• মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮  |   ২৭ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মহান মে দিবসের চেতনায় রয়েছে শোষণ মুক্তির হাতিয়ার

  মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন

০১ মে ২০২১, ১০:৩৫
dfgfgh
ছবি : দৈনিক অধিকার

কাজের ঘণ্টা কমানোর আন্দোলনের সঙ্গে মে দিবসের জন্ম কাহিনী অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে বিশ্বব্যাপী। কাজের ঘণ্টা কমাবার এই দাবি শ্রমিক শ্রেণীর কাছে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কলকারখানা ব্যবস্থা চালু হবার পর থেকেই দিনের পর দিন কাজের ঘণ্টা কমাবার এই আন্দোলনের প্রকাশ সেখানে দেখা যায়। প্রধাণত শ্রমিকের মজুরী বাড়াবার দাবিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোড়ার দিকে যতরকম ধর্মঘট আন্দোলন সংগ্রাম লাগাতার শুরু হয়।

১৮৮৫-৮৬সালে আমেরিকার মাটিতে যতগুলো ধর্মঘট হয়েছে তার সঙ্গে পূর্ববর্তী বছরের ধর্মঘটের সংখ্যা তুলনা করলেই বোঝা যায়, কী অভূতপূর্ব সংগ্রামী চেতনা তখন শ্রমিকদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৮৮১ সাল থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বছরে গড়ে ৫০০ ধর্মঘট হয়, আর এগুলোতে অংশগ্রহণ করে গড়ে ১লক্ষ ৫০হাজার শ্রমিক।পরবর্তী বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০০এবং সেই ধর্মঘটে শ্রমিক যোগদানকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২লক্ষ ৫০হাজার।

যখনই শ্রমিকরা নিজেদের দাবি দাওয়া দলিল-লিফলেটে লিপিবদ্ধ করছে, বিশেষ করে তখনই কাজের ঘণ্টা কমানোর সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার তাগিদ দেখা দিয়েছে। একদিকে কাজের ঘণ্টা কমানো ও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার আদায়ের আন্দোলন বাড়তে থাকে, অন্যদিকে মালিকের শোষণের মাত্রাও বাড়তে থাকে। কাজের ঘণ্টা অত্যাধিক বেশি হওয়ায় অমানুষিক চাপে শ্রমিকরা যেমনি পিষ্ট হতে লাগলো ঠিক তেমনি শ্রম যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তির দাবীতে শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পরতে লাগলো।

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত এই ছিল তখনকার দিনে কাজের ঘণ্টা, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। চৌদ্দ, ষোল এমনকি আঠারো ঘণ্টা কাজের দিনও তখন চালু ছিল। ১৮০৬ সালে “ফিলাডেলফিয়ার” ধর্মঘটী জুতা শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে যখন মালিক পুঁজিপতি শ্রেনীর ষড়যন্ত্রের মিথ্যা মামলা দেয়া হয়,তখন শ্রমিকদের ১৯ থেকে ২০ঘন্টা পর্যন্ত খাটানো হচ্ছিল, তা পরবর্তী মেহনতী মানুষের মুখপত্র (ওয়ার্কিং মেমস্ অ্যাডভোকেট) নামক পত্রিকায় প্রকাশ পায়।

১৮২০ সাল থেকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবীতে ধর্মঘটের পর ধর্মঘট তখন চলছিল। দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা কাজের নিয়ম চালুর সুনির্দিষ্ট দাবী ধারাবাহিকভাবে উঠতে থাকে ট্রেড ইউনিয়নের পক্ষ থেকে।১৮২৭ সালে ইংল্যান্ডের ফিলাডেলফিয়ার মেকানিকদের নিয়ে বিশ্বে প্রথম ট্রেড ইউনিয়নের জন্ম হয়।১৮৩৪ সালে নিউইয়র্কে রুটি কারখানার শ্রমিকদের ধর্মঘট চলতে থাকে। গৃহনির্মাণ শ্রমিকরা ১০ঘণ্টা কাজের দাবীতে একের পর এক ধর্মঘটের ডাক দিয়ে বসে। নিউইয়র্ক,বাল্টিমোর,ওয়াশিংটন, মিলওয়াতি,সিনসিনাটি,সেন্ট লুই, পিটার্সবার্গ এইসব অঞ্চলে দশ ঘণ্টা কাজের দাবীর আওয়াজ দ্রুত বেগে একটা তীব্র রাজনৈতিক আন্দোলনের দাবানল আকারে একের পর এক জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

অতঃপর ১৮৩৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ভ্যান ব্যুরেনের আমলে যুক্তরাষ্ট্র সরকার সরকারি কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের জন্য ১০ ঘণ্টা কাজের সময় বেঁধে দিতে বাধ্য হয়।এই আইন পৃথিবীর সমস্ত ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আন্দোলনকে সম্প্রসারিত করার সংগ্রাম পরবর্তী যুগে একটানা চলতে থাকে। ১৮৫০ সাল পরবর্তী বছরগুলোতে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার দাবির ব্যাপারে প্রবল কর্মোদ্দীপনা দেখা দেয়ার সাথে সাথে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি ক্রমশ জোরদার হতে থাকে।

১৮৫৭ সালে পুঁজিবাদের সংকটকালে এই আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হলেও কয়েকটি সুসংগঠিত শিল্প কলকারখানায় এই দাবি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছিল। কাজের ঘণ্টা কমানোর আন্দোলন শুধু যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে তা নয়;উদীয়মান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় অবাধ প্রতিযোগীতার যুগে বুর্জোয়া শ্রেনীর ঊষালগ্নে যেখানেই শিল্পের বিকাশ সম্প্রসারিত হয়েছে, যেখানেই শ্রমিকরা নিষ্পেষিত হচ্ছিল সেখানেই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। সুদূর অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে গৃহ নির্মাণ শ্রমিকরা একই আওয়াজ তুলেছিল, আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা আমোদ প্রমোদ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম-এই দাবীর পক্ষে বিশ্বের দেশে দেশে সাধারণ জনগণ তখন যুক্ত হয়ে গিয়েছে।

১৮৮৬ সালের ১মে আমেরিকার হে মার্কেটের দর্জী শ্রমিকরা ৮ঘণ্টা কর্মদিবস ছাড়াও ন্যায্য মজুরী, নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে বিক্ষোভ প্রকাশ করে। মালিক শ্রেণীর পেটোয়া বাহিনী পুলিশ ও গুন্ডা বাহিনী অস্ত্র ও বোমা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর। অসংখ্য শ্রমিককে গুম ও হত্যা করা হয়।বিচারের নামে প্রহসনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয় স্পাইজ, এঙ্গেলস, ফিসার সহ অসংখ্য শ্রমিক নেতাদের। তখন থেকেই লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায় শুরু হয় আট ঘণ্টা কর্মদিবসের।

শ্রমিক নেতাদের বিনা বিচারে জেল-জুলুম-ফাঁসির বিরুদ্ধে ১৮৮৯ সালে সর্বহারার মহান নেতা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সভায় বিশ্বব্যাপী মে দিবস পালনের প্রস্তাব সিন্ধান্ত আকারে গৃহীত হয়।আজ শতবর্ষ পরেও আমাদের দেশের শ্রমিকরা এতো কম মজুরী পায় যে, ৮ ঘণ্টা কাজের পরেও ১২ঘন্টা থেকে১৬ ঘন্টা ওভারটাইম না করলে তার পেট চলে না। আমরা শ্রমিকদের জন্য এমন মজুরী চাই যাতে ৮ঘণ্টা কাজ করেই তার সংসার চালাতে পারে। তাই এ দেশের অধিকাংশ প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠন দীর্ঘদিন যাবত দাবী করে আসছে ; শ্রমিকদের ১০হাজার টাকা মূল মজুরি এবং১৬ হাজার টাকা মোট মজুরী দিতে হবে কেননা একজন শ্রমিক তার পরিবার নিয়ে নুণ্যতম জীবন যাপনের জন্য এই মজুরি অপ্রতুল হওয়া সত্বেও এই দাবী যৌক্তিক ।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে সকল গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রাম শ্রমিক কর্মচারীদের আত্মত্যাগের রক্তে সিক্ত। তাদের রক্ত শ্রম ঘামে গড়ে উঠেছে এই দেশ।বিশ্বে যে কয়েকটি দেশের রপ্তানি আয় খুব দ্রুত বাড়ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। গড় হিসাবে এক দশক ধরে দেশের রপ্তানি আয়ে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে কেবল ভিয়েতনাম। প্রতিবছর দেশে রপ্তানি আয় হয় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের মতো।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯ শীর্ষক) প্রতিবেদনে বলা হয় বাংলাদেশ এখন ৪২তম বড় রপ্তানিকারক দেশ। রপ্তানিতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার অগ্রভাগে পোশাক খাত। যেখানে শ্রমিকের সস্তা শ্রমই মুনাফার প্রধাণ কেন্দ্রবিন্দু।

অথচ স্বাধীন দেশে তাদের নেই জীবন -জীবিকার অধিকার,নেই জীবনের নিরাপত্তা, নেই কাজের অধিকার,ন্যায্য মজুরীর অধিকার, নেই সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক অধিকার, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, কোনটাই এখনও পর্যন্ত পায়নি তারা।অন্যদিকে কল-কারখানার শ্রমিক ছাড়াও রয়েছে রিক্সা শ্রমিক, অটোরিক্সা শ্রমিক, সি.এন.জি চালক, নির্মাণ শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, প্রাইভেটকার চালক, রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী, রংমিস্ত্রি, মৎস্যজীবী, দিনমজুরসহ অনেক শ্রেনী পেশার শ্রমিক যাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই, নেই নূন্যতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নেই পরিচয়পত্র, নিয়োগপত্র, নেই প্রভিডেন্ট ফান্ড।

আছে শ্রমিকদের উপর পুঁজিপতি মালিক শ্রেনীর নির্মম অত্যাচার, অবহেলা, হয়রানি। করোনার মতো পরিস্থিতিতে পোশাক শ্রমিকের বকেয়া বেতন এবং মজুরি নিয়ে টালবাহানা সারা দেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। শ্রমিকের জীবন ভয়ানক বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে বিজিএমইএ। চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় পাই যখন মালিক শ্রেণীর সংঘটিত শক্তি একের পর এক মিথ্যাচার করে যায়। শ্রমিকের মৃত্যুর মিছিল থামতে পারে নি। ভবন ধ্বসে মৃত্যু, আগুনে পুড়ে মৃত্যু, অনাহারে বিনাচিকিৎসায় মৃত্যু, সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু, শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার, নামে-বে-নামে তোলাবাজি,অবৈধ টোল আদায়,ঘরে বাহিরে নারী শ্রমিকদের উপর যৌনহয়রানিসহ জীবন জীবিকার বহুবিধ সমস্যায় ও ভবিষ্যৎ হতাশায় দুর্বিষহ এক স্বপ্নহীন জীবন বয়ে চলে বছরের পর বছর। শ্রমিকদের জীবনে বড় অভিশাপ হলো বেকারত্ব ও কম মজুরী; যা পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থার অমোঘ ফল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব মতে দেশে বর্তমানে কর্মযোগ্য বেকারের সংখ্যা ৪কোটি ৮২লক্ষ। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের বেতন-মজুরি নির্ধারণে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা আই.এল.ও(I.L.O.) এর নীতিমালায় স্বাক্ষরকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশে এখনও শ্রমিকদের মনুষ্যোচিত মজুরি নির্ধারিত হয় নি। একটুখানি উজ্জল ভবিষ্যতের অন্বেষণে সংগ্রাম করে চলছে বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ। এর শেষ কোথায়? সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম “কুলি মজুর” কবিতায় ঠিকই বলেছিলেন,

“বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল! কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্? রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে, রেলপথে চলে বাষ্প-শকট,দেশ ছেয়ে গেল কলে, বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা কার খুনে রাঙা?-ঠুলু খুলে দেখ, প্রতি ইটে আছে লিখা।”

মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, লেখক ও কলামিস্ট

ওডি/

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড