• সোমবার, ০১ মার্চ ২০২১, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭  |   ২৪ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে অর্জিত আমাদের মাতৃভাষা

  মাথিয়া ঐশী

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৬:২২
শহীদ মিনার
ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধায় নির্মিত শহীদ মিনার। ছবি : সংগৃহীত

একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশ মানেই মাথা নত না করা। একুশ মানেই আমাদের অস্তিত্বের অহংকার। একুশ আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তিমূল। এই দিনটি বাঙালির জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। এই দিনে আমরা ফিরে পেয়েছিলাম বাংলায় কথা বলার স্বাধীনতা। যে মৌল ভিত্তির ওপর বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে, তা প্রাণের ভাষা-বাংলা।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রক্ষার লড়াইয়ে রাজপথে প্রাণ দেয় হাজারো বাঙালি। বাঙালি জাতির এই ঐতিহ্যময় ও গৌরবের ভাষা আন্দোলনের মূল্যবোধ এবং স্বাধীনতার ওপর এর প্রকৃষ্ট প্রভাব অনস্বীকার্য। কেবল তাই-ই নয় ভাষা আন্দোলনের জন্য এরূপ আত্মদানের এই বীরত্বগাঁথায় ইতিহাসে বিশ্বের কাছে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাঙালি জাতি।

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় রূপ নেয় পূর্ব পাকিস্তান। তবে বিভাজনের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তীব্র জাতিসত্তার তাড়নায় ঘুম ভাঙে বাঙালি জাতির। তারই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। আর এই ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের প্রতিবাদ করে পূর্ব বাংলার মানুষ। ছাত্র-যুব-জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন বিক্ষোভ করে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ আন্দোলন শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সচেতন শিক্ষিত শ্রেণির একটি বিশাল অংশ। ছাত্রদের ডাকা এই মহাসমাবেশে সর্বশ্রেণির মানুষ যোগদান করে। বাঙালি শিক্ষিত নারীরাও এ আন্দোলনে যোগ দেয়।

আদর্শবাদী ছাত্র যুবারা সব হারানোর ভয় কাটিয়ে শুধু আদর্শের টানে দাবি আদায়ের স্বপ্ন নিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল এই একুশে ফেব্রুয়ারিতে। রক্তে রাঙা রাজপথে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই। বাঙালি জাতি সেদিন নিজের স্বতন্ত্র রক্ষায় প্রতিবাদী, সাহসী ও সংগ্রামী হয়ে উঠেছিল। বুকের রক্ত দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা। কেউ জানে না শহরের কোন কোণে কোন বাড়িতে সন্তানের অপেক্ষায় তাদের মা চাপা কান্নার জলে বুক ভাসিয়েছেন। তাদের অপেক্ষা ছিল আমৃত্যু অবধি, গভীর শোকে যন্ত্রণাদগ্ধ। হারিয়ে গেছেন একাধিক ভাষা সংগ্রামী নামহীন, পরিচয়হীন অন্ধকারে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা পায় এমন হাজারো প্রাণের বিনিময়ে।

অবশেষে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে বাঙালির দাবি মেনে নিয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। বাঙালি জাতি মাতৃভাষার অধিকার ফিরে পায়। একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির নবজাগরণের দিন। জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার দিন। বীরের জাতি হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত হওয়ার দিন। ভাষা আন্দোলনের এই উত্তাল দিনগুলো আমাদের প্রেরণা। বাঙালি জাতির এ প্রাণশক্তি স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাঙালি তারুণ্যের শক্তির কাছে যুগে যুগে অপশক্তি পরাজিত হয়েছে। ভাষা শহীদদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি সেদিন মায়ের ভাষার মর্যাদা অর্জনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও পায় নব প্রেরণা। এরই পথ বেয়ে শুরু হয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

একুশ শুধু কথা বলার অধিকার এনে দেয়নি, আমাদের সংস্কৃতিকভাবেও সচেতন ও জাগ্রত করেছে। ভাষা আন্দোলনের সেসব ঘটনা নিয়ে রচিত হয়েছে শত শত ঐতিহাসিক গ্রন্থ। এসব গ্রন্থ- কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধের। মাতৃভাষার জন্য বাঙালির সেই আত্মত্যাগের কাহিনী সেসব গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে। ভাষা শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে স্মৃতির মিনার ‘জাতীয় শহীদ মিনার’।

আমাদের একুশ আজ বিশ্বের। ভাষা আন্দোলন ও ভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।

আরও পড়ুন : ভাষার মাসে তরুণ শিক্ষার্থীদের ভাবনা

কিন্তু আজও ভাষার সংকট কাটল না! এটি বরং ঘনীভূত হলো পুঁজিবাদের মাধ্যমে, বিশ্বায়ন ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়ে। এখন আমাদের ভাষা ব্যবহারে সকল ক্ষেত্রে সংকট। আমাদের উচিত মাতৃভাষাকে আপন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া এবং সর্বোপরি বাংলা ভাষাকে নানা বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করা। তাহলেই একুশের শহীদদের প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা দেখাতে পারব।

লেখক: সদস্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: 02-48118241, +8801907484702 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড