• রোববার, ০৩ জুলাই ২০২২, ১৯ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ন্যায়বিচার

  রহমান মৃধা

২৭ এপ্রিল ২০২২, ১৫:৫৬
ন্যায়বিচার
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

বাংলাদেশে পুরুষ নারীকে বিয়ে করে বেশিরভাগ সময় যৌতুক নিয়ে। হাটে-বাজারে কাজের লোক কেনারও প্রথা রয়েছে সেখানে। নারীকে কাজের লোকের মতো করে ব্যবহার করা হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। বাবার সম্পদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় বিয়ের পরে। হিন্দু মুসলিম বলে কথা নেই নারীর প্রতি অবিচার এখনো বিরাজমান সেখানে। মজার ব্যাপার হলো- সেখানে বহু যুগ ধরে নারীশাসন চলা সত্ত্বেও এসবের পরিবর্তন নেই।

জনৈক মহিলা বহু বছর বাংলাদেশে থেকেছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারে, বাড়ি ইতালি, গ্রামের নাম গায়েতা। ইতালি চিকন এবং লম্বা একটি দেশ, চারিপাশে সাগর। ছোট্ট একটি কফি শপ তার, বিশ্বের নানা দেশের মানুষের আনাগোনা সেখানে। আমি যে বসে আছি সেখানে সে খেয়াল তার নেই। জিজ্ঞেসও করেনি আমি কোন দেশের। কথা বলছে আমেরিকান এক মহিলার সাথে, মহিলাও বেশ তাল মিলিয়ে আলোচনা করে চলছে। আমি বেশ কৌতূহলের ছলে বসে বসে সব শুনছি আর কফি পান করছি।

আমার সঙ্গে রয়েছে আমার সহধর্মিণী মারিয়া। মারিয়া দুইবার বাংলাদেশে গিয়েছে বটে তবে অনেক আগের কথা। এরপর তার জার্নি ছিল স্বল্প সময়ের জন্য। এতকিছু সম্পর্কে তার তেমন ধারণা না থাকারই কথা। তারপরও সে সব শুনছে এবং মাঝেমধ্যে আমাকে সুইডিশে বলছে, ‘কই’ তোমার বাবাকে তো দেখিনি তোমার মাকে এমন করে ট্রিট করতে যা মহিলা বলছে? তোমারও তো তিনটি বোন আছে, ‘কই’ এসব কথার সাথে তো কোনই মিল পাওয়া যাচ্ছে না?

তুমি প্রতিবাদ কর নইলে মহিলা তোমার দেশের সম্পর্কে এইভাবে ভুল তথ্য ছড়াবে। কী জানি কতদিন ধরে মহিলা এভাবে ছাড়াচ্ছে? আমি মারিয়াকে বললাম আজ কোনো কথা নয়, কাল এখানে আসবো তখন মহিলার সঙ্গে পরিচিত হবো এবং জানব কিভাবে মহিলা এত সব তথ্য সম্পর্কে অবগত, আর কী তার উদ্দেশ্য। পরের দিন আবারও এসে হাজির, কিছু না বলতেই জিজ্ঞেস করলো আমি কোন দেশের? বললাম, আমি বাংলাদেশি।

মহিলা শুরু করলো বাংলাদেশের বিচারবিভাগ থেকে শুরু করে নারী-পুরুষের ব্যবধান তারপর দুর্নীতি-অনীতি ইত্যাদি। যা আমি নিজে জানি, সে মহিলাও তা জানে, সেইসাথে জানে আরও অনেক তথ্য। বেশি কিছুতে দ্বিমত পোষণ করতে পারলাম না। পরে জানতে পারলাম মহিলা বহু বছর বাংলাদেশে বসবাস করেছে।

বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশি অন্যায়, অপকর্ম, দুর্নীতি, দলীয় প্রভাব বিস্তারসহ নানা ধরণের অমানবিক কার্যকলাপ হয়ে থাকে। এ কারণে আইনি শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান। কিন্তু বাংলাদেশের আইনের শাসন একটু ব্যতিক্রম। এখানে সকল অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন, গুম-খুন সবকিছুই অবাধে চলছে। কারণ হলো সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থার অভাব। সবখানেই ক্ষমতার অপব্যবহার। অনেকে অপরাধী হওয়া স্বত্বেও ছাড়া পেয়ে আরও বেশি দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এরা সমাজে অমানবিকতার বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। যার ফলে দেশ আজকে এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

আরও পড়ুন : বয়স ১৮ হলেই বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ

সমাজের সবখানেই আজ এরকম বৈষম্য। সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারও বলা যায় হুমকির সম্মুখীন! প্রতিটা জায়গাতেই সাধারণ মানুষ অগ্রহণযোগ্য, বিতাড়িত। পক্ষান্তরে, দেশের প্রশাসন সরকারি ইউনিফর্ম পরে মানবসেবার বদলে আজ চরম বিধ্বংসী ও বেপরোয়া। কিছুতেই থামছে না তাদের হত্যাযজ্ঞ! আমরা জাতি হিসেবে এখন আতংকিত ও ভীষণ চিন্তিত।

প্রশাসনের প্রতিটি সেক্টরেই ভয়াবহ পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ লক্ষণীয়। তাদের ছত্রছায়ায় না থাকলে বিচার পাওয়া তো দূরের কথা বিচার চাওয়াটাই অপরাধ। দুর্বলতার সুযোগে ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার করে প্রশাসনের লোকজন এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের বিচার চাওয়ার অধিকারতো বহু আগেই খর্ব করা হয়েছে।

দেশের বিজ্ঞ আইনজ্ঞরা বা প্রশাসনের কর্তারা একবারের জন্যও উপলব্ধি করছে না যে- একজন সাধারণ মানুষ যদি এরকম অন্যায়ভাবে গুম-খুনে অভিযুক্ত বা হয়রানির শিকার হয় তবে তার পুরো পরিবারটিই হয়তো সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়বে!

ভুক্তভোগী একটু প্রভাবশালী বা নিজেদের লোক হলে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপে প্রশাসনকে মাঝেমধ্যে কিছুটা নড়েচড়ে বসতে দেখা যায়। সকল মিডিয়া ব্যাপক সরগরম থাকে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। সুযোগসন্ধানী সাংবাদিকেরা স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে শুরু করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা, বেরিয়ে আসে গা শিউরে ওঠা ও কাঁপন ধরানো ভয়ংকর সব কর্মকাণ্ড! এসব দেখে আমরা সহজ-সরল মানুষগুলো ধরে নিই, এবার বুঝি আইনের শাসন কায়েম হলো! কিন্তু আদৌ কি তা হয়?

ইদানীং প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা বড় বড় কর্তাব্যক্তিবর্গ দায়িত্ব নিয়ে বিচারের নির্দেশ দিচ্ছেন, সঠিক বিচারও হয়তো হচ্ছে, তবে যে সকল সাধারণ মানুষ হয়রানি বা হেনস্তার শিকার হয়ে দীর্ঘদিন যাবত বিচার না পেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরে পেরেশান হয়ে সব খুইয়ে দিশেহারা, তাদের দায়িত্ব কে নিবে? তাদের বিচার কিভাবে হবে, কে করবে? যদিও দেশে বিচারবিভাগ বলে একটি মস্তবড় বিভাগ রয়েছে তা সত্ত্বেও সব কিছু পরিচালনা হচ্ছে একনায়কতান্ত্রিক প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে। কিন্তু কেন?

কেউ এটা ভেবে ভুল বুঝবেন না যে, আমি ইটালির মহিলাকে সাপোর্ট করেছি। সাপোর্ট দিলে তো ঘটনাটি শেয়ার করতাম না। আমি দল-মত নির্বিশেষে সকল সাধারণ ও ভিআইপি নারী পুরুষকে একই মানদণ্ডে দেখতে চাই। যেখানে থাকবেনা কোনো ধর্মীয় বা দলীয় বিচার-বিশ্লেষণ, বিবেচিত হবেনা কে গরীব কে ধনী বা ক্ষমতাসীন আর কে ক্ষমতাহীন।

আরও পড়ুন : দেখা হয়েছিল পূর্ণিমা রাতে

সবাই স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সঠিক ও ন্যায়বিচার পাবে। এখন প্রশ্ন হলো ‘ন্যায়বিচার’ কি? শাস্তি এবং পুরস্কারের পদ্ধতিগত বণ্টন। পূর্বাকাশে প্রতিদিন যেমন রবির কিরণ দেখি ঘুম থেকে উঠে, কেন প্রতিদিন দেখিনে একটি ন্যায়বিচার! আমি যে আজও তারই অপেক্ষায়, কবে দেখব সেটা!

লেখক : সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড