• শুক্রবার, ১৬ এপ্রিল ২০২১, ৩ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩৫ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

অন্য দেশ যদি পারে, তবে কেন আমরা পারব না

  রহমান মৃধা

০৮ এপ্রিল ২০২১, ১০:৫৫
কষ্টের মূল্য সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই দেবেন
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

গতকাল দুটো হৃদয়ছোঁয়া ঘটনার ওপর বেশ সময় দিয়েছি। ঘটনা দুটো যে কেউ জানে না তা নয় বা এ বিষয় নিয়ে বিশ্বের অনেকে ভাবছে না সেটাও নয়। তবুও আমি শেয়ার করতে চাই লেসন লার্নড কনসেপ্টের একটি অংশ হিসেবে। পৃথিবীর ধনী এবং দরিদ্র সমাজের মধ্যে মূল পার্থক্য দারিদ্র এবং এ বিষয়টিই আমার এই রিফ্লেকশনের মূল কারণ।

বহুবছর ধরে পাশ্চাত্যের একটি বিষয় আমি লক্ষ করে চলছি এবং সেটি প্রভাব বিস্তার করেছে বিশ্বের অনেক দেশে। তবে আমি তিনটি কন্টিনেন্টেকে তুলে ধরবো এবং চিহ্নিত করবো দুটি দেশ উদাহরণ হিসেবে। যদিও এ ঘটনা বিশ্বের সর্বত্রই কম বেশি ঘটে। আমার আলোচনায় থাকবে আফ্রিকার গাম্বিয়া এবং এশিয়ার থাইল্যান্ড।

প্রতি বছর পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক বয়স্ক মহিলা গাম্বিয়াতে বিলাসবহুল ছুটি কাটাতে যায়। তাদের বিলাসিতার বড় সময়টি কাটে সে দেশের তরুণ সমাজের সাথে। বয়স্ক মহিলাদের বয়স বেশিরভাগই হবে পঞ্চাশ প্লাস, অন্য দিকে গাম্বিয়ার তরুণদের বয়স হবে কুড়ি থেকে চল্লিশের মধ্যে।

গাম্বিয়ার দরিদ্র এই তরুণেরা পাশ্চাত্যের বয়স্ক নারী পর্যটকদের বিলাসিতা দিতে যৌনমিলনের পথ বেছে নিয়েছে। বিনিময়ে যে অর্থ তারা উপার্জন করে সেটা দিয়ে তারা গাম্বিয়াতে দিব্যি সুন্দর জীবন যাপন করছে। অনেকে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় বয়সের বিশাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও।

অন্য দিকে পাশ্চাত্যের অনেক বয়স্ক পুরুষ থাইল্যান্ডে গিয়ে অতি অল্প বয়সি তরুণীদের সংস্পর্শে এসে বিলাসিতার সাথে সেখানে ছুটি পার করছে। তাদের অনেকেই ওইসব মেয়েদের বিয়ে করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়ে সংসার করছে।

অনেক মেয়ে বিয়ের পর ইউরোপে পারমিশন পেলে বৃদ্ধকে ছেড়ে নিজ দেশের কোনো তরুণকে বিয়ে করে আবার নতুন জীবন শুরু করছে ইত্যাদি। আমাদের সমাজে এসব ঘটনা নিন্দনীয়।

পাশ্চাত্যের মানুষের বেশিরভাগই অর্থে সচ্ছল। সেক্ষেত্রে যে জীবন তারা বেছে নেবার সুযোগ পেয়েছে দরিদ্র দেশের এই তরুণ/তরুণীদের নিয়ে সেটাতে তারা খুশি। একইভাবে এই দরিদ্র দেশের তরুণ/তরুণীরাও এটাকে জীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম হিসেবে পেয়েছে এবং এতে তারা সন্তুষ্ট।

যে যাই বলি বা যেভাবেই দেখিনা কেন বিষয়টি, তাতে তাদের কিছু যায় আসে বলে মনে হয়না। তবে উভয়পক্ষের পার্টনারদের সঙ্গে কথোপকথনে জানা গেল তারা পরস্পর পরস্পরের উপর নির্ভরশীল এবং উইন উইন পরিবেশের সম্পর্কে বিশ্বাসী।

এখন আমরা যেহেতু কটুক্তি করতে পছন্দ করি, সেক্ষেত্রে সমাজ এবং ধর্মীয়ভাবে এর নিন্দা করতে উঠে পড়ে লাগতে পারি, সবই হতে পারে। তবে এদের জীবনের এই অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারি কি? শুধু ঘৃণা, পরনিন্দা বা পরচর্চা করার জন্যই কি আমাদের জন্ম হয়েছে? আমাদের জন্মের সার্থকতা কি তাহলে কিছু না করেই?

অন্য দিকে যা কিছুরই সমাধান করতে হবে বা হচ্ছে পাশ্চাত্যের মানুষই কিন্তু সেটা করে আসছে।

এটা ছিল একটি দিক, আরেকটি দিক সেটা হলো বিশ্বে করোনা মহামারির উপর কিছু ভাবনা। যতোটুকু জানতে পেরেছি তাতে পরিষ্কার যে দরিদ্র দেশগুলোও এর জন্য কম দায়ী নয়। সমস্যা সৃষ্টি করবো অথচ সমাধান করবো না তা হবে না।

সব সমস্যা নিশ্চয় শুধু পাশ্চাত্যের মানুষ করে এমন কোনো নজিরও নেই তাহলে শুধু তারা কেন সমাধান করবে? বর্তমান করোনা সমস্যার সঙ্গে নতুন আরেকটি ভয়াবহ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং এটি সম্ভবত আফ্রিকা থেকে শুরু হবে। সে আবার কী?

ইদানীং আফ্রিকার অনেক দেশেই প্রচুর বাদুড়ের পাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কারণ মানুষ জাতির খাদ্যের সমস্যা দূর করতে দরকার উৎপাদন এবং তার জন্য প্রয়োজন উর্বর জমি। এখন সেটা পেতে পৃথিবীর সমস্ত জঙ্গল কেটে শেষ করা হচ্ছে। যার ফলে জলবায়ুর বিশাল পরিবর্তনের সঙ্গে পশুপক্ষি এবং মানুষের বসবাসের দূরত্ব কমতে শুরু করেছে। বাদুড় সহ অনেক বন্য পশুপক্ষি ইদানীং ঘনবসতি এলাকাতে আসছে খাদ্যের সন্ধানে।

আমরা বর্তমান আটশো কোটি মানুষ এবং তার প্রায় ছয়শো কোটি মানুষেরই পেটে খিদে। স্বাভাবিকভাবে বাদুড় থেকে শুরু করে যা কিছু চোখের সামনে পড়ছে, শিকার করে খেতে শুরু করছি। এসব বন্য পশুপক্ষি নানা ধরণের ভাইরাস বহন করে চলছে তাদের দেহে যুগ যুগ ধরে, যা আমাদের ভাইরাস থেকে ভিন্ন।

আমরা মানুষ জাতি কখনও পশুপক্ষির ভাইরাস আমাদের শরীরে ম্যানেজ করে বেঁচে থাকতে পারবো না। এখন আমরা যে সব বন্য পশুপাখি শিকার করে খেতে শুরু করেছি সেসব পশুপাখির বর্জ থেকে শুরু করে রক্তে যেসব জীবনু রয়েছে তা আমাদের শরীরে ঢুকে মহামারির সৃষ্টি করছে এবং আগামীতেও করবে।

এখন আমাদের নিজ নিজ দেশের ভৌগলিক আইডেন্টিটি, পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও এবং আমরা ধনী বা দরিদ্র হওয়া সত্ত্বেও একে অপরের সঙ্গে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মিশছি, বিভিন্ন দেশ বিদেশের খাবার খাচ্ছি। সেক্ষেত্রে সম্ভব কি মহামারি এলে সেই বিপদ এড়িয়ে চলা? শুধু যৌনতা বা বিনোদনের কারণে যে আমরা একে অপরের সঙ্গে মিশছি তা নয়, আমরা দিন দিন একে অপরের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি নানাভাবে। সে ক্ষেত্রে সময় এসেছে মানুষের ভারসাম্য রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়ার, সময় এসেছে সবাইকে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার।

ভবিষ্যতে করোনা ভাইরাসের মতো সকল মহামারির জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া আশু প্রয়োজন। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে ২৩টি দেশের নেতারা আলোচনা এবং একটি চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী যেকোনো বিষয়ে তথ্য বিনিময়ের বিষয়ে কঠোর বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছে।

গত নভেম্বরে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক দেশগুলোর জোট গ্রুপ-২০–এর সম্মেলনে এ ধরনের একটি চুক্তির ধারণা তুলে ধরেছিলেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল। সেখানে মহামারিতে টিকা, ওষুধ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার সর্বজনীন ও সমান অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক নতুন এই চুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন।

কোভিড-১৯ মহামারিতে যেসব ঘাটতি দেখা দিয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা সম্ভব হবে নতুন এই চুক্তি হলে। বিশ্ব সংস্থার সদস্য ১৯৪টি দেশের প্রতিনিধিদের এটা নিয়ে এখনই কিছু করতে হবে।

কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। এক বছর তিন মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ২৮ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ নিয়েছে এই করোনাভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে চীনকে গোপনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

কয়েক মাস আগে চীনের উহান ঘুরে আসা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি প্রতিবেদন দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, বাদুড় থেকে মানবদেহে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো প্রাণী অন্তর্বর্তী পোষক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে বলে তাঁদের ধারণা। তবে উহানের গবেষণাগার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়েছে বলে যে সন্দেহের কথা বলা হয়েছিল, সেটা সঠিক তথ্য না এবং এর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

মহামারি মোকাবিলায় প্রস্তাবিত চুক্তিতে সম্মতি দেন ২৩ দেশের নেতারা। দেশগুলো হলো যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, নরওয়ে, গ্রিস, ফিজি, পর্তুগাল, রোমানিয়া, রুয়ান্ডা, কেনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, চিলি, কোস্টারিকা, আলবেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো, তিউনিসিয়া, সেনেগাল, সার্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইউক্রেন। এ সংক্রান্ত চিঠিতে এখনো সই করেনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের নেতারা এই প্রস্তাবে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক জানিয়েছেন।

আমি মনে করি এসব কাজে বাংলাদেশের নাম শুরু থেকে থাকা উচিত। বিশ্বের উন্নত দেশের মতো প্রথম সারিতে থেকে ইনিসিয়েটিভ নেওয়া উচিত। আর কতোদিন পিছনে পড়ে থাকতে হবে আমাদের? আমাদের ইনিসিয়েটিভ কেন হতে পারে না 'বি দ্য ফার্স্ট ট্যু বি নোন'?

এতকিছু বলার একটাই উদ্দেশ্য। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য সব সময় দেশকে দেশের মানুষকে আরামের জায়গা (কমফোর্ট জোন) থেকে বাইরে আনতে হবে, রাখতে হবে প্রচণ্ড ধৈর্য। আর চিন্তাচেতনা থাকতে হবে উদ্দেশ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে (ফোকাসড)। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যাদের, তারা তা করতে পারলে সেটা হবে বিশাল একটি অর্জন, এ কথা বলা যায়। কারণ, এ প্রক্রিয়া চলাকালে যে শারীরিক, মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হয়, তার সাক্ষী শুধুই আমরা বাংলাদেশিরাই।

কষ্টের মূল্য সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই দেবেন। যেখান থেকেই শুরু করি না কেন জয় আমাদের হবেই, কেননা আল্লাহ আমাদের সহায়।

আমার জীবনে এ রকম অনেক সাফল্য, পরাজয় আর পরিশ্রমের গল্প আছে, যা হয়ত মিলে যাবে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। আহামরি কিছু নয়, তবে কেন তুলে ধরা? শুধু ইতিবাচক শক্তিটাকে ছড়িয়ে দেওয়া, এটুকুই!

আমি ইতিবাচক বা পজিটিভিট দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে বিশ্বাস করি। এর একটা বিশেষ কারণ, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক করুণ অবস্থা। আর তা বারবার মনে করিয়ে দেয় আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত সমাজব্যবস্থা।

আমাদের সামাজিক অবস্থান মনে রাখা উচিত। অনেকেই আমাকে বলে বাংলাদেশের কখনও পরিবর্তন হবে না এবং বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে না।

আরও পড়ুন : বিবেক তখনই পীড়াদায়ক যদি তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো না হয়

লেখালেখি করে সময় নষ্ট করার কী দরকার ইত্যাদি। এসব অপমানজনক কথা আমার মধ্যে জিদের জন্ম দেয়, আমাকে উৎসাহ জোগায়। অন্য দেশ যদি পারে কেন আমরা পারব না? অন্যরা গাম্বিয়া ও থাইল্যান্ডে আরাম-আয়েশে ছুটি কাটিয়েও যদি বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে পারে তাহলে আমরা আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কেন পারব না? পারতে যে আমাদের হবেই।

লেখক : রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড