• মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রাষ্ট্র পরিবর্তনে বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিজীবিতা ও তাঁদের শ্রেণী অবস্থান

  মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:২০
লেখক ও কলামিস্ট

বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশ একটি সমাজ রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বলা চলে।শুধুমাত্র বুদ্ধিজীবী কথাটি দিয়ে শুরু করলে তার একটি মানে থাকে।কিন্তু রাষ্ট্র তথা সমাজ পরিবর্তনে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা নিরূপণে বুদ্ধিজীবীর সমাবেশ এবং সংজ্ঞা নিরূপণ আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্র নিরুৎসাহিত করতে পারে।কারণ; সমাজ রাষ্ট্রে বুদ্ধিজীবী নিরূপণ একটি মুখোশ উন্মোচনের মতোই জটিল ও কঠিনতর কাজ।

কারণ;রাষ্ট্রের পলিসির পরিপূরক সমাজ মননে উৎপাদিত বুদ্ধিজীবী আর রাষ্ট্র পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারকারী বুদ্ধিজীবী এই দু'টি সংগঠনের বুদ্ধিজীবী নিরূপণ করতে হলে প্রথমেই পরখ করে নিতে হবে দেশের আর্থ সামাজিক সম্পর্কের জটিল বিন্যাসকে ও তার স্বাস্থ্যগত অবস্থাকে।

কারণ; আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা আছে। যে বাস্তবতা তৈরি করতে যুগের পর যুগ সময় পার করতে হয়েছে গোটা মানবসভ্যতাকে।এই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার জটিল বিন্যাসে সামাজিক সম্পর্কের অভ্যন্তরে বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা, অবস্থান,ক্রিয়া কর্ম, চরিত্র, শ্রেণী অবস্থান,দ্বন্দ্ব,সমন্বয়,গতি,প্রগতিশীল,প্রতিক্রিয়াশীল,কার্যকর অকার্যকর নানারকম স্থিতিতে মিলিয়ে দেখতে পারা যায়।

বুদ্ধিজীবী কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্বের স্বাধীন কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় নয়,শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে যে কোন বুদ্ধিজীবীর সমাবেশ এবং অস্তিত্ব নির্ধারিত হয় তাঁর চিন্তার উপাদান এবং মনস্তত্ত্ববিদ্যা কোন শ্রেণীর উদ্দেশ্য লক্ষ্য এবং সার্বিক সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তার উপর।

বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিজীবীদের রূপ, রস,ছন্দ, ধরন, ধারণ, বৈচিত্র্য আলাদা আলাদা হতে পারে।হতে পারে বর্ণ চোরা। যাকে যখন তখন বুঝা যায় না।বুঝতে হলে তলিয়ে দেখতে হয়।কিন্তু তাঁর অর্গানিক ফাংশনাল মেটারগুলো সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ণভাবে বিশ্লেষণ করলে তার জাত খুঁজে পাওয়া যায়।অর্গানিক মেটার বলতে আমি এখানে বুঝাতে চাচ্ছি তার জীবন ও কর্মের গভীর সম্পর্ককে।

একটি জলের চিংড়ি মাছ অপরটি স্থলের তেলাপোকাকে যেমন আমরা আর্থ্রোপোডা প্রজাতির প্রাণী বলে চিহ্নিত করতে পারি এবং একই পর্যায়ভুক্ত করে প্রাণীর শ্রেণী বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারি।শ্রেণী বিন্যাসের জটিলতায় এই পোকা গুলো ইনসেক্টা এবং এ্যানিমেলিয়া জগতেই এখনো টিকে আছে নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঠিক।ঠিক তেমনি বুদ্ধিজীবীর বুদ্বিজীবিতাও শ্রেণী বিন্যাসের গভীরতা থেকে স্বজাতি বের করে নিয়ে আসতে হবে।

সামাজিক, রাজনৈতিক, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং দার্শনিক পরিমন্ডলে নানারকম উপাদানের সংমিশ্রণ এবং জটিলতায় বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গ অনুসঙ্গ অনেকেই আন্দাজ করার ক্ষমতা বিলুপ্ত করতে পারে পরিস্থিতির কারণে।কিন্তু আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং তার সুনির্দিষ্ট শ্রেণী অবস্থা গুরুত্বের সাথে তার নিজস্ব শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী তৈরিতে সদা তৎপর।আসলে বুদ্ধিজীবীরা তাদের শ্রেণী অবস্থান লুকানোর প্রাণান্তকর অনেক চেষ্টাও চালিয়ে থাকে এমনকি তাঁরা চালাক হওয়া সত্বেও তাঁদের কোন স্বাধীন স্বতন্ত্র সত্তা নেই।

তাঁদের রয়েছে সামাজিক গোষ্ঠীর এবং রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শ্রেণী অবস্থান।আমরা এই শ্রেণী অবস্থানের জটিল বিন্যাসে দুই ধরনের বুদ্ধিজীবীর সমাবেশ দেখতে পাই।যেখানে স্ব স্ব শ্রেণী এই দুই জাতের বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার উপাদান উৎপাদনে মূখ্য ভূমিকা রাখে।যেটাকে ইতালির মার্ক্সবাদী দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি বলেছেন;Organic Intellectual, বা জৈব বুদ্ধিজীবী দ্বিতীয়টি Traditional Intellectual বা প্রথাগত বুদ্ধিজীবী।

ঠাই দাঁড়িয়ে থাকা আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা যে সকল বুদ্ধিজীবী সৃষ্টি করে তার নাম প্রথাগত বুদ্ধিজীবী।

আর জৈব বুদ্ধিজীবীদের বিশেষ ক্ষমতা হচ্ছে; মানুষের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের চিন্তার প্রসার ও বিশ্বচিন্তার সাথে একটি তাল, লয়, সুর রক্ষা করতে পারেন। সমাজের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীর সমস্বার্থের ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই বুদ্ধীজীবীদের দারুণ কাজ রয়েছে।

প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরা বিগত দিনের উৎপাদন যন্ত্র ও উৎপাদন ক্ষেত্রের সামাজিক গোষ্ঠী এবং অর্থনৈতিক পদ্ধতির সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে থাকে যেন তাঁরা সমাজে দাঁড়িয়ে থাকা প্রথা প্রতিষ্ঠানের বাহিরে গিয়ে নতুন করে বিরোধপূর্ণ চিন্তা করতে পারে না।কিন্তু তাঁরা সমাজের কোন না কোন সম্প্রদায় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেন যা সমাজের পরিবর্তন বিরোধী এবং প্রগতিবিরোধী।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক উৎপাদন জগতে উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ককে ঘিরে যখনই কোন না কোন সামাজিক শ্রেণীর আবির্ভাব হয় তখনই সেই সামাজিক শ্রেণীর তার নিজের ভেতর থেকে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর জন্ম দেয়। সমজাতীয় শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়,সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলেও সমজাতীয় বোধ উপলব্ধি ধরন-ধারণ পদ্ধতি এনে দেয় যা সমজাতীয় শ্রেণীকে যোগ্য করে তোলে।যাঁরা অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান দর্শন, ইতিহাসের প্রবক্তা ও প্রযুক্তিবিদ এমনকি বিশেষজ্ঞ যারা আধুনিক যুগের ব্যবস্থাপক ও সংগঠক তৈরি করে তারাও।

এই জৈব বুদ্ধিজীবীদের সাথে পুরনো প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের ইন্টেলেকচুয়াল কন্টিনিউয়াস ফাইট থাকে।তাঁরা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে থাকে পুরনো দিনের প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের ক্রিয়া কর্ম তাদের চিন্তার অসারতা ও প্রতীক্রিয়াশীলতার প্রসারতা ভাঙতে সদা তৎপর।

কারণ;প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের অবলম্বন রয়েছে সমাজে দ্বিধাবিভক্ত সেই শ্রেণীর প্রতি যে শ্রেণী এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে কাজ করে।প্রাচীন কোন বংশ পরম্পরা রক্ষা করে চলছে এমনই মনে হবে। যেমন;পুরোহিত, দার্শনিক,শিল্পী ও সাংবাদিক যারা সমাজ তথা রাষ্ট্রের উপর আরোপিত সংস্কৃতি রাজনীতি এবং মানুষের সম্পর্কের জটিল বিন্যাস নিয়ে মাথা ঘামায় না।

জৈব বুদ্ধিজীবীদের সাথে প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের মৌলিক প্রার্থক্য হচ্ছে; শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক পরিবর্তনে জৈব বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকে।কারণ;সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তনে জৈব বুদ্ধিজীবীরা অঙ্গীকারবদ্ধ যাঁরা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলছে তাদের চিন্তার পরিপূরক সমাজ ও রাষ্ট্র সার্বিকভাবে সিদ্ধ করতে যেন শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে তাঁদের দৈনন্দিন কর্ম অভিজ্ঞতা এবং অর্থনীতি রাজনীতি বিজ্ঞান দর্শন নিয়ে জনগণকে ইতিহাসের ক্রমবিকাশে যৌথতা তৈরিতে শক্ত ভূমিকা রাখবেন।

পাশাপাশি এমন এক অগ্রগণ্য দিক নির্দেশক নেতৃত্ব তৈরী করবেন যাঁরা গোটা সমাজ রাষ্ট্রের সমজাতীয় সর্বস্তরের জনগণকে নেতৃত্ব দিতে পারে।এই বুদ্ধিজীবীদের সচেতন কর্ম তৎপরতার উপর নির্ভর করে শ্রমিক শ্রেণীর মতাদর্শ কতটুকু প্রথিত হয়ে আছে যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত উন্নততর করছে।

আর প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরা থাকে নির্বিকার।সক্রিয় থাকে সমাজ ও রাষ্ট্র বিভক্তি তৈরিতে।

কারণ;সমাজ রাষ্ট্রে কোন শ্রেণী আধিপত্য বিস্তার করবে তা নির্ভর করে বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক তৎপরতার উপর।যে কোনো শ্রেণী ক্ষমতা লাভ করতে কোন না কোন ভাবে জোর খাঁটায়, জোর খাঁটিয়ে সে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে হয়।যে ক্ষমতা অধিষ্ঠিত থাকে তার প্রাধান্য লাভ করা ব্যতীত সমাজ রাষ্ট্রে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া যায় না।

এই প্রাধান্য তৈরির সবচেয়ে ভেতরের কথা হচ্ছে তার শিক্ষা,নীতিবোধ,বুদ্ধি চর্চা, শিল্প, সাহিত্য,, সংস্কৃতি, রাজনীতি এমনকি দার্শনিক ভিত্তিটিও মজবুত করার প্রক্রিয়া বলা চলে।

সর্বক্ষেত্রে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াসেই বুদ্ধিজীবীদের অনবরত অনুসন্ধান জারি থাকে যেখানে প্রাধান্য সেখানেই আধিপত্য।যে কোন শ্রেণী তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার আপনা আপনি ভেঙ্গে পড়ে না।

তাকে পুরাতন আধিপত্যের সাথে নতুন আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়াতে হয়,দার্শনিকভাবে পরাস্ত করতে হয়।এক কথায় যে শ্রেণীর প্রাধান্যকে উৎখাত করে নতুন শ্রেণীর ক্ষমতায় আসতে হয়।এটাও একটি শ্রেণী সংগ্রামেরই পথ বলা চলে।ভাববাদী দর্শন ও বস্তুবাদী দর্শনের ইতিহাস ঠিক একই রকম ভাবে চলছে। দ্বন্দ্ব সংঘাতের পরিনতিই দর্শনের মৌলিক পরিনতি।

মার্ক্সবাদী দার্শনিক আনতোনিও গ্রামসি দুই বর্গের বুদ্ধিজীবীদের কথা বলতে গিয়ে বলেন; "জৈব:অর্থাৎ একটি শ্রেণী তার উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গেই তার নিজস্ব পরিচয়, ভূমিকা, আন্তর সমজাতীয়তা ইত্যাদি গুছিয়ে নির্দেশ করে দেবার দায়িত্বে নিজে থেকেই যাদের প্রতিষ্ঠিত করে,সেই বুদ্ধিজীবীকূল ঐ শ্রেণীর উন্মেষের ইতিহাসের এক স্বাভাবিক অঙ্গ এবং ঐ শ্রেনীর সত্তার সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত।আর প্রথাগত বুদ্ধিজীবীঃএই বুদ্ধিজীবীর আপাতদৃষ্টিতে কোনো বিশেষ শ্রেণীর বিকাশ অবলম্বন করে আবির্ভূত হয়নি, বরং যেন প্রাচীনতর কোনো পরম্পরার প্রতিভূ।গ্রামসি পুরোহিত শ্রেণীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে ধরিয়ে দেন যে এই প্রথাগত বুদ্ধিজীবীরাও কোন শুদ্ধ স্বতন্ত্র স্বাধীন কোনে শ্রেণী নয়,তাদের শ্রেণীপরিচয় এবং শ্রেণীগত আনুগত্য প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে মাত্র।"(আন্তোনিও গ্রামসি, অনুবাদ-সৌরিন ভট্টাচার্য ও শমীক বন্দোপাধ্যায়,নির্বাচিত রচনা সমগ্র, প্রথম খন্ড,পৃষ্ঠা-১৪৮)

ধনতান্ত্রিক অর্থ ব্যবস্থায় মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক যতরকম বিকাশ হয়েছে তাতে মনে হবে এই সকল বুদ্ধিজীবীদের সাথে সমাজ-রাষ্ট্রব্যবস্থার উৎপাদনের সাথে দূরত্ব বেড়েছে।জনগণের জীবন সংগ্রামের কথায় তাঁরা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে নেই।কিন্তু একটু খেয়াল করলেই দেখবেন যে কোন বুদ্ধিজীবী, মালিক এবং শ্রমিজীবী ব্যবস্থার কোন না কোন অংশের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে।এটা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই।

সাধারণত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও সংজ্ঞা নিরূপণ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হলে সমাজ এবং রাষ্ট্র কাঠামোর চরিত্র নির্ধারণ এবং উৎপাদন পদ্ধতি ও রাষ্ট্র চরিত্র বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ;বুদ্ধিজীবীদের রয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষাবলম্বন। যার কারণে তাঁদের মতাদর্শ ও ভূমিকা সম্পর্কে জানতে হলে রাষ্ট্র সমাজের কাঠামো ও উপরিকাঠামোর শ্রেণী চরিত্র নির্ধারণ জরুরি। তাই বুদ্ধিজীবীদের কর্ম প্রক্রিয়াকে শুধুমাত্র যান্ত্রিক রুটিনমাফিক স্তরে রেখে বিশ্লেষণ করলে ভুল করা হবে।তাঁদের চিন্তার উপাদান পরখ করে দেখতে হবে নতুন -পুরাতন, গতিশীল স্থিতিশীল এবং অবস্থিত বাস্তবতা -বৈপ্লবিক বাস্তবতার উপর কতটুকু কার্যকার আর কতটুকু অকার্যকর অর্থাৎ ঐতিহাসিক বাস্তবতার গুচ্ছ রসায়নের উপর এবং ভেতর চোখ ফেলে নয়, হৃদয় দিয়ে দেখতে হবে।

কারণ বুদ্ধিজীবীদের দায়িত্ব থাকে সমাজ রাষ্ট্রের কাঠামো এবং উপরিকাঠামো ভাঙার এবং সৃষ্টি করার ক্ষমতা প্রয়োগে। একজন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী কি করে?একজন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী তার তত্ত্ব এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমাজ রাষ্ট্রের সম্পর্কের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ভাববাদী খোলস ঝেটিয়ে বিদায় দিয়ে মানুষকে এমন একটি সমাজ রাষ্ট্রের সমজাতীয় পরিসরে টেনে নিয়ে আসে যেখানে থাকে না কোন বদ্ধ জায়গা। সেখানে জনগণ সুশৃঙ্খল, স্বস্তি জীবন এবং জীবীকা, চিন্তা এবং চরিত্র সবই একটি সমন্বিত সাবলীল জীবনের অধিকারী হয়।

যেখানে জীবীকাই জীবন৷ জীবীকাই বিজ্ঞান। সমাজ রাষ্ট্রের যুগান্তকারী রূপান্তরের ঐতিহাসিক চালিকাশক্তি যে শ্রমিক শ্রেণী তার পুরানো পিছিয়ে থাকা সত্তাকে অতিক্রম করে নতুন সমাজ ও নতুন মানুষের মানবিক সমাজ রাষ্ট্রের স্তরে পৌঁছাতে পারলেই সমাজ রাষ্ট্রের সৃজনশীল কাঠামো উপরিকাঠামো নির্মাণ সম্ভব।

শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নয় দার্শনিক সকল পরিমন্ডলকে সর্বাগ্রে রাখতে হবে গণমানুষের স্তরে।তানাহলে একটি জাতি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির পথে চিন্তা উপাদানের পরাজয় ঘটবে ভয়ংকর পরিবেশে।শিল্প সাহিত্য দর্শন রাজনীতি বোধ উপলব্ধি গড়ে তোলার পথে বিজ্ঞান প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি সমালোচনা আত্মসমালোচনার পথে এগিয়ে যেতে হবে।

একমাত্র সমালোচনা আত্মসমালোচনা পক্রিয়া পদ্ধতিই একটি উঁচু ধরের বুদ্ধিজীবী নির্মাণ করতে পারে।যাঁরা ভিন্ন মত ভিন্ন চিন্তার সমাহারে পারদর্শী এবং এমনতর মানবিক মানুষ থাকবেন, যাঁদের স্ব স্ব তত্ত্ব-কর্ম অস্তিত্বের মধ্যেই সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক বিকাশে সহযোগীতা থাকবে।

সাধারণ জনগণ যখন নিজেকে দেখবে,নিজেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করবে তখন দেখবে, সমাজ রাষ্ট্র পরিবর্তনে নিজের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং ভূমিকা। ধরতে পারবে নিজের অজ্ঞতা।ইতিহাসের ক্রমবির্বতনের গতিমুখে নিজেকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে হাসিমুখে।

জৈবিক বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রে আরেকেটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে সমাজের নিচুতলার জনগণের সংস্কৃতি যুক্তিবোধ উপলব্ধির সাথে শুধুই সংহতি নয়,এর লক্ষ্য হচ্ছে তাদের চিন্তা চেতনাকে একটি যৌক্তিক ও বৌদ্ধিক প্রগতির পথে চালনা করা।

দুনিয়ার সমস্ত বুদ্ধিজীবীর সমাবেশ এবং ক্রিয়া সবসময় পূর্ণ বিকাশে এসে মিলিত হয় রাজনৈতিক ময়দানে। পৃথিবীর ইতিহাসে বুদ্ধিজীবীদের দর্শন পূর্ণ বিকাশ ও আধিপত্য বিস্তার করেছে রাজনৈতিক ময়দানে। রাজনীতিও এমন এক শক্তিশালী পরিসর যা সকল মানুষকে ঐ বুদ্ধিজীবীদের উপলব্ধি এবং বোধ জনমনে গেঁথে দিতে সর্বদা ওস্তাদ। যার কারণে বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার উপাদান সমাজ মননে গেঁথে দিতে আগেই প্রয়োজন পরে একঝাঁক সমজাতীয় বুদ্ধিজীবী।এই বিষয়টির জলন্ত উদাহরণ তৎকালীন ইতালির ফ্যাসিবাদী শাসন।

ইতালির মুসোলিনির একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে;

"১৯২৩সালে ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুসোলিনি ভাষনে বলেন ;ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রয়োজন এক শাসকশ্রেণীর।...রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আবশ্যক কর্মকর্তাদের আমি শূন্য থেকে সৃষ্টি করতে পারবো না।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই তাদের ক্রমে ক্রমে গঠন করে দিতে হবে আমার জন্য। আমরা পশ্চাৎপদ ও সদ্য উপস্থিত বলেই আমাদের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে শক্তিমান করে তুলতে হবে।"(আন্তিও গ্রামসি জীবন চিন্তা ও প্রাসঙ্গিকতা-সাদিকুর রহমান -পৃষ্ঠা ১৮৩)

ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি খুব পরিষ্কারভাবেই বুঝেছিলেন, জাতি রাষ্ট্র তথা সমাজকে মূল্যবোধের দিক থেকেই সবার আগে আধিপত্য তৈরি করতে হবে।তাহলেই স্বৈরাচারী শাসন শোষণ পাকাপোক্ত করা সম্ভব। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ফ্যাসিস্ট মুসোলিনি দেশ বিদেশের প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাসিস্ট মডারেটদের চিন্তার উপাদান দিয়ে তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা প্রণোদনা,পুরষ্কার, অর্থবিত্ত দিয়ে শক্তিশালী করে।এবং এই শক্তিশালী বুদ্ধিজীবীদের ক্রিয়া কর্ম দ্বারা গোটা ইতালীর জাতি গোষ্ঠীকে মোহাচ্ছন্ন করে তুলে। এমনকি শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন সব বিষয় নির্ধারণ করে দেয় যেখানে ধর্মশিক্ষা ও প্রযুক্তি কারিগরি শিক্ষা গুরুত্ব পায়। যা লাঠি গুলি টিয়ারগ্যাস বল প্রয়োগের পথ ব্যতিরেকে জনগণই হয়ে উঠে ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির সবচেয়ে বড় রক্ষা প্রাচীর।

প্রতিটি সমাজের অভ্যন্তরে প্রথম পর্যায় হলেও গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক কিছু উপাদান থাকে এবং তা ঐতিহাসিক কারণেই কোন না কোন ভাবে প্রকাশ পায়।কারণ; প্রতিটি জাতির ঐতিহাসিক লড়াই সংগ্রামের মধ্যেই শোষিত এবং শাসক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব থাকে।এই ঐতিহাসিক শ্রেণী দ্বন্দ্বই একদিকে পরিপক্ক শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে এবং অন্যদিকে নিখাঁদ সর্বহারা তৈরি হয় যাঁরা যুগে যুগে শোষিত শ্রেণী একটি সংগঠিত সর্বহারা শ্রেণীর পক্ষে অভিজ্ঞতালব্ধ সংগঠিত শক্তিশালী পক্ষাবলম্বন করে।

এই শ্রেণী অবস্থান যত শক্তিশালী হবে সমাজতন্ত্রের গতিমুখ ততই উজ্জ্বল জ্বলজ্বল করবে। এটাই ইতিহাস। কিন্তু প্রতিটি জাতি গোষ্ঠীরই আছে কিছু বুর্জোয়া ব্যক্তিতান্ত্রিক সংস্কৃতিগত জোট।কিন্তু সাধারণ জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সংস্কৃতি হচ্ছে বুর্জোয়া ব্যক্তিতান্ত্রিক সংস্কৃতি। যেটা আপোষ করে চলছে সকল আদিম সত্তার সাথে।কিন্তু সর্বোপরি মানুষের রয়েছে গতিশীল চিন্তা চেতনা যা আবার প্রকৃতির পরিবর্তনে, সমাজের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি।প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি যেমন পাল্টাচ্ছে ঠিক তেমনি মানুষেরও।মানুষের সৃষ্ট সম্পদ অল্প কিছু মানুষের ভোগদখল ও আদিপত্যের বিপরীতে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।সেই লড়াইয়ে অর্জিত মানবিক মূল্যবোধই আসলে সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ।সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ মানেই হচ্ছে বিগত ভোগদখল শোষণ শাসনের মূল্যবোধের অবসানের লক্ষ্যে লড়াই সংগ্রাম জারি রাখার মূল্যবোধ।এই মূল্যবোধ ধারণ করা ব্যতীত সত্যিকারে বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠা সম্ভব না।

লেখক পরিচিতি: লেখক ও কলামিস্ট

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড