• সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯  |   ২৮ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ভালোবাসা

  রহমান মৃধা

২৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:০৮
ভালোবাসা
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা ও তার সহধর্মিণী মারিয়া (ছবি : সংগৃহীত)

সুইডিশ ভাষার একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ লাস্ট (lust)। এর বাংলা আভিধানিক অর্থ আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছা। অনেকভাবে চেষ্টা করেছি সুইডিশদের মতো করে শব্দটির অর্থ মনের মধ্যে খুঁজে পেতে কিন্তু অনুভূতিটা আজ অবধি পাইনি। সুইডিশরা লাস্ট শব্দটি ব্যবহার করে যেমন ‘লাস্ট আত অ্যালস্কা’ ( lust att lska), ‘লাস্ট আত রেসা’ (lust att resa), ‘লাস্ট আত লেভা’ (lust att leva)। বাংলায় মানে দাঁড়াবে ‘ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, ভ্রমণ করতে শখ হয়, ভালোভাবে বেঁচে থাকার শখ।’

মানব জীবনে লাস্ট ছাড়া সব কিছুই মূল্যহীন। কারণ লাস্ট না থাকা মানে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা মনের বিরুদ্ধে জোর করে কিছু করা। জোর করে কিছু করার ভেতর মজা আছে কি? নেই। তাই সচরাচর সুইডিশ জাতি লাস্ট শব্দটি ব্যবহার করে থাকে সুন্দর কিছু করতে বা ভাবতে।

আরেকটি শব্দ লগোম (lagom)। এর সঠিক ১০০% প্রতিশব্দের ব্যবহার পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। লগোমের বাংলা আভিধানিক অর্থ ‘সঠিক’ বলা যেতে পারে। আমরা যেমন বলি, তরকারিতে লবণ সঠিক হয়েছে, মানে কম বা বেশি হয়নি। ‘লগোম’ এবং ‘সঠিক’ শব্দটি সত্যিকারার্থে একই মনে হয় আমার কাছে, তবু এরা যখন লগোম শব্দটি ব্যবহার করে, তখন তা যথার্থ মিলে যায় ব্যবহারিক ক্ষেত্রে।

লাস্ট ও লগোম দুটি শব্দ, যা অন্য দশটা শব্দের মতো নয়। কারণ এ দুটো শব্দে জড়িয়ে রয়েছে বেঁচে থাকার ছন্দ ও গন্ধ, যা সত্যিকার জীবন খুঁজে পেতে সাহায্য করে। যে জীবনে লাস্ট নেই, সে জীবনের মূল্য নেই। যে জীবনে ভালোবাসা নেই, সে জীবনের মানে নেই। সুইডিশ জাতি ভালোবাসা শব্দটিও খুব ব্যবহার করে থাকে। ভালোবাসার সুইডিশ মানে অ্যালস্কা (lska)। ‘ইয়গ অ্যালস্কার ডেই’ (Jag lskar dig), মানে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

মজার বিষয় হলো, শুধু বাংলা ভাষায়ই কয়েকভাবে যেমন ‘তোমাকে আমি ভালোবাসি’, ‘ভালোবাসি তোমাকে আমি’ বা ‘ভালোবাসি আমি তোমাকে’ বলা এবং লেখা যায়, তা অন্য কোনো ভাষায় সম্ভব কি-না, জানি না।

এতো সুন্দর একটি শব্দ ‘ভালোবাসা’ এবং এতভাবে একে বলা যায়, তারপরও আমরা ভালোবাসার সঠিক মূল্যায়ন করতে অনেক সময় ভুলে যাই! ভালোবাসা বেঁচে থাকার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা, যার মধ্যে রয়েছে শুধুই ভালোবাসা। জীবনে লাস্ট, লগোম এবং অ্যালস্কা না থাকলে ‘ভ্যালু ফর কোয়ালিটি লাইফ’ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীতে যারা লগোম, লাস্ট ও ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন হয়েছেন, তারাই জীবনে বেঁচে থাকার স্বাদ পেয়েছেন।

পাঠক, ভালোবাসার ওপর এই লেখা ১৪ ফেব্রুয়ারির ভালোবাসা দিবসে লিখে ছাড়তে পারতাম, কিন্তু তা হলো না। কারণ, ভালোবাসা এমন একটি সুন্দর স্বর্গীয় জিনিস, যা বছরে একবার নয়, বারবার ফিরে আসা উচিৎ আমাদের সবার জীবনে। ফিরে আসুক গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্ত, শীত, বসন্ত এবং শরতেও।

বহুদিন পর ফিরে এলাম সেই ছোটবেলার দিনগুলোয়। আমরাও কোনো এক সময় বর্তমান কিশোরদের মতো ছিলাম, তা ভুলে গেছি। মা–বাবা হয়েছি, আমাদের দায়ভার বেড়েছে। সন্তানের দিকে কড়া নজর রাখতে হয়। কোনো প্রকার খারাপ কাজে ওরা যেন না জড়িয়ে পড়ে, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ধর্মীয় জ্ঞান শেখাতে হবে, পোশাক–আশাকের দিকে নজর রাখতে হবে। কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে—সব জানতে হবে। অনেক সময় ভাবখানা এমন যেন আমাদের আর কোনো কাজ নেই, শুধু সন্তানের পেছনে লেগে থাকাই আমাদের মূল কাজ।

তাদের জীবন গড়তে উঠেপড়ে লাগাই হচ্ছে মা–বাবার গুরুদায়িত্ব। মাঝে মধ্যে মনে হয়, আমরা (মা–বাবা) যা করতে ব্যর্থ হয়েছি, তা সন্তানের মধ্য দিয়ে পেতে চাই, বা আমরা ছোটবেলায় যা করেছি, হয়তো তা ভালো ছিল না, তাই নিজেদের ব্যর্থতাকে মনে রেখে কড়া শাসন করতে চেষ্টা করি। মনে রাখতে হবে, কিশোরদের দৈহিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হরমোনেরও পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তন প্রাকৃতিক এবং বসন্তের ফুলের বাহারের মতো তার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে তাদের হৃদয়ে। মনের গভীরে জানা–অজানা কাউকে পছন্দ করা থেকে রোমান্টিক ভাব জেগে ওঠে জীবনে।

এই রোমান্টিক ভালো লাগার বহিঃপ্রকাশ কখনো হয়, আবার কখনো হয় না। স্মৃতিচারণ করলে বা আমার এ লেখা পড়লে নিজেরাও হয়তো হারিয়ে যাবেন পুরনো সেই দিনে। চলুন জেনে নিই, কিশোর থেকে শুরু করে জীবনের বাকি সময়ের ওপর কিছু তথ্য। কৈশোরে ছেলেমেয়েরা সব সময়ই সুন্দর এবং প্রাণবন্ত থাকতে চেষ্টা করে। বেশ লক্ষণীয় যে এ বয়সের একটি ছেলে বা মেয়ে যখন বাইরে যায়, হঠাৎ পথে দেখা হতে পারে সুন্দর দেখতে কারও সঙ্গে। তার পছন্দের মানুষটির দেখাটা হতে পারে বাসার সামনের রাস্তায়, দোকানে, এমনকি শপিংয়ে যাওয়ার পথে।

আরও পড়ুন : মাইক্রো চিপস হয়ে মানবদেহে ঢুকেছে ‘কোভিড পাস’

এ অপরিচিত মানুষের জন্যই হয়তো সে একেক দিন একেক পোশাক পরে সেজেগুজে বাসা থেকে বের হয়। ঘরের বাইরে যাওয়ার আগে চুলটা ঠিক করে নেয়। অথচ মানুষটির সঙ্গে তার কোনো দিন হয়তো কথা হবে না। তবু সেই অপরিচিত মানুষের প্রতি তার মনে অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি হয়, যা চিরদিন গোপনই থাকে। বোন বা ভাইয়ের বান্ধবী বা বন্ধুর প্রেমে অনেকেই পড়ে। সুন্দর কথা, চেহারা আর বন্ধুসুলভ আচরণের কারণে অনেকেই তাদের প্রেমে হাবুডুবু খায়।

কখন বোন বা ভাইয়ের সঙ্গে সে বাসায় আসবে, কখন পাড়ার মোড়ে আড্ডা দেওয়ার সময় তার সঙ্গে দেখা হবে, এমন ভাবনাতেই অনেকে বিভোর থাকে। এ ভাবনা ও অপেক্ষা তখন বেশ মধুর মনে হয়। কিন্তু অনেকেই আবার এ গোপন ভালোবাসার কারণে ঝামেলায়ও পড়ে। এই গোপন ভালোবাসা প্রকাশ্যে এলে বন্ধুদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আবার বাসার বাইরে এরা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি সময় কাটায়। তখন কোনো বিশেষ শিক্ষকের ক্লাস নেওয়া বা তাঁর পড়ানোর ধরন, কথা বলার ভঙ্গি দুর্বলতার কারণ হতে পারে। ছেলে-মেয়েরা সহজেই এসব শিক্ষকের প্রেমে পড়ে। হয়তো দুই-একজন বন্ধু ছাড়া এ প্রেমের কথা আর কেউই জানে না। মজার বিষয়, অনেক বছর পার হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ কোনো পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেই শিক্ষকের কথা জিজ্ঞেস করে। তখন তার কথা শুনে আনন্দিত হওয়ামাত্রই বলে দেয়, সেই সময়কার ভালো লাগাটা কতখানি সুখকর ছিল।

বন্ধুরা যখন একসঙ্গে হয় তখন একজন আরেকজনের প্রেমিক/প্রেমিকাকে নিয়ে নানান কথা বলে। বিশেষ করে ভালো গুণগুলো। আর এই ভালো ভালো কথা শুনে দেখা যায় ছেলে বা মেয়েটি তার বন্ধু বা বান্ধবীর প্রেমিকের প্রেমে পড়ে যায়! কিন্তু ভুলেও এ কথা কাউকে বলে না।

আবার অনেক সময় হিংসার কারণে অনেকে সম্পর্ক নষ্ট করতেও চেষ্টা করে। অনেক সময় দূরসম্পর্কের ভাই বা বোনের প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। খালাতো বা চাচাতো ভাইবোনের সঙ্গে খুব একটা দেখা হয় না, হঠাৎ পরিবারের কোনো অনুষ্ঠানে হয়তো তাদের সঙ্গে দেখা হলো। অনেক দিন পর দেখা হওয়ার কারণে তাকে নতুন মনে হয়। নতুনভাবে তাকে চেনার ইচ্ছা জাগে। কিন্তু পরিবারের ভয়ে এ কথা সে কাউকে বলতে পারে না।

এমনটি অনেকের জীবনে কর্মজীবনের শুরুতে ঘটে। যেমন বস বা কলিগের গোপন প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া। বস বা কলিগ যদি দেখতে সুন্দর, হাস্যোজ্জ্বল ও স্মার্ট হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই। এমন মানুষের প্রেমে না পড়ে কি থাকা যায়? বস বা কলিগের জন্যই দেখা গেল সে অফিসের কাজে বেশ মনোযোগী, যেন সে তার কাছ থেকে প্রশংসা পায়। সব সময় তার নজরে থাকার জন্যই সে এমন আচরণ করে। হয়তো এই গোপন প্রেমের কথা বস বা কলিগের কান পর্যন্ত কখনো পৌঁছাবেই না। কিন্তু এই অনুভূতিতে সে অন্য রকম আনন্দ পায়।

বাস, ট্রেন অথবা প্লেনে কোথাও যাওয়ার সময় পাশে হয়তো কোনো স্মার্ট ছেলে বা মেয়ে বসল। যাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই একটু নড়েচড়ে বসা বা যাত্রাপথে তার সঙ্গে দুই-একটা কথাও হয়ে থাকে। কিন্তু যাত্রা শেষে এই ভালো লাগার রেশ বহুদিন থেকে যায়।

এ ধরনের ঘটনা সবার জন্য ঘটতে পারে বা ঘটে থাকে। বিবাহিত বা অবিবাহিত বলে কোনো কথা নেই। মনের গভীরে কোনো এক বিশেষ ব্যক্তির জন্য যখন আলাদা জায়গা তৈরি হয়, তখন পুরুষ বা নারী কেউই কিন্তু এ কথা প্রকাশ করে না। তবে একসঙ্গে বসবাস করলে এমন ধরনের ভালো লাগার গোপন রহস্য দৈনন্দিন আচার–ব্যবহারে টের পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। এসব ভালো লাগার মানুষের কাছ থেকে তেমন কোনো আশাপ্রাপ্তি নয়, কিন্তু তাদের উপস্থিতি বেশ আনন্দ দেয়।

তবে এ কথা কেউ কারও সঙ্গে শেয়ার করতে বা বলতে চায় না। এমনকি এটাও চায় না, যাকে পছন্দ করে, সেও তার মনের কথা জানুক। এটাকে একধরনের গোপন প্রেমও বলা যেতে পারে। গোপন প্রেম হতে পারে একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে। এখন মনে মনে পছন্দ করা এক জিনিস। আর যদি এ পছন্দ মন, প্রাণ এবং দৈহিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, তখন জীবনে সঙ্গী বা সঙ্গিনী হওয়াটা স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে ভালো লাগা বা পছন্দের পরিণতি ধীরে ধীরে বিশ্বস্ততা এবং শেষে বিয়েশাদি হতে পারে। কিন্তু যদি একই ঘটনা বিয়ের পর ঘটে, মানে সঙ্গী বা সঙ্গিনী থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি কারও প্রেমে হাবুডুবু খায়, তখন ভালো লাগা বা পছন্দের পরিণতি তিলে তিলে অবিশ্বস্ততায় পরিণত হয়।

বিশ্বস্ত এবং অবিশ্বস্ত যাকে সুইডিশ ভাষায় বলা হয় ‘trogen och otrogen’. সুইডেনে নরনারীর গোপন প্রেম, প্রীতি, মানসিক অথবা দৈহিক সম্পর্ক যখন প্রকাশ পায়, তখন অবিশ্বস্ত (otrogen) শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অবিশ্বস্ততার মধ্যে যদি কেও সংসার করতে চেষ্টা করে, সে সংসারে কখনো শান্তি আসতে পারে না। সে ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদ একমাত্র সমাধান। এখন বাংলাদেশে যেমন বেকার গৃহবধূর সংখ্যা বেশি।

যদিও তারা বাসার সব কাজকর্ম করে, কিন্তু তাদের মাসে মাসে বেতন আসে না। সে ক্ষেত্রে বিবাহিত জীবনে যদি কেউ অন্যের প্রেমে পড়ে, তখন পুরুষের বেলায় যেমনটা সম্ভব ম্যানেজ করা অর্থনৈতিকভাবে, তেমনটি সম্ভব হয়ে ওঠে না গৃহবধূর ক্ষেত্রে। তা ছাড়া সমাজ, সন্তান এবং পরিবারের ভয়ে বা পাছে লোকে কিছু বলে এসব চিন্তা করে অনেকেই সংসারের হাল ধরে দিনরাত যাপন করে নিস্তব্ধতায়, নীরবে, ভালোবাসা ছাড়া।

পাশ্চাত্যে হুবহু একই ঘটনা যেমন সঙ্গী বা সঙ্গিনী থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি কারও প্রেমে হাবুডুবু খায় বা অবিশ্বস্ততা ঘটে, তখন অর্থনৈতিক সাফল্যের কারণে এরা পাছে লোকে কিছু বলে তার পরোয়া না করে ডিভোর্স দিয়ে নতুন পার্টনারের সঙ্গে সংসার করতে শুরু করে।

মানুষের মন বড় দুর্বল ভালোবাসার কাছে। তবু খুব কম ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামী–স্ত্রী দুজনই পরপুরুষ বা রমণীর গোপন প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, যার কারণে যে বিশ্বস্ত থাকে, তাকেই বেদনার ভার বইতে হয়। এখন এ অবিশ্বস্ততার কারণে যে জ্বালার সৃষ্টি হয়, তা থেকে রেহাই পাওয়ার আর কী উপায়ই বা থাকতে পারে ডিভোর্স ছাড়া? কী করারই বা থাকতে পারে সেই পরিবারের জন্য যে পরিবারে বিরহ বিরাজ করছে। তবে সুইডেনে ডিভোর্সই একমাত্র সমাধান, যখন ভালোবাসায় অবিশ্বস্ততা দেখা দেয়।

আরও পড়ুন : সেদিনের অকাল মৃত্যুর ঘটনা আজও ভুলিনি

বাংলাদেশে নানা কারণে এ ঘটনা ঘটে। কিন্তু পাশ্চাত্যে নারী–পুরুষ তাদের সমমানের অধিকারে ডিভোর্স করছেন, যখন ভালোবাসার মধ্যে অবিশ্বস্ততা ঢোকে। কারণ, অর্থনৈতিক দিকটার গুরুত্ব খুবই নগণ্য হিসেবে দেখা হয় এখানে। চরিত্রহীন বা দুশ্চরিত্রের ছোঁয়া বিরাজ করছে পৃথিবীর সর্বত্রই। পার্থক্য শুধু, পাশ্চাত্যে সুযোগ–সুবিধা এবং সমাজব্যবস্থা সৃজনশীল। সৃজনশীল সমাজে কেউ তিলে তিলে ধ্বংস হয় না। তাই বিচ্ছেদে নতুন জীবনের সন্ধানে, আলোর মিছিলে যোগদান করে নতুন সুখের সংসার গড়েন।

জানি না বাংলাদেশ কেমন অবস্থার মধ্যে চলছে! সবাই কি নিশ্চিত, সুচিন্তা ও সুভাবনার মধ্য দিয়ে সুখের সংসার করছে? সংসারের জটিলতা সত্ত্বেও কি আছে পরস্পরের ওপর আস্থা? হচ্ছে কি খোলামনে আলোচনা পারিবারিক অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ওপর? নাকি শাড়ি, চুড়ি আর বিলাসিতায় ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে মনের গভীরের চাওয়া–পাওয়াকে! হ্যালো বাংলাদেশ, হাউ ইউ ডুইং?

আর মাত্র কয়েকটি দিন বাকি। নতুন আরেকটি বছর শুরু হবে। অনেক আশা, অনেক প্রত্যাশা নতুনের ওপর। শহরে একটু কাজে এসেছিলাম স্টকহোমের হোটোরিয়েটে। শহরের মধ্যে বাজার বসে প্রতিদিনই। ফুল–ফলসহ টুকটাক স্যুভেনিয়র কিনতে পাওয়া যায় এখানে। সামনে নতুন বছর, ভাবলাম এক তোড়া ফুল কিনি আমার প্রিয় মানুষটির জন্য।

যারা ফুল বা ফল বিক্রি করেন, তাদের সঙ্গে বেশ পরিচিত। কারণ, বহু বছর এক জায়গায় বসবাস করলে যা হয়। তা ছাড়া এসব হকার কেউই সুইডিশ নযন, ভিনদেশ থেকে এসেছেন। কথা কম বলে বললে ঠিক হবে না; কারণ, যে কথা বলা দরকার, সেটা কম বলেন। তবে রসিকতা করতে চেষ্টা করেন বেশি।

ভাষার সমস্যা না থাকলে হয়তো অন্যকিছু করতেন। যা–ই হোক, সুইডিশে লিখেছে, আজ ফুলের দাম অর্ধেক, কাল ফ্রি! ভাবলাম এখনো নতুন বছর আসতে কয় দিন বাকি। কাল শহরে আসব যখন, তখন ফুলগুলো ফ্রি পাওয়া যাবে, ঠিক আছে তাহলে কাল এসে ফুলগুলো নিয়ে যাব।

আজ সকাল সকাল শহরে এসেছি। বাজার শেষে ফুল নিতে এসে দেখি, সাইনবোর্ডে একই কথা লেখা রয়েছে!! একটু ভাবনায় পড়লাম। পরে ফুল হোটোরিয়েট থেকে অর্ধেক দামেও কিনলাম না। অন্য একটি দোকান থেকে পুরো দামে কিনে এনেছি।

প্রতিদিনই আমরা একটা দিন বা সময় পার করছি। তবে আগামীকালটার দেখা কোনো দিনই হবে না। আমরা শুধু তার অপেক্ষায় আর প্রতীক্ষায়। তবে একটি বছর কিন্তু অনেক দিন মেলে। সে ক্ষেত্রে এক দিন এদিক-ওদিক হলে ক্ষতি কী, পরের দিনটি ভালো গেলে বা পুষিয়ে নিলে গড়ে বছরটি হয়তো ম্যানেজ হয়ে যাবে। এমন আশা এবং ভরসা নিয়েই কিন্তু আমরা বেঁচে আছি।

২০২১ সালকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। অনেক পেয়েছি, অনেক হারিয়েছি। তবে শিক্ষণীয় ছিল বেশি। সমস্যার সমাধান করতে শিখেছি, যেমন ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা এবং শেষে টিকা তৈরি করেছি। ভাইরাস পৃথিবীতে মানুষের আগে থেকেই বসবাস করছে। শুধু ভাইরাস নয়, অনেক কিছুই পৃথিবীতে রয়েছে, যা আমরা হয়তো জানি না বা জানতে চেষ্টাও করি না।

কিন্তু যখনই বড় আকারে সমস্যায় পড়ি, তখন শুরু হয় জানা, বোঝা, শেখা এমনকি তার সমাধান করা। ২০২২ সালে কী হবে জানি না। সবার ধারণা ২০২১ সালের চেয়ে ভালো হবে। কারণ উই এক্সপেক্ট অলওয়েজ সামথিং বেটার। যেমন আমি আগামীকাল ফুলগুলো ফ্রি পাব, সেই আশায় গতকাল অর্ধেক দামে না কিনে আজ এসেছিলাম ফ্রি নিতে। এসে দেখি ফ্রি শুধু আগামীকালের জন্যই!

টুমরো উইল নেভার কাম অর ডাই বাট স্টিল উই আর ওয়েটিং ফর টুমরো। সৃষ্টির রহস্যের শেষ নেই, আগামীকালের শেষ নেই এবং জানারও শেষ নেই, শেষ আছে শুধু জীবনের। জীবনের শেষ আছে, এটা নিশ্চিত। শুধু নিশ্চিত নয় শেষটি কখন, কোথায় এবং কীভাবে! তারপরও জীবনের গতি থেমে নেই।

আশা যখন আছে গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার, তাই ২০২২ সালকে নতুন করে উপভোগ করার শখ রয়েছে। এই শখ পরিপূর্ণভাবে যদি পালন করতে পারি, সেটা হবে আশীর্বাদ। আল্লাহই শুধু জানেন আগামীকাল, আগামী বছর কী হবে বা কী-না হবে!

আরও পড়ুন : দেখা হয়েছিল পূর্ণিমা রাতে

কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে হোটোরিয়েটের ফুলের কথা। আগামী বছর ফ্রি বলে যে কিছু পাব না তা নিশ্চিত এবং প্রতিটি মুহূর্তে যেটা হওয়ার সেটাই হবে; তবে চেষ্টা করতে ক্ষতি কী! সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।

লেখক : সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড