• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ২ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩২ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

ব্যক্তি বা দল নয় আসুন দেশের কথা ভাবি

  রহমান মৃধা

০৪ এপ্রিল ২০২১, ১২:২০
ব্যক্তি বা দল নয় আসুন দেশের কথা ভাবি
ফাইজারের প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের সাবেক পরিচালক রহমান মৃধা (ছবি : সংগৃহীত)

আমার ভাবনার সাথে জড়িত জীবনের অভিজ্ঞতার কিছু কথা যা অপ্রিয় সত্য কথা। শুরু করি ভাষা আন্দোলন দিয়ে। কারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ভাষা আন্দোলনে? সালাম, বরকত, রফিক, শফিক আরও কত অজানা নাম। এরা সবাই গ্রামের ছেলে। দেশ স্বাধীন করার জন্য কারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল? কারা জীবন দিয়েছিল? জাতির পিতা শেখ মুজিব থেকে শুরু করে যাদের নাম আসবে তারা সবাই গ্রামের ছেলে। বাংলাদেশের ৯০% লোক, আমরা গ্রামের ছেলে/মেয়েরা সব সময় ঝাঁপিয়ে পড়ি দেশের স্বার্থে, দেশ গড়ার স্বার্থে, দেশকে বহিঃশত্রুর থেকে রক্ষা করার স্বার্থে।

যুদ্ধের সময় যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ছিল পৃথিবীর অনেক দেশে, তাদের সামর্থ্য ছিল অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে, তাই তারা সহজেই দেশ ছাড়তে পেরেছিল এবং তাদের বেশির ভাগই ছিল শহরকেন্দ্রিক। আমার এই বিশ্বভ্রমণে দেখছি হাজারো মেহনতি ভাইয়েরা যারা এসেছে বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, তারা কঠিন কাজ করছে, একই সাথে যখন তারাও ভালো কিছু দেখছে তা তারা বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে এবং উৎপাদন করছে, নানা ধরনের ফলমূল থেকে শুরু করে খাদ্য সামগ্রী পর্যন্ত। তারাও সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধ করে চলছে তারা।

দেশকে বহিঃশত্রু থেকে মুক্ত করলেই তো দেশ মুক্ত হলো না। দেশকে খাদ্যের অভাবমুক্ত, অন্নবস্ত্রের অভাবমুক্ত, কুশিক্ষা মুক্ত, পরাধীন চেতনা মুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।

সোনার বাংলা গড়তে হলে যারা বর্তমান নানা দায়িত্বে আছে তাদেরকে সক্রিয়ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে আমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

আমি মনে করি যারা ক্ষমতায় থেকেও তার সদ্ব্যবহার করছে না, যারা অন্যকে বিনা অপরাধে অপরাধী করছে, যারা অসৎ পথে অর্থ সঞ্চয় করছে, যারা দুর্নীতি করছে, তারাই হচ্ছে প্রকৃত পক্ষে দেশের শত্রু এবং এদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে অতীতের মতো।

যদিও এখানে একটু সমস্যা আছে, তা হলো তারা ছিল দেশের বাইরের শত্রু আর এরা দেশের ভিতরের শত্রু। এই শত্রুদের মধ্যে কেউ আমার বাবা, কেউ আমার মামা, কেউ আমার চাচা, কেউ আমার বন্ধু, কেউ বা আমার বন্ধুর বন্ধু। তাই এদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া বড় কঠিন।

আসুন আলোচনা করি কিছু অপ্রিয় সত্য কথা নিয়ে। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে নিহত জাতীয় চার নেতার একজন এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। এছাড়া তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মুখপাত্রও ছিলেন।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ নাসিম। এর আগে ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

বাবা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর। তাঁর সন্তান মোহাম্মদ নাসিম বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আস্থাভাজন। ছাত্রজীবন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন নাসিম। বিভিন্ন আন্দোলনে রাজপথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাবার মতো তিনিও দেশের রাজনীতিতে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। মোহাম্মদ নাসিম ভোটের রাজনীতিতে অত্যন্ত সফল।

আশ্চর্য হলেও সত্য যে তার মৃত্যুতে মানুষের মধ্যে শোকের বন্যা বয়ে যাবার কথা ছিল। দুঃখজনক হলেও সত্য হয়েছে ঠিক এর উল্টোটা। কারণ মনে হয় একটিই তা হলো (যদিও স্বাস্থ্য খাতের অধঃপতন এবং দুর্নীতি তাঁর সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল) তিনি বর্তমান সরকারের রাজনীতি করতেন!

অন্য দিকে কবি জসীমউদ্দীনের জামাতা ব্যারিস্টার মওদুদ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মপক্ষ সমর্থন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে দেশের প্রথম সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দেন মওদুদ। বিএনপি গঠনে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। জিয়া তাকে মন্ত্রী ও পরে উপপ্রধানমন্ত্রী করেছিলেন।

জিয়ার মৃত্যুর পর মওদুদ সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের হাত ধরেন। এরশাদের নয় বছরের শাসনামলে তিনি মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেন। এরশাদ সরকারের পতনের পরও জাতীয় পার্টিতেই ছিলেন মওদুদ।

১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর তিনি বিএনপিতে ফেরেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে তিনি আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত মওদুদ, আইন ও সমকালীন রাজনীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন।

স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা, বাংলাদেশ, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ - প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামরিক শাসন, এ স্টাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস, কারাগারে কেমন ছিলাম, বাংলাদেশ ইমার্জেন্সি অ্যান্ড আফটারম্যাথ ২০০৭-২০০৮ তার উল্লেখযোগ্য বই।

মওদুদ আহমেদ মারা যান কয়েকদিন আগে। মওদুদ আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক চরিত্র। বাংলাদেশের সমসাময়িক ইতিহাসজুড়ে তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি লক্ষণীয়। তিনি কখনো নন্দিত, কখনো নিন্দিত। আমরা মওদুদ আহমদের বইয়ের আলোচনায় প্রবেশ করলে বহু কিছু জানতে পারব।

বাংলাদেশের রাজনীতিকে বুঝতে হলে মওদুদের রাজনৈতিক সাহিত্য হবে আলোকবর্তিকা। জেলে বসে নিজেকে রাজনৈতিক লেখায় নিয়োজিত রাখার যে ধারা তিনি চালু করেছেন তা বিরল।

আমার কাছে কেন যেন মনে হয়েছে বই লিখার কারণে হয়তো বা তিনি সব সরকারের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। মওদুদ আহমদ দুই নেত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখেছেন। এর সঙ্গে দলের প্রশ্ন কতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি সত্য হলো এটাই বাস্তবতা। এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শক্তি, এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের দুর্বলতা। একজন মওদুদ আহমদ তার অনন্যসাধারণ সচেতন কুশীলব।

তবে আমার ভাবনা থেকে গেল! জাতিকে বা দেশকে তিনি কী দিয়েছেন? বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ স্বাধীন হতে অনুপ্রেরণা এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হবার পর যে সকল নেতা এপর্যন্ত মারা গেছেন, জাতি ভালো মতো তাদের স্মৃতিচারণে বেশ ধুলায় দিয়েছেন। মওদুদ সাহেবকে কেউ তেমন ধুলায় দেয় নি, বরং বেশ ভালই বলছে, কিন্তু কারণ কী?

সারা জীবন সরকার পার্টি করে তিনি কি শুধু নিজের আখের কামিয়েছেন নাকি দেশের জন্য কিছু করেছেন? আইনের তেমন পরিবর্তন বা উন্নতি হইছে বলে মনে হয় না। কারণ অনেক আইনে এখনও সেই ব্রিটিশ ভাষা রয়েছে এবং সেই জটিলতার কারণে আইনে যে ফাঁক রয়েছে তার জন্য অনেকই দিব্যি বেকসুর খালাশ হচ্ছে আবার অনেকে জেল হাজতে আটকে পড়ে আছে। তারপরও সবার মুখে মওদুদ সাহেবের প্রশংসা শুনে জানতে ইচ্ছে করছে কী কারণে জাতির মধ্যে এই পরিবর্তন যে তাকে কেউ গণ ধুলায় দিলো না!

মওদুদ আহমেদ এত বছর এত বড় সুযোগ এবং দায়িত্ব পালন করা স্বত্বেও দেশের জন্য তার অবদান দেশকে রসাতলে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করেছেন বলে আমি মনে করিনা। তবে নিজেকে প্রভাবশালী করেছেন নানা ধরনের বই লিখে এবং বিক্রি করে।

তিনি ক্ষমতায় থেকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। কারণ দুই দুই বার মিলিটারি সরকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহাযতা করেছেন। অথচ তার বই পড়লে মনে হবে তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি সত্যিকার গণতন্ত্রের চাবিকাঠি। কাজ এবং কথা দুটো ভিন্ন জিনিষ, সেটা প্রমাণিত তার চরিত্রে। আর সেটা ফুটে উঠেছে তার বইতে। স্বাধীনতার সময় যে চেতনা তার মধ্যে ছিল সেই ভাবে তিনি পরে সুযোগ পেয়েও সেই চেতনাকে কাজে লাগাতে পারেন নি, পেরেছেন নিজকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

বাংলাদেশে যে বিষয়টি বেশি লক্ষণীয় সেটা হলো কী বলা হচ্ছে সেটা নয়, বরং কে বলছে এবং কোন পার্টি করে, তার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে মোহাম্মদ নাসিম যদি কিছু ভালো কাজ বা কথা বলেও থাকেন তা জনগণ ভালো চোখে দেখেননি।

কারণ তিনি বর্তমান সরকার পার্টি করতেন এটাই ছিল গণ ধুলাইয়ের কারণ। ঠিক একই ভাবে মওদুদ আহমেদের হাজার দোষ থাকা স্বত্বেও জনগণ সব উপেক্ষা করেছে, কারণ তিনি বর্তমান সরকারের অধীনে তার রাজনীতির জবানিকা টানেন নি।

আমার কাছে কেন যেন মনে হলো বিষয়টি তুলে ধরি কারণ অতীতের ভুল থেকে যদি পরিবর্তন না আনতে পারি দেশ এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে তবে একই ঘটনা ঘটে চলবে। আমাদের ভাবতে হবে মানুষের কথা, ফিরিয়ে আনতে হবে মনুষ্যত্বকে, এমন প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে আমাদের সকলের, তবেই হবে সম্ভব জনগণের ভালোবাসা অর্জন করা।

আরও পড়ুন : জন্মভূমি ত্যাগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মওদুদ আহমেদকে পারলাম না বলতে —-কেহ জানিবে না মোর গভীর প্রণয়, কেহ দেখাবে না মোর অশ্রুবারিচয়। আপনি আজিকে যবে শুধাইছ আসি, কেমনে প্রকাশি কব কত ভালোবাসি।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে।

[email protected]

ওডি/কেএইচআর

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড