• বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা কতটা যথার্থ 

  ডঃ মোঃ কামাল উদ্দিন

২০ মে ২০২২, ১৪:৪৮
ডঃ মোঃ কামাল উদ্দিন
ডঃ মোঃ কামাল উদ্দিন (ছবি : সংগৃহীত)

দেশের প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা একটি ত্রুটিপূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারণ ও মেধার মূল্যায়নের নামে চলমান এই প্রক্রিয়ার রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে রয়েছে অযৌক্তিকতা।

সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল কলেজ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- কোনটিই ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত নয়। কারণ কোন ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় মাধ্যমিক (এসএসসি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের একটি অংশ ভর্তি পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বরের সাথে যোগ করে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল এবং মেধাক্রম প্রকাশ করে। এটি একটি আংশিক যথার্থ পদ্ধতি।

২০১৯ সালে Exploring Predictors of Academic Success of the First Year Undergraduate Students of the University of Dhaka শিরোনামে পরিচালিত একটি গবেষণায় ভর্তি পরীক্ষার মেধাক্রম এবং স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলের মধ্যে সহসম্পর্ক বা Correlation নির্ণয় করা হয়। দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক ও গ বিভাগের স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলের সাথে এইচএসসি পরীক্ষার সহসম্পর্ক থাকলেও এসএসসি পরীক্ষার কোন সহসম্পর্ক নেই। আরও বিশদভাবে বললে, এই গবেষণায় দেখা যায় যে, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় যারা মেধা তালিকায় উপরের দিকে অবস্থান করেছে, তারাই স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলে এগিয়ে রয়েছে। আর এই মেধা তালিকা তৈরি হচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসির জিপিএ এবং ভর্তি পরীক্ষার ফল থেকে। কিন্তু স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলে এগিয়ে থাকার সাথে এসএসসি নয়, বরং ভর্তি পরীক্ষার ফল এবং এইচএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএর ইতিবাচক সহসম্পর্ক (positive correlation) রয়েছে (Uddin, Raisa, & Hossain; 2019)। তাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ভর্তি পরীক্ষার সাথে মাধ্যমিকের প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে মেধা তালিকা তৈরি করা একটি অযৌক্তিক পন্থা। কেবলমাত্র এইচএসসি পরীক্ষার প্রাপ্ত জিপিএর একটি অংশ ভর্তি পরীক্ষার নম্বরের সাথে যোগ করা যেতে পারে। আর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের যোগ্যতা হিসেবে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকের জিপিএ কে একটি ন্যূনতম মানদণ্ড হিসেবে রাখা যেতে পারে। তবে সেটিও সম্পূর্ণভাবে বিতর্ক থেকে মুক্ত নয়। কারণ কেন একটি নির্দিষ্ট জিপিএ স্কোরকেই ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে রাখা হচ্ছে, এখন অবধি দেশে তার কোন গবেষণালব্ধ ভিত্তি নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার জন্য এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষায় যথাক্রমে জিপিএ ৪ এবং ৫ পাওয়া বাধ্যতামূলক। ৪ এর জায়গায় ৩.৫ বা ৫ এর জায়গায় ৪.৫ পেলে কেন সে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না এর কোন বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা নেই। জিপিএ কম বেশী হওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিয়ামক কাজ করে; এর জন্য একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতাকে সর্বদাই এককভাবে দায়ী করা অনুচিত। প্রথমত, বোর্ডভিত্তিক প্রশ্নের ভিন্নতা এর মূল কারণ। দেশের ১০ টি শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্ন তৈরি করা হয়। বলা বাহুল্য, প্রতিটি বোর্ডের প্রশ্নের কাঠিন্য এক রকম নয়। এক্ষেত্রে একই পরীক্ষায় দুই বোর্ডের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। একজন সহজ প্রশ্নের জন্য জিপিএ ৫ পেয়ে যাচ্ছে, অন্যজন কঠিন প্রশ্নের কারণে একই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তার থেকে কম গ্রেড পেয়ে যাচ্ছে। ফলে যারা সহজ প্রশ্ন পাচ্ছে তারা ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি আলাদা সুবিধা ভোগ করছে। অন্যদের তুলনায় এইচএসসি পরীক্ষার বেশী নম্বর যোগ হচ্ছে তাদের ভর্তি পরীক্ষায়। দ্বিতীয়ত, শহর ও গ্রামের স্কুল এবং কলেজের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা গ্রামের তুলনায় অধিক দক্ষ শিক্ষক থেকে শুরু করে কোচিং সুবিধা, একক পরিবারে শান্ত পরিবেশ অধিক পড়াশোনার সুযোগ ইত্যাদি ভোগ করে থাকে। এছাড়াও, গ্রামের স্কুল-কলেজের পরীক্ষার হলের পরিবেশও শহরের পরীক্ষার হলের পরিবেশ থেকে গুণগত মানের দিক দিয়ে আলাদা হয়, যা পরীক্ষার্থীর উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আরও একটি বিষয় হল, বোর্ড পরীক্ষাগুলোতে একজন মাত্র পরীক্ষক খাতা দেখেন। কিন্তু এটি কোনভাবেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। কারণ এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা রক্ষিত হয় না। এখানেই শেষ নয়; শহর এবং গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোর শিক্ষকদের দক্ষতায় পার্থক্য বিদ্যমান। ফলে এর দ্বারা খাতা মূল্যায়নও প্রভাবিত হয়। যা শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিচার বয়ে আনতে পারে না।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, দেশের ১০% পরীক্ষার্থী হয়ত সব রকম সুবিধা পেয়ে দুটো পরীক্ষায় জিপিএ ৫ অর্জন করে একটি ডবল বেনিফিট পেয়ে যাচ্ছে, তারাই ভর্তি হতে পারছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। অভিন্ন প্রশ্ন এবং অভিন্ন পদ্ধতি না থাকায় সমগ্র প্রক্রিয়াটি standardized! হচ্ছে না। ফলে এই ক্ষেত্রে দেশের সকল শিক্ষার্থী সমান নাগরিক সুবিধা পাচ্ছে না।

দেশের সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২ টি পন্থা অনুসরণ করতে হবে। প্রথমত, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। যার মাধ্যমে বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ন্যূনতম কত জিপিএ থাকা উচিত। দ্বিতীয়ত, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জিপিএর কত শতাংশ ভর্তি পরীক্ষার সাথে যোগ করা হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর থেকে প্রতিটি ইউনিটে মোট ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ভর্তি পরীক্ষার ১০০ নম্বর এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ১০ নম্বর করে মোট ২০ নম্বর রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার সাথে এসএসসি পরীক্ষার জিপিএ যোগ করা বাদ দিতে হবে, পরিবর্তে রাখতে হবে শুধু এইচএসসির জিপিএ। তেমনিভাবে দেশের অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়ও এই ধারা অনুসরণ করতে হবে। তাহলে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার মূল্যায়নে বৈষম্য তৈরি হবে না।

২০১৯ সালের উক্ত গবেষণায় আরও দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান (ক) ও বাণিজ্য (গ) বিভাগের ভর্তি পরীক্ষার সাথে স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলের ইতিবাচক সহসম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু মানবিক বিভাগের ক্ষেত্রে তার বিপরীত। অর্থাৎ, ক ও গ বিভাগের মেধা তালিকায় যারা উপরের দিকে অবস্থান করেছে সাধারণত তারাই স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলে এগিয়ে রয়েছে। মানবিক বিভাগের ক্ষেত্রে এর বিপরীত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যারা ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় যত উপরের দিকে ছিল, স্নাতক ১ম বর্ষের ফলাফলে তারা তত নিচের দিকে রয়েছে; অর্থাৎ, দুটোর মধ্যে ঋণাত্মক সহসম্পর্ক (negative correlation) দেখা যায় (Uddin, Raisa, & Hossain; 2019)। এর কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান-এই ৩ টি বিষয়ের প্রশ্ন রাখা হয়। কিন্তু মানবিক বিভাগে আবেদন করা শিক্ষার্থীরা মেধাক্রম অনুসারে ৪০ টি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ পায়। সেসব বিষয়ে পড়ার যোগ্যতা নিরূপণের জন্য ভর্তি পরীক্ষার উক্ত ৩ টি বিষয়ের মুখস্থবিদ্যা যথেষ্ট নয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, বাংলা ও ইংরেজি বিভাগে পড়ার জন্য যথাক্রমে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা সংক্রান্ত জ্ঞান প্রয়োজন। কিন্তু অর্থনীতি পড়ার জন্য গণিতে দক্ষ হতে হবে। আবার মনোবিজ্ঞান পড়ার জন্য ইংরেজি ভাষাজ্ঞান এবং গাণিতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা প্রয়োজন। আইন বিষয়ে পড়ার জন্য আবার দরকার বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তনশক্তি। কিন্তু মানবিক বিভাগের ভর্তি পরীক্ষায় এসব দক্ষতা নির্ণয় করার কোন ব্যবস্থা নেই। একই চিত্র লক্ষ্য করা যায় গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষায়। সেখানে মানবিক বিভাগে ভর্তির জন্য পরীক্ষা নেয়া হয় বাংলা, ইংরেজি ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ের উপর; যা মানবিক বিভাগে থাকা সব বিষয় পড়ার জন্য যথার্থ যোগ্যতার মানদণ্ড হতে পারে না কোন ভাবেই। কারণ শুধু মাত্র ভাষা জ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যায় পারদর্শিতা আইন, ভূগোল, মনোবিজ্ঞান, অর্থনীতি, অপরাধ বিজ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণা প্রভৃতি বিষয় পড়ার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই এক্ষেত্রে মানবিক বিভাগের ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোতে আনতে হবে পরিবর্তন। ভাষা জ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের পাশাপাশি এসব চিন্তনশক্তি ও মানসিক দক্ষতা নির্ণায়ক প্রশ্ন রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। অর্থাৎ, ভর্তি পরীক্ষা হতে হবে Aptitude test। কারণ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা নানাবিধ Achievement test দিয়ে থাকে, আর উচ্চ মাধ্যমিকের জিপিএর একটি অংশ যেহেতু ভর্তি পরীক্ষায় যুক্ত করা হয়, তাই ভর্তি পরীক্ষায় আর আলাদা করে Achievement test রাখার কোন যুক্তি নেই। একমাত্র Aptitude test নিলেই উপরোল্লিখিত দক্ষতা সমূহ নির্ণয় এবং যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন সম্ভব। আবার গুচ্ছ পরীক্ষার আরেকটি সমস্যা হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষার যাবতীয় শর্ত যদি একাধিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তবে আসন সংখ্যা পূর্ণ হয়ে গেলে পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে এখনও কোন নিয়ম করা হয়নি, সেক্ষেত্রে এক এক বিশ্ববিদ্যালয় এক এক রকম সিদ্ধান্ত নেয়।

একই পরীক্ষার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সেটে পরীক্ষা গ্রহণ ভর্তি পরীক্ষার আরেকটি ত্রুটি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একই বিভাগের পরীক্ষা ৩ ভাগে অর্থাৎ ৩ সেটে নিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে প্রতি সেটের প্রশ্নও ভিন্ন হয়, প্রশ্নের কাঠিন্যও ভিন্ন হয়। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নে একই দক্ষতা যাচাই করাটা শিক্ষার্থীদের প্রতি একটি সুস্পষ্ট অবিচার। ধরা যাক, কোন এক সেটে আগে একটি সহজ প্রশ্ন আছে। পরীক্ষার্থী সহজ প্রশ্ন দিয়ে উত্তর দেয়া শুরু করল, তার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গেল, পরে সে কঠিন প্রশ্নগুলোর দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু অন্য এক সেটে যদি প্রথমেই কঠিন প্রশ্ন থাকে, তাহলে পরীক্ষার্থী শুরুতেই ঘাবড়ে গিয়ে জানা জিনিস ভুল করে পরীক্ষা খারাপ করতে পারে। আর সেটগুলোর প্রশ্নও ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ন্যায়সঙ্গতভাবে হচ্ছে না। অবৈজ্ঞানিক পন্থায় ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার ক্ষেত্রে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবরকম অনাচারকে ছাড়িয়ে গেছে দেশের মেডিকেল কলেজগুলো। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ভয়াবহভাবে অযৌক্তিক এবং মেধার চূড়ান্ত অবমাননা।

৩০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষায় ২০০ (৭৫+১২৫) নম্বর বরাদ্দ থাকে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসির প্রাপ্ত জিপিএর উপর। যা কিনা ভর্তি পরীক্ষার দুই-তৃতীয়াংশ! আর মাত্র ১০০ নম্বর বরাদ্দ থাকে ভর্তি পরীক্ষার উপর।

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, মেডিকেলের মতো তাৎপর্যপূর্ণ জায়গায় প্রবেশের জন্য যোগ্যতার সিংহভাগই কি তবে নির্ধারিত হচ্ছে পূর্বের Achievement test গুলো থেকে? যোগ্যতা যাচাইকরণের নামে এটি কি তবে একটি হাস্যকর প্রহসন নয়?

আগেই বলা হয়েছে, উপরন্তু বোর্ড পরীক্ষায় দেশের ১০ টি বোর্ডের প্রশ্ন কাঠিন্যের দিক দিয়ে ভিন্ন হয়। ফলে একই পরীক্ষায় একজন জিপিএ ৫ যত সহজে অর্জন করতে পারছে আর একজন একই সামর্থ্য ও শ্রম দিয়ে হয়ত জিপিএ ৪.৫ অর্জন করছে। এই সুস্পষ্ট বৈষম্য কি মেধার যথাযথ মূল্যায়নের পথে একটি বৃহৎ অন্তরায় নয়? ১০০ নম্বরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান থাকলেও গাণিতিক দক্ষতা বিষয়ক কোন প্রশ্ন থাকে না; চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার জন্য যা একান্ত প্রয়োজন। শুধু তাই নয়, একজন চিকিৎসকের পেশাগত জীবনে রোগ নির্ণয় (Diagnosis), রোগীর সাথে পেশাগত সম্পর্ক স্থাপন (Rapport), চিকিৎসা বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Treatment plan) ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানসিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার গুরুত্ব অপরিসীম। রোগীর সাথে কথোপকথন ও সমস্যা অনুধাবন শুধু মাত্র স্মৃতি শক্তির জোরে বা পঠিত বিষয়লব্ধ জ্ঞানের দ্বারা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন যুক্তিসঙ্গত চিন্তন ও বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা। এছাড়াও চিকিৎসা পেশায় মনোগতীয় দক্ষতা (Psychomotor skills) অপরিহার্য। যেমন রোগী পরীক্ষা (Physical Assessment) এবং অস্ত্রপাচারের (Surgery) সময় হাতের কাজ কতখানি দক্ষতার সাথে করতে পারে, সেটি একজন সফল চিকিৎসক হওয়ার ক্ষেত্রে একটি অতীব জরুরি পূর্বশর্ত।

কিন্তু প্রচলিত রীতির মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শিতা ছাড়া এসব অত্যাবশ্যকীয় দক্ষতা যাচাই করার কোন ব্যবস্থা নেই। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, আসলেই কি দেশের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিজীবী বাছাইকরণের এই প্রক্রিয়া যোগ্যতার নির্ণায়ক না মেধার অবমূল্যায়ন? এই চূড়ান্ত অসাম্য দূরীকরণে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। মেধাতালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এসএসসির নম্বর বাদ দিয়ে কেবলমাত্র এইচএসসির নম্বরের কিছু অংশ রাখতে হবে। আর ভর্তির মূল পরীক্ষার জন্য Aptitude test নিতে হবে, যাতে ডাক্তারি পেশা ও গবেষণার জন্য উল্লিখিত প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিরূপণ করার মতো প্রশ্ন থাকবে।

উল্লেখ্য যে, উপরোল্লিখিত দক্ষতা সমূহ মেডিকেলে পড়ার সময়ও অর্জন করা সম্ভব তবে ভর্তি পরীক্ষার সময়ই এগুলো যাচাই করে নিলে মেডিকেলে পড়ার ক্ষেত্রে সকল শিক্ষার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়। যেমন কোন শিক্ষার্থী হয়তো হাতের কাজ ভালো জানে; অস্ত্রপাচারের মতো কাজগুলো সে ভালো পারবে। তার বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান কিছুটা কম থাকলেও মেডিকেলে ভর্তির সময় সে যাতে তার অন্য দক্ষতাটুকু প্রমাণ করার সুযোগ পায়, সেটা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জন হেনরি নিউম্যানের মতে, “একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় হল চিন্তাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি দল যারা বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যসাধনের লক্ষ্যে নিয়োজিত। যা শিক্ষার্থীদের চিন্তা-ভাবনা, কার্যকারণ অনুধাবন, বিশ্লেষণ এবং সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নিরূপণের মতো উচ্চতর পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে।“

আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করতে হলে প্রয়োজন যোগ্য শিক্ষার্থী, কিন্তু যোগ্য শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সমানাধিকার নিশ্চিত না হলে তা বাস্তবায়িত হতে পারে না। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভর্তি পরীক্ষা নামক প্রতিযোগিতার উপর একটি সম্ভাবনাময় জীবনের গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার এই প্রক্রিয়াগত এবং গুরুত্বগত পার্থক্য একটি বহুবিচিত্র খামখেয়ালীপনা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর ফাঁদে পড়ে অকাল মৃত্যু হচ্ছে অগণিত প্রতিভার। এটি একধরনের ব্রেন ড্রেন বা মেধার অপচয়। তাই উচ্চ শিক্ষার জগতে যোগ্য শিক্ষার্থীদের প্রবেশের সমান অধিকার ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই ভর্তি পরীক্ষার কাঠামোতে অতিসত্বর প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা একান্ত প্রয়োজন।

লেখক : ডঃ মোঃ কামাল উদ্দিন অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ওডি/এসএস

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড