• বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

৭২ এর সংবিধানে বাংলাদেশের চরিত্র স্পষ্ট করেছিলেন বঙ্গবন্ধু

  বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী

০৫ নভেম্বর ২০২২, ১১:৫২
৭২ এর সংবিধানে বাংলাদেশের চরিত্র স্পষ্ট করেছিলেন বঙ্গবন্ধু
সংবিধান গৃহীত হওয়ার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আয়োজিত অনুষ্ঠানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বক্তব্যরত (ছবি : সংগৃহীত)

বঙ্গবন্ধু ৭২ এর সংবিধানে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র কি হবে তা সুস্পষ্ট করে করেছিলেন : বিচারপতি মোঃ আবু জাফর সিদ্দিকী

সুবর্ণজয়ন্তীর এই মহেন্দ্রক্ষণে আমাদের শাসনতন্ত্র রচনার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : আবহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কেবলমাত্র ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ ছিল- বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক, ছাত্রজনতার দীর্ঘদিনের আন্দোলন/সংগ্রামের এক চূড়ান্ত রূপ।

এদেশের সাঁওতাল-গারো-হাজং আদিবাসীদের বিদ্রোহ, সন্ন্যাসী/ফকিরদের বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, শান্তি ঘোষ, বাঘাযতিন, ক্ষুদিরাম প্রমুখ দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের নেতৃত্বে সংঘটিত অগ্নিযুগের সশস্ত্র জাতীয় বিপ্লব ও স্বদেশী আন্দোলনসহ জনগণের বহুমাত্রিক সংগ্রামে ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে কাঁপিয়ে তুলেছিল।

যার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটলেও সাম্প্রদায়িক ও দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত দুই হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষা-ভাষীদের নিয়ে পাকিস্তান নামক এক অদ্ভুত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর জাতিগত বৈষম্য, শোষণ-শাসন, দমন-পীড়ন ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, মুটে-মুজুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে তাঁর আন্দোলন/সংগ্রাম গড়ে তোলে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪' এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৪' এর স্বাধিকার আন্দোলন, ৬৬ এর ৬ দফার আন্দোলন, সবশেষে ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলার রাখাল রাজা শেখ মুজিব কারামুক্তির পর ঢাকার ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে ছাত্র জনতার বিশাল জনসমুদ্রে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত হন।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে এদেশের কৃষক-শ্রমিক, কুলি-মজুর, ছাত্র-জনতা এক নবজাগরণে উজ্জীবিত হয়েছিল এবং তীব্র গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনের পর ছাত্র জনতার উত্তাল সংগ্রাম ও গণদাবির মধ্য দিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়ার অধীনে ৬ দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানী স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া/ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে তারা সমগ্র বাঙালি জাতির উপর নির্যাতনের পথ বেছে নেয়।

যার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের দিক নির্দেশনা মূলক ঐতিহাসিক ভাষণে “যার যা আছে তাই নিয়ে সমগ্র জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান করেন"।

৭ মার্চ থেকেই মূলত: বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাংলাদেশ পরিচালিত হতে থাকে এবং সমগ্র জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ধানমন্ডির ৩২ নং রোডের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যা তৎকালীন ইপিআর বাহিনী কর্তৃক ওয়ারলেস যোগে দেশে-বিদেশে প্রচারিত হয়। নব প্রজন্মের জানা প্রয়োজন যে, হঠাৎ করে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতির দীর্ঘ আন্দোলন/সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছিল ৭১' এ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নির্বাচিত গণপরিষদ কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদ কে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল' ৭১ কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলায় (মুজিব নগরে) নবগঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করেন এবং গণপরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলামের রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ ও অনুমোদনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ও আইনানুগ ভাবে পরিচালিত হয় নবগঠিত সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের পূর্ব পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান হিসাবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের কারাগার থেকে জাতির পিতা মুক্ত হয়ে ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে কেন্দ্রবিন্দু করে হাত দেন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন এবং দেশ পরিচালনার জন্য শাসনতন্ত্র রচনার কাজে।

জাতির পিতা অতি অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ১০ মাসে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লিখিত শাসনতন্ত্র আমাদের উপহার দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় লিখেছিলেন, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য নিশ্চিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলে বিবেচিত হবে এবং সাম্যবাদী সমাজ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা হবে।

রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হবে বাংলার কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ সহ জনগণের অনগ্রসর অংশকে সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি প্রদান করা। ১৯৭২ সালের সংবিধানে স্পষ্টভাবে লেখা হয়েছে-পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশ, নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা, আইনের শাসন ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, সকল নাগরিকের জন্য সমতা, মানুষে-মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের বিলোপ সাধন করা। বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র কি হবে তা সুস্পষ্ট ভাবে সংবিধানে উল্লেখ করেছিলেন।

১৯৭২-এর সংবিধান প্রবর্তিত রাজনীতি, অর্থনীতি ছিল এদেশের কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা ও মেহনতি মানুষের স্বার্থে। সংবিধানের ৪ মূলনীতির আলোকে দেশ চলতে শুরু করে। যার ফলে পাকিস্তানের পরাজিত শত্রু এবং তাদের মদদ পুষ্ট দেশীয় বুর্জোয়া শ্ৰেণী ও আন্তর্জাতিক সম্রাজ্যবাদী চক্র ক্ষুব্ধ হয়ে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে পাকিস্তানীদের দোসর ও স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ক্ষমতা দখল করে লাখো শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা' ও 'সমাজতন্ত্র' কে বাদ দিয়ে একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করার অপচেষ্টা করেছে, অন্যদিকে সামরিক শাসনকে বৈধতা দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় স্থায়ীভাবে ক্ষত সৃষ্টি করে।

উচ্চ আদালতের রায়ে সামরিক ফরমান বৈধ করনের সংশোধনী সমূহ অবৈধ ঘোষণার ফলে পুনরায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে দেশকে বিচ্যুত করার ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। ৭২'-এর সংবিধানের কিছু পরিবর্তন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থি এবং পাকিস্তানী আদর্শবান্ধব হিসাবে সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।

১৯৭২ সালের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ ঘোষণা কেবল মাত্র ঘোষণাই ছিল না, ঐ সংবিধানের বিধানেই বলা হয়েছে যে, সংবিধানের মৌলিক নীতিসমূহ বাংলাদেশ পরিচালনার মূলনীতি হবে। আইন প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তা প্রয়োগ করবে, এই সংবিধান ও বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে তা নির্দেশক হিসাবে কাজ করবে এবং উহা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের জীবন ও কার্য্যের মূল ভিত্তি হবে।

বঙ্গবন্ধু সংবিধানে দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতা প্রণীত সংবিধানের নির্দেশনা অনুস্মরণের বিকল্প নেই। চার মূলনীতির মধ্যেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দিক নির্দেশনা রয়েছে। ৫০ এর দশক থেকে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছিল সংবিধানে। ৭২-এর সংবিধান ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কাঠামোগত রূপ। ৫ম ও ৭ম সংশোধনী দিয়ে সংবিধানকে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিলো, তা আজও বিভাজনের কারণে সম্পূর্ণ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা নিয়ে আজও চলছে নির্লজ্জ অপচেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেয়ে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট কেনা-বেচা করে ৩০ লক্ষ শহীদকে অসম্মানিত করেছে। অসম্মানিত করেছে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বৎসর পরেও মুক্তিযোদ্ধার যাচায়-বাছায়ের কাজ শেষ হয়নি।

এটা জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাকর। রাষ্ট্রের ৪টি মূলনীতির মধ্যে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ছেঁটে ফেলা সহ জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্মের মিশ্রণ ঘটিয়ে জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞাই বদলে দেয়া হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে জাতির পিতা হত্যার বিচার বন্ধে জারিকৃত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে খুনিদের বিচারের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্ক মুক্ত করেছেন এবং ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসাবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা পুনপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতিকে ক্ষত মুক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঐ সংশোধনীতে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসাবে সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

সংবিধান একটি দেশের দর্পণ, সংবিধানে দেশের সার্বিক কাঠামো দেখা যায়। দেশ কিভাবে চলবে, নাগরিকদের অধিকার, সরকারের শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি, রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান, এসকল বিষয়ে নির্দেশনা দেয় সংবিধান, যা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। সংবিধান ব্যতিরেকে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সে কারণেই সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত।

রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে, “সংবিধান রাষ্ট্রের এমন এক জীবন পদ্ধতি, যা রাষ্ট্র স্বয়ং নিজের জন্য বেছে নেয়।” জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকাঙ্ক্ষা ছিল সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে মাতৃত্বও যেমন হার মানে, তেমনি আমাদের সংবিধানকেও হার মানতে হয়েছে বার বার। ৫০ বৎসরে বিভিন্ন সময়ে আমাদের সংবিধানে চালানো হয়েছে অস্ত্রোপচার/কাটাছেঁড়া। সংবিধান প্রণয়নের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৭টি সংশোধনী আনা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস :

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে আত্ম প্রকাশের পরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তনের পরের দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক ভাবে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

একই দিনে তিনি বাংলাদেশ অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন। অস্থায়ী সংবিধান আদেশে বলা হয়, সংবিধান রচনার জন্য বাংলাদেশে একটি গণপরিষদ গঠন হবে। রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা থেকে পরিবর্তিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার প্রবর্তন হবে।

সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের ১১ই এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৭ এপ্রিল থেকে ৩রা অক্টোবর পর্যন্ত সংবিধান কমিটির সভা এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ৯৮টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ভারত ও ইংল্যান্ড সহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের সাথে সমন্বয় রেখে সংবিধান কমিটি একটি খসড়া তৈরি করে যা ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে “খসড়া সংবিধান” বিল আকারে উত্থাপিত হয় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষান্তে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়।

এ কারণেই ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান দিবস হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস থেকে আমাদের সংবিধান কার্যকর হয়েছে। গণপরিষদে সংবিধানের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবেগ আপ্লুত ভাবে বলেন, “এই সংবিধান শহীদের রক্ত দিয়ে লেখা, এই সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।” ৯৩ পাতার হাতে লেখা সংবিধানটি শিল্পী আব্দুর রউফ হাতে লিখেন এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংবিধানের অঙ্গসজ্জা করেছিলেন।

বাংলাদেশের সংবিধান কেবল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইনই নয়, সংবিধানে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মূল চরিত্র বর্ণিত রয়েছে। এতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা বিধৃত আছে। বাংলাদেশ হবে প্রজাতান্ত্রিক, গণতন্ত্র হবে দেশের প্রশাসনিক ভিত্তি, জনগণ হবে সকল ক্ষমতার উৎস এবং বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন। জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস কিন্তু দেশ পরিচালিত হবে আইন দ্বারা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আকাঙ্ক্ষা ছিল সংবিধান সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে। নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে মাতৃত্বও যেমন হার মানে, তেমনি একটি রাষ্ট্রের সংবিধানকেও হার মানতে হয়। বিভিন্ন সময়ে আমাদের সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছে।

এ সময়কালের ১০টি সংসদের মধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদকালের সপ্তম সংসদে সংবিধানে কোন সংশোধন হয়নি।

এক নজরে সংবিধানের সংশোধনী :

১। সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বিল পাস হয় ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই। প্রথম সংশোধনীটি ছিল বিচার নিশ্চিত করা হয়। যুদ্ধাপরাধীসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা।

২। ১৯৭৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় সংশোধনী বিল পাস হয়। এতে সংবিধানের ২৬, ৬৩, ৭২ ও ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনী আনা হয়। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ বা বহিরাক্রমণে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবন বাধাগ্রস্ত হলে ‘জরুরি অবস্থা' ঘোষণার বিধান চালু করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে।

৩। ভারত ও বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণী চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ১৯৭৪ সালের ২৩ নভেম্বর তৃতীয় সংশোধনী আনা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তি অনুমোদন এবং চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহল ও অপদখলীয় জমি বিনিময় বিধান প্রণয়ন করা হয়।

৪। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি চালু হয় ।

৫। ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডসহ ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক সরকারের সকল কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দান এবং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ অনুমোদন সহ সংবিধানে 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' সংযোজন করা হয়।

৬। ১৯৮১ সালের ৮ জুলাই ষষ্ঠ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি পদে আব্দুস সাত্তার বহাল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের বিধান করা হয়।

৭। ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে এরশাদের ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক শাসনের বৈধতা দেওয়া হয় । ১৯৮২ সালের ২ রা মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ৯ নভেম্বর পর্যন্ত সামরিক আইন বলবৎ থাকাকালীন সময়ে প্রণীত সকল ফরমান, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের আদেশ, নির্দেশ ও অধ্যাদেশ সহ অন্যান্য আইনের অনুমোদন দেওয়া হয়।

৮। ১৯৮৮ সালের ৭ জুন সংবিধানে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে ২, ৩, ৫, ৩০ ও ১০০ পরিবর্তন করা হয়। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতিদান করা ও ঢাকার বাইরে ৬টি হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করার বিধান চালু করা হয়।

৯। ১৯৮৯ সালের ১০ জুলাই নবম সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতি পদে কোন ব্যক্তির পর পর দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন সীমাবদ্ধ রাখা হয়।

১০। ১৯৯০ সালের ১২ জুন দশম সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে ১৮০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন ও ৩০টি মহিলা আসনের সময়কাল ১০ বছর বাড়ানো হয়।

১১। ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে এইচ এম এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে ৬ আগস্টে একাদশ সংশোধনীতে বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দায়িত্ব গ্রহণ বিল পাস হয়। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগদান বৈধ ঘোষণা সহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যাবার বিধান পাস হয়।

১২। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্টের সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭ বছর পর দেশে পুনরায় সংসদীয় সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উপ-রাষ্ট্রপতির পদ বিলুপ্ত করা হয়।

১৩। ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চে সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।

১৪। ২০০৪ সালের ১৬ মে চৌদ্দতম সংশোধনীতে সংরক্ষিত মহিলা আসন ৩০ থেকে ৪৫টি এবং সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে ৬৭ বছর করা হয়।

১৫। ২০১১ সালের ৩০ শে জুন পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। সংবিধানে ৭ অনুচ্ছেদের পরে ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করা হয়।

১৬। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে ষোড়শ সংশোধনীতে ৭২ এর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃ স্থাপনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান পাস হয়।

১৭। সর্বশেষ ৮ জুলাই ২০১৮ তারিখে সপ্তদশ সংশোধনীতে সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বহাল রাখার বিল পাস হয়।

সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক, আসুন আমরা সংবিধান প্রণয়নের ঐতিহাসিক এই সুবর্ণজয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের আখরে লেখা সংবিধানকে সমুন্নত রেখে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ আজ সময়ের দাবি। সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক : বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ।

(মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখা একান্ত লেখকের মত। এর সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড