• শনিবার, ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

‘বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে কিছু কথা

  মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:২৮
‘বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে কিছু কথা
রোদে ধান শুকানো হচ্ছে ও মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন (ছবি : সংগৃহীত)

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মহান নেতা কমরেড মাও সেতুং চীন রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় বলেছিলেন, ‘কোনো দেশে যদি বিপ্লব করতে হয় তবে সে দেশের বিগত ৫০০ বছরের ইতিহাস নখদর্পণে থাকতে হবে।‘ বাংলাদেশের মাটি এবং মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতি এ দেশের মানুষের জীবনযাপন, তাদের জীবন বৈশিষ্ট্য, মনন কাঠামো, ভাব মানস, চিন্তার উপাদান বুঝতে হলে বাংলার মানুষের চরিত্র এবং তার শাসন-শোষণ, উত্থান-পতন, অভ্যুদয়, পরাজয়, জাত, পাত, ধর্ম, বর্ণ, সাম্প্রদায়িক মনোভাব, বাংলার রাঢ়-বরেন্দ্র ভূমি, পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ অর্বাচীন, অনুন্নত রাঢ় এবং বরেন্দ্র ভূমির ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের মানুষ পর্যন্ত তার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক বিষয়বস্তুকে জানতে হবে।

ইতিহাসের পরিবেশিত নানান তথ্য উপাত্ত যারা সংকলিত করেছেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পরিষ্কার হওয়াটা জরুরি কেননা তাদের বিধৃত কোনো কোনো তথ্য, তত্ত্ব ও সিদ্ধান্ত পড়ার, শোনার, জানার ও বিশ্বাস করার দরুন সমাজে আজো নানান রকম বিভ্রান্তি তৈরি হয় যার কারণে অধিকাংশ সামাজিক রাষ্ট্রিক, সাংস্কৃতিক, সাম্প্রদায়িক জীবনে তীব্র ক্ষোভ বিক্ষোভ, দাঙ্গা হাঙ্গামা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে যা সাধারণ জনগণের জীবনে ভয়ের, ত্রাসের ও অনিরাপত্তার যন্ত্রণা বয়ে আনে।

ইতিহাসের পরিবেশিত সকল তথ্যই ভুল এ কথা বলা যাবে না।তবে অবশ্যই স্থান, কাল, পাত্র পরিবেশ, প্রয়োজন, শাসক শাসিতের সম্পর্ক, শাসক প্রশাসকের জ্ঞান বুদ্ধি বিশ্বাস, তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চেতনার ফলশ্রুতিতে চরিত্রের কার্যকারণ এবং বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সঠিকতা বেঠিকতা নিরূপণ জরুরি হয়ে পড়ে। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত আর ভুল ইতিহাস নিয়ে ধর্মে কর্মে মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে কত যে গোলাগুলি আর দাঙ্গা বেঁধেছে তার হিসেব আলোচনা তুললে শেষ করা যাবে না।

ফলে যারা ইতিহাস সচেতন হতে চান তাদের অবশ্যই বিজ্ঞানভিত্তিক বাস্তবসম্মত ইতিহাসের সময়োপযোগী জ্ঞানের প্রয়োজন। যারা পথনির্দেশ দিতে পারবেন, মানুষকে সচেতন করতে পরবেন এবং যারা ইতিহাস বিকৃতির অগ্রভাগে তাদের ফাঁকি সীমাবদ্ধতা ধরিয়ে দিতে পারবেন।

বাংলার মানুষের আদি নিবাস সাইবেরিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, হাজারো পথ ঘুরে আসা ভূমধ্যসাগরীয় দ্রাবিড়-নিগ্রো, সাইবেরীয় নর্ডিক-মঙ্গোল, ভোটচীনা, অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, শামীয়, নিগ্রো, আর্য, তাতার, শক, হুন, কুষাণ, গ্রিক, মঙ্গোল, ভোট চীনাসহ আদি পূর্বপুরুষদের বিবর্তন ও পরিবর্তন সম্পর্কে একটা গভীর অনুসন্ধিৎসু আলোচনা রয়েছে ‘বাংলা বাঙালই ও বাংলাদেশ’ গোটা বইটি জুড়ে।

যেখানে বাঙালি জাতির উৎস সন্ধানে আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘আমাদের গায়ে আর্য-রক্ত সামান্য, নিগ্রো রক্ত কম নয়,তবে বেশি আছে দ্রাবিড় ও মঙ্গোল রক্ত, অর্থাৎ আমাদেরই নিকট জ্ঞাতি হচ্ছে কোল, মৃণ্ডা, সাঁওতাল, নাগা, কুকী, তিব্বতি, কাছাড়ী, অহম প্রভৃতি।’

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি এবং বাংলা গবেষণা জগতের প্রধান ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ড. আহমদ শরীফ এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি সকলের কাছে প্রিয় হওয়ার দুর্বলতাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে অপ্রিয়তাকে গ্রহণ করেছেন। তিনিই সম্ভবত বাঙালির মনন জগতের নানান রকম উপাদান সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি ভেবেছেন। চিন্তা মগ্ন হয়ে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, দৈনন্দিন জীবনাচরণ, বাঙালির উৎপত্তি এবং তার বিস্তার, বিশেষ করে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে দেখাতে চেয়েছেন বাঙালি কোন শ্রেণির প্রতিনিধি থেকে আধুনিক বাঙালি হিসেবে এসেছে? তার গোড়ার কথা কি?

তিনি অনুসন্ধান চালিয়েছেন গোটা ভারতবর্ষের বিভাষী, বিজাতি, বিধর্মী, আধা বর্বর, নেপালী, বিহারী, মুনি, ঋষি, সেন, পাল, তুর্কী, ফারসি, মুঘল ও ব্রিটিশদের ধর্ম-কর্ম, শোষণ, নির্যাতন, বঙ্গভঙ্গ, বাংলা বিভাগ, দেশভাগ, স্বদেশি আন্দোলন, দ্বিজাতি তত্ত্ব, পাকিস্তানি বাইশ পরিবারের শাসন শোষণ, পদলেহন, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা, গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী শাসন প্রশাসন, বুর্জোয়া রাজনীতির উত্থান, সামরিক শাসন বেসামরিক শাসন, বহুদলীয় গণতন্ত্র, একদলীয় শাসন, দ্বিদলীয় শাসন, সাম্প্রদায়িক শক্তির বিস্তার, উপজাতি, জাতি সমস্যা এবং বর্তমান শাসক শ্রেণির চরিত্র বৈশিষ্ট্য তাদের নেতৃত্বের উপর।

আজীবক, তীর্থঙ্কর ও বোধিসত্ত, দেবদ্রোহী গৌতম বুদ্ধের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ, বর্ণ বাঙালির উত্তর আর্যভাষা লিপি, সংস্কৃতি, সমাজ নীতি গ্রহণ, সুসভ্যতা থেকে শুরু করে বইটি জুড়ে রয়েছে বাঙালির চিন্তার স্বকীয়তা, মানস স্বাতন্ত্র্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেখানে আহমদ শরীফ বলেছেন,

‘বাঙালির চিন্তার স্বকীয়তা, মানস স্বাতন্ত্র্য ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অবলুপ্ত হয়নি এবং তা একাধারে লজ্জার ও গৌরবের, বাঙালি চিরকাল বিদেশি ও বিজাতি শাসিত সাত শতকের শশাঙ্ক নরেন্দ্র-গুপ্ত এবং পনেরো শতকের যদু জালালুদ্দীন ছাড়া বাংলার কোনো শাসকই বাঙালি ছিলেন না।‘

বাংলার পণ্ডিত আহমদ শরীফের অনন্য নিদর্শন ‘বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ’ বইটিতে এদেশের তথা তদানীন্তন ভারতবর্ষের আদি ইতিহাস বিশেষ করে বাংলা ও বাঙালির উৎপত্তি, ইতিহাসের ধারায় বাংলা ও বাঙালি, আঠারো-উনিশ শতকের বাংলা ও বাঙালির সম্বন্ধে দু একটি ধারণার পুনর্বিবেচনা, উনিশ শতকের বাংলার জাগরণের স্বরূপ, বাংলার গতরখাটা মানুষের ইতিকথা, বাংলার ইতিহাসের কিছু বিবেচ্য মৌল তত্ত্ব, তথ্য ও সত্য,বাঙলার সংস্কৃতি প্রসঙ্গে, বাংলার রাজনীতির ইতিকথা, বাংলার বিপ্লবীদের পটভূমি, ইতিহাসের দর্পণে দুশতকের বাঙালি, কোম্পানি আমলে ও ভিক্টোরিয়া শাসনে বাঙালি, বাঙালি সত্তার বিলোপ প্রয়াসে ১৯০৫ সালের ষড়যন্ত্র, ভাষা সংস্কার ও বাঙালি চেতনার বিকৃতি, বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, বাঙালির মৌল ধর্ম, বাঙালি সত্তার স্বরূপ সন্ধানে বাঙালি সংস্কৃতির উৎস ও ভিত্তি, বাঙালির মনন বৈশিষ্ট্য, বিশ শতকে বাঙালি, বিগত দৃষ্টিতে তাদের রূপ-স্বরূপ, বাঙালি-বাংলাদেশি, বাংলাদেশের বিগত পঞ্চান্ন বছরের রৈখিক চালচিত্র, বাংলাদেশের শতবর্ষী ইতি বৃত্তান্ত, রূপে স্বরূপে রাষ্ট্রিক বাংলাদেশ, বাংলাদেশের রাজনীতি, ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা, এ শতকে আমাদের জীবনধারার রূপরেখা, ভবিষ্যতের বাংলা তথা পরতে পরতে রয়েছে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য আর মাটি ও মানুষের কথা।

কোল, ভীল, ওরাওঁ, মুন্ডা, সাঁওতাল, দ্রাবিড়, চাকমা, নাগা, কুকী, আর্য, শক, হুন, তুর্কী, মুঘল, আরব, ইরানি, হাবসি, প্রভৃতি দুনিয়ার হাজারো নানান গোষ্ঠীর ও জাতির সমন্বয়ে আধুনিক বাঙালি জাতির বিচিত্র আচার-আচরণ, সংস্কার, সংস্কৃতি, মননধারা, চারিত্রিক বৃত্তি-প্রবৃত্তি ও রুচি সংস্কৃতির আভাস আমরা অবলোকন করি। যার মধ্যে রয়েছে নানান বিচিত্রময় দেহাকৃতি ও বৈচিত্র্য-সবমিলিয়ে একটি সুগঠিত সুগন্ধময় বাঙালি জাতি।

বাঙালির ভাষা, শিল্প, সাহিত্য সৃষ্টির পেছনেও রয়েছে ঐ বাঙালির গতিপ্রকৃতি যেখানে রয়েছে হাজারো রকমের গোষ্ঠী এবং জাতিগত বৈচিত্র্য,কেননা মানুষের জীবন কর্ম আচার-আচরণ তার অন্তর সত্ত্বায় গভীরভাবে ছাপ রাখে। মানুষের বা জাতির মনন কাঠামো গড়ে উঠে তার জন্মসূত্রে প্রাপ্ত বৃত্তি-প্রবৃত্তি ও তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে যা গড়ে দেয় জাতির ভিত্তি।

তাই আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘বাঙালি চরিত্রে নানা বিরুদ্ধগুণের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়, ভাবপ্রবণতা, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, ভোগলিপ্সা ও বৈরাগ্য, কর্মকুণ্ঠ ও উচ্চাভিলাষ, ভীরুতা ও অদম্যতা, স্বার্থপরতা ও আদর্শবাদ, বন্ধনভীরুতা ও কাঙালপনা প্রভৃতি দাণ্ডিক গুনই বাঙালি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। বাঙালি ভাবপ্রবণ ও কল্পনাপ্রিয়। উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনাতেই তার প্রকাশ,তাই বাঙালি যখন কাঁদে তখন কেঁদে ভাসায়। আর যখন হাসে, তখন সে দাঁত বের করেই হাসে।

যখন উত্তেজিত হয়, তখন আগুন জ্বালায়। তার সবকিছুই মাত্রাতিরিক্ত। তার অনুভূতি-ফলে অভিভূতি-গভীর। কেঁদে ভাসানো, হেসে লুটানো আর আগুন জ্বালানো আছে বটে, কিন্তু কোনোটাই দীর্ঘস্থায়ী নয়-যেহেতু উচ্ছ্বাস-উত্তেজনা মাত্রেই তাৎক্ষণিক ও ক্ষণজীবী।’ বাঙালির গতিপ্রকৃতির উৎস সম্পর্কে এমনই মন্তব্য করেছেন লেখক। উপায় নেই অন্য কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করার। কারণ বাঙালি হাজার বছরের ইতিহাসে এরকমই দৃষ্টান্ত রেখেছে এদেশের ইতিহাসের আঁকাবাঁকা পথে।

লেখকের কথায়, ‘একান্ত ভাবপ্রবণ বাঙালি মুখে আদর্শবাদী ও বৈরাগ্যধর্মী প্রবৃত্তিতে সে একান্তভাবে আধ্যাত্মবাদীর ভাষায় বস্তুবাদী, গণভাষায় জীবনবাদী এবং নীতিবিদ্যার ভাষায় ভোগবাদী।’ এ জন্যই নির্বাণকামী বাঙালির আরাম বিলাসে দেবতা পূজা, দৈহিক ভোগই কাম্য এবং কর্মকুণ্ঠ মহাজ্ঞান তুক তাক, ডাকিনী-যোগিনী, সিসিম ফাঁক, পালদের আমল ও সেনদের আমলে শঙ্কারাচার্যের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রবর্তন হওয়া সত্ত্বেও বাঙালি মনে জিইয়ে রেখেছে বৈষয়িক জীবন যার অর্থই হচ্ছে ভোগ বিলাস।

এ কারণেই বাঙালি, চণ্ডী অন্নদা, দুর্গা, মনসা, শীতলা, ষষ্ঠী, শনি, লক্ষ্মী, সরস্বতী, প্রভৃতি দেব দেবীর পূজা দিয়ে জীবন জীবিকার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়। একই কারণে ইসলামোত্তর যুগে বিশেষত মুঘল আমলে বাংলাদেশে হিন্দুদের পুরানো দেবতা ও ইসলামের নির্দেশকে ছাপিয়ে উঠে সত্যপীর-সত্যনারায়ণ, বনবিবি, কালুগাজী, কালুরায়, বরখা, গাজী-দক্ষিণ, রায়, ওলাবিবি, শীতলা প্রভৃতি দিয়ে জীবিকা নির্বাহ।

লেখকের কথায়, ‘বৃহৎ ও মহতের সাধনা সাধারণ বাঙালির কোনো কালেই ছিল না। সে একান্তভাবে জীবন-সেবী ও ভোগবাদী। বাংলা ও বাঙালির যা গৌরব গর্বের অবদান, তা সবসময়ই ছিল ব্যক্তিক অবদান, সামগ্রিক জীবনে তা ক্বচিৎফলপ্রসূ হয়েছে।’

বাঙালি চিরকাল বিদেশি-শাসিত, বিজাতি-শাসিত। বাংলাদেশের যেসব ধর্ম সেগুলোও বিদেশ থেকে আগত-হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলাম বিদেশ থেকে আসা, উত্তর ভারত থেকে আসা, আরব থেকে আসা এবং হিব্রু অঞ্চল থেকে আসে খ্রিস্টান ধর্ম। আমাদের ভাষাও হচ্ছে উত্তর-ভারতীয়। আমাদের প্রশাসনও ছিল উত্তর ভারতীয়।

কাজেই বাঙালির যে গৌরব এবং গর্ব আমরা করছি, প্রাচীন এবং মধ্য যুগের বাংলা ও বাঙালির গৌরব-তার কোনোটাই বাঙালী কীর্তি বা কৃতি নয়। এইটাই হচ্ছে দুঃখের কথা। এই যে শিলালিপির বাহাদুরি আমরা করছি, বলছি যে আমাদের এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নত ছিল, আমাদের এখানে মুদ্রা পাওয়া গেছে, আমাদের এখানে সাহিত্যিক ছিলেন, পণ্ডিত ছিলেন, বহু বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, ইত্যাদি অনেক কথা বলি, কেন? যারা এদেশের অধিবাসী- সেই হাড়ি, ডোম, চন্ডাল, বাগদী, যারা শূদ্র, অস্পৃশ্য-তাদের কথা তো বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয়নি, তাদের কোনো অস্তিত্বও তো আজ পর্যন্ত স্বীকৃত হয়নি। বাঙালির ইতিহাস তাই পূর্ণ অবাঙালি বহিরাগতদের বিবরণ দিয়ে।

বিদেশি, বিভাষী, বিজাতি, বিধর্মী যারা এখানে পরাক্রান্ত হয়ে এসেছে, যারা এখানে ধর্ম নিয়ে এসেছে, তাদের রাজত্বের কথা, তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কথা-তাদের জ্ঞান গৌরবের কথা, তাদেরই প্রভাব প্রতিপত্তির কথা আমরা আমাদের বলে দাবি করে গর্বে বুক স্ফীত করছি। যেমন- একালের মুসলমানরা বই লেখে, বই থেকে মুখস্থ করে এবং মনে করে যে তুর্কী মুঘলরা তাদের সগোত্র। তারা ভাবে, ফিরোজ শাহ, শের শাহ,আকবর, আওরঙ্গজেব, সিরাজুদ্দৌলা তাদের স্বজাতি সগোত্র এবং তাদের শাসনকে নিজেদের রাজত্ব মনে করে তারা গর্বে অহংবোধ করে। এতে তারা আত্মপ্রতারণা করে, আত্মপ্রবঞ্চনা করে- মিথ্যা আস্ফালন করে।

আমরাও বাংলাদেশের ইতিহাস যখন বলি- তখন মিথ্যা গর্বে গর্বিত হতে চাই। তাতে স্বদেশের, স্বজাতির, আসল পরিচয় গোপন করে নানা কাল্পনিক কাহিনী দিয়ে মন ভরাতে চাই। কেন? আজকাল যে কথাটা স্বীকৃত হতে যাচ্ছে, অর্থাৎ আমরা যদি অস্ট্রিক-মঙ্গোলদের বংশধর হই, তাহলে সেই অস্ট্রিক -মঙ্গোলেরা চিরকাল এদেশে ছিল নির্জিত, নিপীড়িত, তাদের অধিকাংশ মানুষ এখনো নিন্মবর্ণের ও নিন্মবিত্তের -অস্পৃশ্য।তারা কখনো মানুষ হিসেবে স্বীকৃত হয়নি।

তাদের মধ্যে যারা বনে জঙ্গলে পালিয়ে গেছে তারা সাঁওতাল, গারো খাসিয়া ইত্যাদি। যারা এখানে ছিল তাদেরকে দেখছি দাস ও অস্পৃশ্য হিসেবে। এদের কিছু লোক উত্তর ভারত থেকে বিভিন্ন রকমে আসা লোকের সঙ্গে মিশে উচ্চবর্ণের হয়েছে, শাসক শোষক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।উনিশ শতকে কোনো কোনো বাঙালি যেমন স্বদেশকে ত্যাগ করেছে বিলাতকে হোম মনে করেছে এবং সাহেব ভদ্রলোক হওয়ার চেষ্টা করেছে, ওদের সমাজে ওঠার চেষ্টা করেছে,লর্ড সিন্হা পর্যন্ত হয়েছে, ঠিক তেমনি তাদের মধ্যে থেকেও যারা কিছুটা বড় হয়েছে, মাথা তুলবার চেষ্টা করেছে, তাদের কিছু কিছু শাসকশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

তারা জাত বদলিয়েছে, খানদান বদলিয়েছে। যেমন- আপনারা জানেন- নিজেরা দেখেছেন -আজকে শেখ, কালকে খন্দকার, পরশু কোরেশী, তারপরের দিন সৈয়দ ইত্যাদি ব্যাপার এখনো চলছে। আজকে দাস, কালকে চৌধুরী বা মজুমদার, তারপরে দাসগুপ্ত, সেনগুপ্ত ইত্যাদি খানদান পরিবর্তন ও জাতে ওঠার প্রবণতা আজো আছে, প্রবলভাবে আছে।

খানদান ওঠা নামার ব্যাপার চিরকাল ঘটেছে। এর সবটাই যে কৃত্রিম, অন্য রকমেও বলতে পারি।এই দেশে শতকরা পঁচানব্বই জন ছিল বৌদ্ধ। সে সময় তাদের কোনো জাতিভেদ ছিল না। তারপর আবার যখন ব্রাক্ষণ্যবাদের পুনর্জাগরণ হল, তখন সেন আমলে, নতুন করে বর্ণবিন্যাস করা হয়েছে। কাজেই আমাদের ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র পর্যন্ত সমগ্র বর্ণবিন্যাসটাই হচ্ছে কৃত্রিম। অত্যন্ত কৃত্রিম। তার প্রমাণ বল্লালচরিতে আছে, কুলজীতে আছে,তার প্রমাণ জাতিমালা -কাছারিতে আছে। কাজেই আমাদের পরিপূর্ণ পরিচয়টা জানতে হলে, বুঝতে হলে,সর্বপ্রকার সংস্কার ও সঙ্কোচ ত্যাগ করে আরম্ভ করতে হবে।

ইতিহাস চেতনা দিয়ে যদি আমরা উদ্বুদ্ধ হতে চাই তাহলে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে আমাদের। সে জন্যে আমাদের বুঝতে হবে যে, আমরা একটা নির্জিত জাতি, আমরা একটা পীড়িত জাতি। আমরা দু হাজার বছর ধরে বিজিত, আজো নিরন্ন, নিপীড়িত, নিন্মবিত্ত ও মানবিক মৌলিক অধিকার বঞ্চিত। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে -হাড়ি ডোম-মুচি মেথর বাগদীরাই আমাদের সগোত্র,স্বজাতি, আমাদের ভাই।আমাদের দেহে তাদের রক্ত ধারা বহমান। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, সাঁওতাল, কোচ, গারো, খাসিয়া, চাকমা আমাদের ভাই। আমরা যারা আমাদের গোত্র পরিচয় মুছে দিয়ে আমাদের জাতি পরিচয় লুকিয়ে বিদেশি, বিভাষী, বিজাতি শাসক শ্রেণীতে মিশে যেতে চেয়েছি,শাসকের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করেছি, আত্মপ্রবঞ্চনা করেছি -তার জন্য আমাদের দুর্দশা ভোগ করতে হয়েছে, আজো হচ্ছে।এটা আমাদের উপলব্ধি না হলে ইতিহাস চর্চা হবে অর্থহীন।

মুসলমান হয়ে যারা তুর্কী -মুঘলদের জ্ঞাতিত্বের পরিচয় দিয়ে, আরবি ইরানি পরিচয় দিয়ে, নামের সঙ্গে সৈয়দ কোরেশী ইত্যাদি লাগিয়ে জাতে ওঠার চেষ্টা করেছে তারা আমাদের বিভ্রান্ত করেছে। আমাদের সর্বনাশ করেছে।তারা নিজেরা দু’কূল হারাবার অবস্থায় পৌঁছাবে। কারণ মিথ্যা কুল পরিচয়ে, নিজের বাপ ভাইয়ের পরিচয়কে মুছে ফেলে মিথ্যা খানদান পরিচয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ানো যায় না।

লেখক : মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, লেখক ও কলামিস্ট।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড