• সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জনগণতান্ত্রিক মতবাদ হিসেবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা

  মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩:৩৭
জনগণতান্ত্রিক

যে কোন দার্শনিক অবস্থানকে আমরা কিভাবে দেখবো?এবং নির্ভরযোগ্য সীমানা কতটুকু? কিভাবে তা নির্ধারণ করবো? একটি দার্শনিক চিন্তনগত অবস্থান দেখার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সীমানা বা ক্ষেত্র হচ্ছে মানবগোষ্ঠী-প্রাণ প্রকৃতির স্বার্থ সংরক্ষণের সীমানা বা ক্ষেত্র। যেটা দিয়ে ঐ দর্শনটির কার্যকারীতা কতটুকু তা,পরিমাপ করার বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি। যে কোনো মতবাদ গ্রহণ এবং পর্যালোচনা করার প্রথম শর্তই হচ্ছে মনটাকে এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ- পরিস্থিতিটাকে একটা ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশের আন্তঃসম্পর্কের বিকাশের উপর আলো ফেলে দেখা।

আমাদের দেশে বেশীরভাগ কমিউনিস্ট পার্টিতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার একটা জোরালো সুর বা বুলি আওড়ানো রয়েছে। এই দলগুলোর ভিতরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার উছিলায় অনেক ঘটনা এবং পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে।যদিও আমরা আলোচনা করতে পারছি দলগুলোর অস্তিত্ব এখনো টিকে আছে বলে। এটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যও বটে। আমরা অনেকেই আমাদের জীবন যৌবনের ঠিকানা এই মতাদর্শের নিশানায় গেঁথে ছিলাম।তাই গুচ্ছ ঘটনাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার তাগিদ থেকে বরং বিরত থেকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাই আলোচনা করা দরকার। কারণ; মহামতি লেনিনের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় আদতে কি কি আছে, আর আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে কি কি থাকা দরকার ছিলো তার একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা না থাকলে আমাদের এখানে আবারও সেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা নামক একটা মহড়া গলায় কাঁটা বিঁধল বলে থেকে যাবে।

"গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা"র মূল প্রবক্তা কমরেড লেনিন।কমরেড লেনিন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার দার্শনিক ভিত্তি স্থপতি একটি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রুশ বিপ্লবের মতো 'দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন'সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেছিলেন। আর আজকে যারা উত্তর-আধুনিকতার উপর বড় বড় বক্তৃতাবাজী করছেন তাদের সামনে দুনিয়াটা মনে হয় একটা খেলনার পুতুল। যখন ইচ্ছে খেললাম, ইচ্ছে হলো না,খেলা ছেড়ে দিলাম।আর এই দিকে দুনিয়া জুড়েই যেন কেন্দ্রিকতার একটা ভাঙা গড়া চলছে। যেমন;বুর্জোয়াদের একটি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা রয়েছে।বুর্জোয়ারা এই পথটা তৈরি করেছে দুনিয়ার সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ মানব সম্পদ এমনকি মানুষের সবচেয়ে সংবেদনশীল উপাদান দিয়ে। সেটা শিল্প হোক আর সাহিত্য হোক,অর্থনীতি হোক রাজনীতিই হোক এমনকি একটি প্রশাসনিক কাঠামোই হোক!সবই তারা স্তরে স্তরে একই রকমভাবে থরে থরে একই ধাঁচে,একই বক্তব্যে তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে সুনিপুণ করে সাজাচ্ছে।পাকাপোক্ত বৈষম্য রাখছে আর বৈচিত্র্য থাকছে শুধু গুণগত মানে। কিন্তু আসল বৈচিত্র্যের বিলোপ সাধন যেন বুর্জোয়াদের একটি প্রকল্প বলা চলে। কারণ; পুঁজিবাদ এবং সাম্রজ্যবাদ মোটা দাগে যে সকল বিষয় ক্যাপিটালাইজেশন করে বিশেষ করে রাষ্ট্রে বা সমাজে যার বেশিরভাগটাই বিভক্তি এবং দূরত্ব টিকিয়ে রাখতে পারার শক্তি প্রদর্শনে। বাজার নির্ভর যুক্তিশাস্ত্র যেন সকলকে এক ভয়ংকর স্টিমরোলারে ঢুকিয়ে রক্ত মাংস শোষণ করছে।এই নিখাঁদ পুঁজিতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এটি একটি এককেন্দ্রিকতার মডেল বলা চলে। পুঁজিতান্ত্রিক এই বৈষম্যের দুনিয়ায় মানুষের চিন্তার উপাদান বিভিন্ন ধাঁচের তা ঠিক কিন্তু শোষণের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আলাদা রাখতে পারছে না। ফলে শোষিত মানুষের বিভিন্ন স্তরের বৈচিত্র্যের সমাহার মিশ্রিত শ্রেণী বিন্যাস একটা সূত্র এসে মিলিত হতে পারে! তা কেবল মৌলিক এবং আবশ্যিক গণতান্ত্রিক মানবিক অধিকারের প্রশ্নে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন একদম মাটি ঘেঁষা প্রশ্ন।

এখানে যোগসূত্র দ্রুত হয়। এই প্রশ্নের সমাধান করার জন্য প্রয়োজন একটি সম্মিলিত অধিকার বোধ ও উপলব্ধি।কিন্তু চিন্তার উপাদান ভিন্নতা স্বীকার করে কেন্দ্রিকতা গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই মাটিচাপা দিতে হবে ব্যক্তিসম্পত্তিজাত মানসিকতা।এক কথায় গড়ে তুলতে হয় নিঃস্বার্থ মনোভঙ্গি।অর্থাৎ কেন্দ্রিকতার ধরনটাই পাল্টাতে হয় বিকেন্দ্রীকরণ উপাদান দিয়ে।বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া পদ্ধতির অভ্যন্তরে নিহিত আছে অসংখ্য সামাজিক গোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ ও অর্থনৈতিক অধিকার ও শ্রেণীবোধ। জনগণের সরাসরি দার্শনিক চিন্তনগত ভিত্তিটাই দাঁড়িয়ে আছে জনগণের বিচিত্র জীবনবোধের উপর।এই জীবনবোধের গভীরতা আছে বলেই এক একটি কমিউনিস্ট পার্টি কেন্দ্রিকতার কথা চিন্তা করতে পারে।এর আগে নয়।

জনগণের মত অভিমত এবং নিচুতলার কমরেডদের লড়াই সংগ্রামের পথে বাঁধ ভাঙা জোয়ার, তাদের যুক্তি আবেগ উচ্ছাস এবং বিদ্যুৎ গতির মতো পদচারণাকে উপেক্ষা করে কিভাবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীতা গড়ে উঠে? সেই আলাপ নেই বলেই প্রতিটি বাম প্রগতিশীল দল ও সংগঠন একটি আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠী বা দলে পরিনত হয়েছে যেখানে গাঢ় নীল হতাশা তাদেরকে চারদেয়ালে বন্দি করে রেখেছে।এই হতাশার দায় আমাদেরও রয়েছে।

শ্রমিকশ্রেণীর পক্ষাবলম্বনকারী পার্টি হতে হলে প্রথমেই যেটা সবচেয়ে জরুরি কথা তা হলো;সমগ্র জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, জনমানসের মনন ও চিন্তনের সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক রূপে সমাজের সমগ্র স্বার্থের অভিন্ন অভিব্যক্তি-তে আঁকা একটি সামষ্টিক চিত্রকল্প, আধুনিক যুথবদ্ধ কর্মকাণ্ড,এবং অভ্যন্তরীণ সংহতি তৈরির মতাদর্শগত সংগ্রাম চালাতে হয়।শ্রমিক শ্রেণীর শুধু অর্থনৈতিক দাবি দাওয়াই নয়,পাশাপাশি শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব শ্রেণী স্বার্থের দেয়ালকে অতিক্রম করে সমগ্র মানব সমাজ ও মানবগোষ্ঠী, প্রাণ-প্রকৃতির সার্বিক স্বার্থে সচল থাকতে হয়।যদিও এই বক্তব্য একমাত্র কমিউনিস্ট সোসাইটিতেই সম্ভব তারপরও এই মডেল বুর্জোয়াদের সামনে হাজির করতে হবে।এরকম পার্টি হলে সেই পার্টির নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ববীক্ষা অর্জনে সহজতর হয়ে উঠে।যেটা মার্ক্স অন্যভাবে বলেছেন ; "প্রয়োজনীয়তা হল অন্ধ যতক্ষণ না এটি সচেতন হয়। স্বাধীনতা হল প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতনতা।"গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মূল কথা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মূল-শেঁকড়বাকড় থেকে শুরু করে সমগ্র শাখা-প্রশাখা উৎখাত করা। কিন্তু গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা যখন একটি পার্টি অভ্যন্তরে অনুপস্থিত রয়ে যায় তখন বাহির থেকে লাল পতাকার পার্টি মনে হলেও, ভিতরে ভিতরে বুরোক্র্যাটিক স্টেটের বৈশিষ্ট্যের সকল উপাদান নিয়ে ছোট্ট পরিসরে গতানুগতিক ধারায় একটি দলও ছোটখাটো বুরোক্র্যাটিক স্টেটের মতো মডেল হয়ে উঠতে পারে। এমনকি তারা আদতে নিজেদেরকে সমাজতন্ত্রের ঝান্ডাধারী বললেও একটা সমাজতান্ত্রিক দলের অভ্যন্তরেও কার্যত আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় পর্যবসিত হয়।

কিন্তু বেশিরভাগ কমিউনিস্ট পার্টি এবং সমাজতান্ত্রিক দল তাদের প্রথম যাত্রাপথে মৌলিক গঠনতন্ত্রে "গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা"র উপর চরম জোর দিয়ে থাকেন এবং সাংগঠনিক ইশতেহারও ঘোষণাও করে থাকেন। অর্থাৎ আমাদের দেশে এমনও হয়; উনিশ শতকের গোড়ার দিকে মার্ক্সবাদের প্রচলিত ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত পোষণ করে লেনিন যে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার কথা বলেছিলেন তা অনুকরণ করে শুধুমাত্র নিজের দেশের ভাষা দিয়ে হুবহু করে বলে যান।কিন্তু তারা খেয়াল রাখেন কিনা জানি না, লেনিন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার তাৎপর্য এবং সংজ্ঞা সময় সময় পাল্টিয়েছেন,সংহত করেছেন, এবং প্রয়োজনে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার তাৎপর্য ও মর্মকে ক্যাটাগরাইজ করেছেন।একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হতে পারে; লেনিন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে "আলোচনার স্বাধীনতা, এবং কর্মের ঐক্য" এর সমন্বয় সাধনের কথা প্রথমত এবং প্রাথমিকভাবে বর্ণনা করেছেন।এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মতবাদের কারণে বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের মধ্যে বিভক্তির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছিল।যেটাকে আমরা বলি লেনিন সংশোধনবাদের হাত থেকে মার্ক্সবাদের সৃজনশীল তত্ত্ব ও পার্টিকে রক্ষা করেছেন।এই বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়;গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা হল এমন একটি অনুশীলন যেখানে ভোটের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি রাজনৈতিক দলের সকল সদস্যের উপর বাধ্যতামূলক। এটি মূলত লেনিনবাদের সাথে যুক্ত, যেখানে পেশাদার বিপ্লবী এবং পার্টির রাজনৈতিক অগ্রগামী নেতা ও কর্মকর্তাদের নির্বাচন করার জন্য গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা তৃণমূলের নেতৃত্ব অনুশীলন করে।মুক্ত স্বাধীন আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণ করে এবং ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের মাধ্যমে সিদ্ধান্তগুলো তারা এটি উপলব্ধিতে নিয়ে আসে । এবং দলের সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন এমনকি গণতান্ত্রিক দলগুলোও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুশীলন করবে।"

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বাস্তবে বাস্তবায়িত হয়েছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে মূলত ৯০ দশকে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর থেকে।কারণ সমাজতন্ত্র বিপর্যয়ের সাথে সাথে ঐ সমস্ত রাষ্ট্রের নেতৃত্বের মধ্যে হিংসাত্মক ক্ষমতার লড়াই, আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক দলের কৌশল,সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র,ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বৈর পরিবেশ এবং সেই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র শাসনগুলিতে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তির রাজনীতির প্রসার ও প্রচারই ইঙ্গিত করে। গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা লেনিনের " কি করিতে হইবে -১৯০২" সালের পর থেকে একটি জনপ্রিয় বক্তব্য হিসেবে ধরা হয়।যেখানে লেনিন তার পার্টিতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা প্রয়োগ করেছিলেন। লেনিন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে সাধারণত বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর একটি সংগঠিত নীতি হিসেবে দেখতেন।

ভ্লাদিমির লেনিন এই জাতীয় পার্টির মডেলটি আনতে পেরেছিলেন কারণ তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিলো জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি,ফ্রান্স বিপ্লবের প্যারি-কমিউনিয়ন দুনিয়া কাঁপানো শ্রমিক বিপ্লব সত্ত্বেও কেন একটি শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারলো না? তার অন্তর্নিহিত কারণ উদ্ঘাটনে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে লেনিন এই থিসিসটি এনেছিলেন।লেনিন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা-কে মূলত দেখেছেন; শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠিত শক্তিশালী গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চয়তার দৃষ্টিকোণ থেকে।তাই তিনি বারবার আলোচনা করেছেন "আলোচনা-সমালোচনার,ব্যক্তি মতের স্বাধীনতার, কর্মের ঐক্য" এবং এর সমন্বয়ের কথা বর্ণনা করেছেন।লেনিনের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার মতবাদ বলশেভিক এবং মেনশেভিকদের মধ্যে ফাটল ধরার অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করলেও মেনশেভিকরা ১৯০৩ সালে রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির মধ্যে একটি ঢিলেঢালা পার্টির শৃঙ্খলা তৈরির পথ সমর্থন করেছিল যেটা প্রকাশ পেয়েছিল লিওন ট্রটস্কির মাধ্যমে।কিন্তু গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার পরিধি কতটুকু মাত্রায় দলকেন্দ্রিক আর কতটুকু মাত্রায় জনগণতান্ত্রিক তার একটি যুতসই উদাহরণ হচ্ছে ট্রটস্কি ১৯১৭ সালে বলশেভিকদের বিপ্লবে পিছুপা হননি।বিপ্লবের সাথে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত ছিলো।

রাশিয়ান সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির (বলশেভিক) ষষ্ঠ পার্টি কংগ্রেস ১৯১৭ সালের ২৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্টের মধ্যে পেট্রোগ্রাদে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল,"প্রথমত; পার্টির সমস্ত নেতৃত্বদানকার সংস্থা নিচ থেকে উপরে নির্বাচিত হবে,দ্বিতীয়ত; পার্টি নেতৃত্বস্থানীয়রা তাদের নিজ নিজ ক্রিয়া কর্ম এবং সিদ্ধান্ত পার্টি সংগঠনকে তাদের কার্যকলাপের সাময়িক হিসাব দেবে।কঠোর দলীয় নিয়ম শৃঙ্খলা থাকবে এবং সংখ্যালঘুদের মতামত সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত অধীনতায় থাকবে।অর্থাৎ সংখ্যা গরিষ্ঠের মতামত প্রাধান্য দেওয়া হবে।তৃতীয়ত;উচ্চতর পার্টি সংস্থাগুলির সমস্ত সিদ্ধান্ত নিম্নতর সংস্থা এবং সমস্ত পার্টি সদস্যদের উপর সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক হবে।" পার্টি শৃঙ্খলার নামে পার্টির অভ্যন্তরে গণ-উদ্যোগ,গণতন্ত্র বা ভিন্নমত পোষকারীর অধিকার প্রয়োজনে খর্ব করার নেতৃত্বের একচ্ছত্র থাকবে এমন বক্তব্য লেনিন কোথাও দেননি।বরং লেনিন মনে করতেন গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা যদি সত্যিকার অর্থেই প্রতিষ্ঠিত হয় তখন কমিউনিস্ট পার্টি জন্ম দেয় এক বিশ্ববীক্ষা। আর যদি গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নামে দল ও সংগঠন মূলত আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় পর্যবসিত হয় তখন দলের অভ্যন্তরে গড়ে উঠে ক্ষমতা লিপ্সা,গোষ্ঠীদ্বন্ধ ও স্থবিরতা।

লেনিনের জীবদ্দশাতেই বহুভাবে লেনিন সতর্কবানী দিয়েছিলেন।সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে যদিও রুশ বিপ্লবের কিছুূূদিন পরেই গণতন্ত্রকে নিরুৎসাহিত করে শুধুমাত্র পার্টির কেন্দ্রিকতাকে উৎসাহিত করতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছিল বলশেভিক পার্টি। লেনিনের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা ছিলো গণতন্ত্রকে সমুন্নত রেখে।মহামতি স্ট্যালিনও সেই পথে হেঁটেছিলেন ঠিক কিন্তু কিছুদূর চলার পর আখেরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা টিকিয়ে রাখতে পারেননি।বরং বিশ্ব রাজনীতি ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাতাবরণে আর বলশেভিকদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে তৃণমূল গণতন্ত্রকে সোভিয়েত গুলোকে ক্রমশ নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার মারাত্মক প্রবনতা পরিলক্ষিত হয়েছিল। লেনিনের রাজনৈতিক চিন্তায় গণতান্ত্রিক উপাদান যেখানে যেখানে উপেক্ষিত হয়েছে সেখানেই সমাজতান্ত্রিক দল সংগঠনের অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল। তাই লেনিন জীবনের শেষ বছরগুলোতে ভবিষ্যতের ভয়ংকর পরিনতির বিষয়টা বরাবরের মতো সতর্কবানী উল্লেখ করেছিলেন, বলেছিলেন;"আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা যেন পার্টির অভ্যন্তরে গড়ে না উঠে তার জন্য ১)প্রয়োজন যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে সোভিয়েতগুলোকে তাদের কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেওয়া,২)পার্টির কাজ কর্ম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য শ্রমিকদের দিয়ে একটি তদারকি সংস্থা গড়ে তোলা,৩)কেন্দ্রীয় কমিটির আয়তন বৃদ্ধি করা যেন যথাসম্ভব ব্যাপকভাবে পার্টিনেতৃত্ব সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিত্ব করে,৪)পার্টির অভ্যন্তরে মত বিনিময় এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য বুলেটিন প্রকাশ করা"

বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভুত্বকে উৎখাত করার প্রয়োজনে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রণয়নে যে কেন্দ্রিকতার প্রয়োজন ঠিক একই কায়দায় পার্টিকেন্দ্রিকতা যদি দলের অভ্যন্তরে গড়ে উঠে তাতে বিপত্তি তৈরি হয় দুই দিক থেকে;প্রথমটি মনে করা হয়; পার্টি সিদ্ধান্ত অভ্রান্ত,দ্বিতীয়টি মনে করা হয়; পার্টি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এই এই দু'টি উপাদানই আমলাতন্ত্রের জন্য যথেষ্ট। এরকম করেই জনগণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকে উপড়ে ফেলে স্থাপিত হয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা,যেখানে দল একটি আমলা নির্ভর গোষ্ঠীতে পরিনত হয়।বিপরীতে তৈরি হয় জনগণের সাথে বিচ্ছিন্নতা।যেখানে বিপন্ন করে তোলে সমাজতন্ত্রের গতিমুখকে।রুশ বিপ্লবের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়,১৯০২ সালে লেনিন কি করিতে হইবে"বইতে তিনি একটি আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর পার্টির বিপ্লবের সংগঠনের এবং শ্রমিক শ্রেণীর সাথে গড়ে উঠা একটি বিপ্লবী পার্টির কথাই সুপারিশ করেন।যেখানে জার শাসনকে উৎখাত করার পরিকল্পনা ছিলো মূখ্য।১৯০২সালে লেনিন যেই ধাঁচের কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব করেছিলেন যা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা হিসেবে পার্টির কার্যক্রম ছিলো তা ছিলো অগণতান্ত্রিক জার শাসিত একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশকে উৎখাত করার মহাযুদ্ধ পরিচালনা কারী নেতৃত্বকে বিকশিত করার তাগিদ থেকে।

যেটাকে লেনিন বলেছেন;"সর্বহারা গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকতার মিশ্রনের মধ্য দিয়ে দলের অভ্যম্তরে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীয়করনের নীতি চালু করা সম্ভব।" পরিবেশ ছিলো গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা গড়ে তোলবার উপযুক্ত পরিবেশ ও বিপ্লবী দল গড়ে তোলবার আহ্বান। কিন্তু লেনিন ১৯১৭সালের রুশ বিপ্লবের পর পরই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন তৃণমূল স্তরে জনগণের নিজস্ব সংগঠনকে। কারণ; তখন প্রতিবিপ্লবী শক্তি যেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছিলো তখন দলের অভ্যন্তরে মতাদর্শগত সংহতি বৃদ্ধির প্রয়োজনেই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। রুশ বিপ্লব পরবর্তী ১৯২১ সালে রুশ কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেসে লেনিন পার্টির অভ্যন্তরে ভিন্নমত পোষন কারী এবং গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব প্রতিহত করতে ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করেন যা বিশ্বের দেশে দেশে এখনো অনুকরণ করে চলছে। এখনো অনুকরণ করে চলছে অনেক দেশের সমাজতান্ত্রিক দল ও কমিউনিস্ট নামধারী দল,ও সংগঠন।

কিন্তু লেনিনের প্রতিটি পদক্ষেপ এবং প্রস্তাব ছিলো ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিকে ঘিরে।আর আমরা একশত বছর আগের গৃহীত প্রস্তাব হুবহু নকল করছি ঠিক, কিন্তু বিশ্ব পরিবেশ ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের গতিবিধি -পরিস্থিতিতে আগের মতো নেই। কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলবার নামে আমরা কি গড়ে তুলছি এই প্রশ্ন এখন সবাইকে ভাবাচ্ছে।লেনিন-স্ট্যালিন পরবর্তী গোটা বিশ্ব নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।যেখানে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ ঔপনিবেশবাদ আরো সংহত। এই রকম একটি জাতীয় আন্তর্জাতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণীর কাজ হচ্ছে একটি রাজনৈতিক দল এবং সামষ্টিক-সংগঠন গড়ে তোলা যেখানে প্রধান দায়িত্ব থাকে একটি শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।তার জন্য প্রয়োজন প্রতিনিয়ত একটি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ পরিস্থিতি গড়ে তোলার সংগ্রাম। আন্দোলিত পরিস্থিতিকে সংগঠিত করে তার একটি রাজনৈতিক পরিভাষা সৃষ্টি করা। যে রাজনৈতিক পরিভাষা শ্রেণী বৈষম্যের অবসানে মূখ্য ভূমিকা রাখবে।

সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পার্টির শুধু আধিপত্য বিস্তার করতে পারে যেখানে বৃদ্ধি পায় সংকীর্ণতাবাদ। আমলাতান্ত্রিক প্রবনতা হলো এমন এক অত্যন্ত বিপজ্জনক গোঁড়া রক্ষণশীল শক্তি, এটি যদি সুসংবদ্ধ কাঠামোয় পরিনত হয় এবং অগণিত সাধারণ সদস্যদের থেকে নিজেকে স্বাধীন বলে ভাবতে থাকে,তাহলে পার্টি পর্যবসিত হয় একটি কাল বা যুগের অনুপযুক্ত পার্টি ধারনায় এবং চূড়ান্ত সংকটের মুহূর্তে তার সামাজিক ভীত্তিও নড়বড় হয়ে পড়ে।নিচুস্তরে দলের উদ্যোগ ও দায়িত্বের অভাবের জন্য আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠে। যেটাকে মার্ক্সবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি বলেছেন;"ঐক্য-কে আপাতদৃষ্টিতে শান্ত ও স্তব্ধ বদ্ধ জলাশয়-এর ঐক্য মনে হবে।" আমলাতান্ত্রিক নেতৃত্ব হচ্ছে এমনি এক নেতৃত্ব যা অনেকটা বিমূর্ত নেতৃত্ব যেখানে বৈজ্ঞানিক এবং তাত্ত্বিক সূত্রাবলি-কে যান্ত্রিকভাবে চর্বিতচর্বন করার পাশাপাশি রাজনৈতিক বাস্তব পরিবেশ পরিস্থিতিকে কিভাবে কর্মে রূপান্তর করবে তার যুক্তিসঙ্গত অনুসন্ধানে গুলিয়ে ফেলে।অতএব; সমাজিক ও রাজনৈতিক ঐতিহাসিক বাস্তবতার যে সৃজনশীল তত্ত্ব ও সংগঠন নির্মাণের পাশাপাশি জাতীয় এবং বিশ্ব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের অন্তর্নিহিত মূল সূর ও ঐক্য সংহতি। যেখানে মার্ক্সবাদ হবে নবীন বৈজ্ঞানিক নৈর্ব্যত্তিক কর্ম।যে কোন স্বাভাবিক অবস্থার অভ্যন্তরীণ জটিল বিন্যাসের অস্থিতিশীল পরিবেশ- পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে হলে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ জরুরি আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ।এর বাইরে আপনি কাজের উদ্দীপনা পাবেন না। তাই মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ প্রতিনিয়তই আমাদের পুনরায় মূল্যায়ন করতে হয়।

লেখক: লেখক ও কলামিস্ট (মতামত পাতায় প্রকাশিত লেখা লেখকের একান্ত মত। এর সঙ্গে পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড