• বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ (গবাদি পশুপাখি ও মৎস্য) খাতে আলোকপাত

  ড. এ বি এম খালদুন

০১ নভেম্বর ২০২২, ১৭:০১
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ (গবাদি পশুপাখি ও মৎস্য) খাতে আলোকপাত

কৃষির অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উপখাত হল প্রাণিসম্পদ (গবাদি পশুপাখি ও মৎস্য)। পুষ্টির সব থেকে বড় উৎস হল প্রাণীজ খাদ্যোপাদান যা প্রধানত আমিষ ও শক্তির যোগান দিয়ে থাকে। অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিরাপত্তা মেধাবী ও পরিশ্রমী জাতি গঠনের মৌলিক চাহিদা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই উন্নত জাতি গঠনে পুষ্টির বিকল্প কিছু হতে পারে না।

দানাদার মাঠ ফসল, শাক সবজি, ফলমূলের পাশাপাশি এই খাত আজ খাদ্য ও পুষ্টির যোগানে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এর সুফল আজ দৃশ্যমান। পুষ্টির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও এদের থেকে তৈরিকৃত প্রক্রিয়াজাত খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে।

গবাদি পশুপাখির ও মাছের রোগের নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিকার, গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়ন, প্রাণীপুষ্টি উন্নয়ন, প্রাণীজাত পণ্যের ভেল্যুচেইন ও বাজারজাতকরণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে।

ব্রিটিশ আমলে ১৭৭৫ সালে ব্রিটিশ অশ্বারোহী বাহিনীর প্রয়োজনে ভারতে প্রথম ঘোড়ার খামার স্থাপনের মাধ্যমেই মূলত বিজ্ঞানভিত্তিক প্রাণিসম্পদ সেবা শুরু হয়।

বিভিন্ন উত্থান-পতন ও ধারাবাহিক রূপান্তরের মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে মহকুমা ও থানা পর্যায়ের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদাদানের মাধ্যমে দৃশ্যত এ খাতে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। প্রশাসনিক, পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার সাধিত হয়। কালের পরিক্রমায় ২০১১ সালে পশুসম্পদ অধিদপ্তর ‘প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর’নামে নব যাত্রা শুরু করে। প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের ভিশন হল; সকলের জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত প্রাণীজ আমিষ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং মিশন হল প্রাণীস্বাস্থ্য সেবা প্রদান, প্রাণীর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে প্রাণীজ আমিষের চাহিদাপুরণ।

২০২০-২১ অর্থবছরে প্রাণী খাতের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৮০ শতাংশ যা কৃষিজ জিডিপি’র ১৩.১০ শতাংশ। এই সেক্টরের সাথে প্রত্যক্ষভাবে ২০ শতাংশ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ জড়িত। এই অর্থবছরে দুধের উৎপাদন হয়েছে ১১৯.৮৫ লাখ মেট্রিক টন যা ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় ৪ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। গত এক দশকে মাংস উৎপাদন ৪.২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২০-২১ সালে ৮৪.৪০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। এই বছরে ডিমের উৎপাদন ছিল ২০৫৭.৬৪ কোটি পিস যা ২০১০-২১ সালে ছিল ৬০৭.৮৫ কোটি পিস অর্থাৎ ৩.৪ গুন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৪ বছরে দেশে উৎপাদিত গবাদিপশু দ্বারা কোরবানির পশুর চাহিদা পূরণ হয়েছে।

ইদুল আযহা ২০২১ উপলক্ষে ১.১৯ কোটি গবাদিপশু প্রস্তুত ছিল কিন্তু কোরবানি হয়েছে ০.৯১ কোটি। পরিসংখ্যানের হিসেবে ২৮ লাখ পশু উদ্বৃত্ত ছিল। ফলশ্রুতিতে পশুর বাজারে প্রায় ৪৬৪৩০.০৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে যা প্রান্তিক জীবনে ব্যাপক অর্থনৈতিক গতি সঞ্চার করেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২২ সালের কোরবানি ইদে ৯৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৩ টি গবাদিপশু কোরবানি করা হয়েছে। বিগত এক দশকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর প্রায় ৯২ লাখ বেকার যুবক, যুব মহিলা, দুস্থ মহিলা, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষককে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে আত্ম-কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

একইভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদানও অস্বীকার্য। বিশেষত মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন, রফতানি বাণিজ্যের প্রসার সর্বোপরি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।

এ ব্যাপারে সরকারের সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ, মৎস্য গবেষণার উন্নয়ন ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণসহ নানাবিধ কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং চাষি ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক কারিগরি পরিষেবা প্রদানের কারণে এ সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে দেশের মানুষের প্রাণীজ আমিষের চাহিদার প্রায় ৬০ ভাগ জোগান দিচ্ছে মাছ।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে, মাথাপিছু প্রতিদিন ৬০ গ্রাম মাছের চাহিদার বিপরীতে মানুষ এখন ৬২ দশমিক ৫৮ গ্রাম মাছ গ্রহণ করছে। দেশের মোট জিডিপির ৩.৫৭ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২৬.৫০ শতাংশ এখন মৎস্য খাতের অবদান। বিগত ১২ বছরে মৎস্য খাতে জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে মোট মাছের উৎপাদন ছিল ২৭.১ লাখ টন যা ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৪৬.১ লাখ টন। এর মধ্যে সামুদ্রিক মাছের অবদান ৬.৮১ লাখ টন যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ১৪.৭৪ শতাংশ।

২০০৮-০৯ অর্থবছরে জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে। মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্যের রফতানির পরিমাণ মোট রফতানি আয়ের ১.৩৯ শতাংশ। বার্ষিক মৎস্য দরদামের স্থিতিশীলতাই বলে দেয় মৎস্য চাষে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ যদিও কোন কোন জাতের মাছ দেশে উদ্বৃত্ত উৎপাদন হচ্ছে। ২০১৭ সালে ‘বাংলাদেশের ইলিশ’ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই সনদ লাভ করেছে। বিশ্বে ইলিশ আহরণকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে।

মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রফতানি পণ্য। বর্তমানে বিশ্বের ৫২টি দেশে বাংলাদেশের মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএসএ, জাপান, রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে বাংলাদেশের মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য রফতানি হচ্ছে। বর্তমানে ১০৫টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাত প্লান্টকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩টি ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানির জন্য অনুমোদিত। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ হিমায়িত ও তাজা মাছ রফতানি করে ৪৭৭.৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে।

কৃষির অন্যান্য খাত-উপখাতের তুলনায় মাছের উৎপাদন বাড়ার হার বেশি। বিগত ১৫- ১৬ বছরে এ খাতে বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

এছাড়াও মৎস্য জাতীয় পণ্যের মধ্যে কাঁকড়ার চাষে রপ্তানি বাড়ছে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা না থাকলেও বিদেশের রপ্তানি বাজার প্রসারিত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া বিশেষ করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, কোরিয়া ও হংকং-এ কাঁকড়ার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যেও কাঁকড়ার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশে প্রায় ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৪টি স্বাদু পানির এবং ১১ টি লবণাক্ত পানির কাঁকড়া। বছরে প্রায় ৯,৫০০ হেক্টর ঘেরে প্রায় ১৩,০০০ টন কাঁকড়া চাষ হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাঁকড়ার পোনা সংগ্রহ প্রাকৃতিক উৎস নির্ভর। বাংলাদেশ থেকে মূলত ‘শিলা কাঁকড়া’ রপ্তানি করা হয়।

তবে অতি সম্প্রতি মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট কর্তৃক কাঁকড়ার কৃত্রিম প্রজননের দিকে গবেষণা জোরদার করা হয়েছে এবং তা সফলভাবে বাস্তবায়নের পথে। আশার কথা হল এই শিলা কাঁকড়ার পোনা এখন হ্যাচারিতেও উৎপাদন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কাঁকড়া রফতানি থেকে ২০২১ সালে প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে।

আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষির উপরই নির্ভরশীল। সেই কৃষিকেই আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। সবার আগে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর তাই সেভাবেই সরকারও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টর এর ভূমিকাও প্রণিধানযোগ্য। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার দিকে নজর দিতে হবে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য, পরিবহন ও সংরক্ষণে গবেষণা ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং বিদ্যমান পদ্ধতিসমূহের উন্নতির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।

গবেষণা, পরিকল্পনা ও নীতি, প্রশাসনিক নজরদারি, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, চাষি ভাইদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও জনসচেতনতার ফলে আজকে বাংলাদেশ ইলিশ মাছ উৎপাদনে বিশ্বে ১ম। বিশ্বের ৮৬ শতাংশ ইলিশ আহরণ হচ্ছে বাংলাদেশে যা চার বছর আগেও ছিল ৬৫ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ৩য় স্থানে রয়েছে। সরকারের নানা উদ্যোগে গবাদিপশু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ১২তম স্থানে এবং শুধু ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ এবং ছাগলের দুধ উৎপাদনে বিশ্বে ২য় স্থানে রয়েছে। কৃষি ও খাদ্যের রোল মডেল বাংলাদেশ আজ প্রায় ১৭ কোটি মানুষকে খাইয়ে, এই কোভিড-১৯ ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সারা বিশ্বে খাদ্য ও পুষ্টির যোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল ফার্মগেট, ঢাকা।

ইমেইল : [email protected]

(মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখা একান্ত লেখকের মত। এর সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড