• বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫ আশ্বিন ১৪২৭  |   ৩০ °সে
  • বেটা ভার্সন
sonargao

চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক হোক বন্ধুত্বপূর্ণ

  মীর আব্দুল আলীম

২৭ জুন ২০২০, ২৩:১৪
মীর আব্দুল আলীম
মীর আব্দুল আলীম

চিকিৎসকরা প্রায়শই রোগীর স্বজনদের হাতে লাঞ্চিত হন। দেশে চিকিৎসক হত্যার ঘটনাও ঘটে মাঝেমাঝে। সর্বশেষ পত্রিকান্তে দেখলাম, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে ১৬ জুন খুলনায় ডা. রকিব নামে এক চিকিৎসককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এক অন্ত:স্বত্বা মায়ের সন্তান প্রসবে চেষ্টা করেন আনাড়ি দাই। তারপর তাকে নগরীর রাইসা ক্লিনিকে নেয়া হলে দ্রæত সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শিউলি বেগম রাইসা। শিউলি বেগমের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়ার পথে ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়। ভুল চিকিৎসায় শিউলি বেগমের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেন তার পরিবারের লোকজন। এ জন্য ডা. রকিবকে দায়ী করে তার ওপর হামলা করে রোগীর স্বজনরা। এ ঘটনায় ডা. রকিব মারা গেলে পরিবারের লোকজন খুলনা সদর থানায় একটি মামলা করেন।

বরাবরই লক্ষনীয়, বিলম্বিত চিকিৎসা গ্রহন, আনাড়ি দাইয়ের দোষের দায় চাপানো হয় চিকিৎসকের উপর। সরকারী হাসপাতালের অব্যবস্থা, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং লোকবলের অপ্রত্যুলতার দ্বায় চাপে চিকিৎসকদের উপর। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী না দিয়ে করোনাকালীন সময়ে চিকিৎসা করতে গিয়ে আমাদেও অনেক চিকিৎসক প্রাণ দিয়েছেন। এর পরও চিকিৎসা সংকটের দায় যেন কেবল চিকিৎসকের। এদেশে সাধারন এক বিষয় হলো রোগীর মৃত্যু হলে বলা হয় ভুল চিকিৎসার কথা। ভুল চিকিৎসার বিষয়টি তাৎক্ষনীক নির্নয় করেন রোগীর স্বজন কিংবা সাংবাদিক সাহেবগণ। তার পর যা হবার তাই হয় চিকিৎসক লাঞ্চনা কিংবা আহত নিহতের ঘটনা।

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা আর মানুষ মেরে ফেলার এমন অভিযোগ ওঠে মাঝে মধ্যেই। হাসপাতালে রুগী মারা গেলে সোজা খুনের দায় চাপে ডাক্তারের উপর। কথায় কথায় বলা হয় ভুল চিকিৎসার কথা। পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয় ‘ওমক হাসপাতালেরর ওমক ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’। ভুল চিকিৎসার নিশ্চিত কিভাবে হন একজন সাংবাদিক কিংবা রোগীর স্বজন। এটাতো প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয়।অসুস্থ্ মানুষই ডাক্তারের কাছে কিংবা হাসপাতালো আসেন। জীবন মৃত্যুও সন্ধিক্ষণে থাকা মুমূর্ষু রোগীদের আনা হয় হাসপাতালে। সৃষ্টিকর্তাই জীবনের মালিক। মানুষ কেবল চেষ্টা করে মাত্র। প্রায় ক্ষেত্রেই অসুস্থ মানুষটি মারা গেলে বলা হয় ভুল চিকিসৎসার কথা। ব্রেইন স্ট্রোক, হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষতো সব সময়ই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন। হাজারো সমস্যার বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা নেই তা কিন্তু না। কোন কোন ডাক্তারও অবহেলা করেন, রোগীদের সাথে পশুর মতো আচরণ করেন। এমন অনেক হচ্ছে। তবে সব ডাক্তার কি এমন বাজে কাজ গুলোর সাথে জড়িত? ভালো গুণের এবং মানবিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যাই এখনও অনেক বেশি। এদেশে ভূল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুও ঘটনা ঘটে। উন্নত বিশে^ও ভুল চিকিৎসার বহু উদাহরন রয়েছে। তাই বলে সব ঘটনাকেই ভুল চিকিৎসা বলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সঠিক নয়। তাতে চিকিৎসক রোগীর সম্পর্কের অবনতি ঘটবে বৈকি! চিকিৎসকরা এক্ষেত্রে রোগীদের জন্য আর ঝুুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিৎসায় ঝুকি নিতেই হয় নইলো রোগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কথায় কথায় চিকিৎসকের গায়ে হাততোলা,ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করা, হত্যা করা এমন ঘটনায় ডাক্তারগণ রোগীর চিকিৎসা দিতে অনুৎসাহিত হবেন। যা রোগীদেও জন্য সুখকর সংবাদ নয়। এমন বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক মেধাবী চিকিৎসক এখন দেশ ছাড়ছেন এমন খবরও আমাদের কাছে আছে। এটাও অনেক বড় দু:সংবাদ বটে!

সেবার শপথ নিয়েই চিকিৎসকদের চিকিৎসা পেশায় প্রবশ করতে হয়। এ পেশাটি রাষ্ট্রের অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক বেশি সম্মানের। এটা পেশা হলেও চিকিৎসকরা মানুষের জীবন রক্ষায় কাজ করেন বলে এটি মানব সেবার একটি অংশও। এটা অনেকটা নিদ্বিধায় বলতে হয় আজকাল এ পেশার কতক চিকিৎসকের কারনে মানবিক চিকিৎসকগণও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। অনেক চিকিৎসক আে যারা কখনো রাজনৈতিক, কখনোবা অমানবিক আচরণও করে গোটা চিকিৎসক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। করোনা ভাইরাস এমন সঙ্কটের মধ্যেও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকরা যাচ্ছেন না, চেম্বার করছেন না এমন অভিযোগ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। যা অমানুবিক বটে! আবার বহু চিকিৎসক দেশের এই সয়ংকটময় সময়ে রাতদিন রোগীদেরসেবায় ঝাপিয়ে পরে চিকিৎসা পেশা যে মহান তার স্বাক্ষর রাখছেন। জীবন বাজি রেখে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই জীবন বিপন্ন করেছেন।

রাতদিন একজন ডাক্তারকে পরিশ্রম করতে হয়। রোগীর ডাক পড়লেই তার ঘুম হারাম। আর তাকে যদি কথায় কথায় অপচিকিৎসা কিংবা খুনের অপবাদ কাঁধে নিয়ে চলতে হয় তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ায়? ভালো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেতো মানুষ। প্লিজ অপবাদ দিবেন না। অভিযোগ করতে হলে ভেবে করবেন। সঠিকটা করবেন। একথা কিন্তু সত্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আমাদের ডাক্তারগণ যে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তা কম নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। কিন্তু এখনও সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে ঘরে ফিরছেন। সিট সংকুলান না হলে সেখানে ডাক্তারের দোষ কোথায়। যারা বারান্দায় থাকেন তারাও কিন্তু চিকিৎসা পান। এখনও আস্থার জায়গা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

হুজুগে বাঙালি আমরা, বুঝেও লড়ি, না বুঝেও লড়ি। কথা বলতেতো সীমা পরিসীমা হারিয়ে ফেলতে ওস্তাদ সবাই। পাঠক বলেনতো, কতজন মানুষের জন্য কতজন ডাক্তার নিয়োজিত আছেন এদেশে। কত রোগীর চিকিৎসার সঙ্গতি আছে এদেশের হাসপাতাল গুলোর। ঢাল-তলোয়ার (ডাক্তার ঔষধ) না দিয়ে চিকিৎসা করতে বলবেন তা কি করে হয়? এক পরিসংখ্যানে এভাবেই উল্লেখ আছে- ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ডিপার্টমেন্ট এ প্রায় সকল প্রকার সার্জারি হয়। মোট ডাক্তারের সংখ্যা ১০০ জন। গত এক বছরে অপারেশন হয়েছে ৬৮০০০ এর মত। ছুটিছাটা বাদ দিয়ে ২৭০ দিন কর্মদিবস থাকলে প্রতিদিন অপারেশন হয়েছে প্রায় ২৫০টা। তার মানে, প্রতিটা সার্জন দিনে অপারেশন করেছেন ২.৫টার মত। অন্যদিকে সার্জারির আউটডোরে মোট রোগী দেখা হয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ। প্রতিদিন প্রায় ২২০০ এর মত। একজন ডাক্তার দেখেছেন প্রতিদিন ২২ টা রোগী। লাখ লাখ গরীব মানুষকে সুচিকিৎসা দিয়ে তারা তাদের আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ পান বেতন হিসেবে। আর এতো ঝুঁকি নিয়ে ইনফেকশনের মধ্যেও কাজ করেন, তবুও তারা ঝুঁকি ভাতা পান না। অথচ লোকজন কিছু ঘটলেই ডাক্তারদের গায়ে হাত তোলে, হাসপাতাল ভাংচুর করে। অথচ পরিসংখ্যান বলে যে, ৯৯% সুচিকিৎসা হলেও বছরে প্রায় ১০০০ জন রোগী ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু ২-৪ জন মারা গেলেই শুরু হয়ে যায় আমাদের দানবীয় তান্ডব। অথচ আমরা একবারও ভাবি না যে, একজন ডাক্তার ৭ দিন অসুস্থ থাকলে তিনি প্রায় ১৪০ জন রোগীর চিকিৎসা ও ১৫ জন রোগীর অপারেশন করতে পারবেন না।

স্কুল কলেজে যিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন তাঁরাই একদিন ডাক্তার হয়ে আসেন। সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটিই আজ সমাজে সম্মান পাচ্ছেন কম। বিবিএস করা একজন চিকিৎসক যে মর্যাদা পান কম মেধাবী সম্পন্ন বিসিএস অন্য প্রশাসনের লোক অনেক বেশি মর্জাদা পান। ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করেও অসম্মানীত হন একজন ডাক্তার। এভাবে চলতে থাকলে ডাক্তারগণ আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিৎসা সেবায় ঝুঁকি নিতে হয়। ঝঁকি না নিলে মুমূর্ষু রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়। কথায় কথায় গায়ে হাত তুললে, মামলা হামলা করলে, ভুল চিকিৎসার অপবাদ দিলে ডাক্তারগণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এটা রোগী কিংবা রোগীর পরিবারের জন্য দুঃসংবাদ বটে!

ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা কি সত্যি? কতটা সত্যি? ডাক্তারদের বিরুদ্ধে চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার যে ঢালাও অভিযোগ, তা ষোলোআনা সত্যি নয়। একেবারেই সত্যতা নেই তা বলছি না। বলছি অভিযোগের অনেকটাই অসত্য। তবে রোগীর পেটে ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়াসহ নানা রকমের ভুল চিকিৎসার সংবাদ মাঝেমধ্যেই জানা যায়। সংবাদগুলো মিথ্যা নয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দেশে অনেক ডাক্তার আছেন দেবতুল্যের মতো। ডাক্তার ধর্ম পালনের মতো করে মনপ্রাণ দিয়ে রোগীর সেবা করেন। এমন সব ডাক্তারকেও যখন আশঙ্কায় থাকতে হয়, রোগী মারা গেলে তার ওপর আক্রমণ হতে পারে, হতে পারে হাসপাতাল ভাঙচুর। মস্তিষ্ক, হৃদরোগসহ জটিল অপারেশনে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, ইউরোপ সব জায়গায় রোগী মারা যায়। আমাদের ডাক্তারদের সাফল্যের হার অন্য যেকোনও দেশের ডাক্তারের চেয়ে কম নয়। তাহলে আমাদের ডাক্তারের ক্ষেত্রে কেন শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হবে? ভুল চিকিৎসার দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে কেন আমাদের চিকিৎসকদের?বাংলাদেশে অনেক ডাক্তার ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাতে তাদের সুনাম শোনা যায় না কখনো। অনেক ভালো, মানবিক ডাক্তার আছেন সারাদেশে। কিছু খারাপ ডাক্তার যারা অনৈতিক বাণিজ্য করছেন তাদের তুলনায় ভালো ও নৈতিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। মন্দের জন্য ঘৃণা করেন, সাজার ব্যবস্থা করেন এটা সমর্থন করি। ভালো যারা করছেন তাদের গুণকীর্তনও কিন্তু করা দরকার।

পরিশেষে এটাই বলবো চিকিৎসকের এ মহান পেশাটা যেন কোনভাবে কলুষিত না হয়। দেশের চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে এ পেশাকে আগলে রাখতে হবে কারণ চিকিৎসা সেবা আমাদের জন্য জরুরি বিষয়।চিকিৎসকের সেবার সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি জড়িত। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনোই অধিকার নেই কারো। চিকিৎসকদের মাঝে নীতিনিষ্ঠা, মানবিকতা, সদাচার, কর্তব্যপরায়ণতা- এসব গুণের বেশি পূজারী হওয়ার কথা। অনেক চিকিৎসক এমনটাই। এ জন্য অবশ্য আপনাদের ক’জন ডাক্তারকে সম্প্রতি করোনা সংকটকালীন সময়ে জীবনও দিতে হয়েছে। চিকিৎসা পেশাটা তো এমনই। আর এমনটা হওয়াই উচিত। রোগী এবং রোগীর স্বজন, ক্ষেত্রভেদে চিকিৎসকদের কারনে ডাক্তার-রোগীর মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ দুরত্ব কমিয়ে চিকিৎসক রোগীর মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান রাখা দরকার। চিকিৎসক, রোগী এবং রোগীর স্বজনরাই তা করবেন। রোগী-ডাক্তার সম্পর্ক অটুট থাকবে-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক, [email protected]

চলমান আলোচিত ঘটনা বা দৃষ্টি আকর্ষণযোগ্য সমসাময়িক বিষয়ে আপনার মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই, সরাসরি দৈনিক অধিকারকে জানাতে ই-মেইলকরুন- [email protected] আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।
jachai
niet
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
niet

সম্পাদক: মো: তাজবীর হোসাইন  

 

সম্পাদকীয় কার্যালয় 

১৪৭/ডি, গ্রীন রোড, ঢাকা-১২১৫।

যোগাযোগ: +8801721978664

ই-মেইল: [email protected]

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

Developed by : অধিকার মিডিয়া লিমিটেড