• বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আমরা কী সত্যিই দুর্নীতি দূর করতে চাই?

  রহমান মৃধা

১৫ মে ২০২২, ১৪:৫০
আমরা কী সত্যিই দুর্নীতি দূর করতে চাই?
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

হঠাৎ ছোটবেলার একটি গল্প মনে পড়ে গেল। সে বহু বছর আগের কথা। পাশের গ্রামে সম্পর্কে দানা হন, মারা গেছেন। দেখতে গিয়েছি, দাদি কান্না করছেন আর নানা কথা স্মৃতিচারণ করছেন। যেমন বলছেন- তোর দাদা মিষ্টি খেতেন না, গোস খেতেন না ইত্যাদি। আমি বেশ ছোট, দাদির কান্নার সুরে কথাগুলো শোনার পর একটু কৌতূহল হলো এবং দাদিকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা দাদি, দাদা মিষ্টি, গোস এসব খাতেন না কেন? দাদি বেশ জোর গলায় কান্নার সুরে বলেছিলেন, ‘পাতেন না তাই খাতেন না।’

আমরা যারা পশ্চাতে বিশেষ করে সুইডেনে বসবাস করি আমাদের অবস্থা হয়েছে অনেকটা গ্রামের সেই দাদার মতো। আমাদের উপায় নেই তাই হয়ত আমরা দুর্নীতি করতে পারি না। না পারার কারণ এখানকার পরিকাঠামো এতো মজবুত অন্যায় করার উপায় নেই বললেই চলে, ফলে সবাই ভালো হতে বাধ্য এখানে।

যাই হোক ‘টাচ অফ টেস্ট’ বেশ পরিচিত একটি অভিব্যক্তি (এক্সপ্রেশন)। নানাভাবে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। আমি অতীতে লেখালেখির শুরুতে একটি বিষয়ের উপর ছোঁয়া দিয়েছিলাম তা হলো দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে প্রযুক্তির যুগে ক্যাশ টাকার পরিবর্তে কার্ডের মাধ্যমে শতভাগ কেনাবেচা চালু করা যেতে পারে।

এটা ছিল কিছু চিন্তাধারা এবং ভালোমন্দের ওপর চোখের পলকে একটু ঝলক। আমার সেদিনের সে ঝলক ছিল অনেকের কাছে স্বপ্নের দৃশ্য, যা নতুন প্রজন্মের জন্য মিশন, ভিশন এবং পলিসি।

আজ সেই ঝলক আর ঝলক বা টাচ নেই, আজ তা বাস্তবে রূপ নিতে চলছে। আজ সেই কার্ডের মাধ্যমে বেচাকেনার ওপর পরিষ্কার একটি ছবি তুলে ধরবো, যা শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তব জীবনের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

সুইডেনের শতভাগ কেনাকাটাতে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং সুইডেন প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্বের ফ্রন্ট পেজে রয়েছে। ভিসা, মাস্টার কার্ড, আমেরিকান এক্সপ্রেস এবং সুইচ অ্যাপসের ব্যবহারে এক অগ্রগামী জাতি হিসাবে বিশ্বে পরিচিত হতে চলেছে।

আরও পড়ুন : শিক্ষার মূল রহস্য হোক অনুরাগ সৃষ্টি

টেলিফোন, টেলিভিশনের ব্যবহারে কোনো এক সময় ক্যাবল ছাড়া কথা বলা বা ছবি দেখা সম্ভব ছিল না। আজ ক্যাবল (ওয়ারলেস) ছাড়াই আমরা টেলিফোন এবং টেলিভিশন ব্যবহার করছি।

প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির কারণে সব কিছুর পরিবর্তন শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতায় শুধু অংশগ্রহণ নয়, টিকে থাকার জন্য অনেকে উঠে পড়ে লেগেছে।

দেশে অরাজকতার মূল কারণ কী, তা যদি সনাক্ত করা না হয়, তবে কোনো দিনও সম্ভব হবে না দুর্নীতিমুক্ত পরিবার, সমাজ বা একটি দেশ গড়ে তোলা। যুগ যুগ ধরে ধর্ম, পুলিশ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এসব সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর কোথাও কখনো অন্যায়কে অ্যালিমিনেট করতে পারেনি।

বরং পরিবার, সমাজ এবং দেশে দুর্নীতি, অবিচার এবং অত্যাচারের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছে। বর্তমান পৃথিবীর সকল সমস্যার যেমন চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, দুর্নীতি, ঘুষ, বাজেটে ফাঁকি, চিকিৎসায় ফাঁকি, কেনাকাটায় ফাঁকি, খাদ্যে ভেজাল সবকিছুর মূলে কাগজের টাকা বিনিময় জড়িত।

সততার অবনতি বা অবক্ষয় রোধে সৃষ্টি হয় সিস্টেমের। মানব জাতিকে শাসন, শোষণ বা ভাষণে নয় সিস্টেমের সাহায্যে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। সিস্টেম বা পদ্ধতির পরিবর্তন করলে হাজার ইচ্ছে থাকলেও উপায় থাকবে না দুর্নীতি বা অন্যায় করার।

কেনাবেচা, আদানপ্রদান বা বিনিময় যখন নথিভুক্ত উপায়ে (ডকুমেন্টেড ওয়ে) হবে তখন হিসাবে গড়মিল হলে বা দুর্নীতির মধ্যে অর্থ পাচারের চেষ্টা করলে সহজ উপায়ে তা সনাক্ত করা সম্ভব হবে।

সুইডেনে আমি প্রতিদিন কোথায়, কখন, কাকে, কীভাবে কত টাকা দিয়েছি বা কী কিনেছি সবকিছুর মনিটরিং হচ্ছে। নিচের স্ক্রিন শট ছবিটি আমার দৈনন্দিন অর্থনৈতিক ট্রানজেকশনের একটি উদাহরণ, যা আমি আমার ক্রেডিট কার্ডে কেনাবেচা করেছি। যদিও সুইডিশ ভাষা তবুও সবার অবগতির জন্য স্ক্রিনশট ছবিটি লেখার সাথে যুক্ত করলাম।

চার্ট (ছবি : সংগৃহীত)

কাগজের টাকার মাধ্যমে কোনোরকম কেনাবেচা নেই এখানে। যা ঘটছে তার সবকিছুই ডকুমেন্টেড হয়ে রয়েছে। বর্তমান যুগে সহজ উপায়ে নানা ধরণের যন্ত্রপাতির সাহায্যে কেনাকাটা বা মনিটরিং করার ব্যবস্থা রয়েছে। আমার প্রশ্ন জাতির কাছে, আসলে কি আমরা পরিবর্তন চাই?

আরও পড়ুন : রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা শুধু জনগণের কাছেই থাকার কথা

আমরা কি সবাই মিলেমিশে সুন্দরভাবে বসবাস করতে চাই? নাকি যেমন আছি তেমন থাকতে চাই? যারা সৎ পথে চলতে রাজি তারা বলবে ইয়েস, আমরা পরিবর্তন চাই।

বাংলাদেশ যেহেতু স্যাটেলাইট আকাশে পাঠিয়েছে তাই প্রত্যাশা থাকতেই পারে সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো। শুধু বাংলাদেশ নয় আশেপাশের দেশও কাগজের টাকা ধরে রাখতে চায় কারণ একটাই তা হলো দুর্নীতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকা।

একই সঙ্গে লোক দেখানোর জন্য গঠন করা হয়েছে দুর্নীতি বিভাগ যা কাইন্ড অব গুড ফর নাথিং। উদ্দেশ্য যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া হয়, তাহলে কাগজের টাকাযুক্ত পদ্ধতির ব্যবহার ছেড়ে ক্রেডিট কার্ডে কেনাবেচা করতে কষ্ট কোথায়?

দেশের বাজেট প্রক্রিয়ায় বিশাল আকারে দুর্নীতি যা দিন দিন বেড়ে চলছে। এসব সমস্যা থেকে রেহাই পেতে সিস্টেমের আবির্ভাব ঘটানো ছাড়া আছে কি অন্য কোনো সমাধান? আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে পুরো পৃথিবী কাগজের টাকার লেনদেন বন্ধ করে দিবে।তখন কালো টাকা কিভাবে সাদা হবে তা আমি জানি না। তবে ধরা খেতে হবে এ বিষয় আমি নিশ্চিত।

সরকারের উচিৎ হবে দেশে কাগজের টাকা ধাপে ধাপে বন্ধ করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। বাংলাদেশে এ ধরণের ব্যবস্থা হলে দরগায় মন দিতে হবে না, মিথ্যে ফকির সাজা লাগবে না, অন্তর থাকবে সুন্দর এবং সাধনা বিফলে যাবে না।

যেহেতু বর্তমানে দেশে অঢেল পরিমাণ দুর্নীতি চলছে তাই পুরো জাতির মনুষ্যত্বের অবক্ষয় ঘটে চলেছে। এর থেকে রেহাই পেতে হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ নামে নয়, তা কামে দেখাতে হবে। জানি প্রিয় দেশবাসীর অনেকেই আমার এই ধারণাকে অপছন্দ করবে।

তবে এই অপছন্দই হবে নতুন প্রজন্মের জন্য বেঁচে থাকার এক স্বপ্ন। আমি বিশ্বাস করি, জন্মের সাধ মেটাতে এবং মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে সততার বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন : দেখা হয়েছিল পূর্ণিমা রাতে

মরতে সবার হবেই, শুধু কবে তা আজও অজানা। ঘৃণা নয় প্রীতি, দুর্নীতি নয় নীতি, অন্ধকার নয় আলো, তাই তো পৃথিবী তোমারে বাসি ভালো। ভুবন কাঁদিবে আমি চলে গেলে, মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে আমার কর্মের ফল, যে কর্মের ফলে থাকবে না ঘৃণা। থাকবে শুধু সবার প্রাণঢালা ভালোবাসা; এটাই হোক সেই অজানা দিনগুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে যাবার নতুন স্বপ্ন এবং সাধনা।

লেখক : সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড