• শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ২৫ বৈশাখ ১৪২৮  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

মানহীন শিক্ষায় বাড়ছে বেকারত্বের অভিশাপ

  শাহীন আলম

১৬ মার্চ ২০২১, ১৩:৫৩
ইবি
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থী শাহীন আলম। ছবি : সংগৃহীত

বলা হয়, ‘যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত।’ তবে শিক্ষা যদি হয় মানহীন তাহলে সেটা হয়ে দাঁড়ায় গভীর জাতীয় অভিশাপ। মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি হলো শিক্ষা যা বাকি চারটিকে প্রভাবিত করে থাকে।

শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের সর্বোত্তম লাভজনক ও অব্যর্থ বিনিয়োগ যা তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করে তুলতে সহায়তা করে। অথচ সেই শিক্ষাই আজ আমাদের নাভিশ্বাসের কারণ। গবেষণাহীন, পুরনো, অগভীর, অগোছালো ও মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থার দ্বারা কেবল তৈরি হচ্ছে মগজধোলাই করা গ্রাজুয়েট। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। বগল বাধা ফাইলবন্দি সার্টিফিকেট আর জীবন বৃত্তান্তের ভারে চাপা পরছে হাজারও বেকার তরুণের স্বপ্ন।

‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ সাময়িকীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রিধারীদের প্রায় ৪৭ শতাংশই বেকার। সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এর হিসাবে, মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর ৩৩ শতাংশেরও বেশি বেকার। এর মধ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর ৩৪ শতাংশ, স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রিধারীর প্রায় ৩৭ শতাংশ, উচ্চ মাধ্যমিকের ২৮ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পাশ করা তরুণ-তরুণীর প্রায় ২৭ শতাংশ বেকার।

অপরদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়েমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল আউটলুক’ এর গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীর বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় চারগুণ। নারীর বেকারত্বের হারে উচ্চ শিক্ষিতদের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া বেকারত্ব নিরূপণ মানদণ্ড অনুযায়ী, যারা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজের সুযোগ পান তারা হলো ‘ছদ্ম বেকার’। দেশে এমন লোকের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। তবে বাংলাদেশে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা কত তা নিয়ে ধোঁয়াশা এবং নানা বিতর্ক থাকলেও সরকারি কোনো খাতে একটি শূন্য পদে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা দেখলেই সেটি সহজে অনুমান করা যায়।

শিক্ষার নানা সূচকে আমাদের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হলেও মানসম্মত ও কার্যকর শিক্ষা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের ‘লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশন প্রমিজ’ প্রতিবেদন বলেছে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ১১ বছরের শিক্ষা জীবনে যা শিখছে অন্য দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মাত্র ছয় বছরেই তা শেখানো হয়। এর মূল কারণ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নয়ন কর্মসূচির অনুপস্থিতি, নিম্নমানের শিক্ষাচর্চা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষা খাতে কম অর্থ বরাদ্দকে দায়ী করা হয়েছে।

অথচ বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালেই বলেছিলেন, আমাদের শিক্ষাবাজেট জিডিপির ৪ শতাংশ হতে হবে। কিন্তু আমরা আজও তা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। তাছাড়া আমাদের ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাতও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। একজন শিক্ষকের গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থীকে পড়াতে হয়। এমনকি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য।

শিক্ষকের ওপরই জাতির ভবিষ্যৎ। অথচ শিক্ষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান না করায় মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এছাড়া অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিক্ষাখাতে দুর্নীতি। এতে করে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিরা চলে আসছেন শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ মহান পেশায়।

বিশ্বব্যাংক তার এক গবেষণায় বলছে, তৃতীয় শ্রেণির ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় যা পড়ে তা বুঝতে পারে না। আবার পঞ্চম শ্রেণির ২৫ শতাংশ কোনোরকম অংক বুঝলেও বাকি ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই পাঠ্য বইয়ের অংক বুঝতে পারে না। এর একমাত্র কারণ হিসাবে বলা যায় শিক্ষকদের অযোগ্যতা।

আরও পড়ুন : বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

প্রতি বছর লাখো শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে আমাদের দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। অথচ তার প্রায় ৫০ শতাংশই থেকে যাচ্ছেন বেকার। তাই যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। শ্রম বাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে ঢেলে সাজাতে হবে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা। নজর দিতে হবে গবেষণা এবং কর্মমুখী শিক্ষায়।

অর্থনৈতিক নীতি এবং গতি-প্রকৃতির সাথে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করতে হবে। উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি প্রণয়ন করে তা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যেমনটা ইতোমধ্যে করেছে মালয়েশিয়া। দেশটি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং বিগত ৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা নামিয়ে এনেছে অর্ধেকে। এছাড়াও আমাদের শিক্ষার মান বাড়াতে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবলের যে শূন্যতা রয়েছে সেটি পূরণ করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, সর্বোপরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

ওডি/আইএইচএন

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড