• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১৫ কার্তিক ১৪২৭  |   ৩১ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

আলবেয়ার কামু : দ্যা ফার্স্ট ম্যান উইদিন অ্যাবসার্ডিটি 

  সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার

২৯ আগস্ট ২০২০, ১৯:৫৪
করোনা
ছবি : সংগৃহীত

দুপুর ২টা ছুঁই ছুঁই। ৪ জানুয়ারি ১৯৬০। প্যারিস থেকে ১০৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর ফ্রান্সের সেন শহরের একটা গ্রাম। লাইওন-প্যারিসের ৬নং রুট ধরে ছুটছিলেন তাঁরা। মিশেল গ্যালিমার্ড চালাচ্ছিলেন ভ্যাসেল ভেগা নামের একটা গাড়ি। ভেতরে গ্যালিমার্ডের স্ত্রী-কন্যা। আর আছেন মানুষের চিন্তার বাঁক ঘোরানো নতুন ইতিহাসের এক অনবদ্য সৃষ্টিশীল মানুষ, সদ্য নোবেল বিজয়ী দার্শনিক আলবেয়ার কামু। গ্যালিমার্ড ছিলেন তাঁর এক প্রকাশকের ভাতিজা। কামুর স্ত্রী কন্যা ফিরছেন ট্রেনে, অনেকটা অনিচ্ছার পরও হয়তো গ্যালিমার্ডের অনুরোধে গাড়িতে একসাথে আসছেন। ছুটে চলেছেন তাঁরা গ্রামের রাস্তা দিয়ে। হঠাৎ সজোরে ধাক্কা, বিকট শব্দে ছিন্নভিন্ন হয়ে অন্তত ৫০০ ফুট দূরে ছিটকে পড়লো গাড়ির যন্ত্রাংশ। গাড়ির ভেতর যেন ঘুমিয়ে আছেন একজন, চিরঘুম। শুধু কপালের এপাশ থেকে ওপাশে একটা লম্বা আঁচড়। যে মৃত্যুকে এতকাল উপহাস করেছেন সেই মৃত্যুর হিম শীতল পরশ তাঁকে শান্তিতে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে মুহূর্তের এক ঝড়ে।

ছোট একটা ছুটি কাটিয়ে প্যারিসে ফেরার পথে এমন এক দুর্ভাগ্য অপেক্ষা করছিল তাঁর জন্য। ব্রিফকেসের ভেতর পুলিশ খুঁজে পেল পাসপোর্ট, কিছু ছবির সাথে ফেড্রিক নিটসের The Gay Science, সেক্সপিয়ারের Othelo আর নিজের বই The First Man ('Le Premier Homme) -এর হাতে লেখা ১৪৪ পাতার ম্যানুস্ক্রিপ্ট। আত্মজীবনীমূলক এই বই কামুর মৃত্যুর ৩৪ বছর পর ১৯৯৪ সালে প্রকাশ করেন তাঁর মেয়ে ক্যাথেরাইন কামু। কেন এতো সময় নিয়েছেন এই বই প্রকাশ করতে? সে সময় প্রকাশিত হলে কামুর অপ্রিয় সত্য কথাগুলো হয়তো কেও গ্রহণ করতো না। বিশেষকরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তিনি যা লিখেছিলেন তা হয়তো তাঁকে মরণোত্তর হিমঘরে পাঠাতো। একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যদিকে আলজেরিরার যুদ্ধ–এই দুই বিশ্ব পরিস্থিতির তীব্র সমালোচক কামু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে কিছু কথা লিখেছিলেন, যার দরুন জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় তাঁর মেয়ে চাননি কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা তৈরি হোক যা তাঁর নোবেল প্রাপ্তির মুহূর্তটা ম্লান করে দিক। মেয়ে লিখছেন, “... আমার মা চাননি এই ঝুঁকিটুকু নিতে। সময় গড়াল, আমার মায়ের মৃত্যুর পর ... একটা সময় হয়তো আসলো যখন মনে হলো তাঁর চিন্তা আর অপাংক্তেয় না”।

অবশ্য তাঁর মৃত্যু ঘিরে রহস্য এখনো হয়তো রয়ে গেছে মানুষের মনে, যেমন ২০১১ সালে ইতালির এক পত্রিকা লিখেছিল, তাঁর কার দুর্ঘটনার জন্য তৎকালীন KGB-র হাত ছিল। যাই হোক। এমন একটা মৃত্যু কি তিনি চাননি? চেয়েছেন তো! অনেকবার চেয়েছেন, লিখেছেনও। কেন চেয়েছেন, কেন চাওয়া উচিৎ মৃত্যু – এ নিয়ে বিস্তৃত হয়েছে বিশ শতকের এক নতুন দর্শন। এটাকে হয়তো আমরা বলি দ্যা ফিলসফি অব অ্যাবসার্ডিজম বা নিহিলিজম। কামুর প্রত্যেকটা চিন্তা আবর্তিত হয়েছে এই ধরণের জীবনবোধ থেকে। এক উদ্ধারহীন শ্বাসরুদ্ধকর এই পৃথিবীতে যখন অদ্ভুত এক আঁধার নেমে আসে তখন বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশাটুকু হারিয়ে গেলে এক নতুন জীবনবোধ তৈরি হয়, কামু ছিলেন বিশশতকের এমনই এক মন-দর্শনের অগ্রদূত। তবে হয়তো অনেক প্রাচীন বোধেরই এক নবতর চেতনা। খ্রিস্টপূর্ব ১০৬ অব্দে রোমান সাম্রাজ্যের শাসক সিসেরো থেকে শুরু করে হাল আমলের ভিটগেন্সটাইন– অনেকেই অ্যাবসার্ডিজম ধারা বহন করে চলেছেন।

“প্রথম দিনের সূর্য/ প্রশ্ন করেছিল/ সত্তার নূতন আবির্ভাবে--/ কে তুমি,/ মেলেনি উত্তর।/বৎসর বৎসর চলে গেল,/দিবসের শেষ সূর্য/ শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল পশ্চিম-সাগরতীরে,/নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়--/ কে তুমি,/ পেল না উত্তর”। আপদমস্তক আশাবাদী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনশেষে এহেন বোধ কেন এসেছিলো? ১৯৪১ সালের ২৭ জুলাই “শেষলেখায়” এই কবিতার ভেতর তিনি কী উত্তর চেয়েছেন? হয়তো জীবনের অর্থ খুঁজেছিলেন, হয়তো খুঁজেছিলেন জীবনের এই হার না মানা দীর্ঘ যাত্রার শুরুটা; এমনকি বুঝেছিলেন হয়তো এই সমগ্র আয়োজনের নিরর্থকতা, কিন্তু উত্তর মেলেনি। ১৮৮৭ সালের স্প্রিং-ফল এ দ্যা উইল টু পাওয়ার এ ফেড্রিক নিটসে ঠিক একই কথা বলেছিলেন নিহিলিজম বা শূন্যবাদের বিস্তৃত ব্যাখ্যায়। নিটসে লিখেছিলেন, “শুন্যবাদ আসলে কী? জীবনের চরম অর্থটুকু যখন নিজেই হারিয়ে যায় শুন্যতার অতলগর্ভে। এর কোন মানে নেই, কেন? মেলেনা উত্তর”(What does nihilism mean? That the highest values devaluate themselves. The aim is lacking; “why?” finds no answer)।

জীবনের এই অর্থ মেলা না-মেলার দ্বন্দ্ব কী তাহলে রবীন্দ্রনাথকেও আচ্ছাদন করেছিলো? অন্তত এতোটুকুন বলা যায় এক ধরণের সংশয় সম্ভবত তাঁর মনাকাশে মেঘের সঞ্চার করেছিলো।কারণ এর দু’দিন পর তিনি লিখলেন, “যতবার ভয়ের মুখোশ তার করেছি বিশ্বাস ততবার হয়েছে অনর্থ পরাজয়।এই হার-জিত-খেলা—জীবনের মিথ্যা এ কুহক শিশুকাল হতে বিজড়িত পদে পদে এই বিভীষিকা— দুঃখের পরিহাসে ভরা চলচ্ছবি— মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে”। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় রবীন্দ্রনাথ যে অর্থে এক ধরণের প্যাসিমিজমের জালে আটকে পড়েছিলেন জীবণের প্রায় শেষভাগে সেটা অবশ্যই একটা প্যাথলজিক্যাল প্যাসিমিজম। হয়তো খুব কম মানুষ মৃত্যুশয্যায় এধরণের বোধ এড়াতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপে অতি মজবুত এক দার্শনিক নিহিলিজমের জন্ম হয়েছিলো যা জার্মানির শোপেনহাওয়ার, নিটসে, হাইডেগারের হাত ধরে প্রবেশ করেছিলো ফ্রান্সে। আলবেয়ার কামু-র দর্শন সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত অবস্থান যা অ্যাবসাডিজম বা নিহিলিজম নামে আমাদের কাছে পরিচিত। জীবনের চূড়ান্ত মানে খোঁজ করার এক অনর্থক প্রচেষ্টার অন্ধকারে হারিয়ে ফেলার নামই সম্ভবত অ্যাবসাডিজম বা নিহিলিজম। সতের শতকের ইংরেজ কবি John Dryden যেমনটি লিখেছেন “When I consider life ‘tis all a cheat/ Yet, fooled with hope, men favour the deceit”।

১৯১৩ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে ফ্রান্স আলজেরিয়ার উত্তরপূর্ব অংশের অ্যানাবা শহরের মন্ডভি গ্রামে এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলবেয়ার কামু। দিনটা ছিল ৭ নভেম্বর। বাবা লুসিয়ান অগাস্টে কামু প্রাক্তন মিলিটারি ম্যান, মদের কারবারি। আর মা ক্যাথেরিন গোলাবারুদ ফ্যাক্টরির আয়া। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেনাবাহিনীতে ডাক পড়লে তাঁর বাবা মার্নের যুদ্ধে ১৯১৪ সালের ১১ অক্টোবর নিহত হন। তখন এক বছরের কম বয়স কামুর। বাবার স্মৃতি তাই মনে থাকার কথা না। তবে তিনি একটু বড় হয়ে শুনেছিলেন তাঁর বাবা নাকি প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় এক মানুষকে হত্যা করতে দেখে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেটা তাঁর শিশু মনের ওপর সাঙ্ঘাতিক প্রভাব পড়েছিল। তিনি যে Outsider বা Reflections on the Guillotine লিখেছিলেন তার ভেতর ঐ স্মৃতি মনে রেখে মৃত্যুদণ্ডকে সারাজীবন ঘৃণা করেছিলেন তিনি। কামুর মা ছিলেন একজন প্রতিবন্ধী। স্বামীর মৃত্যুর পর এমন অসহায় অবস্থায় তিনি আলজেরিয়াতে বাবার বাড়ি গিয়ে ওঠেন। ভীষণ অপরিচ্ছন্ন আর দারিদ্র্যে জর্জরিত এই পরিবারে তিনি আশ্রিত হলে দুঃখ নেমে আসে। কামু তাঁর জীবনী The First Man -এ সেই বর্ণনাতীত কষ্টগুলোর কথা লিখেছেন। তিন রুমের সেই এপার্টমেন্টে ছিল না কোন শৌচাগার, ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না জলের বন্দোবস্ত। অন্যান্যদের মতো ছোটবেলার আনন্দটুকু তিনি কোনোদিন উপভোগ করতে পারেননি। এক অসহায়, ক্লান্তিকর, দারিদ্রক্লিষ্ট, দমবন্ধ হওয়া পরিবেশে কামু বড় হতে শুরু করেন। জায়গাটার নাম ছিল বেলকোর্ট।

ঘিঞ্জি বেলকোর্টের শৈশবে যেন একটু শান্তির পরশ এলো যখন স্থানীয় এক মিশনারিতে ভর্তি করানো হলো তাঁকে। দুঃসহ দারিদ্র আর আনন্দহীন জীবন যেন একটু পাল্টাতে শুরু করলো যখন মিশনারিতে ফাদার ইতিহাস আর সাহিত্যের ক্লাস নেয়া শুরু করেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তিনি গ্রান্ড লাইসি হাইস্কুলে ভর্তি হন, পান বৃত্তি। তবে এখানে এসে তিনি মুসলিমদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পান কারণ কেশব নামে ঐ জেলায় অনেক মুসলিম বাস করতেন। হাইস্কুলে এসে তিনি ল্যাটিন, ইংরেজি শেখার ব্যাপক সুযোগ পান যার প্রেক্ষিতে তিনি হয়ে উঠেন একজন সর্বগ্রাসি পাঠক। পড়তে শুরু করেন Henri Bergson, Paul Verlaine, Andre Paul Guillaume Gide, Marcel Proust -সহ আরও অনেককে। এরা সবাই ছিলেন নামকরা ফরাসী সাহিত্যিক, কবি কিম্বা দার্শনিক। উল্লেখ করার মত একটা ব্যাপার হলো, ছোটবেলায় একবার কামু গিয়েছিলেন ফুটবল খেলতে। দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো তাঁকে গোলরক্ষকের কিন্তু তিনি দেখলেন গোলরক্ষণ এমন একটা জিনিস যা কখনই মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী আসতে চায়না। অর্থাৎ সবসময় এটা থেকে যায় অপ্রত্যাশার আড়ালে। এই শিক্ষাটা তাঁর পরের জীবনে কাজে লেগেছিল কারণ তিনি লক্ষ্য করেন তাঁর আশপাশে কেহই সোজাসাপ্টা না। যাদের কাছ থেকে যেটা প্রত্যাশা করেন, ঘটে তার উল্টো।

১৯৩২ সালের জুনে স্নাতক শেষ করেন এবং ভবিষ্যতে একজন জার্নালিস্ট হওয়ার জন্য মনস্থির করেন কামু। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭ সালের ভেতর তিনি জীবন বাঁচানোর তাগিদে বিভিন্ন যেনতেন কাজ করতে থাকেন। ইতোমধ্যে বিয়ে করেন সিমন হাই নামে একজনকে তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিচ্ছেদ ঘটে তাঁদের। এসময়ে অর্থাভাবে তিনি খুব নিম্নমানের কিছু চাকরি করেন যেখান থেকে জীবন ও জগত সম্পর্কে ভিন্নরকম অনুভূতি হয় তাঁর যা পরবর্তীতে কাজে লাগে। এই ’৩৩ সালেই তিনি ইউনিভার্সিটি অব আলজিয়ার্স থেকে দর্শন, মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের ওপর ডিপ্লোমা অর্জন করেন। তাছাড়া এসময়ে কিছু বুদ্ধিজীবী তরুণদের নিয়ে তিনি একটা থিয়াটার গ্রুপ গড়ে তোলেন। তাঁর প্রথম নাটক Revolt in Asturia সে সময়ে প্রকাশিত হয় যা কিনা স্প্যানিশ যুদ্ধে ভাগ্যহত শ্রমিকদের জীবন নিয়ে লেখা।

কামু সে সময়ে কম্যুনিস্ট পার্টির একজন সদস্য ছিলেন। কিন্তু কিছু মত পার্থক্যের জন্য তাঁকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পরপরই তিনি নাটক জগতে মনোনিবেশ করেন এবং Théâtre de l’Equipe নামে একটা নাট্যদল গঠন করেন। ১৯৪০ এর দশকে কামুর সাহিত্য খ্যাতি ক্রমেই বাড়তে থাকে, এবং তাঁর নাম আলজেরিয়া থেকে ধীরে ধীরে বিশ্বাভিমুখি হয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে Francine Faure নামে একজনের সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ওরানে এ সময় একটা প্রাইভেট স্কুলে ফ্রান্সের ইতিহাস ও ভূগোল বিষয়ে পড়ানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। ১৯৪২ সালে তিনি লেখেন Stranger যা তাঁকে বিশ্বখ্যাতি এনে দেয়। বইটার একটা রিভিউ করে দেন জ্যাঁ-পল-সার্ত। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে ফ্রান্সে ফিরে এসে তিনি একটা গোপন পত্রিকা Combat সম্পাদনার কাজে হাত দেন যা ছিল মূলত ফ্রান্সের প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখপাত্র। যুদ্ধ শেষে দু’জন যমজ সন্তানের বাবা হন কামু। এসময়ে কামু আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ পান। এসময় তিনি উপন্যাস লেখেন The Rebel যেটা বিশ্বখ্যাত হয় পরবর্তীতে। ইতোমধ্যে তাত্বিকভাবে মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। বিচ্ছেদও ঘটে। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত The Plague উপন্যাসটি কামুর অন্যতম এক ফিকশন। প্লেগে ছেয়ে ফেলা ফ্রান্স আলজেরিয়ার ওরান শহরের জীবন নিয়ে উপন্যাস। প্লেগকে কেন্দ্র করে মানুষের জীবনের দুঃখ ও টানা পড়েনের ছবি এঁকেছেন কামু এই উপন্যাসে।

১৯৫৭ সালে কামু নোবেল ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে নোবেল পুরষ্কার পান মাত্র ৪৪ বছর বয়সে। রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর পর তিনি এযাবৎ কালে নোবেল প্রাপ্তদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। নোবেল পুরষ্কার মূলত কামুকে বিস্মিত করেছিলো। কেননা তাঁর ধারণা ছিল এন্ড্রি মালরক্স-এর এ পুরষ্কার পাওয়া উচিৎ। সাহিত্যিক মালরক্স সম্পর্কে তিনি খুব উচ্চ ধারণা রাখতেন। নোবেল কমিটির সামনে বক্তৃতায় তিনি ভীষণ বিব্রতকর কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, “প্রতিটা মানুষ বিশেষ করে শিল্পী তাঁর স্বীকৃতিকে দারুণভাবে উপভোগ করেন, সেজন্য আমিও তাই করেছি। কিন্তু আমি বুঝে উঠতে পারিনি আপনাদের এই স্বীকৃতি সত্যি এমন একজন তরুনকে ঘিরে যার সংশয়ের শেষ নেই, যার সামনে রয়েছে বিপুল পথ”।

১৯৫৭ সালেই তিনি একটা সেমি-ফিকশনাল বই লেখেন The Fall। বইটি সম্পর্কে বোদ্ধাজন অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করলেও তাঁর সব বইয়ের ভেতর সবচেয়ে কম সমাদৃত এটি। এটি লেখার পর পরই তিনি টিবি রোগে আক্রান্ত হন। আলজেরিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ হয়ে উঠলে মানুষিক ভাবে তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ফ্রান্সের এবং আলজেরিয়ান মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা তাঁকে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত করে।

অ্যাবসার্ডিজম বা নিহিলিজম

এ জীবনের অর্থ কী? আলবেয়ার কামু তাঁর সমস্ত সাহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস ও নাটকের ভেতর দিয়ে এ প্রশ্নটাই খোঁজ করেছেন। কামু মনে করেন এ জীবনের তেমন কোন মানে নেই। এবং এর কোন মানে থাকার কথাও নেই। এ ধরণের ভাবনার নাম অ্যাবসার্ডিজম যা অস্তিত্ববাদী দর্শনের একটা বিশেষ অংশ। কিন্তু যদি সত্যি সত্যি মানেই না থাকে অর্থাৎ জীবনটা যদি এক উদ্ভট বা উৎকট জঞ্জাল বলে মনে হয় তাহলে এর অবসান কোথায়? এর উত্তরে কামু তাঁর The Myth of Sisyphus-এ বলেন “সত্যি এটা গুরুত্বপূর্ণ দাশনিক প্রশ্ন আছে, এবং প্রশ্নটা আত্মহত্যা নিয়ে”। তিনি স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন এই উৎকট জঞ্জাল থেকে যৌক্তিক বাঁচার উপায় কি আত্মহত্যা?” তিনি বলেন, আত্মহত্যা কোন সমাধান না। অনেক দার্শনিকের মতো তিনি আত্মহত্যাকে জীবনের বিকল্প মনে করেন না। তিনি মনে করেন, এই উৎকট জঞ্জাল থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় এটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া। এ যেন ট্রেনে উঠে পড়া এক যাত্রী। অবধারিত এই যাত্রায় সামিল হওয়া মানে এর শেষ গন্তব্যে পৌঁছানো।

১৯৪২ সালে প্রথম উপন্যাস The Outsider-এ কামুর এই চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। উপন্যাসটি আমেরিকাতে The Stranger নামে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের নায়ক মার্শালই সেই কথিত বহিরাগত যাকে কামু বলছেন আউটসাইডার। তিনি ছিলেন একজন ফরাসী যুবক।বাস করতেন আলজেরিয়ায়। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে মারাত্মক এক মানসিক অবসাদ্গ্রথতার ভেতর দিয়ে। “মা আজ মারা গেছে অথবা হতে পারে কাল, আমি জানিনা”। কী পরিস্থিথিতে একজন মানুষ এতো নিরুত্তাপ হয় সেটা বোঝা যায় মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে। চারিদিকে শোকাবহ এক পরিবেশ, ঠিক এই অবস্থায় মার্শালের মুখে নেই কোন শোকের চিহ্ন, বরং অন্যান্য সময়ের মতো সে স্বাভাবিক। এর পরবর্তীতে এক সম্পর্কের জের ধরে মার্শাল একটা এক আরব যুবকে খুন করে। এর প্রেক্ষিতে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় তাকে এবং শেষমেশ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয় সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাবার মৃত্যু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আলজেরিয়ার ওপর ফ্রান্সের নিপীড়ন তা ছাড়া সীমাহীন দারিদ্র্য তাঁকে জীবন সম্পর্কে ভিন্ন রকম ভাবতে বাধ্য করেছে। মার্শালে একজন আরব হত্যার বিষয়টা আলজেরিয়ার ওপর ফ্রান্সের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। আলজেরিয়ার রাজনৈতিক স্বাধীনতার যুদ্ধ যেটা ১৯৫৪ সালে চূড়ান্ত রূপে প্রকাশিত হয় তার প্রাথমিক অবস্থা, মানুষের মনোভাব, সম্পর্ক ইত্যাদি আউটসাইডার-এ ফুটে ওঠে।

কামুর দর্শন ভাবনা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে (নন-ফিকশন আকারে)The Myth of Sisyphus বইয়ে। বইটা ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হলেও এটা ইংরেজি অনুবাদ আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে। কিয়ার্কেগার্ড, শোপেনহাওয়ার, নিটসের ধারাবাহিকতায় কামু বলেন জীবনের কোন মানে নেই, নেই কোন গভীর অর্থ। গ্রীক মিথলোজিতে সিসিপাসের জীবনের মতই মানুষের জীবন। দেবতার রুদ্ররোষে যেমন সিসিপাস আজীবন পাহাড়ের নিচে আটকে ছিল, পাথর ওপরে তোলার বার বার ব্যর্থ চেষ্টা করেও পারেনি ঠিক মানুষের জীবনটাও সিসিপাসের ট্র্যাজেডির মতো। মানুষ বাঁচে স্বপ্ন নিয়ে, আগামীকালের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু আগামীকাল তাকে নিয়ে মৃত্যুর দুয়ারে, তাই আগামীকাল যে তার শত্রু! মানুষের জীবন সম্ভবত এমনি এক অজানায় পাড়ি দেয়া, এক ঠিকানাহীন অনির্দেশ্যের পথে অকারণে ভেসে যাওয়া। এ পৃথিবীটা সে কারণেই বড্ড অস্থায়ী আর ক্ষণিকের। বাঙলার বাউলরা যখন পথে পথে গান গেয়ে ফেরে, “একদিন মাটির ভিতরে হবে ঘর রে মন আমার/ কেন বান্ধ দালান ঘর” তখন বোধকরি এই অ্যাবসার্ডিজমের ভেতর আমরা ডুবে যায়। তবে কামু একটা গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেন, এই পৃথিবীটা নিজে জঞ্জাল কিছু না, এমনকি মানুষের চিন্তাও না; তখনই অ্যাবসার্ড ঘিরে ধরে যখন মানুষ এই পৃথিবীর অবৈদ্ধিকতাকে বুঝতে চেষ্টা করে।

কামু বলেন মানুষের জীবনের কোন মুল্য আছে কি নেই সেটাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন। অন্যন্য প্রশ্নগুলো তাঁর কাছে বিশেষ একটা গুরুত্ব বহন করেনা। পৃথিবী নাকি সূর্য—কে কাকে মাঝে রেখে ঘুরল সেটা বিশেষ কোন গুরুত্বের বিষয় না। এটা না জানলে মহাভারত অসুদ্ধ হবেনা, কিন্তু তাকে অবশ্যই জানতে হবে, কেন সে বেঁচে থাকবে? কামু মনে করেন জীবনের যেহেতু কোন মানে হয়না তাই আত্মহত্যা এর একমাত্র পথ। সিসিপাসে তিনি বলেন “There is only one really serious philosophical problem, and that is suicide.”। সম্পূর্ণ নিরেশ্বরবাদী কামুর জগত ভাবনায় ছিল না পরা-বাস্তবতা, ছিল না পারমার্থিক সুখের প্রত্যাশা। প্রতিটা মানুষকে মরতে হবে, জীবনকে যতো দীর্ঘায়িত করা হোক না এযেন এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি।

তবে স্মরণ রাখতে হবে, কামু শুধু শুধু মানুষের জীবনকে অ্যাবসার্ড বলেননি, এটা এমন নয় যে আধুনিক জীবন অত্যন্ত জটিল, অত্যন্ত সমস্যাসংকুল, ব্যর্থতা, হতাশা, গ্লানি আর ক্লান্তিকর, তাই এ জীবন অর্থহীন। কামু এটা বোঝাননি বরং তিনি বুঝিয়েছেন, আমাদের অস্তিত্বের গভীরে লুকিয়ে আছে ভীষণ এক অসামঞ্জস্যতা। অ্যাবসার্ডের জন্ম মানুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে, বেঁচে থাকার নিরন্তর ইচ্ছের মধ্যে, ইচ্ছে আর বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মধ্যে, জীবনের অগ্রস্ররমানতার বিরুদ্ধে, এই বোধহীন নিরুত্তাপ মহাবিশ্বের মধ্যে। কামুর অ্যাবসার্ডিজম যতটা রাজনৈতিক বা সামাজিক তার থেকে ঢের বেশি, এটাই ফিলসফিক্যাল অ্যাবসার্ডিজম। কামুর নিহিলিজম গৌতমবুদ্ধের থেকেও তীব্র এবং মারাত্মকভাবে সাংগঠনিক। বুদ্ধকে অনেকে নিরেশ্বরবাদী, নিহিলিস্ট, অ্যাবসার্ডিস্ট ইত্যাদি বলেন। কিন্তু যেখানে চূড়ান্ত বিচারে মানুষ চির মুক্তির আশা করে সেখানে কীভাবে তাঁকে এগুলো বলা যাবে? এক্ষেত্রে কামু ছিলেন ভিন্ন রকম। জ্যাঁ-পল-সার্ত তাই আউটসাইডারের রিভিউ করতে গিয়ে লেখেন, “The absurd, to be sure, resides neither in man nor in the world, if you consider each separately. But since man’s dominant characteristic is ‘being in the world,’ the absurd is, in the end, an inseparable part of the human condition.”

২০১৮ সালের ৪ মার্চ Los Angles Review of Books এর সম্পাদক Robert Zaretsky এর সাথে এক ইন্টারভিউতে তাঁর মেয়ে ক্যাথেরাইন কামু বলেন, “আমার বাবা ঠিক অন্যদের মতই একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর লেখা আমাদের স্মরণ করায় আমাদের দুর্বলতা, ভুলভ্রান্তিও আমার মহানভবতার সাথে যুক্ত। আমি খুব ছোটবেলা থেকে বাবার নিঃসঙ্গতা, এবং কষ্টগুলো কাছ থেকে অনুভব করতাম। কিন্তু আমি খুব ছোট ছিলাম, তাই তাঁকে আমি আমার ভীষণ শ্রদ্ধাকরার কথাগুলো বলতে জড়তা অনুভব করতাম।(My father was human like the rest of us. But his writings remind us that our weakness and fallibility also make for our greatness. Personally, I felt from an early age my father’s solitude and suffering. But I was too small, too shy to tell him that I loved him just as he was. ) তিনি আরও বলেন, তিনি সত্যি অত্যন্ত গর্বিত যে তিনি আলবেয়ার কামুর সন্তান। তাঁর বাবার সাহিত্যকর্ম, চিন্তার ঋজুতা, তাকে আজও অনুপ্রাণিত করে। নোবেল পুরস্কারের মতো এতো বড় একটা স্বীকৃতির মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৬০ সালে তাঁর মৃত্যু যেন মাঝ আকাশে এক নক্ষত্রের পতন। ফ্রান্সের ভিলেব্লেভেন শহরে ব্রোঞ্জের এক স্মৃতিফলকে এই ক্ষণজন্মা মানুষটার নিয়ে লেখা হয়, “"From the General Council of the Yonne Department, in homage to the writer Albert Camus whose remains lay in vigil at the Villeblevin town hall on the night of 4 to 5 January 1960"।

লেখক : সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার, অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801703790747, +8801721978664, 02-9110584 

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড