• সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

সমাজের প্রচলিত কু-প্রথার আড়ালে হরণ হচ্ছে মানবতা!

  শিব্বির আহমদ রানা

১২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:৫৭
সমাজের প্রচলিত কু-প্রথার আড়ালে হরণ হচ্ছে মানবতা!
শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী শিব্বির আহমদ রানা (ছবি : সংগৃহীত)

একটা সমাজ, একটা দেশ, একটি জাতি তখনই বৈষম্যের শিকার হয়, যখন সমাজে বৈষম্যমূলক কুপ্রথাগুলো জায়গা করে নেয়। প্রতিটি কুপ্রথা মানবতা হরণের জন্য, মনুষ্যত্ব বিকিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। নারী নেতৃত্বের দেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত যৌতুকপ্রথা বাঙ্গালী নারীদের জন্য শুধু বৈষম্যমূলক আচরণই নয়, বরং নারী অধিকার হরণের নীরব ঘাতক ভাইরাসও বটে। যৌতুকের বলি হচ্ছে শতশত সংসার। নারীর রঙ্গিন শাড়ি পড়ে শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার মাস না হতেই ভোগ করতে হয় যৌতুকের যন্ত্রণা।

যৌতুককে কেন্দ্র করে ফাঁসি খাওয়া থেকে বিষ খাওয়ার মতো অনেক সিদ্ধান্তে কুপোকাত হচ্ছে কতো নারীর সংসার। যৌতুক নিঃসন্দেহ সামাজিক ব্যাধি। সরকারের সচেতনতায় কিংবা আইন প্রয়োগে কখনো যৌতুক দূর হবেনা, যদি না আমরা সচেতন না হই। আমাদের সমাজে যৌতুকের মতো নানা কুপ্রথা জায়গা করে নিয়েছে, যার দরুন সমাজের মানুষ দিন দিন মানবতা, মনুষ্যত্ব, স্বকীয়তা সব হারাচ্ছে। বৈষম্যবিহীন সমাজ বিনির্মাণে আমাদের নতুন প্রজন্মকে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ এসব কু-প্রথা সবার জন্য কৃত্রিম সমস্যা ও সংকট সৃষ্টি করে।

যেভাবে সামাজিক অসংগতি গুলো দূর করতে হবে: হ্যাঁ, আমাদের সংকট, আমাদের সমস্যা আমাদেরই দূর করতে হবে। এখানে আইন প্রয়োগের চেয়ে নিজের নিজেকেই পরিবর্তন করতে হবে। প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করুন। পরিবর্তন আসবে, সময় লাগবে।

যেমন, আপনাকে বিয়ের দাওয়াত দিতে এলো আপনার কোন বন্ধু কিংবা আত্মীয় স্বজন। এবার তাহার থেকে জেনে নিন- শ্বশুরবাড়ি থেকে মোটর সাইকেল দিচ্ছে কিনা (মূলত নিচ্ছে), টিভি-ফ্রিজ, ফার্নিচারসহ, বিয়ে-ভাতের লস্কর খাওয়াচ্ছে কি-না (মূলত দাবি)। যদি এর সবকটির একটিও শ্বশুরবাড়ি থেকে দাবি করে নিচ্ছে দহিলে আপনার প্রিয় ওই মানুষটা কে নম্র ভাষায় বলুন- সরি ভাই!

ওই বিয়েতে আমি যেতে অপারগ। অন্তত এভাবে বয়কট করুন কয়েকটি বিয়ের অনুষ্ঠান। বুঝিয়ে দিন তার এসব কর্মকাণ্ড মূলত অমানবিক ও ঘৃণার কাজ। এভাবে এড়িয়ে যাওয়ার ফলে দেখবেন যৌতুক কমে যাবে, বিমুখ হবে অসংগতির ধারা থেকে। পক্ষান্তরে সবকিছু নিজের (বরের) পক্ষ থেকে ম্যানেজ করলে সাদরে দাওয়াত গ্রহণ করুন এবং তার চমৎকার কাজের প্রশংসা করুন এভাবে- আপনিই সেরা কাজটি করছেন। যৌতুকের মতো জঘণ্য প্রথাকে এড়িয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটাই পুরুষোত্তম।

যৌতুকের আবেদনটা ঠিক দুই হাতের তালি। এক হাতে কখনো তালি বাজে না বা শব্দ সঞ্চার করা যায় না। মুহাম্মদ'র (সঃ) শরীয়াহ্ আইনে বলা আছে ওই বিয়ে উত্তম এবং বরকত ময় যে বিয়েতে খরচ কম। কম কাবিনে বিয়ের পক্ষে ইসলাম। বিয়ে কে ইসলাম খুব সহজ থেকে সহজতর করেছে।

সম্প্রতি যৌতুকের আবেদনটা কন্যার পরিবার থেকেই শুরু। এখানে কনে পক্ষের বড় একটা অসংগতি থাকে তা হলো- বড় অংকের কাবিনের দাবি! বিয়েতে বড় অংকের কাবিন নামাও প্রচলিত অর্থে জুলুম। কাবিনের মোটা অংকের দাবি থেকেই মূলত বিয়ে প্রথা দরকষাকষিতে গড়ায়। তখনই শুরু হয় দাবি দাওয়ার ইশতেহার, যা গড়িয়েছে যৌতুকের মত জঘণ্য প্রথায়। এ বিষয়ে আমাদের (কনে-বর পক্ষ) ব্যালেন্সে আসা জরুরি। আমরা কি একবারও ভেবেছি- বিয়ের সময় যে যৌতুক নিচ্ছি সে যৌতুক আমার মেয়ের বিয়েতেও দিতে হবে। বরকে জুলুম করে যে কাবিন আদায় করছি সে কাবিন আমার ছেলের জন্যও তো প্রস্তুত হচ্ছে। তাহলে এ সংকট তো সবার জন্য সমান। এটা দূর করতে আমাদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই। তাই যৌতুক ও উচ্চ কাবিন এ দু'টোকেই একসাথে না বলি।

মেজবানের যে কালচার আমাদের সমাজে প্রচলিত বিশেষ করে চট্টগ্রামে, তাতে মেজবানের স্বকীয়তা টিকিয়ে নেই! গরীব-মিসকিনদের জন্য মূলত মেজবানের আয়োজনটা করা হয়। বড়-বড়, সাহেব-সাহেব, বাবু-বাবু, নেতা-নেতা, ক্ষমতা-ক্ষমতা ভাবের লোকদের জন্য মেজবানের দাওয়াতের লম্বা একটা লিস্ট থাকে। এদের উপচে-পড়া ভিড়ে তলিয়ে যায় মেজবানের স্বকীয়তা ও মানবতা! কিন্তু ফকির মিসকিনদের আলাদা প্লেসে, আলাদাভাবে খেতে দেওয়া হয়! অনেক সময় এদের প্রতি দুরাচারও করা হয়!

আর সাহেব বাবুদের খাওয়া-দাওয়া যেন জামাই আদুরে! এসব মেজবানের উদ্দেশ্যটা মূলত ভিন্ন। বৈষম্যমূলক এ আচরণ দেখলে লজ্জার মাথা না নুইয়ে উঁচু করে বলুন- সরি ভাই, এটা মূলত মেজবানের নিয়ম না। এয়াতিম, মিসকিনদের সাথে এমন আচরণে মনঃক্ষুণ্ণ হলো। মেজবানির এ বৈষম্যমূলক আচরণে পরিবর্তন আসুক।

মৃত ব্যক্তির জন্য চারদিনা, চল্লিশা নামে যে প্রথাগত অনৈসলামিক কালচার সমাজে প্রচলিত তা বরাবরের মতোই এড়িয়ে চলুন। এসব দাওয়াতে না বলুন! অন্তত নিরুৎসাহিত করুন। এতে অন্তত কুপ্রথাগুলো বর্জন হবে। এমনও হয় যে, অসহায় মৃতের পরিবারের জন্য ওই চারদিনা, চল্লিশা জুলুমে পরিণত হয়। এগুলো পালন না করলে সামাজিকভাবে মৃতের পরিবারকে ছোট হতে হয়! এগুলো মূলত ভূরিভোজন ছাড়া, উদর ফুর্তি ছাড়া বৈ কিছু না।

এক্ষেত্রে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, সর্দার, মাতব্বররা কখনো অসহায় পরিবারের একদিনের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবে না। তাই এসব দাওয়াতের বিপরীতে ভদ্রভাবে সরি বলুন। তবে, সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে মৃত ব্যক্তিকে কবরে সমাহিত করে চলে আসাটাই কাজের কাজ। আর সামর্থ্যের বিষয়ে আলাদা।

আপনার প্রতিবেশীর গরীব, অসহায়, অনাথ মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে। আপনি তখন ওই সমাজের মাতব্বর, মোড়ল হয়ে এমনটা করতে যাবেন না- অমুক তমুক একশজন, দুশজন সামাজিকে (সমাজের লোকজন) খাওয়াবেন এমনটা বলার স্পর্ধা দেখাবেন না (বড় জঘন্য সমাজ)!

সমাজকে বাধ্য করুন- মেয়েটির বিয়ের কাজ সম্পন্ন না করে বিয়ে বাড়ি থেকে কেউ আসবেন না। আর ওই বিয়ে বাড়িতে মাত্র কয়েকজন যাবেন খাওয়ার জন্য নয় বরং সামাজিকতা ও দায়িত্ব পালন করার জন্য। অন্তত এভাবে হলে সমাজ থেকে জুলুম কমে যাবে। সাম্য-মৈত্রী প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।

বিয়ে বাড়িতে রঙ্গ করে নানা তামাশার আয়োজন করা হয়। নিতান্ত অপচয় যাকে বলি। গান বাজনা বিয়ের জন্য কোন উপকরণ বা উপলক্ষ হতে পারেনা, মোটেও না। বরং এসব কালচার বিয়ে নামক সুন্নতি একটি কাজকে কলুষিত করার নামান্তর। বিশালাকার সু-সজ্জিত গেইট, লস্কর বাহারি লাইটিং এসবের পিছনে হাজার হাজার, লক্ষ টাকার অপচয়ের কোন জরুরত দেখছিনা- যদি না আপনি বিবেকবান হয়ে থাকেন।

পারলে ওসব ব্যয় বাঁচিয়ে এতিম খানায় দান করুন, নতুবা এতিম-মিসকিনদের দিয়ে দেন। হাতের কামাই, কষ্টার্জিত অর্থের অপচয়ের হিসাব কিন্তু ঠিকই একদিন দিতে হবে। তাই আপনার বন্ধু, চাচা, ভাই-বোনদের বিয়েতে এসব না করতে বলুন। বাঁধা দেন। আর বলুন- এসবে আমার মনঃক্ষুণ্ণ হয়। এসব অন্তত অবান্তর, অপচয় ও অকাজের কাজ ছাড়া কিছুই নয়।

সমাজের সকল কু-প্রথা গুলো সমাজের মানুষগুলোই সৃষ্টি করে। এ গুলো তাই সবার আগে নিজেদের কল্যাণে সমাজ থেকে তাড়াতে হবে। সরকারের আইন তখনই বাস্তবায়ন হয়, যখন আমরা সচেতন হই। আমরা সচেতন হলে সমাজ হবে যৌতুক মুক্ত, দূর হবে নানা অপসংস্কৃতি, বিলুপ্ত হবে বৈষম্য, কলুষিত হবেনা মানবতা, কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবার হবে ভারমুক্ত ও চাপমুক্ত, অপচয় বন্ধ হবে আয়ে বাড়বে বরকত। তাই সমাজের সকল প্রকার অসংগতিকে না বলুন, সরি বলে এড়িয়ে যান। ঠিকই একদিন তাড়িত হবে কু-প্রথা গুলো।

লেখক- শিব্বির আহমদ রানা, শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড