• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

কাজ কম কথা বেশি

  মাহবুব নাহিদ

০৮ এপ্রিল ২০২১, ১৬:২১
কাজ কম কথা বেশি
মাহবুব নাহিদ (ছবি : দৈনিক অধিকার)

'আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে? কথা না বড় হয়ে, কাজে বড় হবে।'

সেই ছেলের অভাব আমাদের দেশে শুরুর দিক থেকেই ছিল। এ নিয়ে একটি প্রবাদবাক্যও রয়েছে ‘কথা কম কাজ বেশি’। এখানে কথা বলাকে খারাপ বলা হয়নাই, বরং কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ না করে কথা বেশি বলাকে বুঝানো হয়েছে।

এতো বড় দুর্যোগ তবু আমাদের কথার জোর কমে না। আমরা খুব অহমিকার সাথে কথা বলে যাচ্ছি।

কাজ করতে গেলেও কথা বলতে হয়। কিন্তু কাজ না করেই কথা বলা অন্যায়। আমাদের দেশে এখন কাজ কম, কথা বেশি-এই ঘটনাই অহরহ দেখা যাচ্ছে। এই কথাকে অনেক জায়গায় বলা হয় বয়ানে মফিজ। আমরা মাইক পেলে সহজে ছাড়তে চাই না। যতক্ষণ আমাদের দেহে শক্তি থাকে ততক্ষণ কথা চালিয়ে যেতে পারি আমরা।

কাজ সামনে চলে আসলে বালিশ খেলার মতো বালিশ অন্যজনের কাছে পাস করে দিতে খুব ভালো পারি। কাজ করতে গেলে কথা বলেই সময় নষ্ট করে ফেলি, একে বলে কাজের বেলায় ঠনঠন।

আমরা ইদানীং খুবই জাজমেন্টাল জাতি হয়ে গেছি। সহজেই আমরা বিচার করে ফেলি। কে ভালো কে খারাপ এগুলো খুব সহজেই আমরা মন্তব্য করে ফেলি। মানুষের সমালোচনা করা ভালো কিন্তু সেটা নিশ্চয়ই বাস্তবমুখী হতে হবে! কিন্তু আমাদের সমালোচনা হচ্ছে হিংসাত্মক ও ধ্বংসাত্মক।

আমরা সমালোচনা করতে গিয়ে একজনের মূণ্ডুপাত করে ফেলি, মানুষের মনে আঘাত দিয়ে ফেলি। আমরা কোনো একটা কাজের দায়িত্ব নিজে ঠিকই নেই না তবে অন্য কেউ কেন নিচ্ছে না তার জন্য আমরা কত কিছুই না করি। আর বর্তমান সময়ে আমাদের সমালোচক হয়ে ওঠার পিছনে মুল হাতিয়ার হচ্ছে।

ফেসবুক আমাদের আরও বেশি ঘরকুনো বানিয়ে দিয়েছে। শুধুমাত্র নিজেকে জাহির করার জন্য ফেসবুকে আমরা যাচ্ছেতাই করছি। সবার মধ্যে নিজেকে প্রচার করার প্রতিযোগিতা। আমরা এখন পরচর্চা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকি। কোন সেলেব্রিটি কি করল, কার সাথে বিয়ে করল এসব নিয়ে মাতামাতি শুরু করর দেই। কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তো বিশ্লেষণ না করাই শ্রেয়।

সমালোচনা আমাদের জন্য বড় একটি ব্যাধি। বর্তমানে আমরা সঠিকভাবে সমালোচনা করতেও জানিনা আর অধিকাংশ মানুষই সমালোচনা সহ্য করতে পারি না। সমালোচনা সহ্য করতে না পারলে আগানো সম্ভব হয় না। তবে এখনকার সমালোচনার পর্যায় খুবই জঘন্য রকমের। এখন সমালোচনা কিরার জন্য ইস্যু খোঁজে আর বর্তমানে যে ঘরানার সমালোচনা হয় তার নাম দেয়া হয় ট্রল। ট্রল করার নেশায় সবাই ব্যকুল হয়ে থাকে।

কেউ কোনো কথা বললে বা কাজ করলে সবাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখে যে কখন সে ভুল কিছু বলে ফেলে। ভুল কিছু বলা বা করা হলেই শুরু হয় যায় ট্রল নামের ভয়ানক কাজটি। যদি এই ভুলের কোনো ছবি বা ভিডিও থাকে তখন শুরু হয়ে যায় ভাইরাল করার খেলা। ভাইরাল হওয়াটাও আবার অনেকে যোগ্যতা মনে করে। তাই অনেকে আবার ইচ্ছা করেই ভাইরাল হবার মতো কিছু করে ফেলে। তবে এই ভাইরাল হবার জন্য ভালোর চেয়ে খারাপ কোনো কিছু বেশি কাজ করে। তাই নিজের মান সম্মান জৌলুস বিসর্জন দিয়ে হলেও অনেকে ভাইরাল হবার মতো কিছু করে ফেলে।

সমালোচনা যারা করে তাদের নিজেদের যোগ্যতা সম্পর্কে নিজেদের জানা উচিত। নিজে জীবনে ব্যাট হাতে না নিয়েও যদি বিরাট কোহলির ফুটওয়ার্ক নিয়ে কথা বলে মানুষের কাছে তা হাস্যকর মনে করে। সমালোচনা করতে হলে সেই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। পর্যবেক্ষণ করে সঠিকভাবে সমালোচনা করলে তা অবশ্যই মানুষ পছন্দ করবে।

সবচেয়ে বেশি কথা বলতে দেখা যায় রাজনীতিবিদদের। মঞ্চে দাঁড়ালে কথা শেষ হয় না। তারা শুরুতেই দেয় ভূমিকা। এই ভূমিকাই হয়ে যায় বক্তব্যের চেয়েও বড়। মঞ্চে কারা উপস্থিত আছে সবার নাম ঘোষণা করা লাগে প্রত্যেকে বক্তার। এটাকে এক ধরণের বাধ্যতামূলক করে ফেলেছে আমাদের দেশে। মূল বক্তব্য আসার আগেই শ্রোতাদের ধৈর্য পৌঁছে যায় তলানিতে। বক্তব্য এতো দীর্ঘ হয় যে মানুষ তখন আশায় থাকে কখন শেষ হবে।

যদিও এমনটা কিন্তু হবার কথা ছিল না। মানুষ শুনে খুব বেশি কথা মনে রাখতে পারে না। তাই চুম্বকীয় অংশ গুলো আগে বলে কথা সংক্ষিপ্ত করা ভালো। কম কথা বললে মানুষের আর নিনের জন্যই ভালো। রাজনীতিবিদদের কাছে আমাদের অবশ্যই শিক্ষণীয় কিছু থাকবে।

এতো জায়গায় এতো কথা বললেও আমরা এখন কম কথা বলি আড্ডায়। কিন্তু এই জায়গায়ই তো সবচেয়ে বেশি কথা বলা উচিত। তা না করে সেখানে আমরা বসে যাই মোবাইল নামক একটা যন্ত্র নিয়ে এবং লেগে পড়ি সোশ্যাল মিডিয়ায়। এখন আমাদের দেশে গঠনমূলক আড্ডা হয় না, আড্ডায় তর্ক বিতর্ক হয় না। আড্ডা থেকেই তো জ্ঞান আহরণ হবার কথা, যা এখন হয়ে গেছে গারদখানা। কথা বলতে ভুলে গেছি আমরা, দিনদিন ভার্চুয়াল জগতে বন্দী হয়ে যাচ্ছি।

কথা আবার মানুষকে শেখানোও যায়। যেমন বাচ্চাদের মা বাবারা কথা বলা শিখায়। এখানে আবার আমরা এখন কথা কম কাজ বেশি থিওরি প্রয়োগ করি। বাচ্চাদের কথা বলা না শিখিয়ে মোবাইলে গেম খেলা শিখাই কিংবা খাওয়ানোর ধান্দায় কার্টুন খেলতে দিয়ে দেই।

আর যখন কথা বলতে শিখাই তখন আবার শিখাই আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা বাদ দিয়ে ইংরেজি ভাষা। তাই এক্ষেত্রে কথা কম কাজ বেশি করে কোনোই ফলাফল আসে না। আমাদের নতুন প্রজন্ম জন্মের সাথে সাথেই ডুবে যাচ্ছে ভার্চুয়াল জগতে আর শিখছে মাতৃভাষা বাদ দিয়ে অন্য ভাষায় কথা বলা।

আসলে বুদ্ধিমান তারাই যারা কথা কম বলে আর কাজ বেশি করে। কাজ করতে অনেকেই অজুহাত দেখায়। কাজ করতেও যোগ্যতা লাগে। কোনো কাজে কেউ আপনাকে এগিয়ে দিবে না। কাজ নিজের হাতে তুলে নিতে হবে। আর যেকোনো বিষয়ে যারা কাজ করে দুর্নাম তাদেরই হয়। যারা কাজ করে তারাই ব্যর্থ হয়। যারা কিছু করে না তারা ব্যর্থও হয় না। গ্যালারীতে বসে তালি দিতে সবাই পারেন কিংবা খেলা দেখে ভুল ধরে দেওয়ার অনেক মানুষ থাকে।

কিন্তু মাঠে নেমে ব্যাট হাতে বা বল পায়ে দেখিয়ে দেওয়া সহজ ব্যাপার নয়। কোনো একটা কাজে সবাই সফল হবে না। ক্লাসে সবাই প্রথম হয় না, খেলায় দুই দলই জিততে পারে না। একজনকে পরাজয় বরণ করে নিতেই হবে। কিন্তু পরাজিত হবার মানে এই নয় যে আপনিই প্রতিদিন পরাজিত হবেন।

আপনার জন্যও একদিন বিজয় লেখা আছে। কিন্তু হাল ছেড়ে দিলে তো আর কিছুই করা যাবে না। অনেকেই সামান্যতম কাজের পরে ক্লান্ত হয়ে যায়, নিয়তি কিংবা ভাগ্যকে দোষারোপ করে ফেলে সহসা। এগুলো শুধুমাত্র নিজের ব্যর্থতা লুকানোর পন্থা মাত্র। সবসময়ই মনে রাখতে হবে যে আমি সফল হইনি মানে আমার চেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। নিজেকে সর্বদা উন্নতি করার চেষ্টায় থাকতে হবে।

আরও পড়ুন : অন্য দেশ যদি পারে, তবে কেন আমরা পারব না

সব কথার শেষ কথা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত কথা বলা। বেশি কথা বলা কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমাদের কথায় একজনের চেয়ে বড় হবার চেষ্টা না করে কাজে বড় হবার চেষ্টা করা উচিত।

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড