র ৮/১০ মণ। তার উপর বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সে ফসলও ঠিকমতো পাওয়া যেত না। তাই ওই এলাকাকে বাংলাদেশের সবাই একনামে মঙ্গাপীড়িত এলাকা বরে জানত।

কাজের মৌসুমে, দল বেঁধে সবাই দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কাজের সন্ধানে চলে যেত। এর পুরোটা সময় পুরুষরা বাইরে গিয়ে আয়-রোজগার করে আনত এবং মহিলারা খেতের কাজ করে সংসারের চাকাকে সচল রাখত।

বুড়িতিস্তা ছিল একটি আন্তঃ সীমান্ত নদী। অতীতে এই নদীটি মূল তিস্তার শাখানদী ছিল। পরবর্তী সময়ে তিস্তা তার গতিপথ পরিবর্তন করার ফলে ধীরে ধীরে বুড়িতিস্তা একটি মরা নদীতে পরিণত হয়ে পড়ে।

ঘটনার শুরু যেভাবে...

১৯৭১ সারে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারিনি। তিনবেলা খেতে পারিনি। তাইতো ৭৪-এর দুর্ভিক্ষে আমাদের উত্তরাঞ্চলে তথা মঙ্গাপীড়িত এলাকার হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা যায়। যা হোক, এই এলাকার জীবনমান উন্নয়নের জন্য অনেক সময় অনেক ভগবানের উদ্ভব ঘটে, কিন্তু মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে হয়- ‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে ; এখানে তাঁহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’

কারণ, এই গ্রামের, এই জনপদের উন্নয়নের জন্য অনেকেই এগিয়ে এসেছে, কিন্তু দিনশেষে গ্রামের উন্নয়ন কতটুকু হয়েছে তা গবেষণা করে বের করা না গেলেও তাদের নিজেদের জীবন-মানের যে উন্নয়ন ঘটেছে তা দিনের আলোর ন্যায় পরিষ্কার।

গ্রামবাসীর জন্য তেমনই একটি অভিশাপের নাম পানি উন্নয়ন বোর্ড। ১৯৪০ সালে এবং ১৯৬২ সালে এই জমি এলাকার কৃষকদের নামে রেকর্ড রয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়নের ভাষ্য মতে তারা নাকি ১৯৬৭-৬৯ সালে স্থানীয় লোকদের নিকট থেকে তিন মৌজায় মোট ১২১৭ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। তবে এর স্বপক্ষে তারা কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।

যাই হোক, এই জমি অধিগ্রহণ করে তারা নাকি ডোমার-ডিমলা-জলঢাকা মোট তিন উপজেলার কৃষকদের জীবনযাত্রার মানের প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। প্রকৃত ঘটনা হলো ১৯৬৮ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড সেখানে পানি ধরে রেখে চাষাবাদের জন্য একটি সেচ প্রকল্প গ্রহণ করে। সেমই সময়ে ডিমলা ও জলঢাকা থানার সীমান্তবর্তী কালীগঞ্জে তিনশ’ ফুটের একটি ব্যারাজ নির্মাণ করে পাউবো। পরে এলাকার পাঁচ গ্রামের প্রায় এক হাজার তিনশ’ একর জমিতে জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে জমি অধিগ্রহণ করা হয় কোনো দলিল ছাড়াই। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন না হওয়ায় জমি অধিগ্রহণ করেনি পাউবো। জলাধার নির্মাণের প্রকল্প সফল না হওয়ায় স্বভাবতই স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের জমিতে চাষাবাদসহ বসবাস করে আসছেন। প্রায় ৩৫ হাজার কৃষকের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল এই জমির ওপর।

কিন্তু বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। ১৯৬০ মতান্তরে ১৯৬৫ সালে বুড়িতিস্তা নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখার ফলে নদীর নব্যতা সংকট শুরু হয়। এর ফলে এই এলাকার প্রায় ১৫০০ একর নিম্নভূমিতে কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। কারণ, নব্যতা সংকটের কারণে অল্প বৃষ্টি কিংবা উজান থেকে নেমে পানি নদীর দুকুল ছাপিয়ে আশেপাশের নিম্নাঞ্চলকেও প্লাবিত করে।

আমি আমার নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে বলি আমরা যদি আমাদের গ্রাম (কুঠির ডাঙ্গা) থেকে ডিমলা বাজার বা গোল না বাজার যেতাম, তাহলেও সব সময় সাথে একটি করে অতিরিক্ত গামছা নিয়ে যেতে হতো। এমনকি ২০০৬ সাল পর্যন্ত সু (জুতা) না খুলে কেউ গ্রামে যেতে পারত না। অর্থাৎ গ্রামে যেতে হলে জোতা-মোজা খুলে যেতে হতো। আমি হলফ করে বলতে পারি ১৯৬০/৬৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বুড়িতিস্তা সেচ প্রকল্প দিয়ে অত্র এলাকার মানুষের ন্যূনতম উপকারও সাধিত হয়নি। ১৭,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠার ৫৪ বরে ১০০০ হেক্টর জমিতেও সেচ সুবিধা দিতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। যদি উপকারের কথা বলতেই হয়, তাহলে বলব- হ্যাঁ, উপকার হয়েছে।

এই যেমন :- এখন যে জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলানো যাচ্ছে, সেই জমিতে বছরে মাত্র একবার ফসল হতো; তাও আবার নামমাত্র। উপকার বলতে বছর বছর বন্যার কারণে কৃষকদের আশা-ভরসা সব বানের পানির সাথে ভেসে যেত।

বর্তমান অবস্থা...

বর্তমানে বুড়িতিস্তা নদীর অববাহিকায় প্রায় ৩৫-৪০ হাজার লোকের বসবাস। কারণ, বুড়িতিস্তা ডোমার-ডিমলা-জলঢাকার প্রান্তঘেষে অবস্থিত। এটিকে এখন নদী না বলে মরা নদী বলাই শ্রেয়। কারণ, একসময়ের তিস্তার শাখা নদী এই বুড়িতিস্তায় কখনো জোয়ার ভাটা হয় না। শুধু বুড়িতিস্তাই নয়; এর সাথে মিলিত সিঙ্গাহাড়া নদীটিও আজ প্রায় মৃত।

নদীতে নাব্যতা সংকটের কারণে সামান্য বন্যায় নদীর পানি দুকুল ছাপিয়ে আশেপাশের আবাদি জমিতে উঠে জমির ফসল নষ্ট করে। আর সেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের নেশায় কিছু অসাধু ব্যক্তি কিছু টাকার জন্য সেই জমিগুলোকেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি বলে দাবি করতে থাকে।

কারণ, এই গ্রামে শিক্ষার হার আগে একবারেই ছিল না। গ্রামের অধিকাংশ দলিলে এখনো আপনি টিপসই দেওয়া দেখতে পাবেন। বর্তমান সময়ে এসে নদীর উন্নয়নের জন্য ১২০ কোটি টাকা নতুন করে বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ সরকার।

সেই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য তারা নদী খননের নামে অসহায় কৃষকদের জীবন ধারণের একমাত্র অবলম্বন এই ফসলি জমিকেও দখলে নিতে মরিয়া হয়ে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। জমি নিয়ে গত ১৪ বছর ধরে তারা এলাকাবাসীর নামে একাধিক মামলা দিয়েই যাচ্ছে। এমনকি গত ১৪/১৫ তারিখে নতুন করে এলাকার ২৫ জনকে আসামি করে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। এই মামলায় জামিন নিতে গেলে তাদের জামিন নামঞ্জুর করে জেল-হাজতে পাঠানো হয়।

এভাবে একের পর মামলা দিয়ে এলাকাবাসীকে গ্রাম ছাড়া করে তারা উক্ত জমিগুলোর অবৈধ দখল নিতে চায়।

এ কথা বোঝা যায় তখন, যখন স্থানীয় আওয়ামী লীগের কিছু ভাড়াটে মাস্তান পুলিশদের সাথে মিলে হঠাৎ করে চলতি বছরের ১৭ ডিসেম্বর বুড়িতিস্তার সেচ প্রকল্পের জলাধার নির্মাণের জমি জমির দখল নিতে আসে পাউবো। গ্রামবাসীর দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তাঁরা বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অবস্থা বেগতিক দেখে তাঁরা পালিয়ে যায় এবং যাওয়ার সময় নিজেদের সেট করা লোকদের দিয়ে নিজেদের জিনিসপত্রে আগুন দেয় এবং সব ভাঙচুর করে। আবার এটা নিয়ে নিজেরাই সাংবাদিকদের দিয়ে একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ করায়। অথচ এই জমি নিয়ে উচ্চ আদালতে ২টি এবং নিম্ন আদালতে তিনটিসহ মোট ৫টি মামলা চলমান রয়েছে।

এমতাবস্থায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিত হবে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সকলের গ্রহণযোগ্য একটি সুষ্ঠু সমাধানে উপনীত হওয়া। মোট কথা, অসহায় গরিব কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণসহ খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই এ কাজটি করা আবশ্যক। সেই সঙ্গে গ্রহণযোগ্য কৃষিঋণ অনাদায়ে কৃষকের বিরুদ্ধে হয়রানিসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং মিথ্যা মামলা দেওয়াও কোনোভাবেই কাম্য নয়।

আমরা এই বুড়িতিস্তা অববাহিকার আপামর জনতার কথা আমরা কৃষি বাঁচাতে চাই, নদী বাঁচাতে চাই এবং নদীর মাছ বাঁচাতে চাই। আমরা নদী খননের বিরুদ্ধে নই, তবে এই নদী খনন প্রক্রিয়া বিজ্ঞানসম্মতভাবে হতে হবে।

কিন্তু একটি মরা নদী জরুরি ভিত্তিতে খনন করে নব্যতা সংকট দূর করা দরকার ওপর বাঁধ দিয়ে তার ভাটির নদীটিকে মেরে ফেলা তো কোনো আইনসিদ্ধ এবং বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।

২০২৯ সালের জুলাই মাসের ১ তারিখে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন জীবন্ত সত্তা হলো নদী। তাই এই জীবন্ত সত্তা নদীকে বাঁধ দিয়ে মেরে ফেলার অধিকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নেই। যেহেতু এখানে বাঁধ দিয়ে জনগণের কোনো উপকার তো নয়ই: ক্ষতি করছে, তাই আমরা চাই এখানে জনবিরোধী, কৃষিবিরোধী, নদীবিরোধী কোনো প্রকল্প যাতে না নেওয়া হয়।

পশ্চিম পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশ নামক পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের ধারা ব্যাহত করার নিমিত্তে যে পরিবেশ বিরোধী, নদী বিরোধী, কৃষিবিরোধী প্রকল্প হাতে নিয়েছিল স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে সেই পশ্চাৎপদ প্রকল্প আবার চালু করার কোনোই যৌক্তিকতা নেই। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড এখনো যেহেতু বলছে- এলাকার কৃষির উন্নতির জন্যই এই প্রকল্প, তাই কৃষির উন্নতি না হলে তো এই প্রকল্পের পরিকল্পনাকেই ব্যর্থ বলা যায়।

পাশাপাশি ২০১৯ সালে রায়ে হাইকোর্ট যে রায় দিয়েছে যে, বাংলাদেশের যে কোনো প্রকল্প নদীর পাড়ে নিতে হলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে, কিন্তু পাউবো এখানো সেই ধরনের কোনো অনাপত্তি গ্রহণ ছাড়াই এই নদীবিরোধী প্রকল্প হাতে নেয়।

তাই রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের প্রতি আমদের আকুল আবেদন আপনারা এই জনবিরোধী প্রকল্প থেকে সরে আসুন। প্রয়োজনে নদী খননের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা সংকট দূর করার মাধ্যমে কৃষির উন্নতি বিধানে ব্যবস্থা করুন। তাহলে দেশ বাঁচবে, নদী বাঁচবে, কৃষি বাঁচবে; সর্বোপুরি কৃষি নামক সোনার ফসল যারা ফলায়, সেই অসহায়, দরিদ্র কৃষকরা বাঁচবে। আর এর মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নতির দিকে, সমৃদ্ধির পানে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।

লেখক : গবেষক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

(মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখা একান্ত লেখকের মত। এর সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড