• মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮  |   ২৬ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শকুনের ডানা ভাঙতে হবে

  ইমরান হুসাইন

০৪ জুন ২০২১, ১০:১১
dfghd
ছবি : দৈনিক অধিকার

করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে সারা বিশ্বের প্রায় দুই শতাধিক দেশ গুলোর ন্যায় বাংলাদেশ ও ব্যাপক ভাবে করোনার এই ভয়াল থাবায় আক্রান্ত। যার প্রভাবে জনজীবন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত। পাল্টে গেছে সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের গতি ধারা। করোনার প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে উঠতে না উঠতেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ধাক্কা। এই ভয়াবহ অবস্থাতার কারনে সমাজের মানুষগুলো যখন আতংকিত এবং বেশ হতাশ জনক ভাবে সময় কাটাচ্ছে তার মধ্যেও মাথাচাড়া দিয়ে ব্যাপক আকার ধারণ করছে সামাজিক ব্যাধি গুলো।

ক্রমেই বেড়ে চলেছে সমাজের ধর্ষণ নামক ভয়াবহ অবস্থা। যার বিরুদ্ধে শত লেখালেখি, মানববন্ধন করার পরও এ অবস্থার বিন্দু মাত্র পরিবর্তন নেই। প্রশাসনের যেনো টনকই নড়ে না। দুই দিন পর পর এরূপ ঘটনা ঘটেই চলেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ করার কথা কিছু দিন চললেও পরবর্তীতে আমরা তা ভুলে যাই এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে থাকে।

বলছি দেশে করোনার এরূপ ভয়াবহ অবস্থাতেও ঘটে যাওয়া ধর্ষণ ও গনধর্ষনের কথা। যা এই সময়ে সমাজ ও দেশের উপর চরম বিরূপ অবস্থা সৃষ্টি করছে। সমাজের এই ব্যাধি আমাদের কাছে অতি পরিচিত হলেও মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে বর্তমান সময়ে তা খুবই বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক যে মানুষ কতটা হীন মানুষিকতার হলে বর্তমান এই কঠিন সময়েও এমন আচারন করতে পারে!

প্রতিনিয়তই আমরা টেলিভিশনের পর্দা বা খবরের কাগজ খুললেই ধর্ষণ , গনধর্ষন এবং ধর্ষণের পর হত্যার খবর নিয়মিত ভাবে পাচ্ছি । ধর্ষণের এই নির্মম কান্ড থেকে বাদ যাচ্ছে না ছয় মাস বয়সীর শিশুরাও।ছয় মাসের শিশু থেকে শুরু করে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ষাটঊর্ধ বয়সের মহিলারাও। যা সমাজের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক দিক। সম্প্রতি দেশে একটি নৃশংস গনধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে জানা যায় (২৮) মে সাভারের আশুলিয়ায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিশমাইল এলাকায় এক নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে ওই ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী নারীর বোন মানিকগঞ্জে থাকেন। গত শুক্রবার তিনি বোনের বাসায় যান। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে নারায়ণগঞ্জে নিজের বাসায় ফেরার জন্য তিনি বাসে ওঠেন। রাত আটটার দিকে আশুলিয়ার নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে তাঁকে নামিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় বাসের জন্য তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। রাত নয়টার দিকে নিউ গ্রামবাংলা পরিবহনের একটি মিনিবাসের চালকের সহকারী মনোয়ার ও সুপারভাইজার সাইফুল ইসলাম এসে টঙ্গী স্টেশন রোডের কথা বলে তার কাছে ৩৫ টাকা ভাড়া চান। এরপর তিনি মিনিবাসে উঠলে গন্তব্যে যাওয়ার আগেই সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। চালক বাসটি নিয়ে আবার নবীনগরের দিকে রওনা হন। এ সময় বাসের জানালা ও দরজা আটকে বাসের চালক, সহকারীসহ ছয়জন ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। টহল পুলিশ বাসটি থামিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে। যা অতি বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। ধর্ষক নামক ওই শকুনেরা কতটা বেপরোয়া ও হীনমানুষিকতার হলে এমন করতে পারে! এছাড়াই দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি নৃশংস ধর্ষণের চিত্র তুলে ধরছি-

(১) ২৭ মে কুড়িগ্রামের কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারিতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে সৎ বাবাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। (২) ২৪ মে কুড়িগ্রামের উলিপুরে ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর মা উলিপুর থানায় অভিযুক্ত মঞ্জু মিয়াকে (৬০) আসামি করে রোববার (২৩ মে) মামলা করেছেন। (৩) ৮ মে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় স্কুলছাত্রী ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সুমন মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। (৪) ফেনীর দাগনভূঞাতে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্কুলশিক্ষক রমজান আলী শাহিনকে (৩৩) গ্রেফতার করেছে পুলিশ (৫) বগুড়ার ধুনটে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধরালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া এসময় ধারণ করা ভিডিও ও ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন অভিযুক্ত ধর্ষকরা। (৬) ২২ মে ঢাকার সাভারে এক পোশাক শ্রমিককে ধর্ষণের অভিযোগে তার সহকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। (৭)১৭ মে, ভারত থেকে ফিরে আসার পর কোয়ারেন্টিনে থাকা একজন তরুণীকে খুলনার একটি আইসোলেশন কেন্দ্রে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এতে পুলিশের একজন সাব ইন্সপেক্টরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

যেখানে প্রত্যহ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে কিন্তু নেই কোন প্রতিকার,নেই কঠোর শান্তির ব্যবস্থা, নেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ। যেকারণে বেড়েই চলেছে ধর্ষণের মতো এমন নৃশংস ঘটনা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশে করোনার এই ভয়াবহ অবস্থাতেও থেমে নেই ধর্ষণের মতো এমন কুকর্ম। নীতি নৈতিকতা হীন মানুষ রূপী হিংস্র পশুগুলো যখন তখন ঝাপিয়ে পড়ে নারীর উপর। এদের এমন আচারনে মনে হয় না এদের ভিতর মনুষ্যত্ব বোধ আছে। প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে ধর্ষণের মতো এমন বিকৃত কাজ যা কলুষিত করে আমাদের সমাজ ও আমাদের রাষ্ট্রকে। আর এর সাথে আমাদের সমাজ ও দেশের সুশীল সমাজের মানুষ দায়ী কারণ অন্যায় করা ও অন্যায় সহা সমান অপরাধ।

বারবার এমন ঘটনার দৃষ্টান্ত আমাদের এটা জানান দেয় যে, আমাদের দেশে ধর্ষনের বিরুদ্ধে সঠিক বিচার নেই,সঠিক পদক্ষেপ নেই, নেই ধর্ষকের সাজা।যার কারনেই একজন ধর্ষক এমন খারাপ একটা কাজ করার পরেও সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে এবং পুনরায় সেই একই কাজ করতে সাহস পায়।আজ যদি আমাদের দেশে ধর্ষনের কঠিন বিচার ব্যাবস্থা থাকতো তাহলে একজনের কঠিন শাস্তি দেখে অন্যরা সাবধান হয়ে যেতো ফলে সমাজে বারবার এমন ঘটনা ঘটতো না।

কিন্তু আমরা দেখি ধর্ষনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত পরিমান নিয়ম কানুন আমাদের সংবিধানে চালু আছে।ধর্ষনের বিরুদ্ধে পূর্বের নিয়ম দেখলেই আমরা জানতে পারি যে,১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ বিশেষ বিধান আইন করা হয়। পর্যায়ক্রমে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়। ২০০৩ সালে এ আইন আবার সংশোধন করা হয়।ধর্ষণের শাস্তি কত ভয়ানক, তা অনেকেই জানেন না। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের বিচার হয়। এ আইনে ধর্ষণের সর্বনিম্ন শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়েছে। আইনের ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তাহলে সে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে। এ ছাড়া অর্থদন্ড ও দিতে হবে। ৯(২) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা ওই ধর্ষণ-পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে। অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদন্ড ও দন্ডনীয় হবে। উপধারা ৯(৩)-এ বলা হয়েছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুর জন্য দায়ী। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করে, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে ও এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দণ্ডণীয় হবে।

এবছর জানুয়ারীতে ধর্ষনের প্রকোপের ফলে সংসদে এমন একটি প্রস্তাবনা উঠে যেখানে বলা হয় ধর্ষনের শাস্তি হবে ক্রোসফাইয়ার।যদি তাই করা হয় তাহলে সমাজ থেকে ধর্ষণ নামক শব্দটা মুছে যাবে।কিন্তু আলোচিত প্রস্তাববার যথাযথ প্রয়োগ দেখা না যাওয়ায় বেড়েই চলেছে ধর্ষণের প্রভাব।করোনায় লকডাউনের কারনে মানুষ ঘরবন্দী হয়ে যাওয়াতে তাদের রুচির বিপর্যয় ঘটেছে।পর্ণ সাইটের কারনে মানুষ নীতি নৈতিকতার থেকে সরে যাচ্ছে অনেক গুন।মানুষের এরুপ অবস্থা থেকে ফিরাতে প্রয়োজন ধর্মীয় ও নীতি নৈতিকতার জ্ঞান।

সমাজ থেকে ধর্ষণ নামক শব্দ মুছে দিতে হলে প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং নৈতিক শিক্ষা এবং ধর্মের কঠোরতা।পাশাপাশি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সমাজের সবাইকে এক হয়ে এ ধরনের হীন কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সবাই সচেতন হলেই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি দোষীরা যাতে শাস্তি পায় সে দিকটাও কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।তাহলেই ধর্ষণ নামক এই কলুষিত কাজ থেকে আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে পারবো।প্রতিটি মানুষ স্বাভাবিক ভাবে জীবন যাপন করতে পারবে। মুছে যাবে ধর্ষণ নামক জঘন্যতম শব্দটি আমাদের দেশ থেকে।ধর্ষণ নামক শব্দটি মুছে দিতে অতিবিলম্বে ধর্শক নামক শকুনদের ডানা ভাঙতে হবে। এমন দৃষ্টান্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেনো অন্য শকুনেরা এমন চিন্তা করতেও ভয়ে শিহরে উঠে।ধর্ষক নামক এই শকুনদের ডানা ভাঙ্গা এখন সময়ের দাবি।

লেখক : ইমরান হুসাইন। শিক্ষার্থী বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ওডি/

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

সহযোগী সম্পাদক: গোলাম যাকারিয়া

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড