• রোববার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ৯ মাঘ ১৪২৮  |   ২৩ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

বিকাশ না ঘটলে প্রতিভা মূল্যহীন

  রহমান মৃধা

০৭ জানুয়ারি ২০২২, ১৬:৩৩
বিকাশ না ঘটলে প্রতিভা মূল্যহীন
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

মৌমাছি পোকামাকড় জগতের প্রাণী, ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় মৌমাছিরা তাদের পা এবং বুকের লোমে ফুলের অসংখ্য পরাগরেণু বয়ে বেড়ায়। এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলের গর্ভমুণ্ডে পড়লে পরাগায়ণ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে উৎপন্ন হয় ফল। এভাবে মৌমাছিরা পরাগায়ণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে ফল ও ফসলের উৎপাদন বাড়ায়। তাছাড়া মধু সঞ্চয় করে এবং সেই সঞ্চিত মধু মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হয়। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে যে মৌমাছির মতো ছোট প্রাণীর প্রতিভা এবং অস্তিত্বের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব নির্ভরশীল।

কাক পাখিজগতের প্রাণী, কাককে পাখিজগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়। আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, কাক যে কেবল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে তাই নয়, যন্ত্রপাতি নির্মাণেও এরা পারদর্শী। তবে কাক তার সঞ্চিত সঞ্চয় নিজে ভোগ করতে পারে না। বেশি চালাক তাই চোখ বন্ধ করে গোপন জায়গাতে সঞ্চয় করে যাতে করে অন্য কেউ দেখতে না পায়।

মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী জীব। অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতর ভাষার ব্যবহার করতে সক্ষম। কারণ মানুষের রয়েছে জটিল মস্তিষ্ক যা খুবই উন্নত।

আমি নিজে মাঝে মধ্যে কল্পনার যুগে বাস করি এবং গল্প করি। তবে গুজব ছড়ানোর জন্য নয়, নিজেকে ইনোভেটিভ করার চেষ্টা মাত্র। বর্তমান বিশ্বে সাইবার অ্যাটক বা হ্যাক হবার ঘটনা গুজব নয়। যে ঘটনাগুলো এখন কিছুটা বেশি করে ছড়ানো হচ্ছে যেমন শরীরে বা ব্রেনে চিপ ঢোকানো এবং সকল তথ্য সংগ্রহ করা বা ব্যাংক থেকে টাকা গায়েব করা।

অনেকে গোপন তথ্য জানার জন্য অনেক তথ্য প্রয়োগ করছে, যা সিনেমার জগতে সম্ভব হচ্ছে। তবে হ্যা ভবিষ্যতে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারের দ্বারা এমন নিউরো চিপ হয়তোবা স্থাপন করা হবে যাতে করে কারো দ্বারা বিধ্বংসী কোনো কিছু ঘটতে না পারে।

এটার পক্ষে এবং বিপক্ষে অনেক রিসার্চও চলছে। সিনেমার জগতের অনেক আজগবি কাণ্ড মানুষ তার কল্পনায় এনে ছড়াচ্ছে। আমরা এমন এক ভয়ংকর পৃথিবীতে বাস করছি কখন কী ঘটে বলা মুশকিল। তারপরও বলতে চাই অন্যায়-অত্যাচার যখন সীমাহীন তখন অনেক অসত্যও সত্যে পরিণত হতে পারে।

তবে সত্যিই যদি হ্যাকারদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে তাহলে আমরা কেউই নিরাপদে বসবাস করতে পারব না। বিশেষ করে যে কোনো সময় আমরাও আক্রান্ত হব। কারণ মানুষই পারে মানুষের জীবনে আনন্দ ফিরিয়ে দিতে, মানুষই হতে পারে মানুষের জীবনের বেদনার কারণ। মানুষই লোভে পড়ে মানুষের সব লুট করে এবং নির্লজ্জের হাসি হাসে। মানুষই কেড়ে নেয় মানুষের অধিকার, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, আশা, সব। বিশ্বে ভয়ংকর চরিত্র মানুষ, অন্য কেউ নয়।

আবার কিছু কিছু মানুষ সারাক্ষণ জ্ঞানচর্চায় মগ্ন। মনে হয় তাদের জন্মই হয়েছে জ্ঞান সঞ্চয় করার জন্য। এমনও দেখা যায় কিছু কিছু মানুষ রয়েছে তারা কিছু না করেই জীবন পার করে দেয়।

আরও পড়ুন : চিন্তা, ভাবনা, কল্পনা আর স্বপ্ন

কিছু মানুষ শুধু অর্থ সঞ্চয়ে ব্যস্ত, কিছু মানুষ অর্থ অপচয়ে ব্যস্ত। কিছু মানুষের মেধা আছে, অর্থ আছে, অথচ ব্যবহার নেই।

ভাবতেই অবাক লাগে যে কাকের মতো ছোট প্রাণীর বুদ্ধি, প্রতিভা এবং অস্তিত্বের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব এবং চরিত্রের এত মিল! কারণ দিন শেষে বৈশ্বিক বিশ্লেষণে ক্ষমতাধর আর নিরীহ সমস্ত প্রাণই নিঃসঙ্গ একা অসহায়। তার সমস্ত সংকট-সম্ভাবনা একান্তই নিজস্ব। কী সাংঘাতিক নিয়ম প্রকৃতি-চরিত্রের।

প্রকৃতি, পৃথিবী এবং মানুষের কথা ভাবতে তিনটি প্রাণীর মধ্যে মিল এবং অমিল নিয়ে যখন তুলনা করছি ঠিক তখনই মনে পড়ে গেল ১৯৭১ সালের কথা। বাঙালির প্রতিভার সত্যি বিকাশ ঘটেছিল সে সময়। সত্যিকার দেশপ্রেমিক গ্রামের সাধারণ মানুষ মৌমাছির মতো প্রতিভা নিয়ে অস্তিত্বের জন্য লড়াই করেছিল।

কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরও সেই মানুষগুলো পরাধীনই থেকে গেল।

এটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়। আমি তখন ছোট, গ্রামে বসবাস, হাসিখুশি আর তামাশার মধ্যে শিশুকাল পার হবার কথা। বয়স আর কত? দশ হবে! একটি দশ বছরের ছেলের নিকট থেকে পরিবার, সমাজ, দেশ এমনকি বিশ্ব কী আশা করে? তেমন কিছু না।

একটি ডিম বাইরের চাপে ভেঙে যায় আর ভেতরের চাপে সেই ডিম থেকে সৃষ্টি হয় এক নতুন জীবনের।

৭১ এর যুদ্ধে বাঙালি জাতির ভেঙে যাবার কথা কিন্তু স্বাধীনতার চেতনা জাতিকে জাগ্রত করে রেখেছিল। এমনভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি তখন যে বয়স দশ বছর তাতে কী যায় আসে? দরকার কোনো বাঁধা মানে না বয়স তো দূরের কথা।

আরও পড়ুন : শুধু শপথের বাণী পড়লে হবে না, ঘটাতে হবে প্রতিফলন

মনে কি পড়ে? গত কয়েক বছর আগে কথা। রাস্তায় মা অসুস্থ হয়ে মরার সঙ্গে যুদ্ধ করছে সেই যুদ্ধে ছোট্ট দুটি শিশু মাকে যুদ্ধে জয়ী করতে সাহায্য করছে ফুটপাতে। ঘটনাটি ফেসবুকের মাধ্যমে আমার নজরে পড়ে। দূরপরবাস থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলাম। পরে সরকার বিশেষ করে একজন মহিলা ডিসি, পরিবারের দায়ভার নিয়েছিলেন। কত হবে বাচ্চা দুটোর বয়স, বড় জোর ৫-৭ বছর, কিন্তু তারা জানত যে, মা মরতে পড়েছে। যদি মা না বাঁচে তাহলে আমাদেরও মরণ।

আমারও পরাণে তখন সেই অল্প বয়সে (১৯৭১ সালে) চিন্তা ঢুকেছিল কী হবে যদি মাকে সাহায্য না করি? কিভাবে তিনি একলা সামলাবেন এতকিছু? বাবা এবং বড় তিন ভাই নেমেছে মুক্তির সংগ্রামে। কেউ লড়ছে অস্ত্রহাতে, কেউ লড়ছে প্রতিভা দিয়ে।

৯ মাসের যুদ্ধে শুধু সংগ্রাম করেছি কিভাবে টিকে থাকা যায়, মুক্তি পাওয়া যায় জালেমদের হাত থেকে। নিজ জন্মস্থান থেকে বিতাড়িত হয়েছি বার বার। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে গ্রাম, বাজার, ঘর। আশ্রয় নিয়েছি তৎকালীন মাগুরা মহকুমা এবং নড়াইল মহকুমার বিভিন্ন গ্রামে। কত রাত কত দিন পার করেছি এক মুঠো খাবার জোটেনি। দেশ পানিতে ভাসমান, একটু লবণ বা একটি মরিচ কেনার মতো তৌফিক নেই কারও। পাওয়া তো দুষ্কর তার পর সেযে কী দাম?

দেখেছি মানুষের দুঃখ, শুনেছি অনেক মায়ের কান্না, দুঃখ এবং ত্যাগের ভাগী হয়েছি। দেখেছি তাদেরকে যারা ৭১-এর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। দেখেছি যারা প্রাণ দিয়েছিল এবং দেখেছি পরে যারা উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল।

সত্যিকারার্থে যারা দেশের জন্য এতকিছু করল বা প্রাণ দিল তাদের কোনো মূল্যায়ন আজ অবধি হলো না! এই সত্যকে অন্ধকারে রেখে জাতি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার করছে। যতদিন না পর্যন্ত সঠিক মানুষের মূল্যায়ন না করা হবে ততদিন জাতি অন্ধকারে জ্বলে পুড়ে মরবে।

সব থাকতেও মনে হবে কিছু নেই কেউ নেই। যে জাতি সত্যকে ভুলে যায় সে জাতির জন্য রয়েছে শুধু অভিশাপ! এ অভিশাপ থেকে বাঙালি জাতি কোনোদিন মুক্তি পাবে বলে আমি মনে করিনা। হয়তো জাতির সব হবে, সব পাবে, তবে মনের শান্তি থাকবে বলে মনে হয় না। বর্তমান জাতির প্রতিভা বা অর্থ থাকতে পারে কিন্তু কী হবে যদি তার বিকাশ বা সঠিক ব্যবহার না হয়? যদি কাকের মতো চোখ থাকতেও তার বিকাশ না ঘটিয়ে তা বন্ধ করে অন্ধ হয়ে সঞ্চিত অর্থ বিদেশে প্রচার করে!

দেশ স্বাধীন হলে কী হবে যদি দেশের সাধারণ মানুষ যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিল আজ তারাই যদি সেই স্বাধীনতা উপভোগ করতে না পারে?

মৌমাছি যেমন মধু সঞ্চয় করে মানবকল্যাণে দিয়ে যায় ঠিক তেমনি ১৯৭১ যুদ্ধে লাখো মানুষ তাদের রক্তের এবং কোটি মানুষের সংগ্রামের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। আমি তারই সাক্ষী এবং আমি তাদেরই একজন। ভুলিলি সে সময়ের কথা।

দেখেছি তাদের খুব কাছ থেকে, থেকেছি তাদের হৃদয়ের সাথে। আমাদের অনেক ঋণ রয়েছে তাদের প্রতি কারণ তারা শুধু মৌমাছির মতো দিয়ে গেছে। দেশটিকে বিনা শর্তে উপহার দিয়ে গেছে আমাদের জন্য।

আরও পড়ুন : দেখা হয়েছিল পূর্ণিমা রাতে

কিন্তু যারা আজ সবকিছু উপভোগ করছে তারা সেই সুবিধাবাদী গোষ্ঠী, আমাদের ফেলে ভারতে আশ্রিত ছিল, পরে সময়মতো এসে কাকের ন্যায় আজ দেশটিকে লুটপাট করে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে। তারা সত্যিই কাকের মতো চতুর, কারণ তাদের সঞ্চিত সম্পদ গোপনে জমা করে গেল, উপভোগ করে গেল না। সবই অভিশাপ, এ অভিশাপ বাংলার মেহনতি ও বঞ্চিত কোটি কোটি মানুষের অভিশাপ।

লেখক : সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড