• সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

প্রাণীকুলের স্বতন্ত্র সত্তার স্বীকৃতিই নৈতিকতা

  মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন

০৪ জুন ২০২১, ২২:২৭
sdgsdfsd
ছবি : দৈনিক অধিকার

গত ৩ মে বিবিসি বাংলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছকাটা নিয়ে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একটি ঐতিহাসিক সম্পত্তি হওয়া সত্বেও সাংবিধানিকভাবে এটি রক্ষার দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে উদ্যানের অনেক গাছ কেটে সৌন্দর্য্য বাড়ানোর কাজ চলছে। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু বড় ও পুরনো গাছ কাটা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো গগনশিরিষ গাছ, যেগুলোতে চিল বসে। যারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বেড়াতে আসেন, তারা জানেন রোজ বিকেলে এখানে আকাশে চিল উড়ে। যে কেউ সেখানে গেলেই বুঝতে পারবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কাঠবিড়ালীর অভয়ারণ্য। এ ছাড়াও জারুল, অশোকসহ আরও অনেক গাছ কাটা হয়েছে। আবার অনেক গাছ কাটার প্রস্তুতি চলছিলো। রাতের আঁধারে গাছ কেটে গাছের গোড়ায় মাটি ভরাট করে গাছ কাঁটার চিহ্ন চিরতরে মুছে দিতে চেয়েছে। কিন্তু শহরের নাগরিকদের যথাসময়ে আন্দোলনের চাপে সর্বশেষ গাছকাটা বন্ধের জন্য উচ্চ আদালত গাছ কাটা ও দোকান নির্মাণের কার্যক্রম স্থিতাবস্থা চেয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলেকে আদেশ দেন। অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদন জানানো শেষে গাছকাটা বন্ধ হয়।

আমরা এমন এক নৈরাজ্যবাদী দেশে বসবাস করি যেখানে প্রতিটি মানুষ প্রতিষ্ঠান প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত ভক্ষন করি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে। এমনই এক বিবেকহীন রাষ্ট্রে আছি যেখানে প্রাণ প্রকৃতি গাছ পালা রক্ষার্থে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ আসতে হয়। নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত রক্ষা গাছপালা রক্ষা পায় না।। প্রকৃতিকে বাদ দিয়েছে বৈষয়িক মানুষ,পরিবার, সমাজ,রাষ্ট্র,একই সাথে বিভিন্ন মতাদর্শ।

কিন্তু, কেন এই গাছগুলো কাটা হচ্ছে? উত্তরে দায়িত্বশীলরা বলছেন, এখানে হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে করতে হবে। শুধু ওয়াকওয়ের জন্যে নয়, উদ্যানে ঘুরতে আসা সাধারণ মানুষের খাবারের চাহিদা মেটাতে এখানে বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁও হবে। সেজন্যও গাছ কাটা পড়ছে।এতো খোঁড়া এবং ঠুনকো আয়োজনের জন্য গোটা ঢাকা শহরের ফুসফুসের মতো সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনের গাছ গুলো কাটতে হবে..?এই প্রশ্নটা অতিব জরুরি ছিলো সর্বমহলে। চারপাশে প্রকৃতির উপর যখন এতো আক্রমন তখন দু একটি কথা না বললেই নয়...

প্রতিদিন ভোরে ছোট্ট চড়ুইপাখির কিচিরমিচির ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠতে পারা ঢাকা শহরে সৌভাগ্যের ব্যাপার। কনক্রিট ইট পাথরের শহরে গাছপালা পশু পাখি বিরল জিনিস। মানুষ বৈষয়িক জীবনকে সম্প্রসারিত করতে গিয়ে প্রকৃতিকে করেছে সীমাহীন সংকুচিত।

জানালার পাশে কিছু শস্যদানার বিনিময়ে চড়ুই পাখির ডাকাডাকি, তাদের ছোটাছুটি, ডানা ঝাপটানো শব্দ, তাদের চোখ এবং ঠোঁটের অঙ্গভঙ্গি, খাবার খাওয়ার সময় এক পাখি আরেক পাখিকে ডেকে আনার কৌশল, আর দেখা হলেই একঝলক চোখাচোখির মনোরম দৃশ্য গত এক বছর ধরে আমি আর আমার সঙ্গিনী প্রত্যক্ষ করছি।পাখিগুলো জীবনকে আনন্দঘন করে তুলেছে। কিন্তু এতো আনন্দ কি আর ধরনীতে সয়? সয় না! কেননা হঠাৎই পাখিগুলো দেখছি না গত বছর মে মাসের মাঝখানে দুই তিন সপ্তাহ থেকে। পরে আবিষ্কার করলাম ১৬-২১মে পর্যন্ত সুপার সাইক্লোন আম্ফান প্রতি তিন মিনিটে ২৪০ কিলোমিটার বেগে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলীয় অঞ্চলে যে ভয়ানক আঘাত হেনেছিলো তার ঝড়ো প্রভাব রাজধানী ঢাকাতেও কমবেশি পড়েছিলো। আমাদের দেখা চড়ুই পাখি দুটিও হয়তো হারিয়ে গেছে আম্ফানের ঝড়ো আঘাতে। বাতাসের গতির সাথে তাল মিলাতে না পেরে কোথায় বিধ্বস্ত হয়েছে কেই বা জানে। এ নিয়ে আমাদের দুঃখের শেষ নেই। আরো দুঃখ বেড়ে যায় যখন জানতে পারলাম আম্ফানের আঘাতে সারাদেশে ১১৮ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ আর্থিক ক্ষতির স্বীকার হয়েছিলো প্রায় ১৩৩৫০কোটি টাকা। এই ক্ষতিতে সবচেয়ে বেশী ক্ষতির স্বীকার হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে আমাদের রক্ষাপ্রাচীর সুন্দরবন। যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হিসেব করে শেষ করা যাবে না। কেননা এবারও ভয়াল গতি নিয়ে সেই সুন্দরবনেই ছোবল মারল ‘অতি প্রবল’ ঘূর্ণিঝড় আম্ফান। এর আগেও সিডর-বুলবুলের আঘাত এসেছিল সুন্দরবনে। এই সুন্দরবনই বাঁচিয়েছিল হাজার হাজার মানুষের প্রাণ। সেবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

আম্ফানের আঘাতে বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, ভোলা, বরিশাল, খুলনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর জেলাসহ ৪৬টি জেলা লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিলো। দেশের নদীর স্বাভাবিক জোয়ারের তুলনায় ৮-১০ ফুট বেশী উচ্চতায় পানি বেড়ে ১৩টি জেলায় ৮৪টি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে জোয়ারের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছিলো। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ কিলোমিটার। ভেঙে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি ও গাছপালা। সারাদেশে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭ একর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে। প্রকৃতিমাতা সুন্দরবন এবারও বুক চিতিয়ে আমাদের রক্ষা করেছিল নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে।

আমরা রক্ষা পাই আবার ভুলেও যাই সুন্দরবনের কথা। এটা আমাদের মজ্জাগত সংস্কৃতি। তা নাহলে আম্ফান যখন ধেয়ে আসছিলো তখন সবাই সুন্দরবনের গুরুত্ব দেয়া শুরু করলেন ও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপক বিরোধীতা শুরু করলেন। সুন্দরবনকে ঘিরে এই অনুধাবন নিশ্চয়ই অনেক প্রয়োজনীয়। কিন্তু এটি মৌসুমী চাওয়া হলেই ক্ষতিকর। কারণ মৌসুমী দাবি দিয়ে সুন্দরবনের নিত্য ধ্বংস রোধ করা যাবে না।প্রাণ প্রকৃতিকেও রক্ষা করা যাবে না।

সুন্দরবনের ওপর যে বহুমাত্রিক আক্রমণ চলছে তার হদিস বের করতে হবে। তাহলেই কেবল বিরোধীতার প্রবল ঢেউ জায়গামত আছড়ে পড়বে। সুন্দরবনের পাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে শিল্পকারখানা ১৯০টি। মারাত্মকভাবে দূষণকারী শিল্পকারখানা ২৪টি। কারখানার পার্শ্ববর্তী নদীতে প্রতি ঘণ্টায় যেখানে ৭-৮টি ডলফিন দেখা যায়, কারখানা নেই এমন স্থানে ডলফিন দেখা যায় ১৫-১৭টি। নতুন সমীক্ষায় দেখা গেছে, কারখানার পাশে সুন্দরবন এলাকায় বাঘের বিচরণ কমেছে। সুন্দরী গাছের বীজ নষ্ট হচ্ছে ৭০%। (সূত্রঃ প্রথম আলো, ২৯ এপ্রিল, ২০১৮)।

সুন্দরবন নিয়ে মানুষের উদ্বেগের বহু কারণ রয়েছে। এই কারণ কেবলমাত্র রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার বহু আগেই শিল্প মালিকেরা সেখানে জমি কেনা শুরু করেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে যত ক্ষতি হবে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে শিল্প কারখানা থেকে। এছাড়া দ্বিতীয় সুন্দরবন হিসেবে পরিচিত ট্যাংরাগিরি ম্যানগ্রোভ বনের একদম কাছে আরেকটি ৪০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। সেটি থেকে সুন্দরবনের দুরত্ব ১৫ কিলোমিটার। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ও শত শত শিল্প প্রতিষ্ঠান সুন্দরবনকে জাপটে ধরছে। নিশ্চিত থাকুন এই বন উজাড় হবেই। কোনো প্রযুক্তিই বনকে বাঁচাতে পারবে না।

প্রকৃতির গতি প্রকৃতিকে বুঝতে হলে প্রকৃতিকে তার নিজস্ব জায়গায় রেখে বুঝতে হয় এবং কাছে আসতে হয়। প্রকৃতির মধ্যে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের খেলা মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এক আম্ফানের তাণ্ডব দিয়ে আমরা তা আঁচ করতে পারি। প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট করে, প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মকে ভেঙে মানুষ নিজেদেরকে যতই সুখী করতে চেয়েছে ততই নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। মানুষ এবং প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য টানার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তাতে মানুষের জীবন বিষাক্ততায় পূর্ণ হয়েছে। এই পার্থক্য তৈরির সংস্কৃতি শুরু হয়েছে সেই আদিকাল থেকেই। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই প্রকৃতিকে জীবিকার “উপায়” রূপে পেতে চেয়েছে মানবগোষ্ঠী। প্রকৃতি কখনো মানুষের “লক্ষ্যে” পরিণত হতে পারেনি। অথচ বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, মানুষের সাথে প্রাণীকূলের যতটুকু পার্থক্য রয়েছে তা শুধুই মাত্রাগত, গুণগতভাবে তেমন নয়।

একটা সময়ে বলা হত- শুধু মানুষই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রমাণ হলো গ্যালাপ্যাগজ (Galapagos) নামক এক প্রজাতির কাঠঠোকরা পাখি গাছের ফাটল থেকে পোকামাকড় বের করার জন্য ফণীমনসা গাছের কাঁটা ব্যবহার করে। বিজ্ঞানী জেইন গুডাল (Jane Goodall) আবিস্কার করেন, তানজানিয়ার জঙ্গলে শিম্পাঞ্জি জলে পূর্ণ সিক্ত হবার জন্য গাছের পাতা চিবিয়ে স্পন্জ তৈরি করে এবং পোকামাকড় ধরার উদ্দেশ্যে গাছের পাতা ছিঁড়ে সাজিয়ে রাখে। ভাষা নিয়ে মানুষের গর্বের শেষ নেই! পরে দেখা গেল শিম্পাঞ্জি ও গরিলা মূক ও বধিরদের প্রতীকী ভাষা শিখেছে। প্রমাণ রয়েছে যে, তিমি ও ডলফিনের নিজস্ব জটিল ভাষা রয়েছে। আমাদের দেশে বাবুই পাখির তাল গাছের পাতায় সূক্ষ্ণ ঘর বোনার দৃশ্য কার না মনে পড়ে যা গোটা পৃথিবীর মাধ্যার্কষন শক্তির বিরুদ্ধে ঝড়বৃষ্টিতেও টিকে থাকে!

আদিমকালে মানুষ যখন অন্যায় করা এবং অন্যায় ভোগ করার অভিজ্ঞতা প্রথম লাভ করে তখন তারা এই উপলব্ধিটাও করেছিল যে, দ্বিতীয়টি ভোগ করা ব্যতীত প্রথমটি ভোগ করা সম্ভব নয়। তখন তারা নিজেরা নিজেদের মধ্যে মীমাংসায় উপনীত হয়েছিল, অন্যায় করা বা অন্যায় সহ্য করা কোনোটিতেই লিপ্ত হওয়া ঠিক নয়। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ও উচ্চতর গণতন্ত্র আমাদের এই শিক্ষাই দেয়, যা আইনসম্মত তা সর্বদা ন্যায়সম্মত নাও হতে পারে। অন্যায় কর্মকে ন্যায়সম্মত করা অন্যায় এবং এর ভয়াবহ দিক হচ্ছে অন্যায়কারীর শাস্তি ভোগ না করা।

মানুষ এবং প্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থানই পৃথিবীর বৈচিত্র্য। এদের পার্থক্য নিরূপণে উঠেপড়ে লাগা মানেই হচ্ছে বৈচিত্র্য ধ্বংস করার পায়তারা করা।বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা মানুষ অন্য মানুষের জন্যও ভয়ংকর হতে পারে। কারণ অন্য মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন তার কাছে অসহ্য লাগে। প্রাণীর সামর্থ্য মানসিক ও শারীরিকভাবে অপরিণত বা সমপর্যায়ে নেই বলে তাদের সঙ্গে অসামঞ্জস্য আচার-আচরণ করা যদি নৈতিক হয়, তাহলে আমাদের নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নিরীহ প্রাণীর প্রতি মানুষের নির্যাতনের নির্মম চিত্র গত কয়েকদিন ধরেই পত্রপত্রিকায় আমরা দেখতে পাচ্ছি।গত বছর মাদারীপুর পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের মধ্যখাগদী এলাকায় শাহনাজ (৫৫)নামক এক মধ্য বয়সী নারী খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে ১৫টি বানরের দলকে হত্যা করে (প্রথম আলো-১০মে ২০২০)। সারিবদ্ধভাবে বানরগুলোর নিথর দেহগুলোর ছবি স্যোশাল মিডিয়ায় শিক্ষিত সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভ বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিলো। এরকম স্পর্শকাতর দৃশ্য যেকোন স্বাভাবিক মানুষকে মর্মাহত করবে। অন্যদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ভ্রমন নিষিদ্ধের পর সাগরের নির্জনতায় ডলফিনের একটি দলের লুটোপুটি খেলা যারা দেখেছে তাদের মনে আনন্দ সঞ্চারিত হয়েছে। এই দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না। বিগত প্রায় ১৫-২০ বছর পর নতুন করে এই আনন্দদায়ক দৃশ্য দেখা গেল। গতবছর ৩- ৪এপ্রিল ২০২০ ডলফিনগুলোর মরদেহ একটি একটি করে সমুদ্র তীরে ভেসে আসতে থাকে। ডলফিনের দেহ রক্তে ক্ষতবিক্ষত। পরে স্থানীয়রা বলেছে, ১০-১২টি ডলফিনকে জেলেরা পিটিয়ে হত্যা করেছে যা খুবই কষ্টদায়ক।

প্রকৃতির কোন নিরাপত্তা বেষ্টনী নেই, রয়েছে মানুষের। গত বছর ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ঝড়ো হাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছিল নাটোরের বড়াই গ্রামের বাজিতপুর গ্রামের গাছে ঠাই নেওয়া শামুকখোল পাখিগুলো। বাতাসের তোড়ের সঙ্গে তাল মিলাতে না পেরে ২১মে ভোরে অন্তত ২০০টি পাখি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর গ্রামবাসী পাখিগুলো ধরে নিয়ে রান্না করে খায়। প্রশ্ন হলো এই পাখিগুলো তো ঐ গ্রামের মানুষের খামারের চাষকৃত পাখি ছিলো না যে তাদের জবাই করে ভুরিভোজন করতে হবে! সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ভারতের কেরালায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটি। ভারতের কেরালায় মালাপ্পুরমের ১৫ বছরের একটি অন্তঃসত্ত্বা হস্তিনী খিদের জ্বালায় থাকতে না পেরে, খাবার খুঁজতে গ্রামে ঢুকেছিল। গ্রামের মানুষ খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে একটি আনারসের মধ্যে বাজি ফটকা পুরে খেতে দেয়। সরল হস্তিনী খিদের যন্ত্রণা মেটাতে খেয়ে ফেলেছিলো আনারসটি। খাওয়ার পর তার মুখগহ্বর বাজি ফটকার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। আঘাতের যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলেও আশপাশের মানুষ তা দেখে উল্লাসে মত্ত থাকে। হতাশ হয়ে অন্তঃসত্তা হস্তিনীটি পাশের নদীতে ঝাঁপ দিয়েও মৃত্যু থেকে রেহাই পায় নি।

এই ঘটনাগুলো আমাদের সামনে কী শিক্ষা দেয়? ঘটনাগুলো সভ্যতা এবং সুসভ্যতার মধ্যে পার্থক্যকে আবারও আমাদের সামনে নিয়ে আসে। মানুষ কতটুকু সভ্য, তা পরিমাপের চেয়ে মানুষ কতটুকু সুসভ্য তা পরিমাপ করা জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের আত্মিক উন্নয়ন ব্যতীত কোন ব্যবস্থাই মানুষকে সুসভ্য করতে পারে না। গত দুই বছরে কেরালা করোনা নিয়ে যতটা দাপট দেখিয়েছে, মানুষকে নিরাপদে রেখেছে, ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখাল হস্তিনীটাকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দিয়ে।

আত্মিক অনুভূতি কতটা বিকল হলে একটা ক্ষুদার্ত গর্ভবতী হস্তিনীকে আনারসের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ মুখে বাজি ফটকা পুরে দিতে পারে! যেকোন সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা নির্মাণ করার পূর্বে সুসভ্য মানুষ নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা মানুষের যে কোন নৈতিক অবস্থান তার বাইরের বস্তুজগৎ, প্রাণীজগৎ, উদ্ভিদজগৎ বর্হিভূত হতে পারে না। নৈতিকতার মানদণ্ড তখনই ঠিক থাকে যখন একটা মানুষ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পিপীলিকা থেকে শুরু করে বিরাট হাতি পর্যন্ত প্রতিটি প্রাণীকে স্ব-অবস্থানে স্বতন্ত্র সত্তার স্বীকৃতি দিয়ে নিজস্ব অবস্থানকে তুলে ধরতে পারবে।

প্রতিটি প্রাণীর বাঁচার অধিকার পৃথিবীর মানবকূলের অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কারণ নৈতিকতার ভিত্তি যদি এই হয় যে, অন্যেরা আমার প্রতি যতক্ষণ না পর্যন্ত অপ্রীতিকর কাজ করবে আমিও সে পর্যন্ত তাদের প্রতি অপ্রীতিকর কাজ করা থেকে বিরত থাকবো। তাহলে যেকোন প্রাণীকূলের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর কাজ করার আমার কোন রকম যুক্তিই থাকতে পারে না। নিরীহ মানবেতর প্রাণীর ক্ষেত্রে তো নয়ই। নিরীহ ডলফিনের দল যখন খেলা করে তখন তাকে আঘাত করা অন্যায়। আবার নদীতে হাঙর যখন আমাকে আক্রমণ করবে তখন নিজেকে রক্ষার জন্য তাকে আঘাত করা আমার পক্ষে অনৈতিক নয়। যদিও সুপ্রাচীণ ধর্মগ্রন্থগুলো বিশ্বাস করে যে, “ঈশ্বরই অ-মানব প্রাণীকে মানুষের কর্তৃত্বাধীন করেছেন।” (জেনেসিস ১,২৯,এবং ৯,১-৩)।

সুতরাং অ-মানব প্রাণী অন্যের সম্পদ না হলে মানুষ খুশী মতো তাদের হত্যা করতে পারে- এই স্বীকৃতি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। খ্রিষ্টধর্মের কর্তৃত্বাধীন এসব মতবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপীয় সভ্যতায় গোঁড়ামির অংশে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই সকল প্রাচীন কলিযুগের মতবাদ আর সাধারণভাবে স্বীকৃত নয়। নিজের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অগ্রাধিকার যেমন মানুষের রয়েছে তেমনি মানবেতর প্রাণীরও রয়েছে। আমাদের বেঁচে থাকা তখনই নৈতিক হবে যখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী সার্বজনীন হবে। প্রাণীজগতে আমি যেমন বেঁচে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করি বা পোষণ করি, ঠিক তেমনি অন্য প্রাণীরাও আমার মতো প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার ইচ্ছা পোষণ করে। এই বেঁচে থাকার ইচ্ছা পোষণের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতাই আমাদেরকে সার্বজনীন করে তুলে নৈতিকতার মানদণ্ডে, এর আগে নয়।

আমার নিজস্ব জীবনধারণের ইচ্ছার মধ্যে যেমন দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার আকুল আকাঙ্ক্ষা আছে তেমনি বিলুপ্ত হয়ে যাবো এই ভেবে ভয়ও আছে। বেঁচে থাকার ইচ্ছে পোষণ করার মধ্যেই রয়েছে পরমানন্দ। আবার বেঁচে থাকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আঘাতই হল বেদনা। সুতরাং বিষয়টি পরিষ্কার, মানব জাতির বাইরে যে জীবজগৎ- তারা নিজেরা বেঁচে থাকার উপলব্ধি ব্যক্ত করতে পারুক বা না-ই পারুক, সকলের সমভাবে বেঁচে থাকার সার্বজনীন অধিকারকে আমি শ্রদ্ধা করি। এটাই নৈতিক মানদণ্ড।

সকল প্রকার জীবনের প্রতিই শ্রদ্ধা- এই মতবাদটির সঙ্গে যাঁর নাম সম্ভবত সবচেয়ে বেশী জড়িত, তিনি হচ্ছেন আলবার্ট শোয়াইটজার (Albert Schweitzer)। “Civilization of Ethics” গ্রন্থে তিনি বলেন, “জীবনকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সযত্নে লালন করাই ভালো; জীবনকে ধ্বংস করা এবং নিবৃত্ত করাই মন্দ…..” অর্থাৎ একজন মানুষ শুধু তখনই প্রকৃতভাবে নৈতিক যখন সে সব ধরণের জীবনকে সাহায্য করার জন্য তার উপর অর্পিত দুর্বার চাপকে হাসিমুখে মেনে নিতে সক্ষম।

যখন সে নিয়মের বাইরে হলেও যেকোন প্রাণকে আঘাত করা পরিহার করে চলে। সে দ্বিতীয় বার প্রশ্ন করে না ঐ প্রাণীটি তার সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য কি না? তার কাছে জীবন মানেই পবিত্র। যদিও এই পবিত্রতা ধর্মীয় মানবতাবাদ দ্বারা আচ্ছন্ন নয়। এখানে পবিত্রতা মানেই সর্বত্র জীবন, অযথা হস্তক্ষেপবিহীন জীবন, অস্তিত্বশীল ইহজাগতিক জীবন।

দার্শনিক পিটার সিঙ্গার তাঁর “Applied Ethics” গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন, “যে বরফ স্ফটিক সূর্য আলোতে ঝলমল করে সে তা চূর্ণবিচূর্ণ করে না,কোন গাছের পাতা সে ছিঁড়ে না,কোন ফুল বিচ্ছিন্ন করে না, এবং চলার সময় কোন কীট পতঙ্গ যাতে পায়ের নিচে পড়ে চূর্ণবিচূর্ন না হয়, সে দিকে সে যত্নবান। গ্রীষ্মের কোন সন্ধ্যায় সে যদি দীপালোক দ্বারা কাজ করে তাহলে বরং সে তার টেবিলের উপর ঝলমলে এবং পাখাসহ নির্জীব পতঙ্গের পর পতঙ্গ উড়ে এসে পড়া দেখার চেয়ে জানালা বন্ধ করে দূষিত বাতাস গ্রহণ করতে অধিকতর পছন্দ করে।” (অনুবাদকঃ ড. প্রদীপ কুমার রায়)

পৃথিবীতে আনন্দ বৃদ্ধি করার দুটি পদ্ধতি রয়েছে; একটি হচ্ছে বর্তমানে অস্তিত্বশীল ব্যক্তিদের আনন্দ বৃদ্ধি করা: অন্যটি হচ্ছে আনন্দপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করবে এমন সত্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করা। আনন্দের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে যদি আনন্দপূর্ণ জীবন অতিবাহিতকারীদের হত্যা করা মন্দ হয়, তাহলে আনন্দপূর্ণ জীবন অতিবাহিত করছে এমন সত্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করাই শ্রেয়। অধিকতর সন্তানের জন্ম দিয়ে যদি আমরা আনন্দে জীবন অতিবাহিত করতে পারতাম তাহলে আমরা একাজটি ভালোভাবেই করতাম, যদিও অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক সমাজ এ কাজকে জটিল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে গেছে। ঠিক তেমনি অধিক আনন্দ সৃষ্টি করতে পারে এমনতর মানবেতর প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি করাও আনন্দের ব্যাপার। এই দৃষ্টিভঙ্গী অনুৎপাদনশীল বধির বাকপ্রতিবন্ধী বিকলাঙ্গ একটি মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে যেমন আদালতের সমস্ত আইন ঐ নৃশংস হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে ঠিক তেমনি উৎপাদনশীল এবং জীববৈচিত্র্য ভারসাম্য রক্ষাকারী নিরীহ মানবেতর প্রাণীটি যার শারীরিক এবং মানসিক শক্তি মনুষ্য জগতের কোনরকম ক্ষতির কারণ নয়, তাকে হত্যা করা কত বড় অন্যায় সেই যুক্তিকেই সবচেয়ে বেশী শক্তিশালী করে।

সকল জীব ও জগতের বাঁচার পরিবেশ তৈরি করে দিতে আমাদের মানসিক বৃত্তি প্রবৃত্তির যথেষ্ট উন্নয়ন উৎকর্ষ সাধন করতে হবে। মানবেতর নিরীহ প্রাণীকে হত্যা করে যদি অন্য একটি মানবেতর প্রাণীর দ্বারা তার শূন্যস্থান পূরণ করা যায় বা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয় এবং এই করে প্রতিস্থাপনকারী মানবেতর নিরীহ প্রাণীর জীবনের মূল্য যদি হত্যাকৃত নিরীহ মানবেতর প্রাণীর মূল্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, তাহলে আত্মসচেতনহীন মানবেতর নিরীহ প্রাণীকে হত্যা করা অন্যায় নাও হতে পারে।

মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন ,লেখক ও কলামিস্ট

ওডি/

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড