• সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

জনতা তুমি কার? কী তোমার অধিকার?

  মাহবুব আলম প্রিয়

৩০ জুলাই ২০২২, ১৬:১৪
জনতা তুমি কার? কী তোমার অধিকার?

আমরা আম জনতা। আমরাই জনসাধারণ। আমরাই দেশের নাগরিক। আমার দেশ, তোমার দেশ, সবার দেশ, বাংলাদেশ। আমাদের দেশ, আমাদের মাতৃভূমি,আমাদের অস্তিত্বের নাম, আমাদের পরিচয়, আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়ের নাম বাংলাদেশ। এই আমাদের শব্দটাই জনতার। আমাদের আর জনতার কাছেই দেশ। জনতার জন্যই দেশ, জনতার জন্যেই আইন। এই আমরা জনতা কেমন আছি? কার জন্যে বেঁচে আছি? কি আমার অধিকার আর বাস্তবে আমরা কার? এসব নিয়ে দু' চার লাইন না লিখলেই নয়৷ হেতু হলো সবাই তথা দেশের রাজনৈতিক দল,নানা মতাদর্শের গোষ্ঠী, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান সবাই দাবি করেন, জনতা তাদের। জনতা তাদের পক্ষে আছেন। জনতার জন্যে তাদের সব। জনতাকে তারা ক্ষমতার উৎস মানেন। জনতার মতামতকে কাগজে, কলমে, মঞ্চের ভাষণে প্রাধান্য দেন। জনতার অধিকার রক্ষায় কাজ করেন তারা। তাই জনতার হালহাকিকত ভালো থাকার কথাই ছিল। বাস্তবতায় আমরা কতটুকু ভালো। কতটুকু অধিকার পাচ্ছি?

জনতার দাবিদার সবাই। কারণ জনতা একা কেউ নয়। সবাই মিলে জনতা। তাই দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহীনির একটি শ্লোগান দিয়েই প্রসঙ্গে আসি।

'পুলিশ জনতা; জনতাই পুলিশ' শ্লোগানটির যথার্থতা খুঁজতে গিয়ে যা পেলাম। তা হলো জনতার জননিরাপত্তাদানে পুলিশ সদা তৎপর। তাই এ শ্লোগান সুন্দর! জনবান্ধব! আমরা পুলিশিং সেবা পাই কিন্তু তবুও কেন জানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত?

আমরা কারণে অকারণে পুলিশকে দোষারোপ করি । আমরা যদি পুলিশকে দোষারোপ না করে পুলিশকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসতাম। অর্থাৎ জনতা যদি নিজেই পুলিশ হয়ে যেতো। তাহলে আমি মনে করি দেশের অপরাধ প্রবণতা আর অপরাধীর সংখ্যা কমে আসত। কারণ আমার দৃষ্টিতে অপরাধীরাও জনতার অংশ। তাই জনতা পুলিশ হয়ে ওঠেনি। তাই আইনের রক্ষক হতে পারেনি। আবার পুলিশকে জনতা বন্ধু ভাবার পরিবেশও গড়ে ওঠেনি ।

বাস্তবতা হচ্ছে জনতার তালিকায় থাকা পুলিশি হয়রানিই শিকারের খবর আমাদের ব্যথিত করে। এর জন্য পুলিশকে দোষারোপও করেছি। কিন্তু দায়ী জনতা। পুলিশের পোষাক-পরিচ্ছেদ একই রকম । কিন্তু আমরা যারা জনতা; আমাদের পোষাকে ভিন্নতা রয়েছে।

সব জনতা তো আর এক রকম নন । সমাজের স্থান, কালে প্রকাশ্যে অপরাধ ঘটতে দেখে এই জনতাই আবার চুপ থাকেন। খুনি দেখেও প্রতিবাদ করতে পারেন না। কেউ সাহায্য প্রার্থনা করলে এগিয়ে আসেন না। সেলফি আর ভিডিয়ো আপলোড করে এই জনতাই ডিজিটাল মায়া মমতা ছড়িয়ে দেন। কোথাও আগুন লাগলে দেখা যায়, দর্শক জনতার জন্য ফায়ার সার্ভিস, এম্বুলেন্স যথাস্থানে পৌঁছাতে পারে না। আবার ভিন্ন চিত্রও দেখা যায়। এই জনতার একটি অংশই উদ্ধার কাজে নেমে যায়। কথা হলো, তারাও কিন্তু জনতা।

পুলিশের কোনো পক্ষ বিপক্ষ নেই। আমাদের জনতার মাঝে আছে । যেমন, ধরুন আপনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে কোন অভিযোগ করলেন , পুলিশ আপনার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করলেন । আপনার অভিযোগটি আপনার পক্ষে না আসলেই আপনি শুরু করবেন তদন্তকারী সেই পুলিশ বা পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিষদাগার বা দোষারোপ । এভাবেই শুরু হয় পুলিশের বিরুদ্ধে জনতার অভিযোগ বা ক্ষুব্ধতা । আমাদের উচিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সকল জনতাকে এক সারিতে আসা। জনতাকে সচেতন হওয়া। নিজের পাপ ঢেকে অন্যের পাপ ঘাটা জনতাও আমরা দেখি। পরের দোষারোপকারী জনতার কারনে বহু ভালো জনতার ভালো কর্মের মৃত্যু হয়।

আমাদের দেশের সংবিধানে জনতার কথা বলতে গেলে পাই, সংবিধানে রাষ্ট্রের পছন্দকৃত একটি জীবন প্রণালী পালন করে জনতা। রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান জাতীয় নির্দেশনায় দার্শনিক অ্যারিস্টটল আমাদের সেরকমই জানিয়েছেন। সেই বিশ্বাসের ধারাবাহিকায় আজ সংবিধান আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার অপরিহার্য গাইডবই। তাই সংবিধান ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না। তবে রাষ্ট্রের আধুনিকতা সংবিধানের থাকা না থাকার ওপর নির্ভর করে না। বরং একটি রাষ্ট্র তার গৃহীত সংবিধান কতটুকু মেনে চলে সেটাই বিবেচ্য। কতটুকু পবিত্র জ্ঞান করে সেটাই মূখ্য। এ সংবিধানের বিধি বিধান নাগরিক তথা জনতার স্বার্থে জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই তৈরি করেন। রাজা প্রজাদের যুগে সময়টা হলো রাজার আদেশই চুড়ান্ত বিধান। রাজার ইচ্ছাই রাষ্ট্র ও আইন। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল রাজা বা রানীর ইচ্ছা ও আজ্ঞা পালন। রাজ পরিবারের অনুগত থাকাই ছিলো প্রজাদের দায়িত্ব। সময়ের ব্যবধানে গণতান্ত্রিক ধারার প্রচলনে জনতা ক্ষমতা, ভোটের, সিদ্ধান্তের মালিক। কেবল রাষ্ট্রই নয়, আইনের উদ্দেশ্যও, সরকারের ইচ্ছা, রাজ্যর কার্য সমাধানে জনগণের স্বার্থ থাকা সংবিধান সম্মত অধিকার। অতীতে জনতা বা প্রজার কাজ ছিল রাজা বা যার সার্বভৌমত্ব আছে তার আদেশ মেনে চলা। আর সার্বভৌমত্ব কেবল রাজার জন্য। কারণ, জনগণের সার্বভৌমত্ব তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এখন তার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনতার আদালত। জনতার ক্ষমতা। গণতান্ত্রিক ধারা জেগে ওঠেছে। এই জনতা বা আমরা কি তা মনে প্রাণে গ্রহণ করেছি? আমরা কি আমাদের অধিকার সচেতনতা রপ্ত করেছি। বাস্তবে তা মনে প্রাণে মেনে নিলেও একটা অদৃশ্য জালে আটকে গেছি এমনটাও ভাবতে হচ্ছে৷ কারন, জনতার মৌলিক অধিকার নিয়ে আমরা হতাশ। কারণ মৌলিক অধিকারের বেঁচে থাকার উপাদান খাদ্য নিরাপত্তা পাচ্ছি না আমজনতা। উৎপাদন পরিবেশ, বাজারমূল্যে আকাশ ছোঁয়া সিন্ডিকেট, আয় রোজগারের সহজ পথ সকলের জন্য নেই। সুদভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় ধনী কেবল ধনী হচ্ছে, গরীব হারাচ্ছে তার সহায় সম্বল। পরের মৌলিক অধিকার বাসস্থানের নিরাপত্তাও নেই আমাদের। কারণ, বালি ভরাট করে স্থানে স্থানে আবাসনের নামে সব লুটে নিচ্ছে একটি মাফিয়া চক্র। এ চক্রের জুলুমকারী আর মজলুম উভয় জনতার নানা সংকট বিদ্যমান। একদল খাই খাই করে সব দখলে মরিয়া। অন্যদল সব হারিয়ে দিশেহারা৷ তারাও জনতা।

কিন্তু আজকের আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজা সংবিধানের অধীন। সার্বভৌমত্ব রাজার জন্য নয়, জনগণের জন্য। আমাদের সংবিধানও সে কথাই বলছে। অনুচ্ছেদ-৭ পড়লে এ বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া যায়৷ কাজেই ক্ষমতা জনতার, রাজার নয়। শাসকের নয়। আবার আইনের প্রশ্নে সংবিধান সার্বভৌম। সব আইন সংবিধানের অধীন।

আমাদের দেশে দুটোই বিদ্যমান। ক্ষমতার প্রশ্নে জনগণ সার্বভৌম। অন্যদিকে আমাদের দেশে সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব বিরাজ করছে। সংসদীয় সার্বভৌমত্ব নয়।

সংবিধানে যে বিষয়গুলো থাকে বা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আইনের শাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি ইত্যাদি। রাষ্ট্রভেদে এই নীতিগুলোরও ভিন্নতা আছে। কিন্তু সাধারণভাবে একটি আদর্শ বা কল্যাণরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু নীতি ও আদর্শ মেনে চলে।

আমাদের সংবিধান জনগণকে সব ক্ষমতার মালিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের প্রারম্ভেও এই মালিকানার স্বীকৃতি মিলেছে চূড়ান্তভাবে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের ক্ষমতার চূড়ান্ত মালিক হিসেবে জনগণকে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও রাজনীতিতে ও রাষ্ট্রে সেই নীতির অনুসরণ করা হচ্ছে কি-না সেটি একটি ঘটনার প্রশ্ন।

রাষ্ট্রের মালিকানার প্রথম প্রমাণ হল একটি রাষ্ট্র তার কাঠামোর মধ্যে জনগণের অধিকারকে কতটুকু স্বীকার করছে। এই মালিকানার প্রথম নজির হলো ‘ভোটাধিকার’। এটি কেবল নির্বাচনে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করা নয়, এর তাৎপর্য আরও ব্যাপক। এটি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার। রাজনীতি তথা রাষ্ট্রের দিক নির্দেশনামূলক একটি কর্তব্য। এ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে নাগরিকরা রাষ্ট্রের মালিকানার অধিকার প্রয়োগ করে। সে কারণেই আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ কেবল নয়, আরও অনেক অনুচ্ছেদেই ভোটাধিকারের বা জনগনের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সর্বশেষ নির্বাচনে সংবিধানের সেই নীতির বাস্তবায়ন হয়নি। কেন হয়নি সেটি একটি রাজনৈতিক প্রশ্ন। কিন্তু এটি একটি বাস্তবতা । এবার আসি জনতা কার? কাগজে কলমে ক্ষমতা বাস্তবে কার? দেশের রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশে নিজ দলের গ্রহণ যোগ্যতা বাড়ানোর জন্য নেতারা বলে থাকেন,জনতা তাদের পাশে আছেন। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল। সবাই জনতার দাবিদার। তাহলে আবার জনতার হাহাকারের প্রশ্ন আসে কেন? দেশের কোটি বেকার নারী পুরুষও জনতার অংশ। তাদের মাত্র ২শ টাকা থেকে ৫শ টাকা মুজুরী দিয়ে সভা সমাবেশে সমাগম ঘটানো যায়। রোদে পোড়া আর বৃষ্টিতে ভেঁজা জনতাও পাওয়া যায়৷ জ্বী হুজুর মার্কা জনতাও আমরাই। নেতা যা বলেন মহা সত্য বলেন,তাহাই অমৃত, মহাবানী রূপে গ্রহণকারী জনতা আমরাই। আমরাই আঁতেল, আমরাই জাতে তুলি নেতার মান। আমরাই ৫ শ টাকায় বিক্রি করি নিজের সিদ্ধান্ত। আমরাই চুপসে যাই অন্যায়ের সাথে গা ভাসাই। আমরাই জনতা,আমরাই হতাশার কথা বলি আর হাহাকারের গান গাই। তাহলে, এ জনতা কার?

জনতা হরেক মতের। হরেক জাতের। যদিও আমরা সবাই বাঙালি জাতি৷ মনের দিক থেকে, বলয়ের কব্জায় পড়ে আমরা জনতা উপ জাতের হয়ে চলি। কেউ ধর্মীয় রীতির,কেউ বংশগত জাতের, কেউ নেতার আদর্শের, কেউ পূর্ব পুরুষদের, কেউ নিজের মতো করে বিবাদ তৈরী করে ভিন্ন ভিন্ন জনতায় রূপ নিয়েছে। ফলে জনতার ঐক্য নেই কোথাও। জনতা যখন ঐক্য হারায়,টাকার কাছে বিক্রি হওয়া রপ্ত করে। তখন জনতার নিজ মতামতের মুল্য থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। গোলামীতে অভ্যস্ত জনতার হাতে ক্ষমতা থাকলেই কী বা না থাকলেই কী? যেখানে কতিপয় জনতা ক্রয়ের সুযোগ থাকে সেখানে টাকা যার ক্ষমতা তার হয়ে ওঠে। তাই জনতা টাকার হয়ে গেলে জিতে যায় টাকা হেরে যায় জনতা। অতএব, জনতার দেশপ্রেম, নিজ অধিকার সচেতনতার যেখানে অভাব সেখানে জনতা ক্ষণে আমার,ক্ষণে তোমার, মোদ্দাকথা,টাকা যায় ক্ষমতা তার হয়ে যায়। এই আম জনতায় সব জনতা আবার এক নয়। সবাই বিক্রি হয় না। নীতি আদর্শের বাস্তবায়নে একদল দেশপ্রেমিক জনতা বরাবরই দেশের জন্য, দশের জন্য, জনতার শান্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের তালিকা দীর্ঘ। তারা মহান। তাদের মাঝে আছে সব শ্রেণি,পেশা, রাজনৈতিক নেতা ও সমাজসচেতন, মানবিক জনতা। অতঃপর জনতার ভালো থাকার, জনতার সুখে থাকার প্রত্যাশা করে লেখার পরিসমাপ্তি ঘটালাম। শুভ কামনা আমজনতা।

লেখক- সাংবাদিক

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো. তাজবীর হোসাইন  

নির্বাহী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118243, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড