• শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ঢাকা বাঁচাও

  মাহবুব নাহিদ

০২ আগস্ট ২০২২, ১৭:১০
মাহবুব নাহিদ
মাহবুব নাহিদ

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে প্রায় অর্ধ শতাব্দী হতে চলেছে। এত বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও আমরা অনেক দিক দিয়েই পিছিয়ে। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে না আগানোর কারনেই হয়তো আমাদের এই দুর্দশা। সবচেয়ে বাজে অবস্থায় রয়েছে আমাদের প্রিয় রাজধানী। রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে অপরিষ্কার, বসবাসের অনুপযোগী, অপরিচ্ছন্ন, অসুখী শহরের তালিকায় প্রথম দিকে। স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য সুবিধা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামোসহ ৩০টি মানদণ্ডের বিবেচনায় ঢাকার স্থান তলানিতে।

ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যা জনবসতি। ঢাকাই বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতির শহর। সরকারী হিসাবে এমন হলে আসল হিসাবটা খুবই করুণ। প্রতিদিন বহু মানুষ ঢাকায় আসছে জীবিকা কিংবা পড়ালেখার জন্য। অফিস, ব্যাংক, গার্মেন্টস, ইন্ডাস্ট্রিজ অনেক কিছুই ঢাকামুখী হওয়ায় ঢাকার এই বেহাল দশা। বিভিন্ন জরিপে ঢাকার নাজুক অবস্থার কথা উঠে এসেছে বারবার। সর্বশেষ জাতিসংঘের হ্যাবিটেট প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনেকেই হয়তো বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসছেন কিন্তু ঢাকে যে কতোটা বসবাসের উপযোগী তা ঢাকার বাসিন্দারা খুব ভালোভাবেই জানেন। ঢাকা শহরে রাস্তাঘাটের অবস্থা আসলে একটা মেগাসিটির মতো কখনোই না। এতো বাজে রাস্তাঘাট কোনো সিটিতেই নেই। রাস্তা অপেক্ষাকৃত সরু বিভিন্ন জায়গায়। রাস্তার অভ্যন্তরে খানাখন্দভরা। আর বিভিন্ন কারনে খোড়াখুড়ির কারনে রাস্তা হয়ে যায় জঘন্য। রাস্তার সাথে ড্রেনের সংযোগ একদম নিবিড়। সামান্য বৃষ্টি হলেই কোনটা রাস্তা কোনটা নর্দমা তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। রাস্তা তো যেমনতেমন, এর চেয়েও বেশি খারাপ হচ্ছে রাস্তার ট্রাফিক সিস্টেম। ট্রাফিক সিস্টেমেও মনে হয় বিশ্বে বাংলাদেশ জঘন্য। এতো বেশি যানজট সম্ভবত বিশ্বের আর একটি শহরে কারন যানজটে ঢাকা বিশ্বে দ্বিতীয়। ঢাকা শহরে ককর্মব্যস্ত দিনগুলোতে দশ মিনিটের রাস্তা দেখা যায় এক ঘন্টা লাগে। মাঝেমধ্যে এই সময়টা চলে যায় অনুমানের বাহিরে। এত অসহনীয় যানজটের অন্যতম কারন হচ্ছে ট্রাফিক সিস্টেম এর অভাব, আমাদের আইনের প্রতি শ্বদ্ধাশীল না হওয়া। যত্রতত্র গাড়ি চালানো, ট্রাফিক রুল না মানা আর সবচেয়ে বড় কারন হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি। ঢাকায় মাত্র ভাগ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করে কিন্তু তারাই রাস্তার অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দখল করে। পাবলিক পরিবহন যদি ভাল হতো তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার বন্ধে নিয়ম করা যেতো। কিন্তু আমাদের যে পাবলিক পরিবহন তাতে মানুষ না ঠেকলে উঠতে চাওয়ার মতো। গাড়ির অবস্থা ভাল না, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পরিবহন শ্রমিকদের কর্তৃক যাত্রী হয়রানির কারনে মানুষ পাবলিক সার্ভিসে উঠতে চায় না। শহরের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় রেল ক্রসিং থাকাও যানজটের কারন। সড়ক দুর্ঘটনায়ও ঢাকা এগিয়ে। দেশে যত দুর্ঘটনা হয় তার অনেকাই হয় ঢাকায়। বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ড সঠিক পরিকল্পনা মেনে না করার ফলে রাস্তায় জ্যাম তৈরী হয়। মেট্রোরেল কিংবা র‍্যাপিড ট্রান্সপোর্টের কাজ করা হচ্ছে রাস্তায় বেরিকেড তৈরী করে। এর কারনে রাস্তায় জ্যাম হচ্ছে, তবে কাজ শুরু করার আগে এসব কেনো ভাবা হলো না কে জানে! তবে মেট্রোরেল আর র‍্যাপিড ট্রান্সপোর্ট চালু হয়ে গেলে যানজট নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে ধারনা করা যায়।ঢাকা শহরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খুব একটা ভাল না। আমাদের ঢাকা নগরী হিসেবে গড়ে ওঠার আগে এর কোনো সঠিক পরিকল্পনা ছিলো না। বাড়িঘর কোথায় হবে,স্কুলকলেজ কোথায় হবে, ইন্ডাস্ট্রি কোথায় হবে তা পূর্বনির্ধারিত না। শহরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগলে গাদাগাদি অবস্থার কারনে আগুনের ভয়াবহতা বেশি হয়। পুরান ঢাকার অবস্থা একদম যাচ্ছেতাই। ঢাকা শহরে যত্রতত্র গড়ে উঠছে কলকারখানা। এর জন্য আরো বেশি মানুষ আসছে ঢাকা। জনবসতি দিনদিন বেড়েই চলছে। কলকারখানার বর্জ্র ব্যবস্থাপনায় নেই কোনো সঠিক পদ্ধতি। এর কারনে দুষিত হচ্ছে পরিবেশ, একদম মরতে বসেছে ঢাকার আশেপাশের নদী-খালসমূহ। নাগরিক সুবিধার দিক দিয়েও অবস্থা খুব ভাল না৷ গ্যাস নিয়ে প্রায়ই সমস্যা দেখা যায়। ওয়াসার পানির অবস্থা বলতে গেলে তো ইতিহাসের বই লিখতে হয়। বিভিন্ন কারনে ঢাকার মতোই মরতে বসেছে ঢাকার পাশের জেলা সমূহ। ঢাকাকে বাঁচাতে আমাদের আসলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আগাতে হবে। প্রথমে রাজধানীকে বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। কলকারখানা, কেন্দ্রীয় অফিসগুলো সরিয়ে নিতে হবে অন্যত্র। বিকল্প রাজধানী হিসেবে দাঁড় করা যেতে পারে অন্য কোনো শহরকে। একটা দেশে যে একটিই রাজধানী থাকতে হবে এমন কোথাও বলা নেই। বানিজ্যিক ও প্রশাসনিক হিসেবে রাজধানী দুইটি করা যেতে পারে। ঢাকার আশেপাশের কিছু এলাকা আছ যা এখনো ব্যবহার করা হয়নি সেগুলোকে ব্যবহার করে রাজধানীকে বর্ধিত করা যেতে পারে। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া পর্যন্ত গড়ে উঠাতে হবে নতুন নগরী। ঢাকার আরেক পাশ পূর্বাচলেও নগর পরিকল্পনা করে আগাতে হবে। জেলা শহরগুলোতে ঢাকার সকল সুযোগ সুবিধা দেয়া দরকার। যাতে করে যে কোনো কারনেই মানুষের ঢাকায় আসতে না হয়। আমাদের সকলের দায়িত্ব আমাদের ঢাকা শহরকে পুরোপুরি মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর। এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।

বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো ঈদ চলে গেছে। ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশির আমেজ। কিন্তু ঈদ সকলের জন্য আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনা। কখনো কখনো ঈদ হয়ে ওঠে কষ্ট দুঃখের। ঈদে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে গিয়ে প্রাণ হারায় বহু মানুষ। এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। এবারের ঈদে তেমন বেশি মানুষ যাতায়াত করেনি তাতেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমাদের রাস্তাঘাটের এই বেহাল দশা দূর করতে চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। আমাদের পরিকল্পনা তো নাই উল্টা আছে অনিয়মে জর্জরিত ব্যবস্থা। সড়কপথে দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এর কারন-বেপরোয়া গাড়ি চালানো, সিগন্যাল না মানা, অপ্রয়োজনীয় ওভারটেকিং ইত্যাদি। শুধুমাত্র যানবহনের দোষেই যে দুর্ঘটনা হয় তা নয়। পথচারীদের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে রাস্তায় চলাফেরায়। জেব্রা ক্রসিং বা ফুট ওভার ব্রীজ ব্যবহার না করা, ফুটপাত ব্যবহার না করা এর অন্যতম কারন। দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে তার ক্ষতিপূরণ তো দেয়া সম্ভব না। কিন্তু চালকের একদম দোষ থাকা সত্ত্বেও বিচার হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। হিসাব করলে দেখা যায় শতকরা দশ ভাগ দুর্ঘটনারই বিচার হয় না। শুধু যানবাহন, চালক বা পথচারীদের উপর দ্বায় দিলেই হবে না। আমাদের সড়কের অবস্থা যে খুব ভাল তাও নয়। সড়কের বেহাল দশাও দুর্ঘটনার একটি অন্যতম কারন। অথচ আমাদের দেশে রাস্তা নির্মানে খরচ হয় ইউরোপীয় দেশের চেয়েও বেশি। এত খরচ হওয়ার পরও যদি রাস্তার এই বেহাল দশ হয় তাহলে আমাদের নিতান্তই দুর্ভাগ্য। নিরাপদ সড়কের জন্য অনেক আন্দোলন হয়। অনেক সংগঠন এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এর কোনো ফলাফল আমরা দেখতে পাই না। যখন একটা ঘটনা ঘোতে তখন তা নিয়ে তোরজোড় দেখা যায় কিন্তু সময়ের সাথে তা হারয়ে যায়। অন্যদিকে ট্রেনের দুর্ঘটনা ঘেটে দেখলে জানা যায় অধিকাংশ দুর্ঘটনাই হিয় ক্রসিংয়ে। আমাদের রেলপথে বৈধের চেয়ে অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা বেশি। অবৈধ ক্রসিংয়ে থাকার কথা না তবে বৈধ ক্রসিংয়ের অধিকাংশ জায়গায়ই নেই লাইনম্যান,গেট বা কোনো একটি ব্যবস্থা। এটা তো গেলো রেলওয়ে গভার্নিং বডির ব্যর্থতার কথা। আমাদের দেশের রেললাইন গুলোতে পাতি, নাট বল্টু যে হারে চুরি হয় তা রেকর্ড হবার মতোই। চুরি তো সাধারণ মানুষই করে। নাটবল্টু, পাতির কারনে বগিচ্যুত হবার ঘটনা ঘটে থাকে। এসব রেললাইন পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের নেই কোনো উদ্যোগ। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বহু কথা হয়, বহু আন্দোলন হয় কিন্তু কাজ কিছুতেই হয় না। হয়তো শর্ষের মধ্যে ভূত ঢুকে আছে। আমরাও দিনদিন নিরাপদ সড়ক চাই, নিরাপদ সড়ক চাই বলে আওয়াজ তুলছি কিন্তু নিজেরাও সচেতন হচ্ছি না। সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক আইনের সংশোধন করা হয়। কিন্তু শাস্তি কঠিন হলেই পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট দেখা দেয়। তারা পুরো দেশ জিম্মি করে রাখে। অধিকাংশ মামলার শাস্তিই হয় না। অপরাধ প্রমানিত হলে শাস্তি দিলেও আবার ধর্মঘট। পুরো দেশ অচল করে ফেলে এরা। এদের পিছনে অশুভ কোনো শক্তি কাজ করে। এই সমস্যা দূর করতে হলে অশুভ শক্তির মূলোৎপাটন করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা দূর করতে প্রয়োজন মানসিক অবস্থার উন্নতি। শুধু মুখে আওয়াজ তোলার জন্য না। যখন একদম নিচু থেকে উপর পর্যন্ত সবার মধ্যে এই ধারনা সৃষ্টি হবে যে সড়ক নিরাপদ রাখবো সেদিন সড়ক নিরাপদ হবে। নাহয় সড়কে মৃত্যু চলবেই

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড