• বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

নগরপিতা চাইলেই সম্ভব নিরাপদ বসতি, নিরাপদ নগর

  কবীর আলমগীর

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:০৫
প্রাচীন গ্রিস

খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে প্রাচীন গ্রিসে নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটে। গ্রিক রাষ্ট্রদর্শনের মূল ভিত্তি ছিল নগর ব্যবস্থাপনা। গ্রিসের সেই নগর ব্যবস্থাপনার সূত্র ধরে আজকের দিনে আধুনিক নগর ব্যবস্থার চিন্তা-ভাবনা বিকশিত হতে শুরু করেছে বা হচ্ছে। এ কথাও যে সত্য মানুষ যত সভ্য হচ্ছে নগর ততই বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে। তাই পুঁজি বিকাশের চূড়ান্ত এই সময়ে নগরছাড়া ভাবা যায় না।

নগর সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ একটি আধুনিক নগরের কথা চিন্তা-ভাবনা করেছে। প্রায় ছয় হাজার বছর আগে যখন মেসোপেটোমিয়ার টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর অববাহিকায় ব্যবিলন, উর ইত্যাদি প্রাচীন শহরগুলোর পত্তন হয় বা তার পরে নীল অববাহিকায় কাহুন অথবা সিন্ধু অববাহিকায় হরপ্পা-মহেঞ্জেদারো ইত্যাদি শহর গড়ে ওঠে তার অনেকগুলোই গড়ে উঠেছিল এক একটি আদর্শ রূপকল্পকে ভিত্তি করে। একটি আদর্শ রাষ্ট্র বা দেশ গঠনে পরিকল্পিত নগরায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একবিংশ শতাব্দীতে উন্নত নগরায়ন মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে। জীবনযাত্রার অনিবার্য প্রয়োজনে মানুষ এখন নগরমুখী। সে কারণেই নগরায়নকে পরিবেশবান্ধব, স্বাস্থ্যকর ও সুষম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বলা যায়, নগরজীবনকে স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও উন্নয়নমুখি করা এখন সময়ের দাবি।

মানুষের সঙ্গে নগরের সম্পর্ক এখন অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলেই ভাবতে হচ্ছে নগর ব্যবস্থাপনার নানা দিক নিয়েও। আর নগরপিতা চাইলেই সম্ভব। পত্র-পত্রিকায় একাধিক খবর চোখে পড়েছে; রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন এরইমধ্যে চমক দেখিয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত নগর রাজশাহীকে আমূল পরিবর্তন করেছেন তিনি। যানজট কমেছে, নগরের শ্রী ফিরেছে। সবুজের হাতছানি বিভিন্ন জায়গায়, অবহেলিত পদ্মাপাড় এখন নানন্দিক সৌন্দর্য দেখানো শুরু করেছে। রাজশাহীর এই উদাহরণ সামনে নিয়ে চোখ রাখা যেতে পারে রাজধানী ঢাকার দিকেও। ঢাকার দুই মেয়র নগরব্যবস্থাপনার নানা বিষয়ে গুরুত্ব দিলেও তার সুফল জনসাধারণ খুব বেশি পায় বলে মনে হয় না।

মোট কথা আমাদের পরিকল্পিত নগরায়ন খুবই জরুরি। কেননা বসবাসকারীদের জন্য এক অভিশাপ এবং অভিভাবকহীন ঢাকা শহর । সম্ভবত ঢাকা হচ্ছে পৃথিবীতে সবচেয়ে বসবাসের অনুপযোগী শহর অর্থাৎ নিকৃষ্ট শহর । ঢাকা বসবাসের উপযোগী করতে সরকারের তেমন কোনো তদারকি নেই, ঢাকায় যতটুক পরিকল্পনামাফিক হয় তা বেসরকারিভাবে।

দেশের নগরাঞ্চলের বহুমুখি সংকট উত্তরণে জাতীয় পর্যায়ে একটি ভৌত পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে কোথায় শহর ও শিল্পাঞ্চল হবে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দিতে হবে। কৃষিজমি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই সংক্রান্ত বর্তমান বিশৃঙ্খলা যতটা সম্ভব দূর করে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে। তবে এই পরিকল্পনার আগে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকা দরকার।

ঢাকা শহরটি গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে। পুরোনো ঢাকার ঘিঞ্জিময় এলাকায গেলেই বোঝা যায় নগর ব্যবস্থাপনা কতটা অপরিকল্পিত। পুরোনো ঢাকায় কোনো ফাঁকা জায়গা নেই। রাস্তাগুলোও বেশ সরু। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে যাওয়ার পথটুকু দুজন মানুষের চলার মতো নয়।

একই ভাবে গড়ে উঠছে নতুন ঢাকায়। বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্র কোনো রকম পরিকল্পনা নেই। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার এখনও সময় আছে। রাষ্ট্র, দেশপ্রেমিক জনতা ও শিক্ষিত সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবেশবান্ধব নগরায়ন, শিল্পায়ন, পাশাপাশি যানবাহন ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পরিবেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। শহরের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে হবে গ্রামের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে। ফসলি জমির সুষম ব্যবহার, পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়ের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে উন্নয়নভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, নগরীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ডিএনসিসি’র অধীনে দেওয়া উচিত। তাহলেই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগরীর যানজট সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে। তার অভিমত হলো-রাস্তা সিটি কর্পোরেশনের, কিন্তু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অন্য ডিপার্টমেন্টের। এই কারণেই কোথাও নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ডিজিটাইজেশন করতে হবে। হাতের ইশারায় ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে বেরিয়ে এসে লাইটিং এর মাধ্যমে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ করতে হবে।

হকারদের পুনর্বাসনকল্পে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। শহরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে যেসব হকাররা রয়েছে, তাদের সঠিক তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে এরই মধ্যে যেসব সরকারি জমি উদ্ধার করা হয়েছে- সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী হকার মার্কেট করা যেতে পারে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা মাফিক এ হকার মার্কেটগুলো করা যেতে পারে। এতে করে একদিকে হকাররা পুনর্বাসিত হবে, অপরদিকে যানজট নিরসন ও পথচারী চলাচল নির্বিঘ্ন হবে।

বড় বড় শহরে যে সমস্যাটি লক্ষ্য করা যায়, সেটি হচ্ছে- ট্রাফিকিং ও দুর্নীতির কারণে সমস্যাটি প্রকট আকারে দেখা দিয়েছে। অনেক শহরে ট্রাফিকিং সিগন্যাল লাইট থাকলেও তার তোয়াক্কা কেউ করে না, আবার কোনো কোনো স্থানে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে- ফলে সৃষ্টি হয় যানজট ও দুর্ঘটনা। এগুলোকে সংস্কার ও মেরামত করা প্রয়োজন। এ সমস্যা সমাধানে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ কাজে ট্রাফিক পুলিশকে সততা, আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিতে হবে।

আর একটি বিষয় লক্ষণীয় সেটি হচ্ছে- সড়কবাতি থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকে। আবার এমনও দেখা যায়, দিনের আলোতেও সড়কবাতিগুলো নেভানো হয় না- এ ধরনের অব্যবস্থা নিরসন করা প্রয়োজন।

নগরায়ণের অন্যতম যে বিষয়টি জরুরি সেটি হচ্ছে- নাগরিকদের রিক্রিয়েশনের ব্যবস্থা করা। নগরের সৌন্দর্য রক্ষা সময়ের প্রয়োজনে বৃদ্ধি এবং পরিচর্যার জন্য সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা হাতে নেওয়া প্রয়োজন। শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষাকল্পে উদ্যান, তোরণ, মন্যুমেন্টস, ফুল ও ফলদ গাছ লাগানো এবং এগুলো পরিচর্যার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন। যেখানে-সেখানে পোস্টার ও দেওয়াল লিখন শহরের সৌন্দর্যকে বিনষ্ট করে। এসব কুরুচিপূর্ণ কাজ আইন প্রণয়ন করে কঠোরহস্তে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। সরকারি-আধাসরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনগুলো সৌন্দর্য রক্ষার তাগিদ নির্দিষ্ট মেয়াদে রং ও সংস্কারের একটি বিধিবিধান প্রণয়ন করা উচিত। এটি একদিকে যেমন শহরের সৌন্দর্যকে রক্ষা করা যাবে, অপরদিকে সংস্কারের ফলে ভবনগুলোর স্থায়িত্বও বৃদ্ধি পাবে।

ঢাকা দক্ষিণে ধীরে ধীরে আশাবাদ জাগাচ্ছে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটিতে বেশকিছু চমকপ্রদ উদ্যোগ শুরু করেছিলেন মেয়র আনিসুল হক। কিন্তু স্বপ্নগুলো শেষ করতে পারেননি তার অকাল মৃত্যু হওয়ায়, ওই জায়গায় হাল ধরেছেন মেয়র আতিকুল ইসলাম। হয়ত আতিকুল ইসলামও একসময় থাকবেন না। কিন্তু কাউকে না কাউকে সেই দায়িত্ব নিতেই হবে। নগর উন্নয়নের সবগুলো এজেন্ডা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে আছেন তরুণ সমাজকর্মী আদম তমিজী হক। তিনি নগরবাসীর সেবা করতে চান। হতে চান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কাণ্ডারি। একজন নগরপিতার যতগুলো গুণ থাকা দরকার তার সবগুলোই নিহিত আছে আদমের মধ্যে। তার মানবিক বাংলাদেশ সোসাইটি কাজ করছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার কন্য শেখ হাসিনার সারথি হয়ে। তিনি যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে চান। আশা করি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের মতোই আদম তমিজী হক হতে পারেন অনন্য নগরসেবক। কারণ যোগ্য নগরপিতা চাইলে আমরা নিরাপদ বসতি পাবো, নিরাপদ নগর পাবো। সর্বোপরী নিরাপদ জীবন পাব।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড