• মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৭ আশ্বিন ১৪২৭  |   ২৯ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলে কাজ হবে না

  রহমান মৃধা

১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ২৩:৩৭
অধিকার
রহমান মৃথা

বহুদিন আগের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। চাকরি করি তখন ফার্মাসিয়ার হেড অফিস স্টকহোমে। সে সময় সবাই যার যার জায়গা থেকে কোম্পানির কাজ করে চলছে, তবে ফলাফল আশানুরূপ হচ্ছে না। নতুন প্রডাক্ট মার্কেটে ছাড়ার যে ডেটলাইন ছিল তা সঠিকভাবে মেইনটেইন করতে কেউ সক্ষম হচ্ছে না।

কোম্পানির পাইপলাইনে তখন অনেক প্রজেক্ট। সব সেকশনে দায়িত্বশীল কর্মী সেই সঙ্গে প্রজেক্ট লিডার, লাইন ম্যানেজার এমনকি টপ ম্যানেজমেন্ট থাকা স্বত্বেও লিডটাইম এবং খরচে বড় আকারে ডেভিয়েশন দেখা দিতে থাকে।

এমতাবস্থায় কোম্পানির টপ ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় একটি টাস্কফোর্স বা জরুরি গ্রুপ তৈরি করতে। এই জরুরি গ্রুপের কাজ হবে পুরো বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তদন্ত করা এবং সমস্যার সমাধান দেয়া। এ ধরনের জরুরি গ্রুপ সাধারণত ক্রসফাংশনাল হয়ে থাকে।

সে ক্ষেত্রে টিম গঠন করতে হলে অর্গানাইজেশনের দক্ষ কর্মীদের সমন্বয় ঘটাতে হয়। এসব টিমে সব সেকশনের এক্সপার্ট থাকে যারা দক্ষতার সাথে চ্যুতিগুলো বের করে সমাধান দিতে পারে।

ওয়েস্টার্ন দেশগুলোতে বিশেষ করে সুইডেনে এ ধরনের টাস্কফোর্স তৈরি করা মানেই কোম্পানির ম্যানেজমেন্টে বড় ধরণের গাফিলতি বিদ্যমান। সেক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্টে রদবদল করা এমনকি চাকরি থেকে উচ্চ পদের ম্যানেজারদের বহিষ্কার করা হয়ে থাকে।

কারণ নামি দামি ম্যানেজার থাকা সত্ত্বেও যখন একটি কোম্পানি খারাপের দিকে যেতে থাকে তখন সমস্যার সমাধানে নতুন টিম গঠন করা প্রয়োজন হয়। এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে কোম্পানির পে-ব্যাক প্রফিটেবল করা।

আমার কর্মজীবনে এ ধরণের জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাই জানি কীভাবে এসবের সমাধান করতে হয়। আমি শুধু এতটুকু ফিডব্যাক দিতে পারবো আমার অভিজ্ঞতা থেকে তা হলো প্রত্যেকটি প্রজেক্টের একজন প্রসেস ওনার থাকতে হবে। যার সেই প্রজেক্টের ওপর হলিস্টিক পার্সপেকটিভ ভিউ অফ রিয়েল পিকচারের ওপর জ্ঞান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি টিম গঠন করার সাথে সাথে ফলোআপের ব্যবস্থা করতে হবে। টাইম লাইন, বাজেট এবং লিড টাইমের ওপর কড়া নজর দিতে হবে। কোনো অগ্রহণযোগ্য অজুহাত গ্রায্য করা যাবে না। সর্বোপরি ডেভিয়েশনের কারণ যদি মনঃপূত না হয় তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে, যা হতে পারে কর্মীর চাকরিচ্যুতি বা অন্য কোন সাজা।

তা না হলে এসব টিম গুড ফর নাথিং হবে। এমতাবস্থায় কোন অর্গানাইজেশন বা সমাজের বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দুর্নীতি এবং অনীতির সাথে জড়িত হয়ে কোম্পানি বা দেশের বারোটা বাজিয়ে ম্যানেজমেন্ট বা সরকারের অধঃপতন ডেকে আনবে।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু শিখেছি তা হলো কী পরিমাণ অর্থ এবং সময় ব্যয় হবে তা যেমন নির্ধারণ করা দরকার তেমনভাবে এসব টিম থেকে কী এক্সপেকটেশন তাও পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতে হবে। তা না হলে সময় এবং অর্থ দুটোই অপচয় হবে এবং কোনো সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যাবে না।

বর্তমানে এ ধরনের ব্যর্থ প্রজেক্ট বিশ্বের অনেক কোম্পানি এবং দেশে লক্ষ্যণীয়। যখনই কোথাও কোনো ডেভিয়েশন বা অঘটন ঘটে তৎক্ষণাৎ কোম্পানি বা সরকারের ঊর্ধ্বতন নেতা/নেত্রীর নির্দেশে তদন্ত টিম গঠন করা হয় বটে তবে এর কোনো কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয় না।

যার ফলে কোম্পানির ক্ষেত্রে কর্মচারীরা মোটিভেশন হারিয়ে ফেলে। কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের ওপর কর্মীদের নেতৃত্ব এবং বিশ্বস্ততা বিলীন হয়ে যায়। দেশের ক্ষেত্রে মানুষ পুরো আস্থা হারিয়ে ফেলে প্রশাসনের ওপর। একই সাথে নেতৃত্ব এবং গণতন্ত্রের বিশ্বস্ততার অবক্ষয় হতে শুরু করে।

সরকারের কাজ কর্মের ওপর জনগণ প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। শেষে যেমন ম্যানেজমেন্ট প্রশাসন এবং আইন ব্যবস্থার ভারসাম্য হারায় ঠিক তেমনি করে দেশ অরাজকতা, দুর্নীতিসহ নানা ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়।

সরকার তার ব্যর্থতার সমস্ত দায়ভার এড়িয়ে একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করে। কোনো এক সময় অরাজকতা জটিল আকারে সারা দেশে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় ঠিক তখনই মার্শাল 'ল জারি করে দেশের গণতন্ত্রের পরিকাঠামোকে দুর্বল করে ফেলা হয়।

এমন একটি সিসুয়েশনে জনগণ সম্পূর্ণরূপে হারায় বাক স্বাধীনতা। মার্শাল 'ল বহির্বিশ্ব থেকে সাপোর্ট পায় না। দেশে দুর্ভিক্ষ, মহামারীসহ হাজারও সমস্যা শুরু হয়। মিলিটারি সরকার তখন আর দেশকে কন্ট্রোল করতে পারে না যতই তাদের চেষ্টা বা ক্ষমতা থাকুক না কেন।

একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ এ ক্ষেত্রে তুলে ধরা যেতে পারে বেলারুশকে দিয়ে। বেলারুশের জনগণ এখন আর তাদের স্বৈরাচারি সরকারকে মেনে নিতে রাজি নয়। বেলারুশের সরকার এবং তার প্রশাসন স্বয়ং রাশিয়ার সাপোর্ট পাওয়া সত্ত্বেও নিজেদের জনগণ এবং বিশ্বের সহযোগীতা থেকে বঞ্চিত। বেলারুশের জনগণ এবং গোটা বিশ্ব (রাশিয়া ছাড়া) সরকারকে উৎখাত করতে উঠেপড়ে লেগেছে।

আমি বাংলাদেশের নানা সমস্যা ফলো করে আসছি দূরপরবাস থেকে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে। বড় বড় অঘটন ঘটলেই সরকারের তরফ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কর্তৃপক্ষ বেশ তোড়জোড় করে কাজ শুরু করে। জনগণ আশাবাদী হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে হয়তো বিশেষ পরিবর্তন আসবে এই ভেবে।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় এক্ষেত্রে কাজের চেয়ে কথা বেশি হয়ে থাকে। এর ফলে সাধারণ জনগণ হতাশ হয়ে পড়ছে সেই সাথে দেশের সার্বিক মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে ফেলছে। কী করণীয় থাকতে পারে এর থেকে রেহাই পেতে?

আমি মনে করি যে ভুলের কারণে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গণতন্ত্র হারিয়েছে এবং পরাজিত হয়েছে তা থেকে আমাদের অনেক শিক্ষণীয় আছে। এক্ষেত্রে অতীতের ভুল থেকে নিজেদেরকে শোধরানো খুবই জরুরি। সর্বশেষে বলতে চাই দেশের পরিকাঠামো গঠনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার বাস্তবায়নই হোক বাংলাদেশকে সোনার বাংলা করার মূল লক্ষ্য।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন থেকে, [email protected]

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

ফোন: 02-9110584, +8801907484800

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড