• বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭ আশ্বিন ১৪২৮  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আমরা কি স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি?

  মঈন বকুল

৩১ জুলাই ২০২১, ১৯:৫৪
মঈন বকুল
মঈন বকুল (ছবি : সংগৃহীত)

সময়ের বিবর্তনে দিন দিন একে অপরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে যাচ্ছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে সম্প্রীতি-ভালোবাসা। কিছুদিন যাবৎ কেন জানি এই কথাটিই বার বার স্মরণ হচ্ছে। জানি না কেন এমন হচ্ছে। মৃত্যুর কথা চিন্তা হচ্ছে বারবার। কারো কাছে অন্যায় করে থাকলে মাফ চেয়ে নেওয়া, পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করার চেষ্টা করা ইত্যাদি। কেন জানি মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে এখনো বেঁচে আছি এটাই বিস্ময়কর।

বিশেষ করে করোনা মহামারির এই সময়ে কেড়ে নিয়েছে আমাদের বহু আপনজন। কাছ থেকে দেখছি মানুষের কষ্ট-হাহাকার। মা-বাবা হারানোর বেদনা। হাসপাতালের বারান্দায় বসে থাকা আত্মীস্বজনের আত্ম-চিৎকার। এরই মধ্যে উঠে যাচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের সম্প্রীতি-ভালোবাসা, স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি আমরা, যৌথ পরিবার ছেড়ে জীবনের প্রয়োজনে পড়ে আছি কোনো এক ঘোরের অমানিশায়। ফলে জীবনে আসছে একঘেয়েমি, অনুভব করছি একাকীত্ব। তবে এই মহামারির মধ্যেই কিছু মানুষ নতুন ভোরের আশায় লড়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন।

ঈদুল আজহা। এখনো গোশত-চামড়ার ঘ্রাণ যায়নি। ঘরে ঘরে পোলাও-মাংসের সুগন্ধ (কারও ঘরে আবার খাবারের অভাব)। আবার রাস্তায় বের হলে পাওয়া যাচ্ছে চামড়ার দুর্গন্ধ। এই ঈদে কয়েকটি বিষয় নিজেকে উৎকণ্ঠিত করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- প্রতি বছরই আমাদের আশপাশের ধনীরা কোরবানি দিয়ে থাকেন। অনেকেই কোরবানি দিয়ে যেভাবে ভাগ করা দরকার সেভাবে করেন। আবার কেউ কেউ কোরবানি দিয়ে সব মাংস নিজের ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। এই বিষয়টি খুব কষ্টকর। যে কোরবানিতে ছিল অসহায়-গরীবদের ভাগ, আত্মীয়স্বজনদের ভাগ। কিন্তু তা না দিয়ে অনেকেই ট্রাক লোড করার মতো ফ্রিজে লোড করে দিচ্ছেন।

আমি যে বাসায় থাকি তার পাশের বাসায় তিন/চারটা গরু, দুইটা খাসি কোরবানি দিলেন। কিন্তু ঈদে পুরো ভবন মিলে তিন/চারটা পরিবার ছিল। কোনো পরিবারকে তো এক টুকরাও মাংস দিলেনই না এমনকি বাসার কাজের দারোয়ানকে পর্যন্তও এক টুকরা মাংস দেননি। সব ফ্রিজে...। শুধু ওই বাসাতেই যে এমন ঘটনা ঘটেছে তা নয়, আরও অনেক বাসার মালিকই তার বাসায় ভাড়া থাকা পরিবারগুলোকে কোরবানির মাংস দেননি। এভাবে কি কোরবানি হয়? যা হোক আমার কাছে মনে হয়েছে এটা মানবিকতার অভাব, ভালোবাসার অভাব, সম্প্রীতির অভাব, আবার হতে পারে না জানার অভাব। কারণ মহামারি এই করোনার দিনে যেখানে মানুষ না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন সেখানে কেউ কেউ নিজেরা কোরবানি দিয়ে নিজেরাই ভোগ করছেন। বিস্ময়কর...!

একযুগেরও বেশি সময় ঢাকায় থাকি। জীবনে খুব কম ঈদই গ্রামের বাড়ির বাইরে করেছি। আমরা খুব পরিবার বা এলাকাপ্রিয় মানুষ। বাড়ির বাইরে ঈদ করার বিষয়টি পরিবার বা এলাকার মানুষজন মেনে নিতে পারেন না। যা হোক চাকরির কারণে মাঝে মাঝে বাইরে ঈদ করতেই হয়। কিন্তু এই ঈদুল আজহাসহ কয়েকটি ঈদের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে হয়, আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঈদের দাওয়াত। দাওয়াত দেওয়ার যে রীতি তা একেবারে ভুলেই যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত কমার্শিয়াল হয়ে যাচ্ছি আমরা।

আগে ঈদের মধ্যে আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি যাওয়ার যে কী আনন্দ ছিল তা মনে হয় ভুলেই যাচ্ছি দিন দিন। আমরা এখন আর বাসাতে কাউকে দাওয়াত দিতে চাই না। মনে সায় দেয় না। বাসায় কেউ আসা মানেই মনে হয় বাড়তি একটা ঝামেলা। এক কথায় দিন দিন উঠেই যাচ্ছে একে অপরকে দাওয়াত দেওয়ার রীতি।

আমার বেড়ে উঠা যৌথ পরিবারে। দাদা-দাদি, বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, ভাবি-ভাতিজাসহ সে এক বিশাল বহর। বিশেষ করে যাদের জন্ম ৮০ বা ৯০ দশকে তাদের বেশিরভাগই বেড়ে উঠেছে যৌথ পরিবারে। তারা বুঝবে যৌথ পরিবারের স্বাদ। তবে এখনকার প্রজন্ম অবশ্য বুঝবে না যৌথ পরিবার কী? এখন আর সে রকম যৌথ পরিবার দেখাও যায় না। কিছু দেখা যায় গ্রামে। সে সংখ্যা খুবই কম। যৌথ পরিবারের প্রসঙ্গটি নিয়ে আসার কারণ হচ্ছে-আমরা দিনের পর দিন পরিবারের বাইরে থাকতে থাকতে এতটাই নিজেদেরকে ব্যস্ত করে ফেলেছি যে, আপনজনকে ভুলে যাচ্ছি, পরিবারকে ভুলে যাচ্ছি, ভুলে যাচ্ছি সবুজে মোড়ানো গ্রামের মেঠো পথ।

বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর জেনারেশন এখন আর যৌথ পরিবারে থাকতে চায় না। আমরা পরিবার, আত্মীয়স্বজন, নিজের গ্রাম ছেড়ে যে দিন দিন স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিনিয়ত আমরা একাকী হয়ে যাচ্ছি। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের আত্মিক বন্ধন। এই ঈদে করোনার কারণে অনেকেই বাড়ি যাননি। আবার অনেকে এমনিতেই যেতে চাননি। অনেকে মনে করেছেন এটা বাড়তি ঝামেলা, কি দরকার। কিন্তু একবারও কি মনে করেছেন আপনার জন্য চেয়ে রয়েছে আপনার মা-বাবা, ভাই-বোন, আপনার আত্মীয়-স্বজন, আপনার বেড়ে উঠার গ্রাম কিংবা ছোট্ট বেলার সেই স্কুল বন্ধুটি? তাহলে আমরা কি দিন দিন স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছি?

লেখক : মঈন বকুল, সাংবাদিক

ওডি

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড