• সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

পহেলা বৈশাখ নয় বাঙালির উৎসব পহেলা অগ্রহায়ণ

  সামিরাহ্ সালসাবিল খান

১৬ নভেম্বর ২০২২, ১৬:৫৯
পহেলা বৈশাখ নয় বাঙালির উৎসব পহেলা অগ্রহায়ণ
সামিরাহ্ সালসাবিল খান (ছবি : সংগৃহীত)

আজ পহেলা অগ্রহায়ণ। সাম্রাজ্যবাদী মুঘল আমলের আগে এদিনটিই ছিল বাংলার নববর্ষ। আজ চারুকলার বকুলতলায় হবে নবান্ন উৎসব। অথচ, আমি মনে করি, এদিনেই হওয়া উচিত আমাদের নববর্ষ। আমরা যদি আমাদের শেকড়ে ফিরে যেতে চাই। সাম্রাজ্যবাদীদের দশচক্রে পড়ে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরতে চাই তাহলে সেটার শুরু এখান থেকেই হওয়া উচিত।

"পহেলা বৈশাখ বাঙালির উৎসব নয়। বাঙালির উৎসব ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ। বাংলা বছরের পঞ্জিকায় যে ১২টি মাস আছে, তার মধ্যে ১১টিই নক্ষত্রের নামে। এক্ষেত্রে 'বৈশাখ' বিশাখা নক্ষত্রের নামে, 'জ্যৈষ্ঠ' জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, 'আষাঢ়' আষাঢ়ার নামে এবং এরূপ শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র যথাক্রমে শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পৌষী, মঘা, ফাল্গুনী ও চিত্রার নামে। যে মাসটি নক্ষত্রের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেটি হচ্ছে অগ্রহায়ণ; আর এই নামটির সঙ্গেই মিশে আছে বাংলার কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি এবং কিছু বিস্মৃত হয়ে যাওয়া তথ্য।

'অগ্র' শব্দের অর্থ প্রথম, আর 'হায়ণ' শব্দের অর্থ বছর। বছরের প্রথম বা অগ্রে অবস্থান করার কারণে নক্ষত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন একমাত্র মাসটির নাম হচ্ছে অগ্রহায়ণ। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ মতান্তরে ১৫০০ বছর আগে প্রণীত শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় মাস হিসেবে অগ্রহায়ণ মাসটির উদ্ধৃতি রয়েছে (১০ম অধ্যায় : ৩৫ নম্বর শ্লোক)। অবশ্য সেখানে প্রিয় ঋতু হিসেবে বর্ণিত আছে বসন্তকালের নাম। বাংলার এই মাস ও ঋতুগুলো যে বহুপূর্বকাল থেকে ভারতবর্ষে প্রচলিত, উপর্যুক্ত তথ্য মূলত তারই সত্যতা নিশ্চিত করে।

প্রায় প্রাচীন কাল থেকেই এ অঞ্চলে নববর্ষের উৎসব পালন হয়ে আসছিল। নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ‘আমানি’ উৎসবের কথা বলেছেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক। যা পহেলা অগ্রহায়ণে অনুষ্ঠিত হত। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে 'বৈশাখ' মাসকে বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়। কিন্তু বৈশাখকে বছর শুরুর মাস আর পহেলা বৈশাখকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে বাঙালি উদযাপন করেনি।

ইংরেজ আমলে রবীন্দ্রনাথদের পরিবারে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে। পরে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের ব্যবস্থা করেন। কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারেও এভাবে ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে কিছু উৎসাহ-উদ্দীপনার খবরাদি পাওয়া যায়।

পরবর্তীকালে ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয় মূলত রবীন্দ্র চর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে। তারা ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সূত্রপাত করে। পাকিস্তানি শাসকরা এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করায় এন্টি পাকিস্তানি মানসিকতার বাঙালির কাছে পহেলা বৈশাখ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এভাবেই আত্মবিস্মৃত কিছু শিক্ষিত বাঙালির উদ্যোগে বাঙালীর আদি উৎসব আমানী উৎসব বা নবান্ন উৎসবকে নওরোজ বা নতুন বছরের উৎসব থেকে সরিয়ে মুঘল শাসকদের দ্বারা প্রবর্তিত পহেলা বৈশাখকে প্রতিস্থাপন করা হয়।

বাঙালির উচিত আবারো পহেলা অগ্রহায়ণেই নববর্ষ উদযাপন শুরু করে নিজেদের হারানো ইতিহাস পুনরুদ্ধার করা। ভীন সংস্কৃতিতে আসক্ত শিক্ষিত কলকাত্তাইয়া বাঙালি নয়, আমাদেরকে আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ের প্রতিই দায়বদ্ধ থাকতে হবে। একই সাথে আমি দাবি জানাই, বাংলা বছরের শুরুর মাস হিসেবে অগ্রহায়ণকে পুন:প্রতিষ্ঠিত করা হোক।"

পহেলা বৈশাখের পরিবর্তে পহেলা অগ্রহায়ণকে আমাদের বছরের শুরুর দিন করা হোক। বৈশাখের এই ঝড় ঝঞ্ঝার মইদ্যে আনন্দ করাটা বড় বেমানান। এক দিকে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘরহীন হয়ে পড়বে অন্য দিকে কিছু লোক আনন্দ করবে এটা হয় না। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের মধ্যে কোনো উৎসব সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারে না।

পহেলা অগ্রহায়ণে আবহাওয়া থাকে সুন্দর। নতুন ধানের আনন্দে জেগে ওঠে গ্রাম বাংলা। তাছাড়া আবহমান কাল থেকেই এসময় গ্রাম বাংলা নানাবিধ উৎসবে মেতে ওঠে। ইতিহাস বলে পহেলা অগ্রহায়ণই ছিল আমাদের বছরের শুরুর দিন। মুঘল আমল থেকে, বিশেষ করে আকবরের আমলে পহেলা বৈশাখকে বছরের শুরুর দিন ঘোষণা করা হয়। আর পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয় আরও পরে, রবি ঠাকুরের সময়, পাশ্চাত্যের অনুকরণে বছরের প্রথম দিন উদযাপন উপলক্ষে। এ কারণে পহেলা বৈশাখ হলো জোর করে চাপিয়ে দেয়া উৎসব। যার সাথে গ্রাম বাংলার কোন নাড়ির টান নেই।

নববর্ষকে সার্বজনীন উৎসব করতে হলে সেটা পহেলা অগ্রহায়ণে করার কোন বিকল্প নেই। আমরা বৈশাখের এই ধ্বংসলীলার মধ্যে আর কোন নববর্ষ উদযাপন করতে চাই না।

লেখক : সরকারি কর্মকর্তা। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন।

(মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখা একান্ত লেখকের মত। এর সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড