• মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কার দিকে আঙুল তুলব?

  সাজিয়া আফরিন

০২ মে ২০২১, ১৬:৪৯
কার দিকে আঙুল তুলব?
সাজিয়া আফরিন, সহকারী অধ্যাপক (দর্শন বিভাগ) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (ছবি : সংগৃহীত)

কিছুদিন আগে প্রথিতযশা মার্কসবাদী লেখক ও দার্শনিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের রচিত "পিতৃতান্ত্রিকতার বিপক্ষে" শিরোনামে বইটি পড়ছিলাম। বইটির একটি উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ "শহীদ সাবেরকে স্মরণ করে"।

উক্ত প্রবন্ধে লেখক আলোচনা করেছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের তৎকালীন প্রেক্ষাপটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আলোচনার ধারাবাহিকতায় তিনি অবতারণা করেন, বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মগত দুর্বলতা ও তাত্ত্বিক বিভ্রান্তির কিছু মৌলিক দিক যা আজও বিবেচনার দাবি রাখে। উক্ত প্রবন্ধের কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরছি, "রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময়েই পার্টি ধ্বনি তুলেছিল সকল ভাষার সমান মর্যাদার।

আদর্শিকভাবে এই কথাটা ঠিকই ছিল, কমিউনিস্টরা অবশ্যই সকল ভাষা ও জনগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারে বিশ্বাস করে ; কিন্তু বায়ান্নতে যখন লড়াইটা চলছে রাষ্ট্রের শতকরা অধিবাসীদের ছাপ্পান্ন জনের (অর্থাৎ বাঙালীর) সঙ্গে পাঞ্জাবী শাসকদের তখন পশ্চিম পাকিস্তানের পশতু বা সিন্ধি ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য বাঙালী উত্তেজিত হবে এমনটা আশা করার কোনো কারণই ছিল না।

তখনকার পরিস্থিতিতে সকল ভাষার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকে বরঞ্চ বিবেচনা করা হতে পারতো আন্দোলন বানচাল করার অভিসন্ধি হিসেবে।"( পৃ-১০৯)। প্রশ্ন হতে পারে উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করার উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য একটাই - ইতিহাসই তো আমাদের প্রকৃত শিক্ষক।

মোটা দাগে আমি যা বলতে চাই, একটা যুদ্ধ কিংবা আন্দোলন সংগঠিত হওয়ার সময় কোন বিষয়টা অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি কম, কিংবা কোনটি মাঝারি - সেটা যদি সংগঠনকারীদের কাছে পরিষ্কার না থাকে তখন সেই যুদ্ধ বা আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। মহান ভাষা আন্দোলনের সময় যদি আমরা বুঝতে না পারতাম যে, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে লাগাতার আন্দোলন সংগ্রাম করতে হবে কারণ তা শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের মুখের বুলি, তাহলে বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হওয়া তো দূরের কথা, মুখের বুলি হিসেবেও বাংলাকে হারিয়ে ফেলতে হতো।

তাই সকল ভাষার মর্যাদা সমান- এই মহান বাক্যটি প্রতিষ্ঠার চেয়ে তখন "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই" এই দাবিটি প্রতিষ্ঠাই ছিল মুখ্য। একটা রাষ্ট্রের যখন ভাষা আন্দোলন কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো গৌরবময় ইতিহাস থাকে যা ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের দ্বারা সংঘটিত সকল রকম শোষণ ও লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তখন সেই রাষ্ট্রে সকলের, বিশেষ করে নারীর, সামাজিক মুক্তি কামনা করা এদেশের একজন স্বাধীন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার।

কিন্তু যে বাংলাদেশের রয়েছে শত শত অর্জন, তা যেন ম্লান হয়ে যায় যখন ফেসবুকের রঙিন পর্দায় ভেসে আসে ফুটফুটে ষোড়শী মেয়ের লাশের ছবি। আরও হতাশ লাগে যখন গণমাধ্যমগুলোতে দেখতে পাই, মেয়েটির হত্যাকারী কিংবা আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী লম্পট বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর তার বিবাহিত স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য সকলে বিমানে চড়ে দুবাইয়ে পাড়ি দিয়েছে।

পত্রিকাগুলো প্রথম দিকে ভয় পেয়েছিল হত্যাকারীর নাম পরিচয় প্রকাশ করতে, কারণ পুঁজিবাদের নগদ মোটা অঙ্কের অর্থই যে সকল কিছুর নিয়ন্ত্রণকারী। কোন খবর মানুষ জানবে আর কোনটা জানবে না তা তো পুঁজিই নির্ধারণ করে দেবে- এই তো পুঁজিবাদের নিয়ম। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজপতিদের এটা ভুলে গেলে চলবে না, সমাজটা যতই ধসে পড়ুক, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি তার নাম- গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ( People's Republic of Bangladesh)অর্থাৎ রাষ্ট্রটা জনগণের, কেবল গুটিকয়েক পুঁজিপতিদের নয়।

সাধারণ জনগণ আবারও তার প্রমাণ ঠিকই রেখেছে, মুনিয়ার খুনির নাম পরিচয় গণমাধ্যমগুলো প্রকাশ করতে হয়তো দ্বিধায় ভুগতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক, প্রকৃত শক্তি যে জনগণ যাদের শরীরে জীর্ণ পোশাক, যাদের খুব সাধারণ মনে হয় -তারা কিন্তু সেই নাম পরিচয় প্রকাশ করতে ভোলেনি। রাষ্ট্র মুনিয়ার খুনিকে বিচার করতে পারেনি এখনো, কিন্তু সোবহানের যদি বিন্দুমাত্র লজ্জা থেকে থাকে তার ফাঁসি না হোক, কারাদণ্ড না হোক- জনগণ তাকে মানসিক যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তা নিশ্চয়ই তার জন্য সুখকর নয়!

তবু আমাদের যে আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এখনো পুঁজিবাদী সংবাদমাধ্যমগুলো খুব চতুরভাবে মানুষের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিচ্ছে খুনির চেয়ে ঐ নারী বেশি দোষী, কারণ সে টাকার লোভী, সে সম্মতির (Consent) মাধ্যমে ঐ খুনির সাথে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিল, তার অনেক প্রেমিক ছিল, সে লাখ টাকার ফ্ল্যাটে বাস করত ইত্যাদি ইত্যাদি।

অথচ তাদের পত্রিকার ভাষাটা এমনও তো হতে পারতো- ঐ খুনি একটা নারী পিশাচ ছিল, যে তার বিবাহিত স্ত্রীকে তার লাম্পট্য জীবনের কথা জানায়নি, যে পিতৃমাতৃহীন মুনিয়াকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিদেশে নিরাপদে থাকার রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাকে লাখ টাকার ফ্ল্যাটে রেখেছিল- একটা পরিপক্ব আইবুড়ো যতভাবে পারে সেভাবেই বিভোর করেছিল একটা অপরিপক্ব ষোড়শী মেয়েকে। ঐ যে বলছিলাম এই সমাজটা পুঁজিবাদী।

পুঁজিপতিদের স্বার্থ কখনো জনগণের স্বার্থ নয়, পুঁজিপতিদের স্বার্থ ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি। আর ব্যক্তিগত সম্পদ যাদের হাজার হাজার কোটি টাকা,সেখানে লাম্পট্য চরিতার্থের জন্য গুলশানের লাখ টাকার একটি ফ্ল্যাট কিছুই নয়। তার প্রমাণ তারা রেখেছেও। তাদের যখন কারাগারে থাকবার কথা, তারা সেখানে নেই। তারা এখন দুবাই। তাই আমাদের ভাববার সময় এসেছে, আমরা আপামর জনগোষ্ঠী কার পক্ষ নেবো? শতকরা ১ভাগ পুঁজিপতি, নাকি শতকরা ৯৯ভাগ শোষিতের?

আরও পড়ুন : জাতির পরিবর্তনে দরকার সুশিক্ষা

আজকে মুনিয়ার চারিত্রিক বিশ্লেষণে যারা ব্যস্ত আছি, তাদের আবারও ভাবতে হবে- আমাদের ঘরেও মা,বোন,স্ত্রী বা মেয়ে আছে। তারা যদি কখনো অনিচ্ছাকৃত ভুলক্রমে বা ইচ্ছাকৃত,যেভাবেই হোক, অন্য কোনো পুঁজিপতির লাম্পট্যের শিকার হয়, তখনও রাষ্ট্র ঐ লম্পটের বিচার করতে বাধ্য হবে না। রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে আমাদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আজ রাখতে হবে- ঐ লম্পট শোষকের বিরুদ্ধে, যে লাশ হয়ে গেছে তার বিরুদ্ধে নয়। আমরা খুনির বিচার চাই, তার সকল সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানাই।

সাজিয়া আফরিন, সহকারী অধ্যাপক (দর্শন বিভাগ) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড